খেলাঘরখেলাঘর

যে সয় সে রয়

এক

নিশ্চিন্ত রাজ্যের মহারাজ অচিন্ত্য সিংহ সিংহাসনে বসতে না বসতেই চারিদিকে ফিসফিস শব্দ শুরু হয়ে গেল। প্রজারা, সভাসদরা, মন্ত্রীরা এমনকী প্রধান সেনাপতি পর্যন্ত রাজার দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে আর এ ওর কানে, ও এর কানে কি যেন বলাবলি করে চলেছে। এরকম আগে কখনো ঘটেনি। রাজা খুব কৌতুহলী হয়ে পড়লেন। প্রধান মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন
- ‘সমস্যাটা কি? কী নিয়ে এতো গোপন আলোচনা চলছে?’
- ‘পাকা চুল মহারাজ’।
- ‘কার মাথায় পাকা চুল? তাকে এক্ষুনি সভায় এনে হাজির করো। আমি থাকতে আমার দেশের লোক দুঃশ্চিন্তা করবে এ তো মেনে নেওয়া যায় না।’

নিশ্চিন্ত রাজ্যে আবার কিছুতেই দুঃশ্চিন্তা লুকিয়ে রাখা যায় না। সামান্য কিছু একটা কারনে কেউ দুঃশ্চিন্তা করলেই তার মাথার চুল সাদা হয়ে যায়। প্রধান মন্ত্রী একটু ইতস্তত করে বলল
- ‘আপনার মাথায় পাকা চুল মহারাজ’।
- ‘আমার মাথায়?’ রাজা আকাশ থেকে পড়লেন। ‘কই আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।’
- ‘রাজআয়না নিয়ে এলেই দেখতে পাবেন মহারাজ। লোক পাঠাবো আনতে?’
- ‘আচ্ছা পাঠাও।’
রাজার বুকে দুরু দুরু কাঁপুনি শুরু হল। খবরটা উনি কাউকে জানাতে চাননি। কিন্তু এখন তো না জানিয়ে আর উপায় রইল না। মন্ত্রীর আদেশে ততক্ষনে দশ জন লোক মিলে বয়ে নিয়ে এসেছে রাজআয়না। সে এক দেখার মতো আয়না বটে। যেমন বিশাল তেমন অদ্ভূত কায়দায় তৈরী। সামনে দাঁড়িয়ে সোজা তাকালেই শরীরের সব দিক দেখা যায়। পায়ের পাতার নীচ থেকে মাথার তালু, হাতের নখ থেকে পায়ের গোড়ালি কিচ্ছু বাদ নেই।

সেই আয়নায় মাথার প্রতিটি চুল নিখুঁত করে পর্যবেক্ষন করলেন রাজা। পাকা চুলের সংখ্যা গুনতে গুনতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। দেখা গেল মাথায় মোট একানব্বইটা চুল পুরো পেকেছে, উনপঞ্চাশটা চুল অর্ধেক পাকা আর তেত্রিশটা চুলের গোড়ায় সবে একটু পাক ধরেছে। রাজা বাধ্য হয়ে স্বীকার করলেন- ‘হ্যাঁ বেশ অনেকগুলোই চুল পেকেছে বটে।’ অর্থাৎ দুঃশ্চিন্তাটা বেশ বড় ধরনের তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সভাসদরা সবাই মিলে রাজাকে চেপে ধরল
- ‘মহারাজ, আমরা থাকতে আপনার এতো দুঃশ্চিন্তার কারনটা কী?’
রাজা আমতা আমতা করে শেষে বলেই ফেললেন
- ‘রাজকন্যা নন্দিনী ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না।’
সেনাপতি বললেন – ‘সে কি !’
মন্ত্রী বললেন – ‘সে কি !’
সব সভাসদরা এক সাথে বলে উঠলো – ‘সে কি !’
‘সে কি’ ‘সে কি’ রবে গম গম করে উঠলো রাজসভা। সেনাপতি মাথা চুলকায়। মন্ত্রী মাথা চুলকায়। সভাসদরা সবাই জোরে জোরে মাথা চুলকে চলে। এমন কঠিন সমস্যায় সভাসদরা আগে কখনো পড়েন নি। রাজকন্যা সাঁতার কাটতে পারে, ঘোড়ায় চড়তে পারে, পাহাড়ে উঠতে পারে, শক্ত শক্ত অংক কষতে পারে, মোটা মোটা বই পড়তে পারে, কিন্তু ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না। এ ও কী সম্ভব? কিন্তু অনেক মাথা চুলকেও কেউ কোন উপায় ভেবে পেল না। ধীরে ধীরে সবার মন দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেল। প্রথমে প্রধান মন্ত্রীর মাথার চুলে কিছুটা পাক ধরল। তারপর সেনাপতির মাথার কয়েকগাছি চুল পেকে গেল। ক্রমশঃ সব সভাসদের চুল কিছুটা করে সাদা হয়ে গেল। দুঃসংবাদ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল দেশে। কিছুদিনের মধ্যে দেশবাসীর সবার মাথার এক গাছি করে চুল গেল পেকে।

দেশবাসীর সাদা কালো মাথাগুলোর দিকে তাকিয়ে রাজার মন আরো খারাপ হয়ে গেল। শেষে সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল - রাজকন্যাকে যে ভাজা মাছ উলটে খাওয়া শেখাতে পারবে তাকে ভুরি ভুরি পুরস্কার দেওয়া হবে।

এই খবর যথাসময়ে রাজকন্যা নন্দিনীর কানেও এসে পৌঁছল। কিন্তু সে স্বভাববশতঃ তাতে উতলা হওয়ার কোন কারন খুঁজে পেল না। তাই খবরটা এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বার করে দিলো।

দুই

একদিন দুপুরে রোজদিনকার মতোই রাজকন্যা মনের আনন্দে মধ্যাহ্ন ভোজ সারল। সোনার থালায় ভাত আর সঙ্গে সোনার বাটিতে সাজানো ছিল সাতাশ রকমের মাছ আর চৌষট্টি রকমের তরকারী। খাওয়া দাওয়া সেরে রাজকন্যা হেলতে দুলতে এসে তার নিজের শোওয়ার ঘরে ঢুকেছে। এখন সে সোনার পালঙ্কে লাল মখমলের বিছানায় শুয়ে মনের সুখে দিবাস্বপ্ন দেখবে। কিন্তু পালঙ্কে শুতে না শুতেই হঠাৎ অদ্ভূত এক শব্দ করে রাজবাড়ির সব ঘড়ি এক সঙ্গে থেমে গেল।

ঘড়িগুলোর কোন দোষ নেই। এমনিতে তারা খুব নিয়ম মেনে চলে। সারাদিন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাঁটাগুলো ‘টিক’ ‘টিক’ আওয়াজ করতে করতে ছুটে চলে। কিন্তু সময়টাই এমন খামখেয়ালি। সারা দিনরাত তার নদীর স্রোতের মতো একনাগাড়ে বয়ে যেতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে সে থমকে দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। ঘড়ির কাঁটাগুলোও তখন চলতে চলতে চমকে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কারো কোন সময়ের হিসাব থাকে না তখন। তাই সবার সব কাজ থেকে ছুটি হয়ে যায়। এই সময়টাকে বলে পড়েপাওয়া সময়। সবাই তখন স্বাধীন। কারো ওপর কারো আদেশ চলে না, কোনো জোর খাটে না। সবাই নিজের ইচ্ছে খুশি মতো আনন্দে সময় কাটায়। তারপর আবার সময় যেই বইতে শুরু করে, ঘড়িও চলতে শুরু করে, সবাই যে যার রুটিনে ফিরে যায়।

অন্যদিন এইরকম পড়েপাওয়া সময়ে রাজকন্যা ছাদে ঘুড়ি ওড়ায় বা বিড়ালদেরকে দাবা খেলা শেখায় বা গাছে উঠে আম-জাম পাড়ে বা পিঁপড়েদের জন্যে পাতার ঘর বানিয়ে দেয়। কিন্তু আজ সে সব কিছুই করতে ইচ্ছে করল না তার। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে শুধু আকাশকুসুম ভেবে যাচ্ছে। কত রকমের ভাবনারা যে মাথায় ভীড় করে আসছে তার ঠিক নেই। সময়ের খামখেয়ালিপনার কথাই বেশী করে মনে হচ্ছে এখন। ছোটবেলা থেকেই শুনেছে যে এই পড়েপাওয়া সময়ে নাকি কোন সন্দেহ করা উচিত না। কিন্তু সন্দেহ করলে কী হতে পারে তা কেউ জানে না। অবশ্য লোকে বলে বলেই সব কথা যে সত্যি হবে এমনও তো নয়। হয়তো এসব শুধুই কথার কথা। যেমন সবাই বলে ‘শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়’। কিন্তু এ কথা কি আর সত্যি নাকি? একদিনও যদি রাজকন্যাকে এই নরম বিছানা ছেড়ে অন্য কোথাও ঘুমোতে বলা হয় তো রাজকন্যার কী আর ঘুম আসবে? জেগে জেগেই কাটিয়ে দিতে হবে সারারাত। অথবা একদিনও যদি সোনার থালায় ভাত আর সোনার বাটিতে করে নানারকম মাছ আর তরকারী না দেওয়া হয় তাহলে কী সে ভাত খেতে পারবে? কিছুতেই পারবে না। মুখেই রুচবে না। না খেয়েই থাকতে হবে।

যেই না ভাবা অমনি হঠাৎ রাজকন্যা দেখল হলুদ রং-এর আলোতে ঘর ভরে গেছে। আর সেই আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক পরী। সোনার মত তার গায়ের রঙ। আকাশের মতো নীল তার জামা। কালো মেঘের মতো তার চুল। হাতে তার জাদু লাঠি। লাঠিতে চাঁদ তারা ঝিকমিক করছে। এসেই বললো
- ‘পড়েপাওয়া সময় আনন্দে না কাটিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছ। এখন যাও নিজের সন্দেহ নিজেই নিরসন কর।’

এই লেখকের অন্যান্য রচনা