সূচীপত্র -গ্রীষ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

কি মুশকিল

মাত্র আট বছরের বিনুর মাথায় এতরকমের দুষ্টুবুদ্ধি আসে কি করে, এ এক রহস্য। কোনদিন রাস্তার ধারে বাদামভাজা খুঞ্চাওয়ালার খুঞ্চাটা উল্টে দিল, কোনদিন স্কুলে যাবার পথে মুচির মাথায় এক চাঁটি কশিয়ে দিল। কোনদিন বা রামবাবুদের বাড়ীর সদর দরজায় জলবিয়োগ করে দিল। সেদিন পরেশবাবুর বাড়ীর নতুন চুনকাম করা দেওয়ালে নামতা লিখে এলো। আর একদিন ক্ষেন্তিপিসির ছাগলটাকে খোঁটা থেকে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলো, সন্ধে পর্যন্ত পিসি ছাগল খুঁজে হয়রান। এইরকম কোন না কোন একটা গন্ডগোল না করে বিনু থাকতে পারতো না। আর বাড়ীতে দিদির প্র্যাকটিক্যাল খাতায় মুরগী এঁকে রাখা, ছোটোকাকার গিলে করা পাঞ্জাবীতে কাদা মাখা হাত মুছে রাখা, বিধবা পিসিমার গঙ্গাজলের পাত্রে ময়দার লেই ঢেলে রাখা, মায়ের রেসিপির বইয়ের পাতা ছিঁড়ে নৌকো বানানো, এসব তো লেগেই আছে।

বিনু যে সর্বদা জেনেশুনে দুষ্টুমি করতো, তা কিন্তু নয়। সম্পূর্ণ নির্দোষ আনন্দের জন্যে করা ছোট ছোট ব্যাপারগুলোও বড়দের এতো অসুবিধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি করে, তা বিনু আজ অবধি বুঝে ওঠেনি। অনেক সময়ে বুদ্ধি করে বড়দের উপকার করতে গিয়েও সে উল্টো ফল পেয়েছে।

যেমন সেবারের ঘটনাটা। প্রচন্ড গরম পড়েছে। সন্ধ্যার সময় বিনুর কানে গেল মা গজগজ করছে, 'ধিঙ্গি মেয়ের কান্ড দেখো! বালিশটা একটু রোদ দেখিয়েই তুলে নিতে বলেছিলাম। তা নবাবনন্দিনীর আর সারাদিনে সময় হল না সেটা তুলে আনার। এখন এই উপজ্বলন্ত বালিশ রাত পর্যন্ত আর ঠাণ্ডা হবে? আর কোনকালে যে আক্কেল হবে কে জানে বাবা।'

বিনু জানে মায়ের রাগটা দিদির উদ্দেশ্যে। বালিশ রোদ দেখিয়ে তুলতে ভুলে গেছে। হুঁ, দিদির আবার কান্ডজ্ঞান। কিন্তু একটা ব্যবস্থা তো করা দরকার। তাই খানিক বাদে কলতলায় এক বালতি জলে চোবানো বালিশটা পাওয়া গেল। আর তাইতেই আবার মাকে গলা তুলতে হল, এবার বিনুর উদ্দেশ্যে। সেইসঙ্গে চুলের মুঠি ধরে টেনে পিঠে গুমগুম করে দুটো কিল। বিনু ঠিক বুঝতে পারল না ভালো করতে গিয়েও কেন এই ফল হল। সে তো বালিশটা ঠাণ্ডাই করতে চেয়েছিল। কে না জানে জলে ডোবালে গরম জিনিষ ঠাণ্ডা হয়।

কিলকে তেমন আমল দেয় না বিনু। কিন্তু মায়ের এই চুল ধরে নাড়ার অব্যেশটা তার একদম পছন্দ নয়। আজ আবার নাড়াটা একটু জোরেই হয়ে গেছে, এখনও চুলের গোড়াগুলো চিনচিন করছে। এইরকম সময়ে বিনুর সতুজ্যাঠার কথা মনে পড়ে যায়। মাথাজোড়া টাক, দিব্যি দিলখোলা মানুষ। বাবা একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'সতুদা, তোমার যে এই মাথাজোড়া টাক, কোন অসুবিধে হয় না?' সতুজ্যাঠা বেশ মজার মানুষ, উত্তর দিলেন, 'অসুবিধে আর কি? শুধু মুখ ধোবার সময়ে বুঝতে পারি না কত পর্যন্ত ধুতে হবে।' সেই সতুজ্যাঠা প্রায়ই বলেন, 'ভগবান আমার একটা কথা অন্তত শুনেছেন। ইস্কুলে পন্ডিতমশাই যখন চুলের মুঠি ধরে নাড়া দিতেন, মনে মনে বলতাম, চুলগুলো নিয়ে নাও ভগবান। তা সে মনস্কামনা আমার আজ পূরন হয়েছে।' মায়ের হাতে চুলনাড়া খেয়ে বিনুরও সেইরকমই মনে হয়, আহা, যদি চুলগুলো না থাকতো। কিন্তু সতুজ্যাঠার টাকমাথা মুখটা ভেবে ভগবানকে আর সেটা জানায় না।

তারপর এই তো পরশুর কথাই ধরা যাক। কি দোষ ছিল বিনুর, যে সন্ধেবেলায় হঠাৎ সেজোকাকা তার ওপর অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো? আগের দিনে কেনা কাকার নতুন পেনটায় নাকি লেখা যাচ্ছে না। আরে বাবা, তাতে বিনু কি করবে? সারা দুপুর সে ওই পেন দিয়ে চিলেকোঠার দেওয়ালে ছবি এঁকেছে, কোনো সমস্যা তো ছিল না তখন। হ্যাঁ, শেষদিকে একটু অসুবিধে হচ্ছিল বটে, কিন্তু একটু চেপে ঘসে ঘসে আঁকতে দিব্যি কাজ চলে গেছে। সেই কথা বলতেই সারা বাড়ী মাথায় করে সেজোকাকা যা একখানা কান্ড করলো, তার ঠেলায় মা আবার তাকে সতুজ্যাঠার কথা মনে করিয়ে দিল।

শুধু বাড়ীতেই নয়, স্কুলেও সেদিন মিস তাকে সারাক্ষণ কান ধরে বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে রেখে দিল। বিনু কিন্তু টিচারের ভালো করতেই গিয়েছিল। হয়েছে কি, ক্লাসের সবচেয়ে বিচ্ছু ছেলে রাজু (এটা বিনুর মত, টিচারদের মতে এই খেতাবটা বিনু ছাড়া আর কারো হতে পারে না) টিচারের চেয়ারের বসবার জায়গায় বেশ ক'টা পিন খাড়া করে আটকে দিয়েছে। বল, এটা ভালো কাজ? টিচার তার ওপর বসতেই যাচ্ছিল, ঠিক সময়মতো চেয়ারটা সরিয়ে নিয়ে বিনু যে কি অপরাধ করলো বুঝতেই পারল না। হ্যাঁ, উলটে পড়ে টিচারের খোঁপা-টোপা খুলে দেওয়ালে মাথা ঠুকে আলু হল বটে, কিন্তু বিনু চেয়ারটা না সরিয়ে নিলে পিনগুলো তো টিচারের, ইয়ে, ওইখানে ফুটত কি না?

বাড়ী ফিরেও নিস্তার নেই, রাজু এসে মা'র কাছে স্কুলের কথা লাগিয়েছে। কানমলা দিয়ে মা বললেন, 'বল, আর কি কি করেছিস?' মা'কে কি করে বোঝায় বিনু যে, যদিও রাজুকে এক থাপ্পড় কষিয়ে বা টিচারের দিকে চকের টুকরো ছুঁড়ে তার শোধ নেওয়া উচিত ছিল। সে ইচ্ছে যে তার হয় নি, তাও নয়। কিন্তু কান ধরে সারাক্ষণ বেঞ্চির ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় সে এসব কিছুই করতে পারে নি।

এইরকমই চলছিল। বিনুর বাবা ও মা পাড়াপড়শির নালিশ শুনতে শুনতে পাগল হবার যোগাড়। অপিস থেকে ফিরেই প্রায়ই বিনুর বাবাকে শুনতে হতো ছেলের সেদিনের কোন এক অভিনব কীর্তি। রাগের মাথায় মাঝেমধ্যেই তুলোধোনা করতেন বিনুকে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, তাতে বিনুর কোন বিকার হতো না। পরদিন আবার আর এক নতুন কীর্তির জন্যে আবার মার পড়ত। শেষাশেষি এমন হয়ে দাঁড়ালো, বিনুর বাবা বাড়ী ফিরেই দুচার হাত চড়চাপড় বসিয়ে দিতেন। তারপর জানতে চাইতেন, বিনু সেদিন কিছু করেছে কিনা। তাই ইদানীং বাবার বাড়ী আসার সময়ে বিনু ধারে কাছে বড় একটা থাকতো না।

সেদিন কিন্তু বিনুর সত্যিই কোন দোষ ছিল না। দোষ সম্পূর্ণ জুডোর, মানে বিনুর আহ্লাদী কুকুর, যে বিনুর প্রায় সবরকম দুষ্কর্মের সঙ্গী। সকাল থেকে মৌসুমি বৃষ্টির ধারাশ্রাবণ নেমেছিল। পথেঘাটে জলকাদা। বেলা পড়ে আসার সাথে বৃষ্টির তেজ কিছু কমেছিল। পুরো থামে নি, ঝিরঝির করে পড়ছিল। বিনুর পড়ায় মন বসছিল না, বাইরেও বেরোতে পারছিল না। বাড়ীর মধ্যে আর নতুন কি করা যায় মাথায় আসছিল না। একটু আগেই অবশ্য দয়ালকে মাথায় গোবর জলের বালতি নিয়ে উঠোন দিয়ে যেতে দেখেও অনেক কষ্টে গুলতি মেরে বালতিটা ফেলে দেবার লোভ সামলেছে। কেলেঙ্কারীটা একটু বেশী হয়ে যেতো। দাওয়ায় বসে ভাবছিল, এমন নিরালা দুপুরটা বেকার যাচ্ছে। রান্নাঘরের পেছনের বাগানে জ্যাঠাইমার লাগানো কচি ভিন্ডি গাছগুলোয় ছোট ছোট ভিন্ডি ধরেছে। চুপচাপ বসে না থেকে, দৌড়ে গিয়ে ওগুলোয় কাস্তের গোটাকয়েক কোপ বসিয়ে আসা যায় কিনা ভাবছিল, এমন সময় চোখে পড়ল জুডো মুখে করে জলকাদা মাখা একটা মরা খরগোশ নিয়ে এদিকেই আসছে।

সব্বোনাশ, এ নির্ঘাত পটলাদের বাড়ী থেকে মেরে এনেছে। পটলার বাবা নীহারকাকার খরগোশ আছে অনেকগুলো। একাজের জন্যে যদিও জুডোকে মোটেই ওস্কায় নি বিনু, কিন্তু সে জানে সন্দেহটা অবধারিতভাবে তার ওপরেই পড়বে। নীহারকাকা বাবার খুব বন্ধু, তাঁকে চটালে ফল যে খুব ভালো হবে না তাও বিলক্ষণ জানা। মনে মনে ভাবছিল কি করা যায়, ততক্ষণে জুডো খরগোশটাকে বিনুর পায়ের কাছে এনে ফেলে ল্যাজ নাড়তে লাগলো। যেন ভারি ভালো কাজ একটা করেছে। এধরনের কাজ করলে সাধারণত বিনুর প্রশংসাই পেয়ে থাকে জুডো। আজ কিন্তু ঠিক সেরকমটা হল না। জুডোকে একটা চাপা ধমক লাগিয়ে বিনু তাড়াতাড়ি খরগোশটাকে বৃষ্টির জলেই ভালো করে ধুয়ে নিল। তারপর পা টিপে টিপে গিয়ে পটলাদের বাড়ী গিয়ে ওটাকে রেখে এলো, যেখানে আর সব খরগোশগুলো ছিল। পেছন ফিরে একবার দেখে নিল, নাঃ, কেউ দেখতে পায় নি। আর বিপদ নেই। খরগোশটাকে দেখলে মনে হবে ঘুমোচ্ছে। যখন জানা যাবে ওটা মরে গেছে, তখন আর বিনুর ওপর সন্দেহ করার কিছু থাকবে না।

বাড়ী আসতেই বৃষ্টিতে ভেজবার জন্যে মা খানিকটা বকাবকি করল, তাতে তেমন আমল দিল না বিনু। চুপচাপ একটা বই খুলে বসে গেল। ছেলের হঠাৎ পড়ায় মন বসেছে দেখে মা'ও আর কিছু বললেন না।

সন্ধের সময়ে বাবা ফিরে মা'কে বললেন, 'আজ বিনু আবার কোন কান্ড করে নি তো? মোড়ের মাথায় নীহার একটা অদ্ভুত কথা বললে।'

শঙ্কিত বিনুর কান খাড়া হয়ে উঠল। হঠাৎ কেমন যেন নিরাপত্তার অভাব বোধ করল। বাড়ী থেকে পালিয়ে রাজুদের বাড়ী খানিকক্ষণ কাটিয়ে আসা যায় কিনা ভাবছিল, শুনতে পেল বাবা মা'কে বলছে, 'নীহারদের একটা খরগোশ কাল রাতে মারা গিয়েছিল। ওরা সেটাকে বাড়ীর পেছনে মাটিচাপা দিয়েছিল। আজ নাকি কে সেটাকে মাটি খুঁড়ে বার করে সাফসাফাই করে আবার তাদের বাড়ীতে রেখে গেছে!'

সূর্যনাথ ভট্টাচার্য
কলকাতা

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)