মিশকুনকে চেনো তোমরা? ওই যে, ইয়াব্বড় শুঁড়ওয়ালা, চারটে গোবদা পা, দুটো লতপতে কান আর একটা পুঁচকে লেজওয়ালা সেই ছোট্ট ছানা হাতি গো, ওরই নাম মিশকুন। ও, হ্যাঁ, ওর কাছে একটা দারুণ মজার জিনিস আছে, জানো! দুটো লম্বা লম্বা ধপধপে সাদা দাঁত। তোমার আমার দাঁতগুলোর মতো মুখের মধ্যে থাকে না কিন্তু সেদুটো, শুঁড়ের দুপাশে বেরিয়ে থাকে ওগুলো। মিশকুন যখন তার মা বাবার সঙ্গে নদীতে নেমে জল ছিটিয়ে চান করে, তখন নদীর জলে আর সূর্যের আলোয় দাঁতগুলো একেবারে ঝকঝক ঝকঝক করতে থাকে।

তা, চানটান করে উঠে তো মিশকুনের বেজায় ক্ষিদে পায়। তার মা জঙ্গলের এ-গলি ও-গলি ঘুরে নরম তুলতুলে আর রসালো সব লতাপাতা খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসেন মিশকুনসোনাকে খাওয়াবেন বলে। সেসব খুঁজতে গিয়ে তাঁকে সেই কোন কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে জঙ্গলে যেতে হয়। জঙ্গলের ভেতরে কাঁটাওয়ালা গাছপালা থাকলে কাঁটার খোঁচায় মায়ের গায়ে এদিক ওদিক কেটেছড়েও যায়। তবুও ছোট্ট ছানা যা যা খেতে ভালোবাসে সেইসব কিছু তিনি বেছে বেছে নিয়ে আসেন।

এদিকে মিশকুন ভাবে অন্য কথা। সে জঙ্গলে ঢুকে দেখে, গাছে গাছে রকমারি ফল ফলে রয়েছে। তার কোনওটা লালচে, কোনওটা ফেটে গিয়ে টকমিষ্টি গন্ধওয়ালা রস গড়াচ্ছে। কতরকম মুচমুচে কাঁটাগাছ রয়েছে চারপাশে। মা সেসব কিচ্ছু খেতে দেন না কেন ওকে? সেদিন ভালুকের কাছে শুনছিলো মৌচাক ভেঙে নাকি মধু পাওয়া যায়, দারুণ খেতে। ভালুকেরা সবাই চেটেপুটে মধু খায়। ও-ও তো খেতে পারে! মাকে জিজ্ঞেস করলেই কেবল বলে,
"ওসব আমাদের জন্য নয় সোনা, সব পশুপাখির খাবার আলাদা রকমের হয়।"
মিশকুন শুনবে না মায়ের কথা, মায়ের আনা খাবার আজ খাবে না। ওর ইচ্ছেমতো খাবার না দিলে ও কিচ্ছুটি মুখে তুলবে না, ঠিক করে নেয় ও।

মা খাবার নিয়ে এলে মিশকুন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলো। মা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়েও তার মুখে একটুকরো খাবার দিতে পারলেন না। অনেকবার জিজ্ঞেস করে তবে মা তার না খাওয়ার কারণ জানতে পারলেন। কি আর করেন, খাবার নিয়ে উনি সরে গেলেন। একটু পরে মিশকুন দেখলো, মা আর বাবা খেতে বসেছেন। ওকে ছাড়াই মায়েরা খেয়ে নিলেন? রাগ করেছেন কি? ঠিক আছে, ওরও রাগ হয়, ও-ও তেজ দেখাবে এবার। ওই টকমিষ্টি ফল, কাঁটাগাছ আর মধু না পেলে সারাদিন না খেয়েই থাকবে।

খাওয়াদাওয়া সেরে বাবা মিশকুনকে বললেন,
"কাল আমি আর তোর মা পাহাড়ে যাব। পাহাড়ের হাতিরা খাবার পাচ্ছে না বলে ওপারের গাঁয়ে ঢুকছে খাবার খুঁজতে। গাঁয়ের লোকেরও খাবারের কষ্ট খুব। তারা ক্ষেতে ধান সব্জি চাষ করে, সেই ফসল দিয়ে ওদের পেট ভরে, আবার তাই বিক্রি করেই সংসার চলে। এদিকে হাতিরা পাহাড়ের ওপরে আর গাছপালা পাচ্ছে না, মানুষ সব গাছ কেটে জ্বালানি জোগাড়, আসবাব তৈরিতে কাজে লাগাচ্ছে। ক্ষিদের জ্বালায় পাহাড়ের হাতিরা গ্রামে ঢুকে ক্ষেতের ফসল কেড়ে আনছে, মানুষরাও তাতে রেগে গিয়ে হাতিদের সঙ্গে মারামারি শুরু করছে। সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা।"
"হ্যাঁ, এরকম বেশিদিন চললে মানুষ, হাতি কেউই আর শান্তিতে থাকবে না। তাই আমরা যাচ্ছি, বুঝিয়েসুজিয়ে যদি হাতিদের আমাদের এখানে আনতে পারি, এখানে জঙ্গলে খাবার পেতে অতটা অসুবিধা হবে না। হাতিরাও খেয়ে বাঁচবে, আর মানুষদেরও ফসল নষ্ট হবে না।" একটু থেমে মা বললেন, "মিশকুন, তুই কাল সারাদিন একাই থাকবি, আরাম করে নিজের ইচ্ছেমতো খাওয়দাওয়া করবি, রোজকার মতো মা সারাদিন তোকে বিরক্ত করবে না।"

মায়ের কথা শুনে যতটা আনন্দ হবে ভেবেছিল, ততটা হচ্ছে না দেখে মিশকুন অবাক হয়ে গেল। তবে বড্ড খিদে পেয়েছে কিনা, তাই কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। যেক'টা লতাপাতা মা এদিক ওদিক ছড়িয়ে রেখেছিল, সেগুলোই তুলে কোনওমতে পেট ভরালো। কাল একা একা জঙ্গলে ঢুকে কুড়মুড়ে কাঁটাঝোপ আর মধু খাবে ভেবে আনন্দের চোটে রাত্তিরে ঘুমই আসছিল না। শেষে কাঁটাঝোপের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে, ঝকঝকে রোদ্দুরের ঝলমলে আলো চোখে এসে পড়তে মিশকুনের ঘুম ভাঙলো।
"মা, খিদে!" রোজকার অভ্যেসমতো আজও ঘুম ভেঙেই খিদে পেয়েছে। দুতিনবার মাকে ডেকে যখন সাড়া পেলো না, তখন ওর মনে পড়ল, ওহো, আজ তো মায়েরা পাহাড়ে গেছে, আজ তো ওর নিজের ইচ্ছেমতো খাবার খুঁজে নেওয়ার দিন! তাড়াতাড়ি উঠে জঙ্গলে চলল মিশকুন। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে মনে হচ্ছে, মা বোধহয় ভোরেই বেরোয় লতাপাতা খুঁজতে।

প্রথমেই মিশকুন গেল ওই টকমিষ্টি গন্ধওয়ালা ফলটার গাছের কাছে। সবচেয়ে উঁচু যে ডালটা, যাকে মগডাল বলে, সেই মগডালে ঝুলছে একথোকা ফল, জিভে জল আনা গন্ধটা নাকে আসছে, তাইতে আরও খিদে পাচ্ছে মিশকুনের। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে যতটুকু জোর আছে, সব একজায়গায় করে বারকয়েক ইয়াব্বড় লাফ দিলো ও, যদি মগডালে শুঁড় পৌঁছায়! ও বাবা, কোথায় কী! মগডাল তো দূর, গাছের অর্ধেক অব্দিও শুঁড় যায়নি। বরং লাফালাফি করার ফলে খিদে আরও বেড়ে গেছে, গা গুলোচ্ছে এবার।

ক্ষিদেয় কাহিল অবস্থায় মিশকুন রওনা হলো কাঁটাঝোপের দিকে। কুড়মুড়ে ঝোপগুলোর ওপরে ওর অনেকদিনের লোভ। কিন্তু এগুলোকে ছিঁড়ে মুখে পুরতে হয় কেমন করে? শুঁড় দিয়েই কি? যেমনভাবে নরম লতাপাতা মুখে ঢোকায়? দেখা যাক চেষ্টা করে। এই ভেবে মিশকুন শুঁড়ে করে একটা কাঁটাডালে টান মারলো। ব্যস, আর যায় কোথায়! শুরু হয়ে গেল মিশকুনের চিৎকার! ছোট্ট নরম শুঁড়ে ওই শক্ত কাঁটাগুলো ফুটে রক্ত ঝরছে, ব্যথায় ছটফট করছে বেচারা মিশকুন। কিকরে রক্ত বন্ধ করতে হয়, তাও জানেনা ছোট্ট ছানা হাতিটা, কি করবে এখন? ব্যথার চোটে চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়ে ও, আর মাকে ডাকতে থাকে। ক্ষিদেয়, ব্যথায় ও ভুলেই গেছে মা বাবা কেউ এখন বাড়িতে নেই, পাহাড়ে গেছে, ফিরতে সে -ই সন্ধে!

হঠাৎ সামনের ঝোপটা সরিয়ে হুড়মুড় করে সামনে এসে হাজির হলেন মিশকুনের মা। এসেই তাকে আদর করে জড়িয়ে ধরলেন।
"এই তো সোনা, আমি এসে গেছি। আর কষ্ট হবে না তোমার, চলো, এই পাতাটার রস লাগিয়ে দিই, এক্ষুনি রক্ত পড়া বন্ধ হবে, জ্বালাও কমে যাবে। দুষ্টু সোনা! বারণ করেছিলাম না কাঁটাঝোপের কাছে আসতে? তাও কেন এসেছ?"
কাঁদতে কাঁদতে মিশকুন বলে,
"ক্ষিদে পেয়েছিল যে! কতদিন ভেবেছি এই কাঁটাঝোপগুলো খাবো, ওই টকমিষ্টি ফলগুলো খাবো, আজ তোমরা নেই বলে একা একা খাবো বলে এসেছিলাম। কিন্তু খেতেই পারলাম না কিচ্ছু। বাজে গাছ, বাজে ফল।"
"না সোনা, গাছ, ফল কোনওটাই বাজে নয়, ওগুলো আমরা খাই না, অন্যরা খায়। একেকজনের খাবার একেকরকম হয়, সবাই সব খাবার খেতে পারে না। তাই নিজের খাবারের ওপর কক্ষনও রাগ করতে নেই, 'খাবো না ' বলতে নেই, তাহলে কিন্তু একটা সময় এইভাবে শাস্তি পেতে হয়। তোমার ক্ষিদে পেয়েছে, কিন্তু তুমি খেতে পারছো না। এবার বুঝেছ বাবু, ক্ষিদে কাকে বলে? আর কখনও খাবার নষ্ট করবে?"

"না না মা, আর কক্ষনও খাবার নষ্ট করবো না। আমার অন্যায় হয়েছে কাল খাবার দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। এবার থেকে তুমি যা আনবে, তাইই খাবো ভালবেসে, দেখে নিও মা।
কিন্তু মা, " হঠাৎ মনে পড়ে মিশকুনের,
"তুমি পাহাড়ে যাওনি?"
"না রে সোনা, আমার মিশকুনকে একলা রেখে কি আমি যেতে পারি কোথাও? তোর বাবা গেছেন বাকিদের সঙ্গে, আমি তোমার কাছেই রয়েছি। শুধু তুমি কাল খাবার নষ্ট করেছিলে বলে আমার মনে দুঃখ হয়েছিল, তাই সকাল থেকে তোমার সামনে আসিনি। এখন চলো, নরম রসালো লতাপাতা খুঁজে এনে বাড়িতে রেখেছি, খাবে চলো। তারপর হুটোপুটি করে চান করতে হবে তো!"
মায়ের কথায় নেচে ওঠে মিশকুন, আহহ্, ওই লতাপাতাগুলো খেতে কি মিষ্টি! মনে হচ্ছে কতদিন খায়নি! মায়ের পাশে পাশে তাড়াতাড়ি পা চালায় ও, এক্ষুনি বাড়ি পৌঁছাতে হবে, মায়ের গা ঘেঁষে বসে সকালের জলখাবারটা খেতে হবে তো!

ছবিঃ শিল্পী ঘোষ