খেলাঘরখেলাঘর

প্রাণ ভরে...

এই ধরো পঞ্চাশ বছর আগের কথা,  ভারতে তখন কমিক্স বলতে শুধুই স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান। এর মধ্যে অবশ্য রামায়ণ,মহাভারত কমিক্স আকারে প্রকাশ করা হয়েছিলো। কিন্তু ভারতীয় নতুন কমিক্স ছিলো না বললেই চলে।

ঠিক এই রকম এক সময়ে মুম্বাইয়ের 'স্যার যে যে  স্কুল অব আর্টে' প্রাণকুমার শর্মা নামের এক যুবক ফাইন আর্ট নিয়ে পড়াশুনো করছিলো। তার কেনো জানি না সব সময় মনে হতো এখানে কমিক্স সেভাবে কেউ উপভোগ করতে  পারে না। কমিক্স পড়ে কেউ আনন্দ পাচ্ছে না, উপভোগ করতে পারছে না। তার মনে হলো সবার হয়তো বিদেশী সুপার হিরোদের গল্প ভালো লাগছে না। কিন্তু সেই সময় খুব কম লোকই নতুন কমিক্স নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতো বা বিদেশী কমিক্সের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করতো।

আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর প্রাণ 'মিলাপ' নামের এক দৈনিকে কার্টুনিস্ট হিসাবে যোগ দেন। এখানেই প্রাণ একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললেন। ডাব্বু নামের এক কমিক্স স্ট্রিপ তৈরী করে ফেললেন কিছু দিনের মধ্যে। তাঁর কমিক্সের চরিত্ররা হলো পাশের বাড়ির দুষ্টু ছেলেটা, পাড়ার ছোট্ট মেয়েটা, জেঠিমা, কাকু, কাকিমা। গল্প গুলো শহর কেন্দ্রিক অর্থাত শহরকে ঘিরে গড়ে উঠলো। ঠিক এর পরেই এলো চাচা চৌধুরী হিন্দি 'লটপট' ম্যাগাজিনের হাত ধরে।

চাচা চৌধুরীর কিন্তু কোনো অদ্ভুত ক্ষমতা নেই অন্যান্য সুপার হিরোদের মতো। তিনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ, বলতে পারো প্রবীন নাগরিক বা সিনিয়র সিটিজেন যাঁর একমাত্র ভরসা  ‘মগজাস্ত্র’, উপস্থিত বুদ্ধি। তাঁর বুদ্ধি সুপার কমপিউটারের থেকেও প্রখর। চাচী আর রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটি নেড়ি  কুকুর রকেটকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। তাঁর একমাত্র ছায়া সঙ্গী  সাবু, যে কিনা বৃহস্পতি গ্রহের বাসিন্দা। জানো তো বৃহষ্পতি হলো সবচেয়ে বড় গ্রহ, আর তাই সাবুও লম্বা, চওড়া আর বেশ শক্তিশালী। চাচা চৌধুরীর প্রখর বুদ্ধি আর সাবুর শক্তি এই দুইয়ে  মিলে গুন্ডা বদমাইশদের সাজা দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। রাকা নামের  এক ডাকাত হলো তাদের প্রধান শত্রু। লাল পাগড়ি, হাতে ছড়ি আর সাদা গোঁফ চাচা চৌধুরী মনে হয় সবচেয়ে প্রবীণ হিরো।

চাচা


তিনি জনতেন কমিক্সের চরিত্রদের কখোনো বয়স বাড়ে না বা কমে  না তাই তিনি বিভিন্ন বয়সের চরিত্রদের সৃষ্টি করলেন। যেমন পাঁচ বছরের ছোট্ট পিঙ্কি। বয়সে ছোট হলে কি হবে। সে আর তার ছোট্ট  কাঠবেড়ালী কুটকুট সাড়া পাড়া দাপিয়ে বেড়ায়। প্রশ্ন করে করে  সবাইকে ব্যাতিব্যস্ত করে তোলে।

আরেকদিকে আছে বিল্লু। সে স্কুলে যায়। তার আদরের কুকুরের নাম মোতি। বন্ধুরা মিলে যখন পাড়ায় ক্রিকেট খেলে তখন আশেপাশে  বাড়ির জানলার কাঁচ আর আস্ত থাকে না। পালোয়ান বজরঙ্গির  সঙ্গে তার যত ঝামেলা। কিন্তু বাড়িতে থাকলে বিল্লু শুধু টিভি দেখে।

এই সমস্ত কমিক্স পাঞ্জাব কেশরী, জগবানী, হিন্দ সমাচার, সন্ধ্যা টাইমস, ময়ূরা, লটপট প্রভৃতি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। পরে ডায়মন্ড কমিক্স এই গুলোকে বই হিসাবে প্রকাশ করে।

ভারতের কমিক্সের জগতে যিনি এত কান্ড ঘটিয়েছিলেন সেই প্রাণকে  ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়ার সম্পাদক মরিস হর্ণ(Maurice Horn)  বলেছেন “Walt Disney of India”।
১৯৯৫ সালে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব কার্টুনিস্ট তাঁকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। লিমকা বুক অব রেকর্ডে প্রাণের নাম পাওয়া যায় ভারতীয় কমিক্সস্ট্রিপে তাঁর অবদানের জন্য। শুধু তাই নয় তিনি অষ্ট্রেলিয়া কার্টুনিস্ট সোসাইটির অন্যতম সদস্য। এখন  প্রাণের বয়স হয়েছে কিন্তু এখোনো থেমে থাকেনি তাঁর কলম... তুলি...কোনো কিছুই। এখোনো চাচা চৌধুরী, সাবু, রাকা বিল্লু তাদের কেরামতি দেখিয়ে চলেছে। আর আমরাও পথ হাঁটছি তাদের সাথে।

 

 

পূর্বাশা
নিউ আলিপুর, কলকাতা

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)