খেলাঘরখেলাঘর

তুলির পৃথিবী


এত সুখ বোধহয় বিধাতার সইল না। সবাই যখন গানে গল্পে হৈচৈ করে মেতে রয়েছে, রূপু বাঁদর গাছ বেয়ে বেয়ে হুপহাপ শব্দ করে হাজির হল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "তুলি, শিগগির চল, ওদিকে ধুন্ধুমার লেগে গেছে। তোমাদের বাড়ির পিছনের দিকের গাছগুলো একদল লোক কাটতে এসেছে। তোমার বাবা বাধা দিয়েছেন। তাই ভীষণ চেঁচামেচি হচ্ছে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।" তুলির সব খেলা নিমেষে ভেঙ্গে গেল। সে ব্যাকুল হয়ে বলল, "আমি কি করে এতো তাড়াতাড়ি যাব। আমি যে রাস্তা চিনিনা।" পরীরা বলল, "তুলি, একটা পাখা পরে নাও। এক্ষুণি পৌঁছে যাবে।" তুলির পিঠে ওরা পাখা জুড়ে দিল। তুলির একটু ভয় ভয় করলেও তা দিয়ে সে সাঁ করে এসে পৌঁছল গন্ডগোলের জায়গায়। মস্ত মস্ত করাত নিয়ে লোকেরা গাছগুলো কাটতে শুরু করেছে। ওরা ওখানে একটা হোটেল করবে বলে জায়গা পরিষ্কার করতে এসেছে। তুলি দৌড়ে গিয়ে একটা বড় গাছকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। চিৎকার করে বলে উঠল, "না, না, এরা সব আমার বন্ধু। এদের কাটতে আমি দেবনা।" একটা হোঁৎকা মতন লোক, গোলগোল চোখ, এসে বলল, "খুকুমনি, বন্ধুদের তো এবার ছাড়তে হবে। আমরা এখানে হোটেল বানাবো। কত আলো জ্বলবে, হৈচৈ হবে, লোকজন গমগম করবে। কতো মজা হবে বলো?" ফুঁপিয়ে উঠে তুলি বলল, "তাহলে তো সব পাখিরা চলে যাবে। ওদের খাওয়া, ঘর কিছুই থাকবে না। আর গাছরাও কি তোমারও বন্ধু নয়? তারা কতো ছায়া দেয়। বাবা বলেছেন ওরা এই বিরাট বিরাট পাহাড়ের মাটি ধরে রেখেছে নিজেদের শিকড় দিয়ে। ওরা সকলের বন্ধু। না না তোমরা ওদের কিছুতেই কাটতে পারবে না।" সে আরো নিবিড় করে গাছটাকে জড়িয়ে ধরল। লোকটা ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে তুলিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ধাক্কা খেয়ে তুলি ছিটকে পড়ল তার মায়ের কোলে। তাকিয়ে দেখে মা তাকে কোলে নিয়ে বলছেন, "তুলি, তুলি কাঁদছিস কেন? আর এখানে এসে কখন থেকে ঘুমিয়ে পড়েছিস। খেয়ালই করিনি। ইস, স্বপ্ন দেখছিলি নাকি, জ্বর বেড়েছে?" আদর করে মা তার মুখটা মুছিয়ে দিলেন। মায়ের কোলে বসে তুলি দেখল একপাশে একদঙ্গল কাক জটলা করে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। কিন্তু বাকি সব কিছুই আগের মতই আছে। নিশ্চিন্ত মনে মার গলা জড়িয়ে ধরে সে বলল, "মা, ঘরে চল, খিদে পেয়েছে।"


শুক্তি দত্ত
বৈষ্ণবঘাটা, কলকাতা