আমার বাংলা শেখা

আমার পড়াশুনো শুরু হয়েছিল হিন্দি মাধ্যমে। বাবা চাকরি করতেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। বদলির চাকরি, সেবার বদলি হলেন লখনউ-তে। মা, আমি আর আমার ছোটো ভাইও চললাম বাবার সঙ্গে লখনউ। আমার তখন পাঁচ বছর বয়স, ভাইয়ের মাত্র এক।
লখনউ-তে বাবা প্রথমেই কোয়ার্টার পেলেন না। আমরা উঠলাম একটা ভাড়া বাড়িতে, তাতে একটামাত্র বড়ো ঘর। কিছুদিন পরে বাড়ির কাছেই পাড়ার এক হিন্দি মাধ্যম স্কুলে আমায় ভরতি করে দেওয়া হল ক্লাস ওয়ানে। সে স্কুলের নাম ছিল 'লালবাবা বাল বিদ্যালয়'।
প্রথম দিন স্কুলে গেছি। মা শিখিয়ে দিয়েছেন, যখন ঢং ঢং ঢং ঢং করে অনেকবার ঘন্টা বাজবে তখন স্কুল শুরু হবে, তারপর একবার ঢং মানে ফার্স্ট পিরিয়ড শুরু, ঢং ঢং মানে সেকেন্ড পিরিয়ড... ইত্যাদি, আর ফের যখন ঢং ঢং করে অনেকবার ঘন্টা পড়বে, তখন স্কুল ছুটি।
বেশ চলছিল। মা যা যা বলে দিয়েছেন মিলে যাচ্ছিল ঠিকঠাক। ফোর্থ পিরিয়ডের পর ঢং ঢং করে অনেকগুলো ঘন্টা পড়ে টিফিন হল। আমি ভাবলাম ছুটি হয়ে গেছে! হাতে বাক্স দুলিয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে এলাম বাড়ি। টিফিনের কথা মা মোটেই বলেননি!
পড়াশুনো কী করতাম মনে নেই। হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা হল, রেজাল্ট বেরোল। প্রথম পিরিয়ডে দিদিমণি সবাইকে মার্কশিট দিলেন। আমি দেখলাম, বেশ খোপ খোপ কাটা সুন্দর একটা কাগজ। নিশ্চয়ই এতে রঙ করতে হবে! তাই মার্কশিটের চৌকো চৌকো খোপগুলো রঙিন মোম-পেনসিল দিয়ে লাল, নীল, সবুজ, হলুদ ইত্যাদি নানা রঙে বেশ করে ভরিয়ে দিলাম। ভারী সুন্দর একটা নকশা হল। মার্কশিট যে বাড়ি এসে মা-বাবাকে দেখাতে হয় সেটা জানতাম না, তাই সেটা স্কুলের বাক্সেই রইল। পরদিন বিকেলে মা আমার এক বন্ধুর মায়ের কাছে খবর পেলেন, হাফ-ইয়ারলির রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমি তখন পাশের মাঠে খেলছি। স্কুলের বাক্স ঘেঁটে মা তো কিছুই পেলেন না। সন্ধেবেলা বাড়ি ফেরার পর মা-বাবার সম্মিলিত জেরা, "স্কুল থেকে তোকে খোপ খোপ কাটা কোনও কাগজ দেয়নি?"
"হ্যাঁ, দিয়েছে তো!" বলে আমি সেই রঙ করা নকশাদার কাগজটা বার করলাম। কোন বিষয়ে কত নম্বর পেয়েছি কেউ বুঝতেই পারল না!
এরপর বাবা কোয়ার্টার পেয়ে গেলেন। আমরাও সেই ভাড়া বাড়ি ছেড়ে চললাম নতুন জায়গায় – আর্মি ক্যান্টনমেন্টে। কাছেই লখনউ-এর নামকরা 'মিশন স্কুল'। সে স্কুলের শিক্ষাবর্ষ শুরু হত মে-জুন থেকে, নতুন বছরে সবে দু-তিন মাস ক্লাস শুরু হয়েছে। ক্লাস ওয়ানের হাফ-ইয়ারলির রেজাল্ট দেখিয়েই বাবা আমায় সেই স্কুলের ক্লাস টু-তে ভরতি করে দিলেন। সেই রঙচঙে মার্কশিটে নিশ্চয়ই কাজ হয়নি, বাবাকে আগের স্কুল থেকে নতুন মার্কশিট বার করে আনতে হয়েছিল। যাই হোক, ক্লাস ওয়ানের ফাইনাল পরীক্ষা আর দেওয়া হল না আমার, পাশও করা হল না!
আমি তখন বাংলা পড়তে পারি না। গল্পের বই যে ক'টা ছিল সবই হিন্দিতে লেখা। এই সময় রোজ সন্ধেবেলা মা আমাদের দুই ভাইকে কাছে বসিয়ে দুটো বাংলা বই পড়ে শোনাতেন। সে দুটো বই ছিল শিশু সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত পূর্ণ চক্রবর্তীর লেখা 'ছবিতে রামায়ণ' আর 'ছবিতে মহাভারত', কমিকসের মতন ছবিতে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প। প্রতিদিন শুনতে শুনতে বই দুটো আগাগোড়া আমাদের মুখস্থ হয়ে গেল। কোন পাতার ছবির সঙ্গে কী লেখা আছে দিব্যি জানতাম। মা'র যখন সময় হত না, নিজে নিজেই চেষ্টা করতাম বই দুটো পড়ার। এ ভাবে ছবির সঙ্গে লেখা মিলিয়ে মিলিয়ে বাংলা পড়তে শিখে গেলাম। হিন্দির সঙ্গে মিলিয়ে বাংলা অক্ষরও চিনে গেলাম। ভাই অবশ্য অক্ষর চিনত না, কিন্তু বছর দুয়েক পর অক্ষর চেনার আগেই সেও দিব্যি পাতা উলটে উলটে ছবি দেখে গড়গড় করে মুখস্থ বলা শুরু করেছিল।
মাঝে মাঝে বড়োদের কাউকে কাউকে বলতে শুনি, 'এখনকার ছেলেমেয়েগুলো একেবারে গোল্লায় গেছে! ভালো বই পড়, তা নয়, সারাদিন শুধু কমিকস আর কমিকস!' শুনে আমার ভারী মজা লাগে। আমি কিনা বাংলা পড়তেই শিখেছিলাম কমিকস পড়ে! এখনও কমিকস আমার ভীষণ প্রিয়।

আমার বাংলা শেখা

আমার মতো নিশ্চয়ই আরও অনেকে আছেন যাঁদের কোনোদিন - 'এইটা হল অ, এটাকে বলে আ' – এভাবে অক্ষর চেনানো হয়নি। বাংলা লেখা দেখে দেখে নিজে নিজেই তাঁরা বাংলা অক্ষর চিনতে শিখেছেন। এতে অবশ্য মাঝে মাঝে বিপত্তিও হতে পারে, যেমন আমার এক বন্ধুর হয়েছিল। বেচারা জানত না যে বাংলা বর্ণমালার অক্ষরগুলো বাঁ দিক থেকে ডান দিকে পড়তে হয়, ওকে নাকি কেউ বলে দেয়নি। ও নিজের মতো করে ওপর থেকে নিচে পড়তে শিখেছিল, তাই কখনও - ক খ গ ঘ ঙ, চ ছ জ ঝ ঞ – এভাবে মুখস্থ বলতে পারত না। বলত – ক চ ট ত প, খ ছ ঠ থ ফ, গ জ ড দ ব – এই ভাবে!
মিশন স্কুলে আমাদের ক্লাসে ফার্স্ট হত একটি মেয়ে। নাম মনে নেই, তোতলা ছিল বলে সবাই 'তুতলি' বলে খ্যাপাতাম তাকে। সে অবশ্য বিশেষ রাগ করত না। ক্লাস টু-য়ের হাফ-ইয়ারলিতে ফার্স্ট হল তুতলি, সেকেন্ড হলাম আমি। সেবারে আর মার্কশিট রঙ করিনি, তাই সবাই জানতে পেরেছিল। মা বললেন, ভালো করে অঙ্ক কর, ফাইনালে ফার্স্ট হতে হবে। অঙ্ক মেলাতে আমার ছোটো থেকেই খুব ভালো লাগত, তাই দিনরাত অঙ্ক কষতে লাগলাম। ফাইনাল পরীক্ষা এল। মা বলেন, পড় পড় –আমিও অমনি অঙ্ক কষতে বসে পড়ি। অঙ্ক পরীক্ষার আগে দু'দিন ছুটি ছিল – সে দু'দিন মনের সুখে প্রচুর অঙ্ক প্র্যাকটিস করে পরীক্ষা দিতে গেলাম। ও বাবা! প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দেখি ভূগোলের প্রশ্ন! অঙ্কের তোড়ে আমি-মা কেউ ভালো করে রুটিনই দেখিনি। যাই হোক, ভূগোলের প্রশ্নগুলোও মোটামুটি জানাই ছিল, যা পারি লিখলাম। বাড়ি এসে রুটিন চেক করে দেখি অঙ্ক পরীক্ষা আসলে পরের দিন। আমায় আর পায় কে! ফের অঙ্ক কষতে বসে পড়লাম, আর রুটিন না দেখার জন্য বাবার কাছে বকুনি খেলেন মা। বাবা বললেন, "এই গন্ডগোলটা না হলে হয়তো ও ফার্স্ট হয়ে যেত!" রেজাল্ট বেরোনোর পরে অবশ্য দেখা গেছিল আমিই ফার্স্ট হয়েছি!
এরপর বাবার ফের বদলির অর্ডার চলে এল। ফিল্ড পোস্টিং – আমাদের নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাই মা'র সঙ্গে আমি আর ভাই চলে এলাম আমাদের বাড়ি বর্ধমান জেলার কালনায়। তখন আগস্ট মাস। এখানে তখন শিক্ষাবর্ষ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর, তায় আবার সব স্কুলই বাংলা মাধ্যম।
কালনায় মেয়েদের সবচেয়ে নামকরা স্কুল ছিল 'হিন্দু গার্লস স্কুল'। আমার মেজপিসি সেই স্কুলে পড়াতেন। হিন্দু গার্লসের প্রাইমারি সেকশন, অর্থাৎ ক্লাস ফোর অবধি ছিল কো-এডুকেশনাল, ছেলে-মেয়ে সবাই পড়তে পারত। ক্লাস হত সকালে। মেজপিসি আমায় নিয়ে গেলেন সেই স্কুলে ক্লাস থ্রি-তে ভরতি করতে। স্কুলের নাম 'গার্লস স্কুল' হওয়ায় আমি একটু কিন্তু কিন্তু করছিলাম, মেজপিসি পাত্তাই দিলেন না।
প্রাইমারি সেকশনের হেড মিস্ট্রেস শুক্লা দিদিমণি জানতে চাইলেন কোন বিষয় আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। বললাম, অঙ্ক। আমায় একটা ভাগের অঙ্ক কষতে দিলেন উনি। দেখলাম অঙ্কটা খুব সোজা, কিন্তু কষতে গিয়ে দেখি কিছুতেই মিলছে না! ভাগফলের জায়গায় দশমিকের পর একটার পর একটা সংখ্যা বেড়ে চলেছে, আর ওদিকে নিচেও লম্বা হতে হতে শেষে পাতাটাই গেল ফুরিয়ে! আরেকটা পাতা নিলাম। তাতেও অঙ্ক মিলল না। তিন নম্বর পাতার শেষেও দেখি অঙ্ক কিছুতেই মিলছে না, সব সময়ই কিছু না কিছু ভাগশেষ থেকে যাচ্ছে। ব্যাপার দেখে শুক্লা দিদিমণি মেজপিসিকে বললেন, "ও যে দেখছি অঙ্কে খুব কাঁচা! বাংলাও ভালো জানে না বলছেন। ডিসেম্বরে ফাইনাল পরীক্ষা, আর মাত্র চার মাস পরে। পারবে কি ও?"
মেজপিসি 'খুব পারবে, খুব পারবে, বাংলা আমি শিখিয়ে দেব' বলে জোরাজুরি করায় শুক্লা দিদিমণি তেতো-গেলা মুখ করে ভরতি করে নিলেন আমায়। সিনিয়র সেকশনের বাংলার দিদিমণি বলছেন, কী আর করেন তিনি! ভরতি হয়ে না-মেলা অঙ্কের সেই তিনটে পাতা বগলদাবা করে ফিরে এলাম বাড়ি। বাড়ি এসে দেখি, ছি ছি, প্রথমেই যে একটা কাঁচা ভুল করে ফেলেছি, অঙ্ক মিলবে কী করে? আজও সেই অঙ্কটা মেলাতে না পারার আফশোশ আমার যায়নি।
ভরতি তো হলাম বাংলা মাধ্যম স্কুলে, এদিকে বাংলা লিখতেই পারি না। বলতে পারি, পড়তে পারি, লিখতে সবে শিখছি। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় মাঝে মাঝেই মুখ থেকে হিন্দি বুলি বেরিয়ে যায়। 'আতা নেহি', 'পতা নেহি' এসব হিন্দি কথা শুনে বন্ধুরা 'আতা গাছে তোতা পাখি' বলে খ্যাপায়। ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে বসে পাতার পর পাতা বাংলা হাতের লেখা লিখে চলি। ইতিহাস, ভূগোল যে ক্লাসই হোক, সেই বিষয়ের বই দেখে দেখে বাংলা লিখে যাই! বড়দিমণির নাকি সেরকমই নির্দেশ।
গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো সেপ্টেম্বরের শেষে আমি আর ভাই দু'জনেই পড়লাম জন্ডিসে। স্কুল যাওয়া বন্ধ। অনেকদিন কামাই হয়ে গেল।
পরীক্ষা চলে এল, শেষও হয়ে গেল। চব্বিশে ডিসেম্বর রেজাল্ট বেরোনোর দিন হেড মিস্ট্রেস শুক্লা দিদিমণি ক্লাসে এলেন, সঙ্গে আমাদের ক্লাস টিচার। রেজাল্ট যখন ঘোষণা করলেন, আমি তো অবাক! আমিই নাকি ফার্স্ট হয়েছি! বোঝো কাণ্ড!
পরে বুঝেছি, আসলে লখনউ-এর বিখ্যাত 'মিশন স্কুল'-এর পড়াশুনো আমাদের মফস্বল শহরের স্কুলের থেকে এগিয়ে ছিল অনেকটাই। জানতাম সবই, শুধু বাংলা লেখাতেই ছিল খামতি।
ক্লাস ফোরে অবশ্য আর অসুবিধে হয়নি। গড়গড় করে বাংলা পড়ি তখন, অনেক বাংলা গল্পের বই পড়ে ফেলেছি, রোজ বাংলা খবরের কাগজ পড়ি। লিখতেও তেমন অসুবিধে নেই, হাতের লেখা যদিও কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং।
ফোরের পরে 'হিন্দু গার্লস স্কুল'-এর পাট শেষ, চলে যেতে হবে অন্য হাই স্কুলে। শেষ দিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেবারও আমি ফার্স্ট হয়েছি। শুক্লা দিদিমণির হাত থেকে লাল গিফট পেপারে মোড়া একটা বই উপহার পেলাম। বাড়ি এসে মোড়ক খুলে বার করেই সঙ্গে সঙ্গে পড়তে শুরু করলাম। কিছুটা পড়েই তো আমি অবাক! বইটার নাম ছিল 'হারানো দিন', প্রকাশক দেব সাহিত্য কুটির। সে বই যে কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে! লেখকের নামও মনে নেই। কিন্তু মনে আছে, লেখক ছোটোবেলা থেকে লখনউ-য়ের মিশন স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন, সেই স্কুলের হোস্টেলেই বড়ো হয়েছেন, আর বইটা ছিল মিশন স্কুলে তাঁর ছাত্রজীবন নিয়েই লেখা। এটা কী নেহাতই কাকতালীয়? নাকি শুক্লা দিদিমণি জেনেশুনেই আমার জন্য বইটা পছন্দ করেছিলেন? কী জানি!