খেলাঘরখেলাঘর

জীয়ন ঝর্ণার জল

খুব শক্ত অসুখ হয়েছিলো তুতুলের। সবে তিন দিন হলো হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। এই ক’দিন এক ছায়া ছায়া ঘুমের দেশে বেড়িয়ে এলো সে। হাতে-পিঠে ছুঁচ, রক্তের বোতল, মুখোশ পরা কারা যেন সব – সমস্ত কিছু ভারী চোখের পাতায় ধোঁয়ার মতো মনে হতো। মা’র জন্য বুক ঠেলে একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইতো।
অসুখের নামটাও জেনে ফেলেছে সে – লিউকেমিয়া। তুতুল ঘুমিয়েছে ভেবে বাবা আর ডাক্তারবাবু ফিসফিস করে কথাবার্তা বলছিলেন। রেমিশন হয়েছে, পঁচিশ পার্সেন্ট চান্স এইসব শক্ত শক্ত কথা। হুঁ, না হয় তুতুলের মোটে পাঁচ বছর বয়েস হয়েছে, তা বলে কি তাকে ইংরেজী বলে ঠকানো যায়! তুতুল ঠিক বুঝেছে, সে মরে যাবে। তবে এখন নয়, অনেক দিন পর। থুত্থুড়ে বুড়োই হয়তো হয়ে যাবে তদ্দিনে। যাকগে, যা হবেই সে নিয়ে আর ভেবে লাভ কী! তুতুল তাই খাটে বসে জানালা দিয়ে শালিক পাখির ঝগড়া দেখতে থাকে।
“ওকে সব সময় খুশিতে রাখবেন”, বলছিলেন ডাক্তার কাকু। মজা লাগে তুতুলের। এই ঘরে বসে দুপুর বেলা এদিক-ওদিক তাকালে মন তো আপ্‌সেই খুশিতে ভরে ওঠে! কিছু দূরে প্রবীরদের সাদা ধুমসো বেড়ালটা চোখ বুঁজে তপস্বীর মতো বসে আছে, একটা কাক তার ল্যাজ ধরে দিলো অ্যায়সা টান। একটা বাচ্চা মোষ চার পা তুলে ধুলো উড়িয়ে ছুটে পালাচ্ছে – কই, কেউ তো তাড়া দেয়নি! ঘরের দেয়ালের টিকটিকিটা পুঁচকে পোকাটাকে ধরতে লাফ মেরেই মেঝেতে ধপাস্‌। মরে গেলো নাতো? একটা কাগজের গুলি পাকিয়ে ছুঁড়ে মারে তুতুল, টিকটিকি অমনি খাটের তলায় সড়াৎ।
অনেক নতুন ছবির বই এসেছে তুতুলের জন্য। ভারী মজার মজার সব ছবি। গল্পও নিশ্চয়ই মজার। কিন্তু কালো কালো অক্ষরগুলো চোখের সামনে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে যায়। আসল ব্যাপারটা শুরু হবার আগেই চোখ ঘুমে ভেঙে আসে। এবার নকশা কাটা জার্মান সিলভারের গ্লাসটার গায়ে চোখ রাখে তুতুল। একটা দারুণ সুন্দর ট্রেন দাঁড়িয়ে। প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই, খালি ফুলের বাগান। ট্রেনের জানালায় আলখাল্লা পরা ওটা কি সেই গল্পের চিনা বুড়োটা, নাকি তার বন্ধু সৌরভ? ঠিক আছে, আজকের মতো অনেক হলো – কাল বাকিটা দেখা যাবে।