সূচীপত্র -গ্রীষ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

ছবি

সিরাজুল,
সুন্দর বনের গন্ধ মেখে একটা নীল খামের চিঠি আমার পড়ার টেবিলে অপেক্ষা করছে। এখোনো আমি হাত দিয়ে ধরিনি পর্যন্ত চিঠিটাকে। কারণ আমি জানি ওই চিঠিতে আছে আমার সিরাজুল, আনন্দী, আর পাখিরালার অনেকের অনেক অনেক গল্প। গভীর রাতে বাড়ি ফিরে মাঝে মাঝে এমন সারপ্রাইজ পেতে বেশ ভালো লাগে আমার। দিনের শেষ ডানকুনি লোকালে ফিরছি যখন, ঝিরঝরে বৃষ্টি জানলার মধ্যে দিয়ে এসে আমার কপাল...চুল...মুখ ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আর আমি যেন চোখ বুঁজে দেখতে পাচ্ছি অনেক রাতের সেই হরিণভাঙা নদীটাকে। আমি যেন কান পাতলে শুনতে পাচ্ছি গফুর চাচার নামাজ পড়া। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি চাচি তালের বড়া ভাজতে ভাজতে গুনগুন করে গান গাইছেন। জানি, এইসব কথা বলে তোমার রাগ বাড়ছে বই কমছে না। অনেকদিন যে যাওয়া হয়না ওই পথে। অনেক দিন আনন্দীর সাথে পুকুরে নেমে তুলি না কলমী শাক। কিম্বা তোমার আর পান্তুর সাথে ছোট ডিঙি বেয়ে যাওয়া হয়নি অনেক দিন ছোট ছোট লাল কাঁকড়ার ডেরায়। আচ্ছা এবার আর প্রমিস করবো না। এক্কেবারে তোমার বাড়ির সামনে ভ্যান থেকে নেমে পড়ে হাঁক-ডাক দেবো। সারপ্রাইজ দেবো তোমাকে সিরাজুল। এবার খুশি তো? লীলা মজুমদারের রচনাবলী পড়ছো শুনে খুশি হলাম। শেষ হলে জানিও। দ্বিতীয় খন্ডটা যাওয়ার সময় নিয়ে যাবো। আচ্ছা রহিম কী এখোনো রাতের আঁধারে হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় ভূতের গল্প বলে? ওকে বোলো সব গল্প জমিয়ে রাখতে সারা রাত ধরে আমরা শুধু নৌকা বাইবো আর ভূতের গল্প শুনবো সিরাজুল।

মেঘালয়ের গল্প শুনতে শুনতে তুমি আর আনন্দী যে ছবি গুলো এঁকেছো সেগুলো যখন তোমার বাড়ি যাবো তখনি দেখবো। চুপি চুপি বলি কিছু ছবি চাঁদের বুড়ির জন্য তুলে রেখো কিন্তু। বুড়ির আবার ছবি জমানোর নেশা আছে ভারী। ও জানতে চাইছো, সেই ছবি দিয়ে বুড়ি কী করে? এমা তুমি জানো না? সেই ছবি চাঁদের বুড়ি ইচ্ছামতীর জলে ভেলা করে ভাসিয়ে দেয়। আর ঠিক তোমার আর আনন্দীর মতো অনেকে সেই ছবি দেখে। মজা পায়। ঠিক আছে বাবা...বুঝতে পেরেছি। আমার বকবকে তুমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছো তো? কিন্তু এক্ষুনি তোমাকে যাদের ছবি দেখাবো, তাদের দেখলে তোমার বেশ আনন্দই হবে। হাতে ফুল নেওয়া এই পুঁচকে দুটোকে আমি দেখতে পাই চেরাপুঞ্জির রাস্তায়। ওদের কাজ ফুল বিক্রি করা। আর সেই টাকায় মা-বাবাকে ওরা কিনে দেয় চাল, আলু, ডিম। তাই বলে ভেবো না ওরা স্কুলে যায় না। পড়াশুনো করে না। এমনি করেই সারাদিন ফুল বিক্রি করে। মোটেই না। সকালের স্কুলে ভাত দেয়, ডাল দেয়, কখোনো কখোনো ওরা খেতে পায় স্কোয়াশের তরকারী। তারপর রাস্তার ধারে ফুটে থাকা ঘাস ফুল তুলতে যায় সবাই মিলে। সেই ঘাসফুল ছোট ছোট বান্ডিল করে ওরা বিক্রি করে।

ছবি

হ্যাঁ ঠিক বলেছো...পুরুলিয়ার অনিল শবর যেমন বিক্রি করে ঘাসের বানানো নৌকা, কুচবিহারের আন্দু রাভা যেমন বিক্রি করে সুপারীর খোসা দিয়ে তৈরী মুখোশ ঝাড়গ্রামের সোনালী হেমব্রম যেমন বিক্রি করে পিঁপড়েদের ফেলে যাওয়া বাসা ঠিক তেমনি এরা ফুল বিক্রি করে। আমিও ওদের কাছ থেকে অনেক অনেক ফুল কিনে গাড়ির সামনে আমার বসার জায়গায় রেখে দিলাম। ওদের কথা খুব একটা বুঝতে পারিনি সিরাজুল। ভাঙা হিন্দিতে কি আর অনেকক্ষণ গল্প করা যায়? ওদিকে আকাশে যে মেঘ করে আসছে। আর আমার ড্রাইভার বন্ধু বাপী তাড়া দিচ্ছে প্রচন্ড। এরপর যেখানে গেলাম সেটা তুমি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। পাহাড়ী ঝরনার তীব্রতা যে কি...তুমি যখন এখানে আসবে নিজেই জানতে পারবে।

ছবি

দেখলাম অনেক স্কুল আর কলেজের ছেলে মেয়েরা এসেছে। মজা করছে। তাদের মধ্যে দুজনকে তো আমার মেক্সিকোর কাউবয়ের মতো মনে হলো। ওরা নিজেরাই ডাকলো আমাকে। আমার হাতে ক্যামেরা দেখে খুব শখ হলো ছবি তোলার। আমি ওদের ছবি তুলে দিলাম। শুনলাম পাশের কোন এক কলেজ থেকে এডুকেশানাল ট্যুরে এসেছে।

ছবি

যাইহোক। এবার এই ছবিটা দেখো। এটা কী তোমার ব্রিজ বলে মনে হচ্ছে সিরাজুল? ঠিক ধরেছো...এটা গাছের শিকড় দিয়ে তৈরী করা একটা ব্রিজ। আপনা থেকেই এমন হয়ে গেছে। অনেক দূর থেকে মানুষরা এখানে আসে এই প্রাকৃতিক উপায়ে নির্মিত ব্রিজটা দেখতে।

ছবি

আরে আরে দাঁড়াও দাঁড়াও...অত হড়বড় করলে হয়? আনারস দেখে থমকে দাঁড়াতেই হলো সিরাজুল।

ছবি

এরা সবাই ট্যুরিস্টদের আনারস বিক্রি করে। জঙ্গলের আনারস, আর মধু খেয়ে আমরা ফিরলাম হোটেলে।

ছবি

মন খারাপ সিরাজুল। বিকেলের উড়োজাহাজে ফিরতে হবে কলকাতা। আর ফিরেই তোমাকে একটা বড় চিঠি লিখতে হবে। তোমার পাঠানো সহজ পাঠের কবিতাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। প্লেনে উঠে, জানলার ধারে ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর মেঘ দেখতে দেখতে সেই কবিতাটার কথাই ভাবছিলাম।

ছবি

"কত দিন ভাবে ফুল/ উড়ে যাবে কবে/ যেথা খুশি সেথা যাবে/ভারী মজা হবে/ তাই ফুল একদিন মেলে দিল ডানা/ প্রজাপতি হল তারে/ কে করিবে মানা..."। আমাকে কেউ এখন আর মানা করে না সিরাজুল কোনো কিছুর জন্য। আমি এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটে বেড়াই। আর যখন খুব মন কেমন করে তখন ফিরে আসি উত্তরপাড়ার খেয়াঘাটে। লিখতে বসি তোমাকে একটা বড় চিঠি। আর ঠিক তখনি কোথা থেকে পাল তোলা নৌকা করে মন কেমনেরা পালিয়ে যায় দূর দেশে। অনেকদিন তাদের আর খোঁজও পাই না। খুব ভালো থেকো সিরাজুল। এবারে রহিমচাচার তাল পাটালী খেয়ে কেমন লাগলো জানিও। আর একটা লম্বা চিঠি লিখো। আবার যেন অনেক রাতে বাড়ি ফিরে আমি আমার পড়ার টেবিলে সোঁদা মাটির নোনা গন্ধ পাই তোমার হাতের লেখায়। তোমার মিষ্টি করে লেখা চিঠিতে। অনেক ভালোবাসা।

লেখা ও ছবিঃ
কল্লোল লাহিড়ী
উত্তরপাড়া খেয়াঘাট, হুগলী।