সূচীপত্র -বর্ষা-শরৎ যুগ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

চারটে বল করার পর প্রমাদ গুনল মানব। মাত্র সাত রানই হয়েছে। অর্থাৎ বাকি দু'বলে আরও এগারো রান দিতে হবে। মাহেশ্বরীর সাথে সেইরকমই চুক্তি হয়েছে। ষাট লাখ টাকার চুক্তি। অবশ্য সে একা নয়, রাভিন্দরও সঙ্গে ছিল। রাভিন্দর ও তার দু'ওভারে গলাতে হবে অন্তত ত্রিশ রান। তাহলেই ঐ টাকা তারা দু'জনে ভাগ করে নিতে পারবে। কিন্তু হতচ্ছাড়া রাভিন্দর তার নির্দিষ্ট ওভারে দিয়েছে মাত্র বারো রান। তাই বাকি আঠেরো রানের দায়টা এখন মানবের।

মানব তার দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী বোলার। যে কোনও ধরণের পিচে, যে কোন পরিস্থিতিতে মানবের হাতে আছে সেই প্রতিভার ছোঁয়া, যা দিয়ে সে তার ছুঁড়ে দেওয়া বলটায় করতে পারে প্রাণসঞ্চার। অলৌকিকভাবে নিষ্প্রাণ বলটা তখন ব্যাটসম্যানের কাছে পৌঁছয় একটা দুর্বোধ্য প্রশ্নচিহ্নের আকারে। বেশীর ভাগ সময়েই সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার আগেই ব্যাটসম্যানকে ধরতে হয় শিবিরে ফেরার রাস্তা। বিপক্ষের জমাট পার্টনারশিপ ভাঙ্গতেই হোক, অবাধ রানের গতি থামাতেই হোক অথবা রুখে ওঠা কোন ব্যাটের বিষদাঁত নষ্ট করতেই হোক, দলের অধিনায়কের একমাত্র ভরসা মানব।

মানবের সামনে ছিল অপার সম্ভাবনা। কিন্তু ক্রিকেট খেলতে গিয়ে কখন যে সে আর এক খেলায় মেতে উঠেছিল, নিজেও ঠাহর করতে পারে নি। রুপোর ঝলকানি ছিল চাড্ডা, মাহেশ্বরীদের হাতে। সে আলোর তীব্রতা ঢেকে দিয়েছিল নিজের ভবিষ্যৎ, দলের স্বার্থ আর ঐ লাল গোলাকার বস্তুটার সাথে তার আবাল্য সখ্যতা... রাভিন্দর এক ফাঁকে সবার চোখ বাঁচিয়ে তার কাছে মাপ চেয়ে গেছে। সেই সঙ্গে যে ইঙ্গিতটা করেছে তার মানে হয়, অব সব কুছ তেরে হাথ মে। তু কর শকতা হ্যায় ইয়ার।

রাভিন্দরকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি উপহার দিয়েও মানব ভেবে নিয়েছিল, করতে তাকে হবেই। কাজটা সহজ করে দিল দলের ক্যাপ্টেন, সে যখন তাকে অন্য টীমের মারকুটে ব্যাটসম্যান বিপিনের বিরুদ্ধে বল করতে ডাকল। বিপিন মানবের খুবই পরিচিত। একসময়ে অনেক কোচিং ক্যাম্প একসাথে করেছে, একই ষ্টেট টীমে খেলেছে। এখন আলাদা ফ্র্যাঞ্চাইজিতে হওয়ায় তারা মুখোমুখি। ম্যাচজেতানো ব্যাটসম্যান বিপিন, মেরে খেলায় প্রসিদ্ধি আছে তার।

ওভারের শুরুতে মাহেশ্বরীকে সংকেত করতে ভোলে নি মানব, এই সেই ওভার। বাঁ পকেট থেকে সবুজ রুমাল বার করে মুখ মুছে ডান পকেটে ঢুকিয়েছিল সে। তখন সে জানবে কি করে ওভারের প্রথম বলটা বিপিন সোজা ব্যাটে খেলে একটা রান নিয়ে নেবে?

অন্যদিকের ব্যাটসম্যানটি একদম নতুন, একেবারে ঢ্যাঁড়স মার্কা। তাড়ু, টেকনিকের বালাই নেই। ভয় হল, আউট না হয়ে যায়। এর পরেই শেষ ব্যাটসম্যান, সে হয়তো একটা বলও টিকবে না। খুব সাবধানে একটা আলগা বল দিল মানব। ব্যাটসম্যান চোখ বুজে চালাল। কি করে যে বলটা উইকেটকীপারের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বাউন্ডারীর বাইরে পড়ল, মানব তা জানে না। জানবার দরকারটাই বা কি, বোলিং মার্কে ফিরে যেতে যেতে খুশী মনে ভাবল মানব। ত্রিশ লাখ টাকার ধূসর স্বপ্নটা এবার যেন একটু পরিস্কার দেখতে পেল সে।

সে স্বপ্ন কিন্তু মিলিয়ে গেল তার পরের দু'বলে। তৃতীয় বলটা অফস্টাম্পে রেখেছিল মানব। নাগাড়ে লুজ বল দিলে পাবলিক সন্দেহ করতে পারে। গাধাটা বিট হয়ে মিস করল। 'বোলিং বোলিং' বল ধরে উইকেটকীপার উচ্ছ্বাস জানালো চেঁচিয়ে। 'ওয়েল বোলড মানব' পয়েন্ট থেকে ক্যাপ্টেনও উৎসাহ দিলেন। মানব কিন্তু মোটেই উৎসাহিত হল না। বোলিঙের নিকুচি করেছে, ভাবতে ভাবতে মরীয়া হয়ে পরের বলটা অফস্টাম্পের এক হাত বাইরে ফুল্টস করলো। স্কোয়ার কাটটা ছোকরা মন্দ করে নি, টাইমিংটা একটু বেশীরকম ভাল ছিল। নক্ষত্রগতিতে পয়েন্টে যাওয়ায় কোন রান হোলো না। ক্যাপ্টেন স্বয়ং ধরে ফেলে ফের হাততালি দিলেন। চার বল হয়ে গেল, রান হয়েছে মাত্র সাত!

দু'বলে এগারো রান ইজ টু মাচ টু আস্ক। একটা নো-বল করা ছাড়া আর উপায় নেই, মানব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। মাহেশ্বরী অবশ্য সাবধান করেছিল। 'নো-বল করবে কিন্তু তোমার রিস্কে' জানিয়েছিল সে, 'মোক্ষম সময়ে নো-বল বেশ সন্দেহজনক হয়ে দাঁড়ায়।'

না, আর চান্স নিতে পারে না মানব। কিন্তু আজ ভাগ্যও কি তার সাথে নেই? সতীর্থদের সহানুভুতি আদায়ের জন্যেই নো-বলটা করেই পিচের ওপর গড়িয়ে পড়ল সে, যেন হোঁচট খেয়েছে। তারপর ঝেড়েঝুড়ে উঠে দেখে আম্পায়ার কোন সিগনাল দিচ্ছে না! তার মানে? পা কি তার ক্রীজের ভেতরেই ছিল? তা কি করে হয়, সে তো বেশ মেপেজুখেই টার্গেট করেছিল? কিন্তু আম্পায়ার কোন সংকেত দেয় নি, সুতরাং নো-বল হয় নি।

শুধু আশার কথা, সেই বলে একটা রান হয়ে বিপিন ক্রীজে ফিরে এসেছিল। কিন্তু আশাই বা কোথায়? ত্রিশ লক্ষ টাকার সমীকরণটা মানবের মাথায় ভীষণ জটিল হয়ে দাঁড়াল। এক বলে দশ রান! সে তো বিপিনের বাবারও ক্ষমতা নেই। সুতরাং আরও একটি নো-বল! একটু বেশী রিস্ক নেওয়া হয়ে যাবে না কি? কোন উপায় নেই। যা হয় হবে ভেবে নো-বল করবার রান-আপে প্রচন্ড ভুল করে ফেলল মানব। শেষ পা'টা ফেলেই বলটা হাত থেকে বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে সে আবিস্কার করল পা তার পপিং ক্রীজের প্রায় এক ফুট ভেতরে। এবার আর হোঁচটের অভিনয় করতে হল না। তার স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে সত্যিই সে পিচের ওপর ভেঙ্গে পড়ল।

আর তখনই বলের ওপর ব্যাটের একটা মিষ্টি আওয়াজে দৃষ্টিটা ফিরিয়ে দেখল, বলটা উড়ে যাচ্ছে স্কোয়্যার লেগ বাউন্ডারীর ওপর দিয়ে, আর... আর... তার নীচে দেবদূতের মতো স্কোয়্যার লেগ আম্পায়ার ডান হাতটা মাটির সমান্তরালে তুলে জানাচ্ছেন, বলটা ছিল নো-বল! ফুট-ফল্টে নয়, কিন্তু নো-বল হয়েছে বলটা ব্যাটসম্যানের কোমরের ওপরে থাকায়। আতঙ্কে বলটা ছাড়বার সময়ে আপনা থেকেই গ্রিপ আলগা হয়ে সেটা যে কোন নেহাত আনাড়ী ব্যাটসম্যানেরও লোভনীয় সঠিক উচ্চতায় ধীরগতির লংহপে পরিণত হয়েছিল। বিপিনের মতো ব্যাটসম্যানের জন্য এর চেয়ে বেশী আমন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল না।

'নেভার মাইন্ড মানব, গো ফর হিম', ক্যাপ্টেন তার পিঠ চাপড়িয়ে উৎসাহ দিয়ে গেলেন। মানবের চোখের সামনে রাশি রাশি শিউলি ঝরছে। কিছু শেষ হয় নি। কেউ কিছু বুঝতে পারে নি। এখনও তার একটা বল বাকি। সামনে বিপিন। মাত্র চারটে রানের দূরত্ব! অতল গহ্বর থেকে ভেসে উঠতে উঠতে মানবের মনে হল, ইচ্ছে করলে ত্রিশ লক্ষ টাকা সে এখনই যেন ছুঁয়ে দেখতে পারে।

একটা হাফ ভলি, আর ভুল করবে না মানব। বোলিং মার্কে ফিরে যেতে যেতে ভাবতে লাগলো, বিপিন তুই আমার পুরনো বন্ধু। জানি তুই আমাকে হতাশ করবি না। দেখিস, আমি প্র্যাক্টিসেও কখনো এতো সফট বল তোকে করি নি। একটা বাউন্ডারী শুধু আজ আমি তোর কাছে ভিক্ষে চাইছি!

যেমনটি ভেবেছিল মানব, বলটা ঠিক তেমনই ছিল। স্ট্রেট ব্যাটে লং অফের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিতে বিপিনের কোন সমস্যা হবার কথা ছিল না। কিন্তু এটা কি করলো বিপিন? স্লো মোশনে কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া ছবির মতো পুরো ঘটনাটা আবার মানবের সামনে যেন রিপ্লে হয়ে গেল। বলটা মাঝমাঠ পার হতেই বিপিন স্টান্স বদল করে সপাটে রিভার্স সুইপ করলো। মানব যখন পয়েন্ট বাউন্ডারীর আকাশে বলটাকে আপ্রাণ খুঁজে নিতে চাইছে, সহ-খেলোয়াড়রা এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। বিপিনের ব্যাট থেকে বন্দুকের বুলেটের মতো বলটা গিয়ে তার মিডল স্টাম্পকে শুইয়ে দিয়েছে।

* * *

আধো অন্ধকারে মানব ক্লাবহাউসের গেটের পাশে দাঁড়িয়েছিল। মাথাটা তার একেবারে শূন্য। মাহেশ্বরীর মুখটা মনে পড়তেই মেরুদন্ডের মধ্যে একটা শীতল স্রোত অনুভব হচ্ছে। বড় কড়া ধাতের ব্যবসাদার, খুব সহজে মানব ছাড়া পাবে না।

বিপিন হাসি হাসি মুখে ক্লাবহাউস থেকে বেরিয়ে আসছে। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে মানবকে দেখে বললে, 'ওয়েল ডান মানব।'

বিপিনের দল হেরে গিয়েছিল। তা সত্বেও সে স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে মানবকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। কেন? দলের হারে সে কি দুঃখিত নয়? মানবের মনটা পাথর হয়ে গেছিল, দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলল, 'উস তরিকে সে আউট হোনা জরুরি থা?'

বিপিন চকিতে একবার এদিকওদিক দেখে নিল। মুখে তার অনেকগুলো এক্সপ্রেশন খেলে গেল। তারপর হাত বাড়িয়ে মানবের কাছে এগিয়ে এল। পরম সৌহার্দে তার গলাটা জড়িয়ে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, 'হাঁ ইয়ার, বহত জরুরি থা। কেয়া করে? আখরি গেন্দ হি তো বচা থা...'

'কেয়া বকওয়াস হ্যায় বিপিন, তু অউর ইতনা ইরেস্পন্সিবিলিটি? তু টীম সে নিকালা যা শকতা...।'

'যা শকতা নহী ইয়ার, নিকালা যায়গা। আই নো। লেকিন কেয়া ফর্ক পড়তা? কল বম্বে যা রহা হুঁ। পুরে সীজন কা এক সাথ মিল যায়গা, চালিশ লাখ কা সওয়াল...' কাঠ হয়ে মানব শুনে যেতে লাগলো বিপিন চাপা গলায় বলে চলেছে, 'তু ভি আ যা না ইয়ার, ইয়ে খেল মে কেয়া রাকখা হ্যায়? অসলি খেল মে আ, ম্যায় সেনগুপ্তাসাবকো বতা দেঙ্গে। সামিল হো যা, তেরা ভী তকদীর বন যায়গা ইয়ার...'

মানবের চোখের সামনে তখন আর শিউলি নয়, সর্ষেফুলের মেলা।


সূর্যনাথ ভট্টাচার্য
কলকাতা

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)