ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
চাঁদের বুড়ির চরকা-চিঠি - ১৪২২/০১- শুভ নববর্ষ

সোনা বন্ধু

অনেকদিন পরে তোমাকে আবার চিঠি লিখছি।

এসে গেল আরেকটা নতুন বাংলা সন - ১৪২২। তোমার জন্য রইল অনেক ভালবাসা আর শুভকামনা। নতুন বছরে নিজেকে গড়ে তোল, বেড়ে ওঠ সবদিক থেকে পরিপূর্ণ মানুষ রূপে; দিকে দিকে ছড়িয়ে দাও আনন্দ, কুসংস্কারমুক্ত জ্ঞানের শুভ্র আলোয় উদ্‌ভাসিত হোক তোমার নরম মন; তোমার পরিবারের সবার জন্য, তোমার সব বন্ধুদের জন্যেও রইল আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

ইচ্ছামতী যেহেতু এখন বেশ বড়ই হয়ে গেছে, তাই খবরের কাগজ পড়ে মাঝে মাঝে, টিভিতে খবর শোনেও, ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকেও খোঁজ পায় নানা ঘটনার। তার মধ্যে বেশিরভাগই খুব মন খারাপ করা সব খবর থাকে । সেইসব খবর শুনে বা পড়ে ইচ্ছামতী আমাকে নানারকমের প্রশ্ন করে; তোমারও নিশ্চয়ই সেইরকম সব নানারকমের প্রশ্ন মনে আসে - কেন পাকিস্থানের স্কুলে জঙ্গীরা ঢুকে হঠাৎ করে গুলি চালিয়ে হত্যা করল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের, কেন আফ্রিকার একটা স্কুল থেকে দুশো জন মেয়েকে ধরে নিয়ে চলে গেল কিছু লোক, যাদের আজও কোন খোঁজ নেই, কেন বাংলাদেশের দুজন মানুষকে সত্যি কথা বলার জন্য, কুসংস্কারমুক্ত চিন্তা করার জন্য মেরে ফেলা হল, কেন সিরিয়ার যুদ্ধ হয়েই চলেছে বছরের পর বছর ধরে, কেন ফ্রান্সে কয়েকজন মানুষ কার্টুন এঁকেছে বলে তাদের মেরে ফেলা হল, কেন আমাদের দেশে চাষীরা আত্মহত্যা করছেন - সত্যি কথা বলতে হলে, সব প্রশ্নগুলির জবাব আমার কাছেও নেই। তবুও বলি, আমরা একটা খুব কঠিণ সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি। দেখতে পাচ্ছি, সারা বিশ্বজুড়েই বেশিরভাগ মানুষ আজ খুব অসহায়। বেশিরভাগ মানুষেরই দিনে দু'বেলা খাবার জোটেনা, মাথার ওপরে ছাদ নেই, পরনে যথেষ্ট কাপড় নেই, হাতে কাজ নেই, অক্ষরজ্ঞান নেই; এই সব সামান্য চাহিদা মেটানোর জন্য তারা যেকোন ধরনের কাজ করতে প্রস্তুত। আর তাদের এই অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছে অল্প কিছু দুষ্টু লোক, যাদের কাছে রয়েছে অনেক অস্ত্র-শস্ত্র, যারা চায় সারা পৃথিবীর ওপর রাজত্ব করতে। তারা খাবারের লোভ দেখিয়ে, স্বস্তির লোভ দেখিয়ে এইসব অসহায় মানুষদের বাধ্য করে যুদ্ধে যোগ দিতে, বা খারাপ কাজকর্ম করতে। সাধারণ মানুষ বেশিরভাগ সময়ে বাধ্য হয় খারাপ কাজে, অন্যায় কাজে শামিল হতে। তারা কিন্তু সবাই আসলে তোমার আমার মতই সবার সাথে মিলেমিশে একসাথে, আনন্দে বাঁচতে চায়। কিন্তু পরিস্থিতি তাদের সবসময়ে ভালভাবে থাকার সুযোগ দেয় না।

তাহলে কি হবে? আমরা সবাই কি চারিদিকের খারাপ পরিস্থিতি বা ঘটনার চাপে পড়ে আরো মন খারাপ করব? হয়ে উঠব আরো অসহিষ্ণু, আরো অধৈর্য্য? আমি ইচ্ছামতীকে যা বলেছি, তোমাকেও তাই বলি- এই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু আসলে খুব ভাল। তারা কিন্তু কেউই যুদ্ধ চায়না, ঝগড়াঝাঁটি চায়না ; ঠিক তোমার, আমার আর ইচ্ছামতীর মতই, তারাও ভালবাসে গাছের রঙিন ফুল, খোলা আকাশ, নদীর ওপর দিয়ে বয়ে আসা তিরতিরে বাতাসের ছোঁয়া, চাঁদের নরম আলো, সূর্যের উত্তাপ, পাখির ডাক, প্রজাপতির পাখায় আলোর নাচন। আর সেই সব ভাল মানুষেরাই কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন - ছোটছোট ছেলেমেয়েদের খাদ্যের ব্যবস্থা, শিক্ষার ব্যবস্থা, বড়দের জন্য কাজের ব্যবস্থা, সবার জন্য মাথা গোঁজার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার জন্য। আর এইসব উৎসাহী মানুষদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু তোমার বা তোমার বন্ধুদের মত ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। আর তাদের মত, তুমিও হয়ে উঠতে পার আশেপাশের মানুষদের বন্ধু - সবার দরকারে সাহায্য কর, সবাইকে সমান ভালবাসা ও সম্মান দাও। মনের কোণে জমতে দিও না অজ্ঞানতার কালো আঁধার। গরীব না ধনী, বাঙালি না অবাঙালি, দেশি না বিদেশি, হিন্দু না মুসলমান না খ্রীশ্চান‌ নাকি বৌদ্ধ-জৈন-শিখ-ব্রাহ্ম - মানুষেরই বানানো এই সব মাপকাঠিতে কারোর বিচার কর না। নীল আকাশের মত উদার, সবুজ জঙ্গলের মত সজীব সরস, সোনালি সূর্যের রশ্মির মত উষ্ণতায় ভরপুর মনে বাড়িয়ে দাও বন্ধুত্বের হাত - ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সাজিয়ে গুছিয়ে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব যে তোমার আর তোমার বন্ধুদের হাতে !

এই নববর্ষে, আবার শুরু হতে চলেছে ইচ্ছামতীর পুরনো এক বিভাগ - 'মনের মানুষ' ; আমাদের এইবারের মনের মানুষ শুরু হচ্ছে অবলা বসুর কথার সাথে। শ্রীমতী অবলা বসু বেশিরভাগ মানুষের কাছে পরিচিত আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সহধর্মিনী রূপে। কিন্তু এর বাইরেও তাঁর একটা আলাদা পরিচিতি ছিল। এই আলোকময়ী নারীর সম্পর্কে জানার জন্য পড়ে ফেল অবলা বসুর কথা। সাথে রইল কয়েকটি মন ভাল করা গল্প আর ছড়া, আশাকরি পয়লা বৈশাখের সকালে -দুপুরে বেজায় ভাল ভাল খাবার খাওয়ার সাথে সাথে এগুলিকে পড়তে তোমার বেশ ভালই লাগবে।

এ ছাড়াও, এই নববর্ষে ইচ্ছামতীর নতুন জামা তো হয়েইছে, সাথে হয়েছে এক নতুন বন্ধু 'কুটুস' ! এখন থেকে কুটুস মাঝেমধ্যেই দেখা দেবে ইচ্ছামতীর পাতায়। কুটুস ঠিক কে, সেটা জানতে হলে সোজা চলে যাও এই পাতায় ! ইচ্ছামতীর সাথে সাথে কুটুস যে তোমারও বন্ধু হয়ে উঠবে খুব তাড়াতাড়ি, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত !

আর হ্যাঁ, এই নতুন বছরে, তোমার সাথে আমাদের বন্ধুত্বটা হল আরেকটু বেশি পুরনো, সাথে আরেকটু বেশি শক্ত। তুমি বলবে, ধুস, পুরনো জিনিষ তো যত দিন যায় তত নষ্ট হয়ে যায়, ভেঙে যায়, ফুরিয়ে যায়, হারিয়ে যায়। সেটা কিছু কিছু জিনিষের ক্ষেত্রে ঠিকই, স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু ইচ্ছামতীর ব্যাপারটা অন্য। যত দিন যাচ্ছে, ইচ্ছামতীর বন্ধুর সংখ্যা তত বাড়ছে, আর তার সাথে মজবুত হচ্ছে সবার সাথে বন্ধুত্ব। সময়ের সাথে সাথে একটু একটু করে বয়স ও বাড়ছে ইচ্ছামতীর, আর সাথে বাড়ছে আয়তন ও। আর এসব কিছুই সম্ভব হত না যদি না দেশ-বিদেশ থেকে আমাদের সব লেখক বন্ধুরা ইচ্ছামতীকে ভালবেসে নানারকমের দারুন সুন্দর সব লেখা পাঠাতেন, যদি না তার সাথে রঙে ভরা সুন্দর, মানানসই সব ছবি এঁকে দিতেন আমাদের শিল্পী বন্ধুরা, আর যদি না তোমার মত সব পাঠক বন্ধুরা আমাদের সবসময়ে উৎসাহ দিয়ে যেতেন। তোমাদের সবার উৎসাহ আর ভালবাসাতেই চাঁদের বুড়ি চরকা কেটে চলে, ইচ্ছামতী তিরতির করে বয়ে চলে, ফুরফুর করে ভেসে চলে, ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে চলে।

তাই আজকের দিনে, তাঁদের প্রত্যেককে আমরা জানাই অনেক, অনেক শুভেচ্ছা। সবার নতুন বছর কাটুক সৃষ্টির আনন্দে, জ্ঞানের আবাহনে !

সব্বার জন্য রইল বেল-যূঁই-চাঁপার সুগন্ধ, কাঁচামিঠে আমের সুবাস, গন্ধরাজলেবুর সুঘ্রাণ আর শেষবিকেলের দখ্‌ণে হাওয়ার আরাম।

ভাল থেক।

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা