খেলাঘরখেলাঘর

বায়োস্কপের বারোকথা

(গত সংখ্যার পর)

বাংলা ছবির দুনিয়ায় 'উদয়ের পথে' এক অত্যন্ত  দামি মলাটবদল এই কারণে যে, এই ছবিতে প্রথম বড়লোক মিল/ কারখানা মালিকের মেয়ের সঙ্গে অতি সাধারণ শ্রমিক নেতার ভালবাসার গল্প দেখান হল। এই প্রথম, আমরা পর্দায় অন্তত ধনী-গরিবের পার্থক্য তুলে দিলাম। আজ পর্যন্ত যেকোন জনিপ্রয় ছবিতে এই একই  কথা বলা হয় - যে ভালবাসায় টাকার দাম থাকেনা।

উদয়ের পথে
উদয়ের পথে

এই ধারণার মডেল ছবি এই 'উদয়ের পথে'। তাছাড়া ছবিতে এসে গেছিল বাইরের শ্রমিক অশান্তি; ছবিতে দেখা গেল ট্রেড ইউনিয়নের অফিস ঘরে কার্ল মার্ক্স এ ছবি ঝুলছে। চলচ্চিত্র আর শুধু স্বপ্নের উপাখ্যান রইল না, তার মধ্যে অল্প অল্প করে দেখা দিতে লাগল বাস্তব। 

এর পরে আমাদের নাম করতে হবে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর পরিচালিত 'কল্পনা' ছবিটির। যদিও ছবিটির ভাষা হিন্দি, কিন্তু ছবিটি কলকাতায় তৈরি হয়েছিল আর উদয় শঙ্করের ম্যাজিক ছোঁয়ায় নাচ সেখানে নিজেই গল্প বলতে পেরেছে। যাঁরা নিরীক্ষামুলক ছবির কথা ভাবেন, তাঁদের কাছে এ এক মস্ত কৃতিত্ব।

উদয়শঙ্করের কল্পনা
উদয়শঙ্করের কল্পনা

আর , এর পরেই, ১৯৫১ সালে এল 'ছিন্নমূল' । এই প্রথম, জীবন প্রায় দলিলের মত উঠে এল ছবিঘরে। উদ্বাস্তু জীবনের অভিশাপ ও কান্নার বিবরণ দেওয়ার সময়ে পরিচালক নিমাই ঘোষ কোন রকম আপোস রফা করেন নি। মাত্র ১০,০০০ ফুটের এই ছবিটি আজ পর্যন্ত শহুরে উদ্বাস্তুর দুর্দশার সবচেয়ে প্রামাণ্য বর্ণনা। এই ছবির অভিনেতারা চলচ্চিত্রের পেশাদার অভিনেতা ছিলেন না। তাঁরা অনেকেই নাটকের কর্মী। তাঁদের অভিনয় দক্ষতা ছিল অবাক হয়ে যাওয়ার মত। এই ছবির ক্যামেরার কারিকুরী তো মুগ্ধ করে দেয়। এজন্যই বিখ্যাত সোভিয়েত পরিচালক পুদভকিন নিজে সে যুগের রুশ পত্রিকা প্রাভ্‌দায় ছিন্নমূলের একটি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। নিমাই ঘোষের বাজেট ছিল অত্যন্ত কম, এত কম যে তাঁকে প্রায় প্রতিটি প্রথম শট্‌কেই ওকে শট্‌ বলে মেনে নিতে হয়েছে। রিটেক করার সুযোগ পান নি। তবুও অপরিসীম নিষ্ঠায় তিনি আমাদের সিনেমার ভাষায় জীবনের প্রত্যক্ষ ছাপ এঁকে দিলেন ।

ইতিমধ্যে আরো কয়েকটি ঘটনা ঘটল যা আমাদের ছায়াছবিকে সাবালক করে দিল ৫০ দশকের গোড়াতেই । প্রথমেই বলতে হবে পৃথিবীর দুই দিকপাল পরিচালক ফ্রান্সের রেঁনোয়া ও রুশদেশের পুদভকিনের কলকাতা সফরের কথা। এতদিন অবধি আমরা ছবি বলতে বুঝতাম আমেরিকার হলিউড ঘরানার ছবি। আর নয়ত এই সব ছবিকে নকল করে তৈরি করা বাংলা বা হিন্দি ছবি। এই দুজন বড় পরিচালক আমাদের তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের জানালেন যে ছবি অন্যরকম ভাবেও করা যায়। কিভাবে আমাদের আশেপাশের ঘটে চলা সত্যিকারের ঘটনাগুলিকে ব্যবহার করে ছবি নানাধরনের গল্প বলতে পারে, সে খবর আমরা জানলাম এই দুই স্রষ্টার সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের সাক্ষাতকার পড়ে। সিনেমা মানেই যে শুধু হলিউড নত, আলাদা ভাবেও গল্প বলতে পারে, সেটা জানা কম কথা নয়।

রেঁনোয়া-পুদভকিন
জঁ রেঁনোয়া আর সেভোলোদ পুদভকিন

তরুণ চলচ্চিত্র উতসাহী ঋত্বিক ঘটক আর সত্যজিত রায় এই দুজনের কাছ থেকে নানা রকমের অভজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। আর নের পরেই হয় সব থেকে বড় এক অভিজ্ঞতা - ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উতসব। সেকথা বলব এর পরের বার।


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক
চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবিঃ
ইন্টারনেট