সূচীপত্র- শীত সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

মেঘ বৃষ্টির দেশে

সিরাজুল, ভুলে গেছো কী আমায়? ও চিনতে পারছো না বুঝি? তা তো হবেই। সেই যে আগষ্টের দু-তারিখে আমাকে তুমি টাটা করে একটা ছোট্ট ডিঙিতে উঠলে তারপর তোমার আর পাত্তাই নেই। মাঝে একটা চিঠি লিখেছিলাম তোমাকে। চাঁদের বুড়ি সেটা ইচ্ছামতীতে ভাসিয়ে দিলো। আর কাগজের নৌকা হয়ে ভাসতে ভাসতে সে তোমার সুন্দর বনের সুন্দর গ্রাম পাখিরালায় যখন পৌঁছোলো তখন শীত এসে গেছে গুটি গুটি পায়ে। চারিদিকে কুয়াশা নামছে ঘন। তুমি আর তোমার বোন আনন্দি পড়তে চলেছো ভবেশ স্যারের বাড়ি বাঁধের রাস্তা দিয়ে গুটি গুটি পায়ে। বিন্দু এই শীতেও বাগদার মীন ধরতে নেমেছে জলে। আনিসুল চাচা খেজুর রসের হাড়ি নামাতে যাচ্ছেন গাছ থেকে। আর হীরু ময়রা এই মাত্র উনুনে আগুন দিয়েছে। সাড়ে ছটার নৌকা আজ ঢের দেরী করবে। তাই লুচি ভাজার জন্যে আজ তাড়াতাড়ি নেই। সামনের হাটের লোকজন সবে জড়ো হতে শুরু করেছে। তুমি আর আনন্দি সেই হাট পেরোলে, মাঠ পেরোলে, প্রাইমারী স্কুলটার পেছনে ফুলে ভরা সজনে গাছটা পেরোলে-আমি চোখ বন্ধ করে সবটা দেখতে পাই সিরাজুল এখোনো। জানতে চাইছো তাহলে কেনো আসছি না তোমার গ্রামে? কেনো ভাসিয়ে দিচ্ছি না আমার ছোটো পানসিটা হরিণভাঙার স্রোতে? কেনো রাতে করিম চাচার নৌকায়  রাতের আঁধারে বসে কুমীরের গল্প শুনছি না? আর সেই দুষ্টু বাঘটাকে ভয় দেখানোর জন্যে কেনোই বা মশাল হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি না বাঁধের চারধার তোমার আর আনন্দির সাথে? এই গুলো আমি কোনোটাই করতে পারবো না সিরাজুল যতক্ষণ না তুমি আমার চিঠির একটা লম্বা উত্তর লেখো। যতক্ষণ না তুমি এসে আমার উত্তরপাড়ার খেয়াঘাট থেকে আমাকে এসে নিয়ে না যাও। হ্যাঁ আমি তোমার ওপর রাগ করেছি সিরাজুল। খুব রাগ। দেখা হলে প্রথমে দুজনে মিলে খুব ঝগড়া করে নেবো একচোট। কিন্তু তার আগে তো শোনাতে হবে আমার সেই চেরাপুঞ্জি যাওয়ার গল্প। না হলে তোমার মুখ যেমন ভারী হবে ঠিক তেমনি আর কোনোদিন ইচ্ছামতীতে আমাকে কাগজের নৌকা ভাসাতে দেবে না চাঁদের বুড়ি। কী শুনতে চাও তো আমার সেই মেঘ বৃষ্টি দেশে ঘুরে বেড়ানোর গল্প? জানো সিরাজুল এক্ষুনি তোমার নাক ফোলানো রাগ করা মুখটা আমি দেখতে পেলাম। আচ্ছা ঠিক আছে এরপর যখন কোথাও দূরে যাবো...অনেক দূরে...তোমাকে সঙ্গে নেবো। এখন তুমি তো আর ছোটোটি নেই...তোমার গোঁফটাও শুনলুম বেশ হয়েছে। থুতনির কাছে কচি ঘাসের মতো কয়েকটা দাড়ি। উফ...আচ্ছা...আর বলবো না। লজ্জা পেয়েছো না? ঠিক আছে। তাহলে এই ছবিটা ভালো করে দেখো।

 মেঘ বৃষ্টির দেশে

ফলটাকে কী চিনতে পারছো? হ্যাঁ ঠিক ধরেছো। ন্যাসপাতি। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি যাওয়ার পথে এই রকম অনেক ন্যাসপাতি গাছের দেখা পেলাম আমি। বায়না করতেই, আমার গাড়ি চালক বাপি এনে দিলো কয়েকটা। কিন্তু সেগুলো তখোনো কোষ্টো। বিস্বাদে ভরা। পাকতে আরো দেড় দুই মাস। কিন্তু প্রথম ন্যাসপাতি গাছ দেখে আমার যা আনন্দ হলো তোমায় বলতে পারবো না সিরাজুল। লিখেও বোঝাতে পারবো না। তা সে তুমি আমার যতই মার্কস কাটো না কেনো। রাস্তায় চলতে চলতে যতই আমাদের গাড়ি পাহাড়ি উতরাই ধরে উঁচুতে চড়তে লাগলো ততই ঘন কুয়াশা ঘিরে ধরলো আমাদের। পাশের বন্ধু শীতের র‍্যাপার বের করে গায়ে পড়লো। কিন্তু তুমি তো জানো। আমার শীত বড় কম। কিচ্ছুটি পড়লাম না। শুধু একটু বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করলো। বন্ধুর ধমকানিতে সেটাও কী হবার জো আছে? হঠাত গাড়ির বাইরে জানলার দিকে চেয়ে দেখলাম কুয়াশা ঘিরে ধরছে আমাদের। ঘন কুয়াশা। মনটা আবার হঠাত ভালো হয়ে গেলো সিরাজুল। বৃষ্টি ভেজার কথা ভুলেই গেলাম।

মেঘ বৃষ্টির দেশে

গাড়ি থামাতে বললাম আমাদের সারথী বাপীকে। চারিদিকে যেদিকে তাকাই শুধু কুয়াশা আর বৃষ্টি। সেই আঁধার আলোর মধ্যেই চোখে পড়লো একটা সাইন বোর্ড। বুঝতে পারলাম আমি পৌঁছে গেছি চেরাপুঞ্জির প্রথম দরজা শোরেতে।

ছবি দেখে বুঝতে পারছো কি, কুয়াশার ঘন ঘটা কেমন ছিলো? না সত্যি ঠান্ডা লাগছিলো না জানো। অথচ চারপাশের লোকজন ভিজে ভিজে কাজ করছে। কারোর বারণ না শুনে আমি সামনের একটা চায়ের দোকান থেকে চা খে্তে চাইলাম।  টুপ করে নেমে পড়লাম রাস্তায়। আর তখনি অবাক হয়ে দেখলাম রাস্তার ধারেই একটা ছোট্ট সুন্দর ঝরনা।

মেঘ বৃষ্টির দেশে

ঝরনা দেখে খুশিতে আহ্লাদে আটখানা হওয়ার জোগাড়। এই ঝরণা গুলোতে সারা বছর জল থাকে। বৃষ্টির জলে পুষ্ট হয়ে নেমে আসে পাহাড়ের খাদ বেয়ে। ঝরনার ছবি তুলে আমি চায়ের দোকান থেকে চা খেতে গিয়ে শুনলাম সামনে এখোনো অপেক্ষা করে আছে আরো নানান সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড়ের একটা সুন্দর শহর এই চেরাপুঞ্জি। ২০০১ সালের জনগনণা অনুসারে চেরাপুঞ্জির জনসংখ্যা ১০,০৮৬ জন। তাহলে ভাবতেই পারছো তোমার পাখিরালা বা আমার উত্তর পাড়া থেকে কতটা কম। হ্যাঁ এই বারো বছর পরেও। এখানে অনেকে ছোট-খাটো খনিতে কাজ করে। ক্ষেতে কাজ করে। কেউ কেউ পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে। আবার কেউ বা হাতের কাজে দক্ষ। তবে অনেকে খুব গরীব। সরকারের তরফ থেকে নানা কিছু চেষ্টা চলছে হয়তো কিন্তু তার সুদূর প্রসারী প্রভাব এইসব মানুষদের জীবনে আসতে এখোনো ঢের দেরী। তার সাথে আছে রাজনৈতিক নানা কিছুর অশান্তি। ওঃ ভুলেই গিয়েছিলাম। তোমার তো আবার এইসব শুনতে মোটেই ভালো লাগে না। আচ্ছা ঠিক আছে যে দুজনের সাথে রাস্তার ধারেই পরিচয় হলো তাদের ছবি আগে তোমাকে দেখাই। তারপর সিরাজুল আমাকে বলতে হবে এরা কী কাজের সঙ্গে যুক্ত। কেমন? রাজী তো?

মেঘ বৃষ্টির দেশে

বুঝতে পারছো কী ছবিটা দেখে কিছু? ধরতে পারলে না তো? তাহলে বলি শোনো। এখানে অনেক ছোট ছোট কয়লার খনি আছে। হ্যাঁ বেশিরভাগ গুলোই বে-আইনি। সরকার থেকে সেখানে কয়লা তোলার কোনো অনুমতি নেই। তবুও এরা সেই কাজ করতে বাধ্য হয়। ঠিক যেমন  তোমাদের  গ্রাম থেকে এখোনো অনেকে লুকিয়ে লুকিয়ে জঙ্গলে কাঠ কাটতে যায়, মধু আনতে যায় তেমন। ওদের সাথে অনেকক্ষণ কথা বললাম। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই। ওরা কথা বলতে থাকলো ওদের খাসি ভাষায়। আর আমাদের ড্রাইভার বাপি সব অনুবাদ করে দিতে থাকলো বাংলাতে। আড্ডাটা যখন বেশ জমে উঠেছে, তখন ওরাই বললো, “এইবারে বেরিয়ে পড়ো বাবুরা...সামনে এখোনো অনেকটা পথ বাঁকি। কত কিছু দেখার আছে আমাদের এই দেশে। কত পাহাড়, কত নদী। অনেক দেখো...অনেক ছবি তোলো...।” ওদের সাথে...ওদের মতো করে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিলো সিরাজুল। মনে হচ্ছিলো ওদের সাথে গিয়ে দেখে আসি ওদের কয়লা খনিটাকে। কিন্তু সময় নেই হাতে। একদিনের মধ্যে আমাকে দেখতে হবে এই সুন্দরী চেরাপুঞ্জিকে। গাড়ি বাঁক নিলো। আর যে জায়গাটায় এসে দাঁড়ালাম সেটা হচ্ছে অন্ধকার এক সুড়ঙ্গের সামনে। প্রাকৃতিক এই সুড়ঙ্গটা পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের জায়গা।

মেঘ বৃষ্টির দেশে

বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না ভেতরটা ঠিক কতটা অন্ধকার হতে পারে। আর এই সুড়ঙ্গের মধ্যে তোমাকে খালিপায়ে হাঁটতে হবে সিরাজুল। জুতো পড়ে ঢুকতে দেয় না। আমি অনেক জঙ্গলে ঘুরেছি, হাতির পিঠে চড়ে জংলী হাতিকে তাড়া করেছি। অনেক রাতে সুন্দর বনের খাড়িতে তোমার সাথে কাঁকড়া ধরতে গেছি। সেই দুষ্টু কুমীরটাকে দেখতে ছুটে গেছি লাল কাঁকড়ায় মোড়া মোহনার কাছে। আমার আবার ভয় কি? বন্ধুদের স্বান্তনা দিই। কিচ্ছুটি হবে না চল না ভেতরে। বলছে তো লাইট আছে। কোনো রকমে রাজী করিয়ে, কুড়িটাকা দিয়ে টিকিট কেটে জুতো গুলো এক জায়গায় জমা রেখে আমরা ঢুকলাম সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে। আর ঢুকেই যেটা বুঝতে পারলাম, এই অভিজ্ঞতা অন্য সব কিছুর থেকে অন্য রকমের হতে চলেছে।

মেঘ বৃষ্টির দেশে

সুড়ঙ্গের ভেতরে পা দিতেই ছ্যাঁক করে উঠলো গাটা। এতো ঠান্ডা পায়ের তলার জলটা। আর পাথর গুলো এতো পেছল? সামনের পথটা আগে অনেকটা বেশি চওড়া ছিলো। কিন্তু যতই এগোতে থাকলাম ততই দেখতে পেলাম ক্রমশ শুরু হয়ে যাচ্ছে পথটা। আর পায়ের নীচে জলটাও বেড়ে যাচ্ছে। হাঁটু পর্যন্ত সমান। মাত্র চারজন করে লোক ঢোকায় এই সুড়ঙ্গে। আমরা চারজন খুব কাছাকাছি পরপর দাঁড়িয়ে। কারণ সামনেই জলের যে অংশটা দেখতে পাচ্ছি সেটা অনেকটা। নীচের কাঠের তক্তাগুলোকে অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে।

মেঘ বৃষ্টির দেশে

কিন্তু সেই তক্তা গুলোও অশক্ত। এদিকে বাইরে শুনে এসেছি গত সাতদিনের থেকে নাকি আজকে বেশি বৃষ্টি পড়ছে। আর সুড়ঙ্গের মধ্যে জল জমা হচ্ছে অনেক। আমরা আর একটুও দেরী না করে একে অপরের হাত ধরে ছোট বেলায় যেমন করে ট্রেন ট্রেন খেলতাম ঠিক সেই রকমভাবে পরপর দাঁড়ালাম। আর এক এক জন করে কাঠের তক্তা পেরোতে চেষ্টা করলাম। সবার শেষে আমি। আমার হাতে ক্যামেরা। সবাই এক এক করে টপকে গেলো সেই ঠান্ডা শীতল জল। খুব পিচ্ছিল পাথর। কাঠের তক্তা। ওপারে আরো অন্ধকার। ওরা ওদিক থেকে আমাকে ডাকতে থাকলো “কল্লোল খুব তাড়াতাড়ি…। এদিকের জল আরো বাড়ছে। সুড়ঙ্গ থেকে বেরোতে আমাদের আরো পাঁচমিনিট লাগবে।” আমি যেটা কোনোদিন করিনা সিরাজুল…সেই ভুলটাই করে ফেললাম। তাড়াতাড়ি সেই পাথর আর কাঠের তক্তার ওপর দিয়ে যেতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেলাম আচমকা সেই ঠান্ডা জলে। আর ঠিক তখনি সুড়ঙ্গের সব আলো গুলো নিভে গেলো। চারিদিকে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা।বন্ধুরা চিতকার করে ডাকতে থাকলো, “কল্লোল...কল্লোল...”। আমি তাদের ডাকে সাড়া দিতে পারলাম না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আর মনে হচ্ছে আমি আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছি অনেক অনেক গভীর জলে। চারিদিক থেকে যেন আমাকে ঘিরে ধরছে অনেক অনেক বছর আগে জমে থাকা শ্যাওলা। আমি বাঁচার জন্যে কাঠের তক্তা ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোথায় কাঠের তক্তা? কোথায় কী? আমি আস্তে আস্তে তলিয়ে যেতে থাকলাম জলের তলায়। তাহলে কী আমি ডুবে যাচ্ছি? মাকে দেখতে ইচ্ছে করলো খুব...তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করলো সিরাজুল। কিন্তু ততক্ষণে শ্যাওলা গুলো আমাকে ঢেকে ফেলেছে। আমি আর কোনোদিন বেরোতে পারবো এখান থেকে? জলের তোড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম সেটা অসম্ভব। আমরা আটকে পড়েছি অন্ধকার সুড়ঙ্গে। আমাদের এখন বিপদ। মনে হলো আস্তে আস্তে তলিয়ে গেলাম গভীর জলে।

 


ছবি ও লেখা
কল্লোল লাহিড়ী, উত্তর পাড়া
তথ্য- উইকিপিডিয়া