খেলাঘরখেলাঘর

সরল ও হাতি
 
এদিকে আর এক কান্ড । ইশকুলে গিয়ে সরলরা যখন হাতির গল্পটা বলেছে, প্রথমে তো কেউ বিশ্বাসই করে না । তারপর মাস্টারমশাইরা ডেকে ডেকে গল্পটা শুনতে চাইলেন । হেডমাস্টারমশাইও ওদের ডেকে সব শুনলেন । কি থেকে কি হল কে জানে, একদিন টিভি থেকে খবরের কাগজ থেকে কত লোক কত ক্যামেরা সরলদের গ্রামে এসে হাজির । বাচ্চা-হাতির কত ছবি তুলল তারা । সরলের সঙ্গে বাচ্চা-হাতির ছবি তুলল । মুখের সামনে মাইক ধরে ধরে সরলের গল্পটা বলতে বলল ।
তারপর আরো এক কান্ড ।
হেডমাস্টারমশাই বাবুকে আর সরলকে সদরের বড় অফিসে নিয়ে গেলেন । সরল সাহসিকতার পুরষ্কার পাবে । সদরের অফিসের সবাই এসে বাবুকে আর সরলকে দেখতে লাগল । সরলের দিল্লী যাবার সব ব্যবস্থা হল । বাবু ভয়ে দিল্লী যেতেই চাইল না । তখন হেডমাস্টারমশাই সরলকে নিয়ে দিল্লী গেলেন । বড়দাদাও সঙ্গে গেল ।
সরলের এই প্রথম ট্রেনে চাপা ।
তারপর রাষ্ট্রপতির হাত থেকে যেদিন পুরষ্কার পেল, সেদিনটার কথা কোনোদিন ভুলবে না সরল । রাষ্ট্রপতি মিষ্টি হেসে সরলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, হোটেলের ঘরে বসে সেই ছবিটা টিভিতেও দেখেছে । কত হাততালি । কত বাজনা । কত ছবি তোলা । সব স্বপ্নের মতো ব্যাপার স্যাপার ।
দেখতে দেখতে সরলের মাথায় একটা কথা এল । এই যে ঘটনাটা ঘটল, এটাকে কি স্মরণীয় ঘটনা বলা হবে ? ভারতের মানচিত্রে কি বেরাপোতা গ্রামের নাম উঠবে ? কিংবা সরলের ইশকুলের গ্রাম কুলহির নাম ? বড়দাদা তো কথাটা বুঝতেই পারল না, হেডমাস্টারমশাই শুনে এমন হাসতে লাগলেন যে আর কিছু জবাব দিতেই পারলেন না ।
গ্রামে ফিরেও অনেকদিন এমন মজা আর আনন্দে কাটল ।

তারপর একদিন মা-হাতি বাচ্চা-হাতিকে নিয়ে জঙ্গলে ফিরে গেল । গ্রামের সব ছোট ছেলেমেয়ে খুব কাঁদল, মা জ্যেঠিরা মা-হাতিকে সিঁদুর পরিয়ে দিল, বাচ্চা-হাতিকে সাদা টিপ পরিয়ে দিল । সরলেরও খুব কান্না পাচ্ছিল । আর একটা কথা নিজে নিজেই বুঝে ফেলল সরল । মানচিত্রে স্মরণীয় না-ই হোক, সরলের কাছে এই ঘটনাটা সারা জীবনের জন্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ।
সরল বইয়ে পড়েছে, হাতিদের স্মৃতিশক্তি খুব ভালো, মানুষের থেকেও বেশি । তাই সরল জানে, হাতিরাও এই ঘটনাটা মনে রাখবে । সরল হাসিমুখে মনখারাপের চোখের জল মুছে নিল ।
 
 
 
আইভি চ্যাটার্জি
জামশেদপুর, ঝাড়খন্ড 
 
অলংকরনঃ
কৌস্তুভ রায়
আহমেদাবাদ, গুজরাত
 

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)