চাঁদের বুড়ির চরকা-চিঠি ১৪২৩/১০ঃ আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি

গতবছর ইচ্ছামতীতে আমরা পড়েছিলাম মারি উইলকক্সের গল্প- কীভাবে একাশি বছর বয়সে তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে হারিয়ে যেতে পারে তাঁর নিজের মাতৃভাষা। যাতে সেরকম কিছু না ঘটে, তাই তিনি নিজের হারিয়ে যেতে বসা ভাষার অভিধান লিখছেন; এইভাবে যদি কোনদিন এমন হয় যে আমাদের অল্প চেনা কোন ভাষা বলতে, লিখতে, পড়তে জানা মানুষের সংখ্যা খুব বেশি কমে গেল; তাহলে কী হতে পারে? হয়ত হারিয়ে যাবে আমাদের দেশের মাঠে-ঘাটে গ্রামে-গঞ্জে-বনে-জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা নানারকমের রূপকথা এবং উপকথাগুলি- যেগুলি এখনও আমাদের শোনা হয়নি, জানা নেই। হারিয়ে যেতে পারে নানারকমের প্রয়োজনীয় গাছপালার হদিশ,অথবা চাষ-বাসের অজানা সব উপায়, যেগুলি এখনও শুধুই ঘুরে ঘুরে বেড়ায় অল্প কিছু মানুষের মুখে মুখে। তাঁরা আমাদের সেইসব জ্ঞানের হদিশ দিতে পারেন নি, কারণ তাঁরা হয়ত লিখতে-পড়তেই জানেন না; অথবা যাঁরা এইসব বিষয়গুলিকে নিয়ে খোঁজখবর পড়াশোনা করতে পারেন, তাঁরা ইংরেজি এবং অন্যান্য বিদেশি ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় দক্ষ নন।

এই কথা মাথায় রেখেই ২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ইউনেস্কোর থীম 'Towards Sustainable Futures through Multilingual Education' (একাধিক ভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে বহনীয় ভবিষ্যতের পথে')। গত কয়েকবছর ধরেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আন্তর্জাতিকভাবে জরুরী ভাষাগুলি শেখার পাশে পাশে স্থানীয় ভাষা এবং মাতৃভাষায় পড়াশোনার দিকে জোর দেওয়ার হচ্ছে। কারণটা বহুবার বলা হলেও আরেকবার বলে নিতে বাধা নেই - যেকোন জায়গার স্থানীয় মানুষদের নিজেদের প্রতিদিনের ব্যবহার করা ভাষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনের নানারকমের সমস্যার সমাধানের উত্তর; ছোট ছোট ছড়া, গান, উপকথা বা প্রবাদ-বাক্যের মধ্যে রয়ে যায় নানারকমের তথ্য, যেগুলি স্থানীয় কৃষি, শিল্প, এবং জীবনযাত্রার সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করে।অব্যবহারের ফলে এবং সংরক্ষনের অভাবে সেইসব স্থানীয় জ্ঞানভান্ডারগুলি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। এইরকম পরিস্থিতি যাতে উপস্থিত না হয়, তার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে উদ্যোগী হতে উৎসাহ দিচ্ছে ইউনেস্কো।

তবে সাথে আরেকটা কথা। আমাদের নিজেদের ভাষা, বাঙলা ভাষাও ক্রমশঃ একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমাদের মাতৃভাষাকে যতটা ভালোবাসা উচিত ততটা কিন্তু আমরা ভালোবাসা দিচ্ছি না। 'বাংলা' শুধুমাত্র স্কুলে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য একটা বিষয় নয়। এই ভাষা আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা। বাংলার সাথে রয়েছে আমাদের শিকড়ের যোগ, নাড়ীর টান। পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত ভাষার মত বাংলার উপকথা, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচনের মধ্যেও রয়ে গেছে এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা জ্ঞানভান্ডার, জীবনের নানা গল্প; ভালোবাসা দিয়ে, যত্ন করে সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।



ছবিঃ ইউনেস্কো এবং বিভিন্ন ফ্রী ইমেজ ওয়েবসাইট

undefined

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা