খেলাঘরখেলাঘর

কাঁচের জানলায় মাথাটা ঠুকে যেতে ঝিমুনিটা কেটে গেল। ভোর সাড়ে তিনটে। এসি-টা বেশ ঠাণ্ডা। কানের পাশে একটানা শাঁ -শাঁ শব্দ আর হাল্কা ঘুমপাড়ানি ঝাঁকুনি। বাসের সিটে আধশোয়া হয়েই বেশ একরাউণ্ড ঘুম দেওয়া হয়ে গেল। বাসের মধ্যে এখনো অন্ধকার। কোমরটাকে একটু সোজা করে নিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম কাঁচের ওপারে কিছু চোখে পড়ে কিনা। মনে হল বিশাল বিশাল পিলারের মতন কিছু যেন হুস্ হুস্ করে বেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। আবছায়ার মধ্যে  দূরে জ্বলছে সারি সারি আলোর মালা । চোখ কচলে ভালো করে দেখে বুঝলাম - আমাদের বাস চলেছে একটা বড় ব্রিজের ওপর দিয়ে। নিচে বইছে বিস্তীর্ণ কালো জলরাশি। ঐ আলোর মালা তারই দূরবর্তী তটরেখা। বুঝলাম, আমরা এইমুহূর্তে রয়েছি ‘যাযাবর’ গায়কের সেই বিখ্যাত নদ মিসিসিপির ওপরে - “আমি গঙ্গার সাথে মিসিসিপি হয়ে ভোলগার রূপ দেখেছি “ ! আমাদের গন্তব্য নিউ অর্লিন্স, লুইসিয়ানা ষ্টেটের এক নম্বর ট্যুরিষ্ট আকর্ষণ!

মার্কিন মুলুকে পা রেখেছি বছরতিনেক আগে । কিন্ত টেক্সাস ছেড়ে বেরোই নি একবারও। পি এইচ ডি-র ছাত্রের পকেট এবং সময় দুয়েরই ভারি টানাটানি। শেষে  এই ২০১২-র মে মাসে স্প্রিং সেমিস্টার শেষ হতে আমার সহধর্মিণী রূপসীর প্রবল তাড়নায় ব্যাকপ্যাকিং! দিনদুয়েকের মধ্যে শ-খানেক ব্লগ, ট্রাভেল ওয়েবসাইট, ইউটিউব ভিডিও আর অবশ্যই গুগল ম্যাপ ঘেঁটে দুজনে স্থির করলাম, এবার নিউ অর্লিন্স শহরে দুই রাত্রিবাস। যাবার দ্রুত ও সহজতম উপায় অবশ্যই বিমানে, কিন্ত সে অনেক ডলারের ধাক্কা ! তাই আমাদের ভ্রমণ একেবারে ডাউন-টু-আর্থ - আমেরিকার সম্ভবতঃ প্রাচীনতম ইন্টার-ষ্টেট বাস সার্ভিস - গ্রে হাউণ্ড-এ সওয়ার হয়ে। হিউষ্টনে বাসে চেপেছি রাত্রে , পৌঁছাব পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ । তবে আমেরিকার হাজার হাজার মাইলব্যাপী ফ্রি-ওয়ে বিশ্বসেরা, তাই এক রাত্রি বাসে কাটিয়েও পায়ে একটু ঝিনঝিন ধরা ছাড়া আর কোনো জার্নির ধকল নেই।

ভোরে ঘুম ভেঙেই মিসিসিপি দর্শনে বেশ একটা ‘বেড়াতে যাচ্ছি’ ‘বেড়াতে যাচ্ছি’ ফিলিং হল। রূপসী-ও জেগে  উঠে মিসিসিপির  বিশালতা দেখে মুগ্ধ । দুধারের জলাভূমি আর জঙ্গল ভেদ করে আমরা চলেছি কংক্রিটের সড়ক ধরে। ভোরের প্রথম আলো ফুটছে - অনেক দিন পর দেখলাম সূর্য ওঠা!

সূর্যোদয়

এইবেলা নিউ অর্লিন্স শহরের সংক্ষিপ্ত ইতিকথা জানিয়ে রাখি। বহু বছর আগে এখানে ছিল নেটিভ আমেরিকান ইণ্ডিয়ানদের বাস। তারপর ১৬৯০ সালে এল ফরাসী বণিকের দল। (লক্ষণীয়, একই বছরে কলকাতায় পা রাখেন জোব চার্ণক)  নিউ অর্লিন্স শহরের আনুষ্ঠানিক পত্তন হয় ১৭১৮ সালে। ১৭৬৩ তে ব্রিটেনের সঙ্গে স্প্যানিশদের দীর্ঘ যুদ্ধের পর ‘প্যারিস চুক্তি’র মাধ্যমে এই শহর স্পেন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর বহুদিন ধরে স্পেন ,  জার্মান, ফরাসী  শাসকদের হাত ঘুরে অবশেষে ১৮০৩ সালে নেপোলিয়ান লুইসিয়ানা রাজ্যটাই বিক্রী করে দেন আমেরিকার  কাছে ।

শংকর তাঁর ‘মানবসাগরের তীরে’ বইতে লিখেছেন বিশ্ববন্দিত প্যারিসের সঙ্গে আমাদের কলকাতার আত্মিক মিলের কথা। তাই মনে হয় আমেরিকার বুকে ফরাসী  সংস্কৃতির এই পীঠস্থান আমাদের পদে পদে মনে করিয়ে দিচ্ছিল নর্থ কলকাতার সরু সরু গলি, ভিড়ে ঠাসা শ্যামবাজার - হাতিবাগানের রাস্তা আর ঠুং ঠুং ঘন্টি বাজিয়ে চলা ট্রাম।তফাৎ একটাই, এদের হেরিটেজ ‘ষ্ট্রীট-কার’ সগর্বে ২৪ ঘন্টা হাজারো ট্যুরিষ্ট  আর শহরবাসীকে সার্ভিস দিচ্ছে - বেচারা ট্রামের মত শহরবাসীর চক্ষুশূল হয়ে ওঠে নি।এ শহর যেন আমেরিকার মধ্যে থেকেও ভিন্ন চরিত্রের এক জনপদ।

স্ট্রীট কার

স্ট্রীট কার
স্ট্রীট কার

আমাদের প্ল্যানমাফিক গ্রে হাউণ্ড বাস ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে সকালেই ঘুরে নেব কিছু জায়গা। সেই ভেবেই আমরা বেরিয়েছি দুটো মাত্র ব্যাকপ্যাক সম্বল করে “ট্রাভেল লাইট” নীতিবাক্য মেনে। একটা কারণ, স্যামচাচার দেশে অনেক কিছুর মত হোটেল বুক করার কানুনও ‘শিবঠাকুরের আপন দেশ’ থেকে যেন আমদানি করা। বেলা তিনটের আগে তোমায় ঘর দেবে না; তবে হোটেল ছাড়ার দিন তোমায় বিদায় হতে হবে সকাল এগারোটার মধ্যে! ধন্য আতিথেয়তা!

যাই হোক, “যস্মিন দেশে যদাচার”! এখন বাস ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে কোন দিকে যাই? পরিত্রাতা - গুগল ম্যাপ !  কোন তারিখে মোটামুটি কটা নাগাদ কোথা থেকে কোথায় যাব - এই সমস্ত ইনপুট দিয়ে দিয়ে ফাইল ভর্তি ম্যাপের প্রিণ্টআউট কি এমনি এমনি বয়ে আনা ? ফাইল থেকে বেরল প্রথম ম্যাপ। রাস্তায়  বেরিয়েই চমক।এই প্রথম এখানকার কোনো শহরে দেখলাম ফ্লাইওভারের নিচে ফুটপাতে বেশ কিছু শ্বেতাঙ্গ ভিখিরি বা বাউণ্ডুলে নারী-পুরুষ নোংরা পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে শুয়ে-বসে আছে। আমরা ম্যাপে রাস্তার নাম দেখতে দেখতে চললাম যে দিকে আমাদের প্রথম  ট্রাম, থুড়ি ‘ষ্ট্রীট-কার’ ধরতে হবে। আমাদের ইতি-উতি চাউনি দেখে এক প্রৌঢ়া এগিয়ে এসে যেচে ম্যাপটা নিয়ে রাস্তা বাতলে দিয়ে নিজের গন্তব্যে চললেন।

Jazz সঙ্গীতের মক্কা এই শহর। তাই এখানকার যে কোনো বাস বা ষ্ট্রীট-কারে সারাদিনে যতবার ইচ্ছে চড়ার Pass -এর নাম Jazz Pass। ষ্ট্রীট-কার দেখতে সত্যিই খুব সুন্দর। মেহগনি কাঠের ডিজাইন করা বেঞ্চ, পিতলের কারুকাজ, সিলিং-এ নকশাদার বাতি! অবিকল কলকাতার ট্রামের মত ঘন্টি বাজিয়ে রেললাইন ধরে ছোট-বড় নানান রাস্তা দিয়ে  আমাদের নিয়ে চলল ক্যানাল ষ্ট্রীটে । সেখান থেকে বেশ খানিকটা হেঁটে আমরা পৌঁছাব এখানকার সবচেয়ে সুন্দর আর ‘হ্যাপেনিং’ জায়গা - জ্যাকসন স্কোয়ারে।

স্ট্রীট কার চালক
স্ট্রীট কার চালক

ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারের সরু সরু গলিপথ ধরে মিনিট পনের হেঁটে জ্যাকসন স্কোয়ারে পৌঁছে দেখি সকাল থেকেই হাজারো ট্যুরিষ্টের হট্টমেলা। সুবিশাল সেন্ট ল্যুইস ব্যাসিলিকার সামনে কী সুন্দর পার্ক। পিঠের বোঝা নামিয়ে সেখানে বসেই জিরিয়ে নিলাম কিছুক্ষণ।তারপর সেখানেই ঘর থেকে টিফিনবক্সে প্যাক করে আনা লুচি-আলুরদম-সহযোগে প্রাতঃরাশ। সকাল সকাল কোনো আমেরিকান রেস্তোঁরায় জলযোগ করার যন্ত্রণা  এড়াতে এটুকু অতিরিক্ত ভার আমরা সানন্দে বহন করেছিলাম।

জ্যাকসন স্কোয়ার
জ্যাকসন স্কোয়ার

জ্যাকসন স্কোয়ার হরেক রকম পসরা সাজায় তার গুণমুগ্ধ পর্যটকদের জন্য। ভাগ্যগণনাকারী টিয়া, Jazz-এর দৈত্যাকার বাদ্যি নিয়ে বাজনদারের দল, ক্যানভাসে রঙ ভরতে ব্যস্ত শিল্পী, হাবিজাবি পুঁতির মালা আর মনিহারী জিনিসের ডালি সাজিয়ে বসা হকার, কিংবা কোনো হোটেল-রেস্তোঁরার বিজ্ঞাপনের বোর্ড হাতে ঘুরঘুর করা ছেলেপিলে - সব মিলিয়ে সদা ব্যস্ত জ্যাকসন স্কোয়ার।আছে আগ্রহী ট্যুরিষ্টের চটজলদি স্কেচ বা কার্টুন এঁকে দেবার শিল্পী। আছে তোমায় নিয়ে টাটকা নতুন পদ্য লিখে দেবার জন্য ষ্ট্রীট-পোয়েট!

ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি একটা সোনালী লোক! তার হাত-পা, জামা-প্যান্ট, মাথার টুপি, হাতের লাঠি এমনকি সানগ্লাসটাও ক্যাঁটকেঁটে সোনালী রঙের। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছিল।হঠাৎ রাস্তার মোড়ে এসে একটা পিলারের ওপর তড়াক করে লাফিয়ে উঠে  দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে অদ্ভুত পোজ দিয়ে বসে পড়ল। তার সামনে একটা বালতি রাখা।পথচলতি লোকজন তাতে ইচ্ছেমতন পয়সাকড়ি ফেলে যাচ্ছে। কেউ আবার এই ‘লাইভ স্ট্যাচু’র পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ছবি ক্যামেরাবন্দী করছে।
জীবন্ত স্ট্যাচু
জীবন্ত স্ট্যাচু

জ্যাকসন স্কোয়ারের এক বিশেষ আকর্ষণ হল “কাফে ড্যু মন্ড” (Cafe Du Monde)। ১৮৬২ সাল থেকে শহরের আ্ড্ডার এই ঠেক বিখ্যাত  তার কফি আর ফ্রেঞ্চ  ডোনাট “বেনইয়া”র (Beignet) জন্য। ২৪ ঘন্টা অবারিত দ্বার। মেজাজ আর ঐতিহ্যে কলকাতার কফি হাউসের এই ফরাসী সংস্করণে অবশ্য ঢোকার সৌভাগ্য হয় নি - একেবারে হাউসফুল!

কফি হাউস
কফি হাউস

এখানে ক্যাথিড্রালের পাশেই রয়েছে “ প্রেসবাইটিয়ার” - লুইসিয়ানা ষ্টেট মিউজিয়াম। খোলে সকাল দশটায়। ফেব্রুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত এখানকার বিখ্যাত কার্নিভাল ‘মারডি-গ্রা’ (Mardi Gras)-র রঙবেরঙের জমকালো পোশাক পরিচ্ছদ, হরেক রকমের মুখোশ, ব্যবহৃত নানান বিচিত্র জিনিসে ঠাসা মিউজিয়াম। এছাড়া আছে এক বিশেষ প্রদর্শনী - মজার নয়, বরং ঠিক উল্টো। ২০০৫ সালে যে কুখ্যাত হ্যারিকেন ক্যাটরিনায় গোটা লুইসিয়ানা রাজ্য বিধ্বস্ত হয়েছিল, তার বহু মর্মস্পর্শী মুহূর্তের স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ দেখা যাবে এখানে। দেখলাম ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত জনপদের বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমে আবার আজকের নিউ অর্লিন্স গড়ে তোলার চলচ্চিত্র।

মিউসিয়াম
মিউসিয়াম

মার্দি গ্রাস শোভাযাত্রার পোষাক
মার্দি গ্রাস শোভাযাত্রার পোষাক

মার্দি গ্রাস শোভাযাত্রার পোষাক
মার্দি গ্রাস শোভাযাত্রার পোষাক

মিউজিয়াম থেকে একটু ভারাক্রান্ত মন নিয়েই বেরোলাম। রাস্তায় নামতেই কানে এল শাহরুখের হিট ছবির গানের সুর।এক ষ্ট্রীট-মিউজিসিয়ান তার ট্রাম্পেটে বলিউডি ধুন তুলেছে ! পরক্ষণেই খেয়াল হল, বলিউডের কত সঙ্গীত পরিচালকই তো ‘মহাবিদ্যা’ধর ! তাই অবাক হবার তেমন কারণ নেই।

দুপুরে হোটেলে ফিরে স্নানাহার সেরে ভাতঘুম, থুড়ি, স্যাণ্ডউইচ-ঘুম দিয়ে বিকেল নাগাদ উঠে শুনি অনেক লোকের হৈ হৈ আর বাজনা। হোটেল থেকে বেরিয়ে দেখি এলাহি ব্যাপার। আমাদের হোটেলের পাশেই “ লাফায়েৎ স্কোয়ার “ নামে একটা বড়সড় সুন্দর পার্ক। দুপুরের মধ্যেই সেখানে বেশ কিছু স্টল, একটা অস্থায়ী স্টেজ বানিয়ে সাড়ম্বরে Jazz Wednesday পালন চলছে। মাঠে গিজগিজ করছে লোক। কোল্ড ড্রিঙ্ক, হট ড্রিঙ্ক, ওয়াইনের স্টল , ধূমায়িত বার-বি-কিউ স্টল - সব তৈরি হয়ে গেছে তাঁবু খাটিয়ে। আছে রঙীন পোস্টার, হাতে আঁকা পেন্টিং ( আকাশছোঁয়া দাম!)  একটু ভয়ে ভয়ে একটাতে হাত দিতেই স্টলের ভদ্রলোক তেড়ে এলেন - হ্যাঁ হ্যাঁ, ভালো করে ঘেঁটেঘুঁটে দেখ, কোনো সংকোচ কোরো না!!

লাফায়েত স্কোয়ার এ জমায়েত
লাফায়েত স্কোয়ার এ জমায়েত

লাফায়েত স্কোয়ারে নতুন বন্ধু
লাফায়েত স্কোয়ারে নতুন বন্ধু

লাফায়েত স্কোয়ারে ছবির দোকান
লাফায়েত স্কোয়ারে ছবির দোকান

এরই মধ্যে স্টেজে কোনো লোকাল ব্যাণ্ড গলা ছেড়ে জগঝম্প গেয়ে চলেছে । গানের গুঁতোয় আমাদের কান ভোঁ ভোঁ। ওদিকে নানা রঙের, নানা বয়সের দর্শক-শ্রোতা হাত-পা ছুঁড়ে চেঁচিয়ে তাদের উৎসাহ দিয়ে চলেছে। বাপ রে কী ফুর্তি!

সন্ধেবেলা সেন্ট চার্লস ষ্ট্রীট-কার  চেপে নগর পরিক্রমা। নিউ অর্লিন্স  বেড়াতে এলে অবশ্য কর্তব্য ! সেন্ট চার্লস এভিনিউ-এর দুধারে অজস্র ঐতিহাসিক অট্টালিকা - দু’তিনশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তির নিদর্শন হয়ে। বানানোর স্টাইল অনুযায়ী তাদের আবার নানা ক্যাটাগরি - আমেরিকান টাউনহাউস, শটগান হাউস, ডবল গ্যালারী হাউস আরও কত কী ! সন্ধে হতেই রাস্তার দুধারে ঝলমলে আলোর বন্যা। মানানসই নরম আলোয় সেজে  উঠেছে যেন মায়ানগরী। টুং-টাং ষ্ট্রীট-কার  আমাদের নিয়ে চলল নগরের রূপ-দর্শন করাতে।

রাতের আলোয় ঐতিহাসিক বাড়ি
রাতের আলোয় ঐতিহাসিক বাড়ি

সন্ধেবেলা স্ট্রীটকারের ভেতরে
সন্ধেবেলা স্ট্রীটকারের ভেতরে

সন্ধেবেলা স্ট্রীটকারের ভেতরে
সন্ধেবেলা স্ট্রীটকারের ভেতরে

পরের দিন সকালে গন্তব্য মিসিসিপি পার হয়ে Algiers Point নামক ভূখণ্ডে পৌঁছান। আধঘন্টা অন্তর অন্তর বিরাট ফেরিবোট ছাড়ে - নিখরচায় যাত্রী পারাপার। অবশ্য এর পাশাপাশি অনেক বাণিজ্যিক ভ্রমণসংস্থার সুন্দর সাজানো ক্রুজের ব্যবস্থা আছে। সে সব সৌখীন জলতরীতে যেতে যেতে আলো-ঝলমল সন্ধেয় লাইভ Jazz মিউজিক সহযোগে পান-ভোজনের রাজকীয় আয়োজন। তা বলে আমাদের নিখরচার ফেরিবোটও কম যায় না ! বোটের দোতলা আর তিনতলায় বিরাট ডেক-এ যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা। আর একতলায়? সেখানে একে একে  উঠল ছোট-বড় মোটরগাড়ি এমনকী ট্রাক পর্যন্ত !

জাহাজে গাড়ি ঢুকছে
জাহাজে গাড়ি ঢুকছে

Algiers Point এর একটা ইতিহাস আছে। বহুদিন আগে আফ্রিকা থেকে কালো মানুষদের ধরে এনে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রী করা হত এখানে। সেজন্যই ছবিতে দেখবে Old Algiers এর বোর্ডে লেখা , “New Orleans’ best kept secret”!

অ্যালজিয়ার্স পয়েন্ট
অ্যালজিয়ার্স পয়েন্ট

আমাদের ফেরিবোট ছাড়তেই ক্যামেরা তাক করে পটাপট ছবি তোলা শুরু করলাম। পুরো নিউ অর্লিন্স শহরের স্কাইলাইন দেখা যায় মাঝনদী থেকে। মিসিসিপির ওপর লম্বা ব্রিজটা যেন ঠিক আমাদের হাওড়া ব্রিজ ! নদী পার হয়ে Old Algiers পৌঁছে চোখে পড়ল কিছু প্রাচীন অট্টালিকা। আর আছে Jazz মিউজিসিয়ান লুইস আর্মস্ট্রং-এর মূর্তি।

মিসিসিপি ব্রিজ
মিসিসিপি ব্রিজ

নদীর থেকে দেখা শহর
নদীর থেকে দেখা শহর

জ্যাজ মিউজিশিয়ান
জ্যাজ মিউজিশিয়ান

দর্শনীয় স্থানগুলো মেটামুটি দেখার পর আামাদের এলোমেলো ঘোরাঘুরি শুরু। বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ মার্কেটের দোকানগুলোয় উঁকি-ঝুঁকি মেরে হ্যাংলার মতন স্যুভেনিয়ারের কালেকশন দেখা ! পথ চলতে চলতে কিছু রেস্তোঁরার দরজায় ঝোলানো মেনু পড়ে নিচ্ছিলাম। চোখটা আটকে গেল “অ্যালিগেটর ডিশ”-এ ! দেখেই তো “আগন্তুক’-এর মনমোহন মিত্রের মত “সর্বভুক” খেতাবটা পাওয়ার জন্য নোলা লকলকিয়ে  উঠেছিল। কিন্তু রূপসী অভিভাবক-সুলভ গাম্ভীর্যে ‘ও সব  দেখতে নেই’ জাতীয় হুংকারে ঐ রেস্তোঁরায় লাঞ্চের প্রস্তাবটা নাকচ করে দিল। ( সেটা অবশ্য  আখেরে ভালই হয়েছে। কালই এক সত্যিকারের  “সর্বভুক” চাইনিজ ছাত্রীর থেকে জানলাম, অ্যালিগেটরের মাংস চিবিয়ে খাওয়া আর তারপর হজম করা চৈনিক পৌষ্টিকতন্ত্রের কাছেও বেশ মেহনতের ব্যাপার ! )
ফ্রেঞ্চ মার্কেটে ভাস্কর্য
ফ্রেঞ্চ মার্কেটে ভাস্কর্য

রাস্তায় সাইকেল রিকশা
রাস্তায় সাইকেল রিকশা

আবার এ-দোকান, সে - দোকান ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক কাউন্টারে দেখি বাঙালি ভদ্রমহিলা ! তবে এই শেষ নয়। আরেক দোকানে বাঁকুড়ার এক  ভদ্রলোকের দেখা মিলল। তিনি দেশ ছেড়েছেন অনেক দিন আগে। দোকানে খদ্দের ছিল না। ভদ্রলোক মনের সুখে অনেক বছরের জমানো গল্পের স্টক নিয়ে বসলেন। তারপর একটা কাগজে লিখে দিলেন কাছেই কোথায় ইস্কনের মন্দির আছে তার ডিরেকশান। পরের দিন সন্ধ্যারতি দেখতে যাওয়ার নিমন্ত্রণও করে ফেললেন। অবশ্য আমাদের যাওয়া হয়ে ওঠে নি। পরদিন ভোরেই আমাদের ফেরার বাস।

সেইদিনই, অর্থাৎ শেষ সন্ধ্যায় দুটো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ! এক, এখানকার নামজাদা ক্যাসিনোয় ঢুকে কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা অর্জন। দুই, ইণ্ডিয়ান রেস্তোঁরায় নৈশভোজন। সিনেমার পর্দায় দেখে দেখে ক্যাসিনোর ব্যাপারে অনেকদিনের আগ্রহ জমেছিল। তবে অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর নয়। আধঘন্টা ধরে তিন-চার রকমের স্লটিং মেশিনে বোতাম টিপে টিপে বোর হয়ে আর ডলার-পাঁচেক খুইয়ে বেরিয়ে এলাম। কী আনন্দে লোকে খেলে রে বাবা !

ক্যাসিনো

যাইহোক, শেষ সন্ধ্যার ক্যাসিনো-পর্বের চেয়ে ঘন্টাখানেক বাদে শহরের একমেবাদ্বিতীয়ম ভারতীয় রেস্তোঁরা ‘নির্বাণা’ (Nirvana) -তে বিরিয়ানী পর্বটা জমেছিল খাসা !