খেলাঘরখেলাঘর

ম্যারাথন

দৌড়ের দিন ভোরবেলা, বাতাসের তাপমাত্রা শূণ্য কি এক ডিগ্রি হবে,প্রায় দশ হাজার লোক জমায়েত হলো। মাইকে সেকি চিতকার, কি হট্টগোল। চতুর্দিকে বিজ্ঞাপন, সবাই বাঁশি বাজিয়ে প্রতিযোগিদের চিয়ার আপ করছে। আমরা লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গা ঘষে চিয়ার আপ হচ্ছি, না দৌড়লে ভীষণ শীত। ঠিক সাড়ে আটটায় বন্দুকের শব্দ হলো-আর আমরা কয়েক হাজার লোক হো...ও...ও...শব্দ করে দৌড়োতে শুরু করলাম। ম্যারাথনের মজা হল সবাই সঙ্গে থাকলে কষ্ট কম হয়, মজা লাগে। আর এইভাবে দৌড়ে একটা শহরের কত জায়গা যে দেখা হয়ে যায় তা আর বলার কথা না। এমনিতে অনেকক্ষণ দৌড়োলে মাথা ফাঁকা থাকে, সময় অনেক স্লো লাগে, তাই নানান হাবিজাবি চিন্তা করতে করতে দৌড়োলে দিব্যি টাইম কাটে। খালি দুম করে আলটপকা কোথাও পা হেলে বা ঘুরে যাতে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। এরমধ্যে আবার ছুটকো-ছাটকা মজা হচ্ছে। একটা ব্রিজের তলা দিয়ে যেতে যেতে একশো্টা লোকের চিতকার দিয়ে যে দারুন প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করা যায় সেটাই জানতাম না। কোথাও কোথাও বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একগাদা বাচ্চা আমাদের হাত ছোঁবে বলে সার বেঁধে জমায়েত হয়েছে। কেউ কেউ আবার দৌড়ের লাইনের ঠিক সাইডে মুসাম্বি বা কোনো ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর এইসব মজার মধ্যে সবাই জানে, যে জলের স্টেশন প্রতি তিন মাইলে একটা। আর বাথরুম হলো ছয়ে এক।

প্রথম পনেরো কিলোমিটার তো এইসব ভাবতে ভাবতেই কেটে গেলো। মনে হলো, গা গরম হচ্ছে না। আর তখনই সেই ভুলটা হলো। আমার পাশ দিয়ে দু-তিন জন পক্ককেশ বৃদ্ধ সাঁ সাঁ করে আমাকে আগেই পেরিয়েছিলেন। তাতে মনে হয় আমার মনে একটু ব্যাথা লেগেছিলো। কিন্তু সাড়ে চার ফুট লম্বা, মানে বেঁটে,মাথায় ব্যান্ডানা বাঁধা এক বুড়ি যখন পনেরো কিলোমিটারে আমায় উল্কার বেগে অতিক্রম করলেন তখন আমার যেন কেমন সব গুলিয়ে গেলো...সুপারম্যান হবার ইচ্ছে হল। নিজের কথা না ভেবে মনে মনে বুড়ির সঙ্গে কম্পিটিশান শুরু করলাম। বুড়ি স্পিড বাড়াচ্ছে, আমিও বাড়াচ্ছি। মনে মনে কে যেন বলছে, যে পরে মহা ফ্যাসাদে পড়বো। কিন্তু থামতে পারছি না। পঁচিশ কিলোমিটারের মাথায় এই সার সত্যটা আবিষ্কার করলাম যে বুড়ি পোড় খাওয়া দৌড়বীর। ওনাকে ধরা আমার সাধ্যের বাইরে। এইভেবে যেই একটু দম ছেড়েছি অমনি টের পেলাম যে আমার দম একেবারে বেরিয়ে গেছে। আমি এসেছি মোট অর্ধেকের একটু বেশি রাস্তা। আর একশো মিটারও যেতে পারবো কিনা সন্দেহ। এই অবস্থাকে ম্যারাথনে নাকি বলে-হিটিং দা ওয়াল। সামনে একটা দেওয়াল যেটা পেরোনো অসম্ভব। আমার মুখ দেখে বোঝাই যাবে না যে আর এক মিনিটের মধ্যে আমি বসে পড়বো। তারপরে পায়ে খিঁচুনি শুরু হবে,এম্বুলেন্সে করে তুলে নিয়ে যাবে - কি লজ্জার ব্যাপার।

ঠিক এইরকম সময় শুনি বিক্রম!বিক্রম! চালিয়ে যা! বলে চিতকার। কি আনন্দ-কি দৃশ্য। সব বন্ধুরা দেখি ওই এলাকাতেই প্রতি মাইল দু মাইলে একজন দুজন করে দাঁড়িয়েছে। ওরা ঠিক জানে যে এইরকম কোনো একটা জায়গাতেই আমি কুপোকাত হতে পারি। ওদের লাফালাফিতে আমার শরীরে বল ভরসা ফিরে এলো। আবার দৌড়োতে লাগলাম। উঁচু রাস্তা, নিচু রাস্তা, ব্রিজ, কোথাও থামলাম না। কুড়ি মাইলের পর এক মহা উতপাত শুরু হলো। লোকে খালি তালি দেয় আর বলে, আরে শাবাস...শাবাস...দৌড় প্রায় শেষ, এই তো আর একটু। মুশকিল হলো এই যে দৌড় মোটেই প্রায় শেষ নয়। আরো প্রায় নয় কিলো মিটার বাঁকি। কিন্তু মন কি আর তখন মনের মধ্যে আছে? মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে যে আমি বোধহয় একটা মাইলপোষ্ট দেখতে না পেয়ে মিস করে গেছি, তাই এত সময় লাগছে। পরের মাইলপোষ্টে গিয়ে ভুল ভাঙে। ততক্ষণে আমার চারিদিকে নানা কারণে ও অকারণে লোকে শয্যাশায়ী হয়েছে,এম্বুলেন্স এসেছে ইত্যাদি। বাইশ মাইল নাগাদ, পাদুটো তখন কি করে চলছে কে জানে, হঠাত বুঝলাম যে আমার একটু বাথরুমে যাওয়া উচিত ছিলো। অতি ক্ষীণ ধারায় আমার প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে, নেহাত গাঢ় রঙ বলে প্যান্টের সাথে তফাত করা যাচ্ছে না। সে কি কান্ড-এইরকম প্রায় মাইল দুয়েক চললো। আবার দু মাইলে শুকিয়েও গেলো।  

শেষ দু মাইল দৌড় যে কি অসহ্য কষ্টের সে কেবল নানা লোকের লেখাতেই পড়েছিলাম। এবার হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। পঁচিশ মাইলের মাথায় দেখি ডান দিকে ঘুরেই আমাদের ফিনিশ লাইন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেই ঢুকতে যাবো, দেখি আরও সোয়া এক মাইল ওই লাইনের ঠিক পাশ দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাইন পেরিয়ে গেছি কিন্তু রেস শেষ হয়নি। এই কষ্টটা আর নেওয়া গেলো না। পুরোটা ঘুরে মুখ কুঁচকে প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে কাতরাতে কাতরাতে লাইনে ঢুকলাম। আমার হিরো হীরালালের মতো প্রবেশের আশা একেবারেই মাটি। ঢুকে যেই না থামা, পা দুটো একেবারে জমে গেলো, হঠাত প্রচন্ড শীত করতে লাগলো। ঠক ঠক করে কাঁপছি, আর মনে হচ্ছে যেন পায়ের নিচের মাটি তখনও নড়তে নড়তে এগোচ্ছে। অবস্থা বিপাক দেখে দু তিনজন স্বেচ্ছাসেবী আমায় তাপ নিরোধক রাংতা দিয়ে জড়িয়ে পায়ের পরিচর্যা করতে লাগলেন, মালিশ ওষুধ এইসব দিয়ে। পনেরো মিনিট বাদে পা ছাড়লো। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে মেডেল আনতে যাওয়া। কতক্ষণ সময় লাগলো? পাক্কা সাড়ে চার ঘন্টা। আর যে ফার্স্ট হলো, তার সময় দু-ঘন্টা নয় মিনিট, ভাবা যায়?

আমার পায়ের ব্যাথা শেষ পর্যন্ত মরলো দু-হপ্তা বাদে। দৌড়ের ছবি গুলো পেলাম এক মাস বাদে। দেখে মনে হচ্ছে যেন এখনি দুম করে পড়ে যাবো। ওই বাইশ থেকে পঁচিশ মাইলের মধ্যেও ছবি আছে। মন দিয়ে প্যান্টের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছি। না বলে দিলে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

 

লেখাঃ
বিক্রম
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড

 

ছবিঃ
কৌস্তুভ রায়
আহমেদাবাদ, গুজরাত

এই লেখকের অন্যান্য রচনা