সূচীপত্র -গ্রীষ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

সিড়িং-এর সমস্যা

সিড়িঙের খুব মনখারাপ। পেট চন্ চন্ করছে খিদেতে। সকাল থেকেই পেটে তেমন কিছু পড়েনি। সেই কাকভোরে পিড়িং, সিড়িঙের মা কতগুলো মাছি ধরে এনে দিয়েছিল। মরা মাছি। মাছি দিয়েই জলখাবার হয়েছে আজ। তাতে কি আর খিদে যায়? পেট টন্ টন্, কন্ কন্ করছে। পিড়িং এরও অনেকক্ষণ পাত্তা নেই। সেই কখন খাবারের যোগাড়ে গিয়েছে। এখনও ফেরেনি সে। সিড়িঙের তেমন করে খাওয়া হয়নি আজ। তাই পিড়িং পণ করেছে ছেলের জন্য খাবার এনেই একেবারে ফিরবে। কিন্তু গেছে সে অনেকক্ষন! কখন ফিরবে? সিড়িঙ খিদেতে আর পারে না যে!

গাছের ডালে বসে সিড়িঙ তাক্ করে মানুষের বাচ্চাগুলোকে। বাচ্চাগুলো চালাক হয়ে গেছে আজকাল। দূরে ঘুরছে, ফিরছে, খেলছে, হাসছে। এদিকে আসছে না একেবারেই। একবার নিম গাছের তলায় এলেই চুলের মুঠি ধরে সরাৎ করে ওপরে। তারপর কপাৎ করে জ্যান্ত গিলে ফেলা। কিন্তু কাঁহাতক্ আর এভাবে বসে থাকা যায়?

সিড়িঙের মানা আছে নিমগাছের দশ হাতের চৌহদ্দি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার। পিড়িং মানা করে গেছে। মানুষগুলো আজকাল নাকি সাহসী হয়ে গেছে। সেদিন পিড়িং ওই কোণের বাড়ি থেকে খাবার চুরি করতে গিয়েছিলো। এখন তো গোটা আস্ত মানুষ আর পাওয়া যায় না। তাই মানুষের এঁটোকাঁটা, ব্যাঙ, মাছি, মশা, মরা সাপ – এসব খেয়েই থাকতে হয়। তা সেদিন রাত্রে পিড়িং তার প্রাত্যহিক খাবারের চৌররযবৃত্তিতে গিয়ে মহা ফ্যাসাদে পড়েছিল। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে, মানুষের বাচ্চাগুলো হাঁ করে একটা কালো বাক্সের দিকে তাকিয়ে আছে। বাক্সটার ভিতরে আবার লোকজন চলাফেরা করছে, কথা বলছে। পিড়িংও খাবার চুরি ভুলে গিয়ে হাঁ করে দেখছিল। দেখে বাক্সটার মধ্যে একটা সবুজ ভূত লাল চোখে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষের বাচ্চারা সব আতঙ্কিত। এমন সময় কোথা থেকে একটা ঝাঁটাচুলের লোক এসে কিসব অং, বং বলতে বলতে চারদিকে ঘুরতে লাগলো আর বাচ্চা ভূতটার দিকে কিসব দানা দানা জিনিস ছূঁড়তে লাগলো। দানাগুলো ভূতটার গায়ে লাগামাত্রই পিড়িং এর চোখের সামনেই বাচ্চা ভূতটা কেমন নির্জীব হয়ে গেল। আর ঝাঁটাচুলো লোকটা ভূতটাকে একটা বোতলে পুরে ফেলে বোতলের মুখটা আটকে দিল একটা ছিপি দিয়ে। তারপর একটা মানুষের বাচ্চা বোতলে পরা ভূতটাকে টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখলো। এসব দেখে শুনে পিড়িং এর চোখ গোলগোল, বুক ধরাস্ ধরাস্। পিড়িং বুঝলো ভূতে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, মানুষেরা এখন বোতলে ভূত পোষে। এসব দেখে পিড়িং মানা করেছে সিড়িঙকে নিম গাছের দশ হাতের চৌহদ্দি ছেড়ে কোথাও যেতে। একবার মানুষের কবলে পড়লে বোতলে পুরে রাখবে। কুকুর, বিড়াল, ছাগলের মত ভূতও পুষবে।

বসে বসে সিড়িঙ এসবই ভাবছিল। খিদেতে পেটের মধ্যে চুঁইচুঁই, কুঁইকুঁই। সিড়িঙের এখন এতো খিদে পেয়েছে যে গোটা দুই মানুষের বাচ্চা খেলে মনে হয় শান্তি হবে। সে তার কালো কালো সরু সরু প্যাংলা প্যাংলা পা দুটি নিয়ে ঝুপ্ করে নামলো গাছ থেকে। এখনও অন্ধকার দানা বাঁধেনি তেমন করে। জম্পেস করে চেপে বসেনি। কিন্তু সিড়িঙ মরীয়া। এখন খাবারের যোগাোড় না করলে মা নির্ঘাৎ সেই ব্যাঙাচি ভাজা নিয়েই ফিরবে। রোজ রোজ কাঁহাতক আর ব্যাঙাচি ভাজা খেতে ভালো লাগে!

খুব ভালো করে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়েই, এক পা এক পা করে সে এগোলো। নিমগাছ থেকেই সে গন্ধ পেয়েছে। রাস্তার ধারের ওই কোণের বাড়িতে আজ খিচুড়ি আর ডিমভাজা হয়েছে। অনেকদিন আগে, মা একবার চুরি করে এনেছিল। সেদিন মা আর ছেলেতে খুব মজা করে খিচুড়ি আর ডিম ভাজা খেয়েছিল। সেই স্বাদ সে এখোনও ভোলেনি। কিন্তু খানিকটা এগিয়েই সে থমকে দাঁড়ালো। দশ হাতের চৌহদ্দির বাইরে যাওয়ার তার মানা আছে। তাই সে একটু ইতস্তত, বিচলিত বোধ করে। কিন্তু গন্ধটা এখন আরও ঘন, আরও তীব্র, আরও লোভনীয়। সিড়িঙ পা রাখলো ধীরে ধীরে। দশ হাতের চৌহদ্দির বাইরে।

সন্তর্পণে পা ফেলে সে এগোয়। বাতাস আজ হাল্কা। ভারী নয় মোটেও। সিড়িঙ ভাবলো আজ সে ভাসবে। হাঁটবে না। তার পাগুলো তো কাঠির মতো সরু, সুতোর মতো ট্যাংলা প্যাংলা! তার হাঁটতে তাই অসুবিধে হয়। বাতাস ভারী হলে, বাধা বেশী। তখন সিড়িঙের ভাসতে অসুবিধে হয়। তখন সিড়িঙকে তার প্যাংলা প্যাংলা সূতোর মতো পাগুলো দিয়ে হাঁটতে হয়। সে মজা করে ভাসতে ভাসতে আর চলতে পারে না। আজ বাতাস হাল্কা থাকাতে সিরিঙ ভেসে মজা পাচ্ছে। সিড়িঙের ভাসতে তাই অসুবিধে হচ্ছে না কোনও। ভাসতে ভাসতে যত সে বাড়িটার কাছাকাছি যাচ্ছে, ততোই গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সুরুৎ করে মুখে আসা জলটাকে সিড়িঙ গিলে ফেলে।

আস্তে আস্তে ভাসতে ভাসতে সে বাড়িটার একেবারে কাছাকাছি চলে এল। মার নিষেধের কথা ভুলে গেছে সে তখন। তার চোখের সামনে এখন শুধুই খিচুড়ি আর ডিমভাজা! সিড়িঙ বাড়িটার জানালা দিয়ে উঁকি দিল। সে জানে সে নিজে থেকে দেখা না দিলে তাকে দেখা যায় না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে এ বাড়ির ছোট ছেলেটি তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে খিচুড়ি আর ডিমভাজা। চাকুম্ চুকুম্, চাকুম্ চুকুম্। সলাৎ করে মুখে আসা জলটাকে টেনে নেয় সে আবার! আহ্। ব্যাঙাচি ভাজা আর খাবেই না সে আর!

সিড়িঙ তার শরীরটাকে পাতলা করে জানালা দিয়ে সুরুৎ করে ঢুকে পড়ে। খিদেতে পেটের মধ্যে চুঁইচুঁই, কুঁইকুঁই। সে ছোট ছেলেটির উল্টোদিকে তার ট্যাংলাম্যাংলা পাতলা পা দুটিকে ভাজ করে গুটিয়ে সুটিয়ে বসে। ছেলেটি টের পায় না। ভূতেদের তো আর দেখা যায় না, ইচ্ছে করে দেখা না দিলে! সিড়িঙ খেতে শুরু করে ছেলেটির পাত থেকে। সলাৎ। আহ্! কি স্বাদ! আবার নেয় সে। এবারে ছেলেটির খানিকটা যেন টনক নড়েছে। সে চোখ গোল গোল করে দেখে, সে খাওয়ার আগেই তার খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিড়িঙ ভাবলো ছেলেটি বোধহয় বেজায় ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ভয় পাওয়া তো দূরের কথা! ছেলেটি চেঁচিয়ে তার মাকে ডাকছে। “মা, তাড়াতাড়ি এসো। আরেকটা ভূত এসেছে। শিগগীরী সর্ষেদানা আনো।“ সিড়িঙ ভাবে, আরেকটা ভূত মানে? এখানে কি খিচুড়ি, ডিমভাজার জন্য ভূতের মেলা বসে? ছেলেটির মা ছুটে আসেন, “কি হয়েছে বুবুন্?” বুবুন্ নামের ছেলেটি উত্তর না দিয়ে তার থালার দিকে মার দৄষ্টি আকর্ষণ করে। সিড়িঙের অবশ্য কোনও দৃকপাত্ নেই তাতে। সে গোগ্রাসে খাচ্ছে। বুবুনের মা ছুটে যান রান্না ঘরে। যখন ফিরে আসেন হাতে একটা ছোট বোতল। তাতে ছোট ছোট কালো কালো, গোল গোল দানা। এই বুঝি সর্ষেদানা? সিড়িঙ ভাবে মনে মনে। বুবুনের মা কৌটোটা খুলে ছড়িয়ে দিলেন বুবুনের থালার চারিপাশে। কয়েকটা দানা সিড়িঙের শরীরে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই সিড়িঙের সারা শরীর জবলতে লাগলো। সিড়িঙের খুব ঠান্ডা বোধ হতে থাকলো। সিড়িঙ গলে যেতে থাকলো। সিড়িঙ বুঝলো, ওই দানার মধ্যে এমন কিছু আছে যাতে সিড়িঙ অদৃশ্যেও গলে যাচ্ছে। আর তখনি সিড়িঙের মনটা হু হু করে উঠলো তার মা পিড়িং এর জন্য। মার মানা ছিল। সে শোনেনি। সে বুঝলো সে মরে যাচ্ছে। মরে যাওয়ার আগে তার আর মার সঙ্গে দেখা হলো না।

মিলিয়ে যেতে যেতে, গলে যেতে যেতে, সে হঠাৎই উপলদ্ধি করলো তার জায়গা আর পরিবেশ বদল হয়ে গেছে। সে শুয়ে আছে একটা পুরু নরম সরম বিছানায়। তার মুখের ওপর আরো পাঁচটা মানুষের মুখ ঝুঁকে আছে। তাদের মধ্যে কেউ একজন বললো, “ও ময়না, এতো একদম তোর মুখ রে! আবার দেখ কেমন পিট্ পিট্ করে চাইছে।“ ময়না নামের মেয়েটি তার গাল দুটো জোরে চেপে ধরে চকাস্ করে একটা চুমু খেলো। সিড়িঙের তা খুব একটা মন্দ লাগলো না। সিরিঙ তার হাতটা বাড়িয়ে ময়নাকে ছূঁতে গেল ধীরে ধীরে। কিন্তু এ কি? এ তো আর ভূতের হাত নেই! ভূতের কালো সূতোর মতো হাত আর নয়। কেমন গোল, গোল, পুরুষ্টু। নধর, নধর হাত। এ তো পুরোপুরি মানুষের বাচ্চার হাত! আর তখনই হঠাৎ খুব পরিচিত গন্ধ নাকে এলো তার। এই গন্ধ সিড়িঙের খুব চেনা! খিচুড়ি, ডিমভাজা, আর আরও কিছুর। সিড়িঙের মুখে এক চিলতে পাতলা হাসি ফুটে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে কে আবার বলে উঠলো, “ময়না রে! তোর মেয়ে তো জন্মেই হাসছে! এ কি পাকা মেয়ে রে!” ময়না নামের মেয়েটি আবারও সিড়িঙের দুই গাল চেপে চকাস্ চকাস্ করে আরো দুটো চুমু খেলো। কিন্তু সিড়িঙের ভাবনা এখন অন্যখানে! সে অপেক্ষায় আছে। খিচুড়ি ডিমভাজার জন্য। সে জানে তাকে একটু পরেই বুবুনের মতোই খিচুড়ি, ডিমভাজা দেবে তার নতুন মা, ময়না। আর সে তারিয়ে তারিয়ে খাবে। সিড়িঙের মন ভালোলাগায় ভরে উঠছিল। হঠাৎই তার চিন্তায় ছেদ পড়লো। ময়না নামের মেয়েটি কি একটা ঢুকিয়ে দিল তার মুখে! জিনিষটা খানিকটা লম্বাটে, সরু, স্বচ্ছ! তাতে সাদা রঙএর তরল পদাথ! কি বিচ্ছিরি খেতে! সেইসময় কে বললো, “ও ময়না রে! তোর মেয়ে দুধের বোতল বের করে দিল যে! ও খিচুড়ি ডিমভাজা খেতে চায়!” এতক্ষণে সিড়িঙের কান্না পেল খুব। এর থেকে তার ব্যাঙাচিভাজা অনেকই ভাল ছিল। হঠাৎই অনেকক্ষণ পর তার ভূত মা পিড়িং এর জন্য মন কেমন কেমন করে উঠলো। মানুষ মরে ভূত হয়, তা মানুষেরা জানে। কিন্তু ভূতেরাও যে মরে, মানুষের তা জানা নেই। আর তারা এটাও জানেনা, মানুষেরা কখনো যেমন জাতিস্মর হয়, ভূতেরাও কখনো কখনো মরে ভূতেস্মর হয়! সিড়িঙেরও ভূত জন্মের কথা খুব মনে আছে। চেনা গন্ধটা যতো তীব্র হচ্ছিল, পরিবেশটা ততোধিক্ অপরিচিত হয়ে উঠলো তার কাছে। হঠাৎ করেই সিড়িঙের কান্না পেল খুব। তার মা পিড়িং এর জন্য।


ঊর্মি ঘোষদস্তিদার (দত্তগুপ্ত)
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

এই লেখকের অন্যান্য রচনা