সূচীপত্র- শীত সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

আমার বন্ধু অনাথ

অনাথ আমার বন্ধু। ওর বাঁ পা-টা একটু ছোট তাই সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে। অবশ্য এই খুঁড়িয়ে হাঁটাটা খুব সহজে চোখে পড়ে না। তবে দৌড়নোর সময় তার শরীরটা বাঁ দিকে অনেকটা ঝুঁকে যায়।
অনাথ ও আমি একসঙ্গে পাকা তাল কুড়াতে যাই। ভাদ্র মাসের শেষে দিকে তাল পেকে নরম হয়ে ওঠে। তাই গাছ থেকে পড়ে মাটিতে বসে যায়। দু-একটা তাল মাঝে মধ্যে গড়িয়ে তালপুকুরের জলে এসে পড়ে। সেগুলো আমরা জল থেকে তুলে নিই। ভোরবেলা গাছের নীচে পাঁচ সাতটা পাকা তাল রোজই পড়ে থাকে। পাকা তাল সবাই খেতে পছন্দ করেনা। ভাদ্র মাসে তাল খেলে মাথা ঘোরে। আমারও খাই না। অনাথ আর আমি পাকা তাল এনে উঠানের একপাশে জমিয়ে রাখি। একটা তালের ভেতরে তিনটে শক্ত বীজ থাকে। ঐ তালবীজ থেকে কিছুদিন পর অঙ্কুর বের হয়। তখন তালবীজ কাটলে ভেতরে নরম কোয়া পাওয়া যায়। তালের নরম কোয়া খেতে দারুন মিষ্টি লাগে। আর ঐ নরম কোয়ার লোভেই আমরা ভোরবেলা ফাঁকা মাঠের ধারে তাল কুড়োতে চলে আসি।
বর্ষার শেষে মাঠঘাট সব জলকাদায় মাখামাখি। চোরকাঁটা আর বনতুলসীর ঝোপ পেরিয়ে পুকুর পাড় যেতে অনেকটা সময় লেগে যায়। অনাথ খুব ভোরবেলা উঠতে পারে। পথ ঘাট তখনও খুব একটা পরিষ্কার হয়না। ও তার মধ্যেই অন্ধকারে ঠিক তাল খুঁজে পায়। আমাকেও এই তাল কুড়োনোর নেশায় পেয়ে গেছে।
একদিন ভোরবেলা তাল কুড়োতে এসে দেখি গাছতলা ফাঁকা। কেউ নেই। অনাথ আজ পৌঁছায়নি বোধহয়। চারদিন শুনশান। অন্যদিন দূর থেকেই অনাথের আবছা মুর্তি দেখা যায়। অনাথ বলে ডাকলেই সাড়া দেয়। আজ তাই একটু ভয় ভয় করতে লাগল। এমনিতেই এই জায়গাটা আলো আঁধারিতে ভরা। রাত্রে শুকনো তালপাতায় নানা ধরনের আওয়াজ হয়, আর তাতেই গ্রামের লোকজন ভয় পায়। তবে অনাথ আর আমি ওসবে ভয় পাইনা। আমাদের চোখ থাকে পাকা তালের দিকে। আমি পুকুরের চারপাশটা একবার তাকিয়ে দেখলাম, না কেউ নেই। তারপর দু-হাতে দুটো তাল নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
যখন আটটা বাজে তখন কে যেন বলল, ভোর থেকে অনাথকে পাওয়া যাচ্ছেনা। বাড়ির সবাই অনাথের খোঁজ করতে শুরু করেছে। অনাথ কোথাও নেই। অনাথের মা আমার কাছে এসে জানতে চাইল অনাথ আজ তাল আনতে গিয়েছিল কি না। আমার সাথে আনাথের দেখা হয়নি শুনে অনাথের মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। মায়ের মন কু ডাকতে শুরু করল। এরপরের ঘটনা অত্যন্ত করুণ। তালপুকুরের জলেই অনাথকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। পাকা তাল জল থেকে তুলে আনতে গিয়ে কোনোভাবে পা পিছলে ডুবে গিয়েছিল অনাথ
তারপর বহুদিন কেটে গেছে। গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে শহরের স্কুলে ভর্তি হয়ছি। পড়াশুনো শেষে সরকারি কাজ পেয়েছি। মা-বাবকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসে শহরে পাকাপাকি ভাবে বাস করছি। অনাথের স্মৃতি একদম ফিকে হয়ে এসেছে। নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে পুজোর সময়ে গ্রামে যেতে পারিনা। এবার অনেকদিন পর পুজোর ছুটিতে গ্রামে এলাম। এসেই মনে হল গ্রাম্য পুজোর একটা অন্যরকম স্বাদ আছে। এখানে এসময় প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে থাকে। সবার সাথে পূজোর দুদিন বেশ হৈ-চৈ করে কাটল। নবমীর দিন শহরে ফিরে যাব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম তাই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মাঠের টাটকা বাতাস গায়ে মেখে একটু বেড়িয়ে আসব ঠিক করলাম। এসময় ভোরবেলা খুব কুয়াশা পড়ে। মাঠের ঘাস জলে ভরে যায়। হাঁটতে হাঁটতে একসময় দেখলাম আমি তালপুকুরের কাছে এসে পড়েছি। পুকুরটি সেরকমই আছে। চারদিকটা গাছ-গাছালিতে ভরা। আর গাছের নীচে তখনো জমাট অন্ধকার। আর সেই আবছা অন্ধকার পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম দূরে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ একটা তালগাছ থেকে ঝড় ঝড় করে আওয়াজ উঠল আর তারপরেই থপ্ করে আওয়াজ হল। বুঝলাম পাকা তাল পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকারের মধ্যে একটা ছেলে দৌড়ে ঐ তালগাছটার দিকে চলে গেল। তখনো ভোরের আলো ঠিক মতো ফোটে নি। তবে আবছা একটা আলোর আভাস ফুটে উঠেছে আর তাতেই দেখতে পেলাম ছেলেটা একটু যেন খুঁড়িয়ে খূঁড়িয়ে তালগাছটার দিকে দৌড়ে গেল। ছুটে যাওয়াটা খুব চেনা চেনা মনে হল। হটাৎ বিদুৎ চমকের মত আমার মাথায় একটা প্রশ্ন জেগে উঠল, অনাথ নাকি? সেই রকম বেঁটে খাটো চেহারা আর বাঁ দিকে ঈষৎ ঝুঁকে দৌড়ে যাওয়া। আমি কি ভুল দেখলাম। ভুলই হবে। এতদিন পরে অনাথ আসবে কথা থেকে। আমিও ঐ গাছটার নীচে এসে দাঁড়ালাম। না! কেউ কোথাও নেই।
চারদিকটা ভালো করে নজর করে দেখলাম, কাউকে দেখতে পেলাম না। তবে কি মনের ভুল। এই এতদিন পরে আমার বাল্যবন্ধু অনাথের স্মৃতি উঁকি মেরে গেল? কিছুই বুঝতে পারলাম না। ক্রমে আলো ফুটে উঠল। শারদ প্রভাতের সোনা আলো ঝরে পড়ল তালপুকুরের জলে। লাল-সাদা অজস্র শাপলা চুপচাপ চেয়ে রইল আমার দিকে। এই পুকুরের জলেই একদিন তলিয়ে গিয়েছিল অনাথ। মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। একটা চিনচিনে ব্যথা নিয়ে শহরে ফিরে এলাম।

তরুণ কুমার সরখেল
আমডিহা, পুরুলিয়া

লেখক পরিচিতি

তরুণ কুমার সরখেল

পুরুলিয়ার বাসিন্দা তরুণ কুমার সরখেল জেলার প্রশাসনিক বিভাগে কাজ করেন। পাশাপাশি ছোটদের জন্য নিয়মিত লেখালিখি করেন, এবং ছোটদের জন্য একটি মুদ্রিত পত্রিকা সম্পাদনা করেন।