ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ichchhamoti-31st-december-2014 editorial

২০১৪ সাল শেষ হল। ইচ্ছামতীর বয়স আরেকটু বাড়ল। তোমারও বয়স আরেকটু বাড়ল। সাথে বয়স বাড়ল আমার; আর বয়স বাড়ল এই পৃথিবীটারও।

একটা বছর, ৩৬৫ দিন, ভূগোলের বই মেনে বলতে গেলে ৩৬৫ আর ১/৪ দিন, দেখতে না দেখতেই হুশ করে কেটে গেল। তার মাঝে ইচ্ছামতী আর আমার বেশ অনেক নতুন বন্ধু হল, যারা ইচ্ছামতীর জন্য ছবি এঁকে পাঠাল, অনেক নতুন লেখক এবং কবি বন্ধু পেলাম, যাঁরা দারুণ সুন্দর সব গল্প, কবিতা এবং নানাধরণের তথ্যমূলক লেখা উপহার দিলেন আমাদের; সেই সব গল্প- কবিতাকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য খুব ভাল ভাল সব ছবি এঁকে দিল আমাদের আরো কিছু নতুন বন্ধু। সব মিলিয়ে দেখতে গেলে ইচ্ছামতীর জন্য ২০১৪ সালটা মন্দ ছিল না। তাই অন্যান্য সবার মতই চেঁচিয়ে, বেলুন ফুলিয়ে, গলা ফাটিয়ে, হইহই করে বলতেই পারি - ইচ্ছামতীর ২০১৪ সালটা বেশ ভালই গেছিল, ২০১৫ সালও খুবই ভাল যাবে-এ-এ-এ...!!

কিন্তু জোর গলায় সেরকম আর বলতে পারছি কই? প্রচুর কাজের চাপে, ইচ্ছামতীকে সাজিয়ে তোলার ব্যস্ততার মধ্যে, ভীড় রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং ধরে পেরোতে পেরোতে, বন্ধুবান্ধবদের জটলায়,যে সব কথাগুলি ভুলে যাই ---একটু একলা হলেই, সেই সমস্ত কথাগুলিই আবার, বারে বারে ফিরে আসে চোখের সামনে; টিভির খবরের চ্যানেলে, খবরের কাগজের পাতায় পাতায়, ইন্টারনেটে দেশ-বিদেশের ওয়েবসাইট যেই চোখ চলে যায়, অমনি সামনে চলে আসে মন খারাপ করা, বুক কাঁপিয়ে দেওয়া নানাধরণের খবর - সারাটা বছর ধরে কত ধরণের খারাপ খবরই না পেলাম - ঠিক এই মূহুর্তে, যখন বসে লিখছি, তখন জানা যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে বহুঘন্টা নিঁখোজ এবং সংযোগবিহীন থাকার পরে, উদ্ধারকারীরা সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে উদ্ধার করে আনছে যাত্রীদের দেহ...যার অর্থ, আরো কিছু পরিবার স্বজন হারাল, আরো কিছু শিশু নিজের বাবাকে বা মা'কে হারাল, আরো কিছু মা আর বাবা তাঁদের সন্তানদের হারালেন...

যেদিকেই তাকাই, দেখছি অস্ত্রধারী, শক্তিশালী কিছু মানুষের হাতে অশক্ত, দুর্বল, অসহায় মানুষের পরাজয়। অধিকাংশ সময়েই ধর্মের নামে, ক্ষমতার নামে, অথবা নিছক সন্দেহের বশে মানুষ একে অপরের ওপর অত্যাচার করছে, আক্রমণ করছে, মেরে ফেলছে। অর্থের লোভে, খাদ্যে লোভে, নিরাপত্তা মিথ্যে আশায় লড়াই করে মরছে মানুষ। আর এইসব যুদ্ধ বিবাদে যারা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা হল পৃথিবীর ছোট ছোট ছেলেয়েমেয়েরা।

২০১৪-এর এপ্রিল মাসে নাইজেরিয়াতে ২৭৬ জন স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে চলে যায় 'বোকো হারাম' নামে পরিচিত এক মৌলবাদী উগ্রপন্থীগোষ্ঠী।তাদের অপরাধ, তারা ধর্মীয় শিক্ষার বদলে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করছিল। তাদের খবর এখনো কেউ সঠিক জানেনা। শোনা যায়, তাদের জোর করে ধর্ম বদল করা হয়েছে, জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে মধ্য প্রাচ্যের গাজা স্ট্রিপে ইজরায়েল যখন 'হামাস' নামের একটি গোষ্ঠীকে কাবু করতে বোমাবর্ষণ করেছিল, তখন যারা সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার ছিল গাজা অঞ্চলের শিশুরা। তাদের বাড়িঘর, খেলার মাঠ, স্কুল, সবকিছু ধূলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।তার প্রায় পাশাপাশিই ইউক্রেনে যুদ্ধবাজের দল মিসাইল ছুঁড়ে ধ্বংস করে দেয় আকাশপথে উড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী এক বিমান। মাত্র কিছুদিন আগে পাকিস্তানের পেশোয়ারের সামরিক স্কুলে সশস্ত্র জঙ্গীরা ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মেরে ফেলে একশো বত্রিশ জন বিভিন্ন বয়সী ছেলে-মেয়েদের সাথে আরো বেশ কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। আর তারপরে পরেই, ভারতের আসামে অন্য এক জঙ্গীগোষ্ঠীর হিংসাভরা আক্রমণে মারা গেল আদিবাসী কিছু অসহায় মানুষ, যাদের মধ্যেও ছিল বেশ কিছু ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।

crying-girl-at-gaza-with-golden-bag

পাশের ছবিটা আমি প্রথম দেখেছিলাম, গত আগস্ট মাসে, একটি ওয়েবসাইটে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত গাজায় এই ছোট্ট মেয়েটির চোখের সামনে একটি বিস্ফোরন হয়ে মারা গেছিলেন বেশ কিছু মানুষ। - তোমার মত নিশ্চয়ই এই ছোট্ট মেয়েটির মনেও আছে বড় হয়ে ওঠার হাজারো স্বপ্ন, তার সোনালি ঝোলার মতই তার সোনালি মনে খেলে বেড়াত রামধনু রঙ কল্পণা যত...কিছু যুদ্ধবাজ মানুষ এক লহমায় কেড়ে নিয়েছে তার ঘর, তার পরিবার, তার স্বপ্ন, তার বন্ধুদের। নীল জামা পরা ছোট্ট মেয়েটার হাতে ঝুলছে একটি সোনালি রঙের ব্যাগ, আর সে কাঁদছে হাপুস নয়নে - এই ছবিটাকে , ছবির এই ছোট্ট মেয়েটিকে আমি অনেক চেষ্টা করেও ভুলতে পারিনি। আজ, বছরের শেষে এসেও ভুলে থাকতে পারলাম না ওকে। তাই ছবিটা আজ দেখালাম তোমায়। ইচ্ছামতী আর তোমার আর বাকি সব্বার যে ওর যে দেখা হওয়াটা খুব জরুরী ! ওর মত আরো হাজার হাজার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে যে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঠিক এইভাবে কাঁদছে...

টিভিতে- খবরের কাগজে- বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এইসব খবর দেখে, শুনে, পড়ে, মন খারাপ এবং আরো মন খারাপ করা ছাড়া কি আমাদের আর কোন কিছুই করার নেই? আজ খবর শুনে কাল ভুলে যাওয়াটা আমাদের দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেইরকমই মন খারাপ করা আর নানারকমের খারাপ খবর শুনেও বিচলিত না হওয়াটাও আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কোন দুর্ঘটনা, অন্যায়, অবিচারের কথা শুনলে, আমরা খানিক্ষণ সেটা নিয়ে আলোচনা করি, তারপরে ভাবি- ওইসব আমাদের সাথে হবে না, ওইসব অন্যদের সাথেই হয়...প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক সময়েই মানুষের হাতের বাইরে থাকে, কিন্তু যখন একদল মানুষ জেনেশুনে অন্য একদল মানুষের ওপর অত্যাচার করে, অন্যায় করে, সেই অন্যায়কে মেনে নেওয়াটাও যে আরো বড় অন্যায়, সেটাই আমরা ভুলে যাই।

fisherman-at-bangladesh-scourging-foul-oil-from-river

এতদূর পড়ে তুমি ভাবছ নিশ্চয়ই, চাঁদের বুড়ির আজ হলটা কি? এতদিন পরে একটা চিঠি, সেটা ভর্তি যত কঠিণ কথা, যত মন খারাপের কথা। নিউ ইয়ার রেসোলিউশন্‌স্‌ কোথায়? সত্যি কথাটা হল, যদিও আমি চাইনা গম্ভীর কথাবার্তা বলতে, বরং ভাল ভাল বেড়ানোর গল্প, ছুটির আনন্দ, নতুন বছরে ইচ্ছামতীর নতুন পরিকল্পনা, এইসব নিয়েই কথা বলতে চাই, কিন্তু বিশ্বাস কর, ঠিক পারছি না।ঘুরে ফিরে মাথায় চলে আসছে সুন্দরবনের কথা। জানো তো, বাংলাদেশের সেলা নদীতে গত ৯ই ডিসেম্বর একটি তেলের ট্যাঙ্কার উলটে গিয়ে ৩,৫০,০০০ লিটার তেল জলে ছড়িয়ে গেছে। সেই তেল আশেপাশের নদীগুলিতেও ছড়িয়ে সুন্দরবনের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউনেস্‌কো হেরিটেজ সাইট রূপে চিহ্নিত সুন্দরবন অঞ্চল বহু বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী্র আবাস স্থল। এই তেল ছড়িয়ে পড়ার ফলে এই সমস্ত প্রাণীসম্পদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ও সম্ভাবনা আছে। চেনা-অচেনা প্রাণীদের মধ্যে সামূহিক ক্ষতি হতে পারে আমাদের অতি পরিচিত রয়্যাল বেঙ্গল বাঘ, কুমির এবং চিতল হরিণদের। হারিয়ে যেতে পারে বিলুপ্তপ্রায় ইরাওয়াডি শুশুক, গাঙ্গেয় শুশুক, সারস এবং মাছরাঙা পাখিরা। সুন্দরবন অঞ্চলের খাদ্য শৃঙ্খল অনেকখানি নষ্ট হয়ে গেছে। কালো তেলের প্রলেপ পড়ে যাচ্ছে সুন্দরী ও অন্যান্য গাছের গুঁড়িতেও। যেকোন সময়েই এই সমস্ত গাছ মরে যেতে পারে। এই গাছগুলিই কিন্তু সমুদ্রের ঢেউয়ের নিয়মিত আক্রমণ থেকে বাংলাদেশে এবং ভারতের অনেকখানি উপকূলরেখাকে রক্ষা করে চলেছে। গাছগুলি যদি মরে যায়, সমুদ্রের ঢেউয়ের স্রোতে ভেসে যাবে বাংলাদেশ ও ভারতের অনেকখানি উপকূল, সাথে সাথে নষ্ট হয়ে যাবে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের সাথে অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকা।

এই পৃথিবীর আলো-বাতাস-জল-মাটিকে ভালবেসে, রঙিন রঙিন ফুল- উড়ুৎফুড়ুৎ-পাখি- ঝলমলে প্রজাপতি- আদুরে কুকুরছানা-গাছের কচি পাতা-আকশাভরা সুয্যি-তারা-নদীভরা-ঝিলিমিলি-মাছ- ছোট্ট ছোট্ট হাসিখুশি খোকাখুকুদের ভালবেসেই তো ইচ্ছামতীর বয়ে চলে, হেসে চলে, ভেসে চলে। সেইসব

ichchhamoti

আলো-পাখি-প্রজাপতি-মাছ-
ফুল-ফল-পাতা-ভরা-হরেক-গাছ-
খোকাখুকুর-কান্না-হাসি-
ধামসা-মাদল-রাখালে-বাঁশি-

-এই সবকিছু থেকেই তো রঙ-রেখা-আল্পনা-কল্পনা মিশিয়ে, রামধনু রঙ সুতো কাটে এই চাঁদের বুড়ি, সাজিয়ে তোলে ইচ্ছামতীকে, তোমার সাথে ভাগ করে নেয় কত কথা, কত গল্প...। তাই জীবনের এই রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ যদি দিনে দিনে ফিকে হয়ে যায়, হারিয়ে যায় যত বৈচিত্র, তাহলে আর আমাদের মন ভাল থাকে কি করে?

তবে ইচ্ছামতী আর আমি এটাও জানি, শুধুই তো হতাশ হয়ে, দুঃখ পেয়ে ঘরের কোণে বসে থাকলে চলবে না। মন খারাপগুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখে আবার এগিয়ে চলতে হবে নতুন দিনের, নতুন দুনিয়া গড়ার উদ্দেশ্যে। এই পৃথিবীতে শুধু তো আর খারাপ মানুষে ভরে নেই, আছে তার থেকে অনেক বেশি ভাল মানুষেরা। মালালা ইউসুফজাই বা কৈলাশ সত্যার্থীর মত মানুষেরাও আছেন, যাঁরা শত বাধাবিঘ্ন পেরিয়েও লক্ষ্যে স্থির থেকে ঠিক নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন- ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যাতে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়, বাবা-মায়ের আদর থেকে দূরে সরে গয়ে রুজি-রোজগারের চিন্তায় না আটকে পড়ে, সুস্থ শৈশবের ভাগীদার হয়। আর একথাও মনে রাখতে হবে, মালালা বা কৈলাশের মত বিখ্যাত মানুষদের পাশে থেকে নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছেন আরো অনেক, অনেক ভাল মানুষ, যাঁদের সবার নাম আমরা জানিনা, যাঁদের সম্পর্কে হয়ত আলাদা করে খবর লেখা হয়না। কিন্তু মানব জাতির সামগ্রিক কল্যাণে এই প্রত্যেকটি মানুষের অবদান আমাদের মনে রাখতে হবে।

এই মূহুর্তে আমাদের সবার জীবনে যে বিষয়গুলির সবথেকে বেশি প্রয়োজন, তা হল একে অপরের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস , ভালবাসা। মানুষ হিসাবে প্রত্যেক মানুষকে সমান সম্মান জানানো। মেয়ে নাকি ছেলে, হিন্দু নাকি মুসলমান নাকি খ্রীশ্চান, গায়ের রঙ কালো নাকি ফর্সা, রোগা নাকি মোটা, ক্লাসের পরীক্ষায় কে অঙ্কে বেশি নম্বর পেল, বছরের শেষে কে ফার্স্ট প্রাইজ পেল- এই সমস্ত মানুষেরই তৈরি নানারকমের ভাগাভাগির নিয়মকানুন দিয়ে একে অপরকে আলাদা করার অভ্যাস ঝেড়ে ফেলতে হবে আমাদের। সবার সাথে করতে হবে সমান বন্ধুত্ব, সবাইকে দিতে হবে সমান ভালবাসা আর সম্মান - এই পৃথিবীর জল- বাতাস-আলো-মাটির ওপর সকলের হোক সমান অধিকার - নতুন বছরে এইটাই না হয় হোক আমাদের সবার 'রেসোলিউশন' ।

Ichchhamoti wishes you a positive year near 2015

তোমার নতুন বছর মুক্ত চিন্তায়, বন্ধুত্বে, আস্থায়, আশায়, উদ্দীপনায় ভরা হোক।।


ফটোগ্রাফঃ ন্যাশ্‌নাল জিওগ্রাফিক ও টাইম্‌স্‌ অফ ইন্ডিয়া

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা