খেলাঘরখেলাঘর

তীর ধনুক

তুমি কি কখোনো তীর ধনুক দেখেছো? দেখেছো নিশ্চয়। হয়তো প্লাস্টিকের তৈরি একটা ছোট্ট নমুনা নিয়ে খেলাও করেছ। কিন্তু সত্যিকারের তীর ধনুক হাতে নিয়েছো? ছুঁড়েছো তীর? কোনো এক অলস দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে আছে...এক পাড়া গাঁয়ের ছেলে হাতে তীর ধনুক নিয়ে নিজেকে বীর কর্ণ মনে করছে। আর কিছু দিন আগে দেখা এক যাত্রার সংলাপ বলে চলে চলেছে। মহাভারতের কর্ণকে কি তুমি চেনো? সে এক বীর নায়ক। সূর্য আর কুন্তীর পুত্র। কিন্তু সে যদি থাকে তাহলে মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবরা জিতবে কি করে? অতএব মরতে হবে কর্ণকে। প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় বীর কর্ণ মারা যাচ্ছেন । গ্রামের যাত্রায় এই গল্প দেখার পর ছোট্ট অপু  কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কর্নের মৃত্যু। একলা একলা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার শেষ পর্যন্ত সে চেষ্টা করে যাচ্ছে কর্ণকে জেতাবার। কিন্তু পারছে না...তীর ধনুকের গল্প করবো আর কর্ণের কথা, অপুর কথা বলবো না সেটা হয়না। অপুর এই তীর ধনুক খেলার গল্প জানতে হলে পড়ে ফেলো 'পথের পাঁচালী' বা অন্তত তার সংক্ষিপ্ত সংস্করন -'আম আঁটির ভেঁপু'। কিন্তু আমি আপাতত করবো তীর ধনুকের গল্প।

তুমি নিশ্চই আমার সাথে একমত হবে যে পৃথিবীতে মানুষই হলো শ্রেষ্ঠ জীব। এই শ্রেষ্ঠত্ত্ব সে পেয়েছে অন্য সব বিশাল আকার বলশালী প্রাণীদের হঠিয়ে অথবা হারিয়ে দিয়ে। অন্য প্রাণিদের চেয়ে দুর্বল মানুষ নিজেকে বাঁচাতে তুলে নিয়েছিলো ভারী ভারী পাথরের টুকরো। সেই পাথরের টুকরো ছুঁড়ে তাকে বাঁচতে হয়েছে সেই বিশালাকার প্রাণিদের হাত থেকে। এই বাঁচার তাগিদেই মানুষ আবিষ্কার করেছিলো তীর ধনুক। হয়তো কোনো বেঁকে যাওয়া গাছের ডালে নিজেদেরই শিকার করা প্রাণীর অন্ত্র দিয়ে তৈরী ছিলা, আর ভেঙে যাওয়া বর্শার সামনের অংশটুকু দিয়ে কোনো একজনের আবিষ্কৃত তীর ধনুক মানুষ ব্যবহার করতে শিখলো...সেদিন থেকেই মানুষ সভ্যতার আর এক ধাপে এগিয়ে গেলো।
স্পেনের আলতামিরা গুহাচিত্রে শিকারীর হাতে তীর ধনুক দেখা যায়। মিশরের প্রাচীন অস্ত্রের তালিকায় ছিল এই তীর ধনুক। পিরামিডের দেওয়ালে বা পাত্রের ভাঙা অংশে তার প্রমান মেলে। গ্রীক পুরানে যে সব দেব-দেবীদের কথা আছে, তাদের অনেকেই তীরধনুক ব্যাবহার করেন-  যেমন,বন্যপ্রানী ও শিকারের দেবী আর্টেমিস।
আর্টেমিস
আর্টেমিস -পিঠে রয়েছে তীরের বোঝা

আমাদের দেশ ভারতবর্ষে দুই মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতে তীর ধনুকের ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো।  রামায়নে আছে রামের হরধনু ভঙ্গ, ইন্দ্রজিতের শক্তিশেল, রাম-রাবণের যুদ্ধ।
রাম
রাজা রবি বর্মার আঁকা রামের হরধনু ভঙ্গ

মহাভারতে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ, একলব্যের গল্প, পিতামহ ভীষ্মের তীর ধনুকের বিছানায় যাকে বলা হয় শরশয্যায় ইচ্ছা মৃত্যু, শ্রীকৃষ্ণের তীরের আঘাতে মৃত্যু ইত্যাদি তীর -ধনুক নিয়ে কত কত গল্প আছে। এমনকি মনিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা, তিনিও ছিলেন ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী।
অর্জুন
তীরধনুক হাতে বীর অর্জুনের এই মূর্তিটি আছে বালিদ্বীপে

পৃথিবীর আদিম অধিবাসীরা এখোনো তীর ধনুকের ব্যবহার করেন। কোনো কোনো আদিম উপজাতি বা জনজাতিরা পূজা করেন এই অস্ত্রের। বিদ্রোহের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয় তীর ধনুককে। তুমি কি সাঁওতাল বিদ্রোহে সিদহু-কানহুর  কথা জানো? বিরসা মুন্ডারবা  কিম্বা তিতুমীরের কথা...তাঁর বাঁশের কেল্লার কথা? পরাধীন ভারতবর্ষে এঁরা সবাই ইংরেজদের সেই ভয়ঙ্কর কামান আর বন্দুকের সামনে লড়াই করেছিলেন তীর ধনুক নিয়ে। তাঁদের সেই বীরত্ত্বের কথা দেশ প্রেমের কথা আজও আমরা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
সিধুকানু
সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা সিদহু আর কানহু
 
বীরসা
বীরসা মুন্ডা- তীর ধনুক নিয়ে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন
 
ধনুক ব্যবহার করতে দরকার ব্যবহারকারীর শক্তি ও দক্ষতা। ধনুকের ছিলায় তীর যোজনা যাকে আমরা গুণ পরানো বলি তার জন্য যিনি ব্যবহারকারী তাঁর নিজস্ব ধনুকের ব্যবহারেই পূর্ণ দক্ষতা প্রকাশ পায়। দুটো উদাহরণ দেবার লোভ সামলাতে পারছি না। পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের খবর পেয়ে কৌরবেরা যখন ধ্রুপদ রাজ্য আক্রমণ করলেন, সেখানে বৃহন্নলাবেশী অর্জুন সেই আক্রমণ ঠেকাতে তাঁর লুকোনো তীর ধনুক নিয়ে যুদ্ধে নামলেন। তাঁর ধনুকের টঙ্কার শুনে কৌরবেরা নিশ্চিত হলেন ছদ্মবেশের আড়ালে আর কেউ নন তিনি স্বয়ং অর্জুন। তীর ধনুক নিয়ে আরো একজন বীরের নাম তুমি নিশ্চই জানো তিনি হলেন রবীন হুড। দুঃখী মানুষের ত্রাতা রূপে আজও এই নামটি খবরের কাগজে বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
রবিনহুড
আরেক বিখ্যাত ধনুর্ধর - রবিনহুড

কিন্তু এইসব গল্প করতে বসলে কাজের গল্প বাদ পড়ে যাবে।

তীর ধনুক নিয়ে অনেক দিন লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের কাছে বারুদ আবিষ্কারের পর এর প্রয়োজন প্রায় ফুরিয়ে এলো। শুধু মাত্র রয়ে গেলো এই অস্ত্রটি নিয়ে প্রতিযোগিতা। তীর ধনুক নিয়ে খেলা। ইতিহাস সংরক্ষণ ও কথনে অন্য সব দেশের চেয়ে একটু বেশি পটু ও মনোযোগী ইংরেজরা এই ইতিহাস ধরে রেখেছেন ১৭৮০ সাল থেকে। লিস্টারশায়ারে স্যার অ্যাশটন লিভার তাঁর কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে তীর ধনুক খেলার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রয়্যাল টক্সোফিলিট সোসাইটি [ Royal Toxophilite Society]। লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের অফিস থেকে আজও এঁরা বিশ্ব তিরন্দাজী খেলার নিয়ম কানুন ঠিক করেন।

সুদূর অতীতের অস্ত্র আজ অন্যতম একটি প্রতিযগিতা মূলক খেলা। তার গাল ভরা নাম তীরন্দাজী, ইংরাজিতে আর্চারি [Archery]। এই খেলার নিয়ম কানুন মেনে ওলিম্পিকে যিনি লক্ষ্যভেদ করতে পারেন তিনিই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। এবার বলো তো দেখি, আমাদের বাংলার এক মেয়ের নাম, যিনি কিনা আবার ওলিম্পিকে ভাগ নেওয়া প্রথম ভারতীয় মহিলা তীরন্দাজ? - ঠিক ধরেছো - তিনি হলেন বরানগরের মেয়ে দোলা ব্যানার্জি।
 দোলা
দোলা ব্যানার্জি
 
দোলা হলেন ভারতের প্রথম মহিলা তীরন্দাজ, যিনি অর্জুন পুরষ্কার পেয়েছেন। অর্জুন পুরষ্কার কি জানোতো? খেলাধূলায় ভারতের সর্বোচ্চ পুরষ্কার হল অর্জুন পুরষ্কার।
 
তাহলেই ভাবো একবার - সেই গ্রীক পুরাণের আর্টেমিস থেকে মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা হয়ে আজকের ভারতের দোলা - কত কত যুগ পেরিয়েও তীর -ধনুক কেমন করে আজও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বয়েছে। অস্ত্রের চেহারা বদলেছে অনেক, ব্যাবহারও বদলেছে, কিন্তু তীর -ধনুকের সাথে মানুষের সম্পর্ক আজও অটুট।
 
 
 
 
প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায়
বালী, হাওড়া
 
ছবি
আইলাভইন্ডিয়া
উইকিমিডিয়া
রাজ্যসভা
ডব্লিউবিগভ

এই লেখকের অন্যান্য রচনা