ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

জিম্বাবওয়েতে সেদিন এবং তার পরে পুরো একটা রাত সব ব্যাপারটা ঘটেছিলো স্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ জীবনের জন্যে। ও সেইসময় গ্রানাইট পাথরে হোঁচট না খেলে আমরা শুধু হতাশ হয়ে হয়ত ফিরে চলে আসতাম, গ্রানাইট পাহাড়ের সোনার সন্ধান অধরাই থাকতো । তবে সেদিন মেঘলা আকাশের দরুন ওর জি পি এস ভুল করতে করতে আমাদের রাস্তা ভুলিয়ে দেয়, এবং আমরা রাত কাটাই চিতাবাঘের গুহার কাছে ।

আমরা যে ভারতীয় কোম্পানির হয়ে জিম্বাবওয়েতে সোনা অনুসন্ধানে এসেছি এই দেশে তারা কয়েক পুরুষ ধরে অন্য জিনিসের ব্যবসা করেছে । জিম্বাবওয়ে সত্যি করে সোনা আর হীরের দেশ । এক টন পাথরে এখানে কুড়ি- তিরিশ গ্রাম সোনা অনায়াসে পাওয়া যায় নদীর বালুতটে আর পাহাড়ের তলায়। এক সপ্তাহ এসব দেখে আমদের তো তাক লেগে গেল।

এখানে আসার আগে আমরা একটা প্রাথমিক অনুসন্ধান করে নিয়েছিলাম ভারতে বসেই। প্রসঙ্গত বলি সোনা অনুসন্ধানে, ভূতাত্ত্বিক কতকগুলো প্রাথমিক খোঁজ করে নেন। সেই সমস্ত দিক গুলো দেখবার পর আমরা দেখি কোথায় আগ্নেয শিলা আছে | অনেক সময় এই সব শিলাতে, অন্য ছোট ছোট আগ্নেয় পাথরের অজস্র শিরা আড়া আড়ি ভাবে কেটে যায় আর দেখা যেতে পারে কখনো ধূসর কোয়ার্টজ পাথর। এই পাথরে এমন কি তার সঙ্গের পাথরেও থাকতে পারে মূল্যবান হলুদ ধাতু- সোনা। সঙ্গ দোষ- থুড়ি -গুণ আর্ কি !

আমরা ভারতে বসে দিনের পর দিন জিম্বাবওয়ের উপগ্রহ চিত্রে খুঁজে বেড়িয়েছি এইরকম পাথরের পাহাড় কোথায় আছে, আর্ তাতে ধূসর কোয়ার্টজ পাথর পাবার সম্ভাবনা কতটা হতে পারে। এইভাবে আমরা বেশ কিছু জায়গা চিহ্নিত করেছিলাম।

এর সাথে আর একটি কথা আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছিলো । এরকম প্রায় সব জায়গা তো সাদা চামড়াদের কবলে, আমাদের এমন কোনো সেরকম সম্ভাবনাময় জায়গা খুঁজে বার করতে হবে যেখানে অন্য কেউ এখনো এসে পৌছায় নি । এ জিনিস একমাত্র জিম্বাবওয়েতে পৌঁছেই করা যেতে পারে।

জিম্বাবওয়েতে আমরা তার ভূ প্রকৃতির সাথে পরিচিত হবার সাথে সাথে সে দেশের সরকারী খনি এবং ভূতাত্ত্বিক বিভাগ গুলোতে ঘুরে বেশ নিরাশ হচ্ছিলাম । সোনার সম্ভাবনাময় কোন কোন জায়গা গুলো অন্যের দখল মুক্ত, সেই অনুসন্ধান মনে হচ্ছিলো সোনা অনুসন্ধানের চাইতে শক্ত । এই করতে করতে আমরা একজন স্থানীয় ভূতাত্ত্বিকের খোঁজ পেয়ে গেলাম যাদের পুরুষানুক্রমিক ভাবে সম্পত্তি কেনা বেচার ব্যবসাও আছে । যে তথ্য গুলো আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম সেগুলো ওর নখদর্পণে, অনায়েসে তার প্রামান্য দলিলের খোঁজ একের পর এক হাজির করতে লাগলো।

দেখতে ওকে অনেকটা হিন্দি সিনেমার জীবনের মতো, ওর খটোমটো নাম পাল্টে আমরা ওর নাম দিলাম জীবন, ও হয়ে গেল আমাদের দলের নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

সকাল দেখে দিনটা বোঝা যায় এটা মেনে নিলে আমরা আর্ যেমন বেরোতাম না, তেমনি সেদিন ওসব একের পর এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটতো না ।

সে সময়টা বৃষ্টি হবার কথা নেই, কিন্তু সকাল থেকে আকাশে মেঘের আনাগোনা হতে হতে একসময় তারা বেশ আসর জমিয়ে নিল। অকালের বৃষ্টি, একটু পরে থেমে যাবে এই ভেবে আমরা এগিয়ে চললাম। আমাদের যেতে হবে রাজধানি শহর হারারে থেকে দক্ষিণে দুশো কিলোমিটার দূরে গ্রানাইট হিল পাহাড়ে ।

গ্রানাইট একধরনের আগ্নেয় শিলা, নুন আর গোলমরিচ মেশালে যে রকম দেখতে হয়, অনেকটা সেই রকম এই পাথরের রং, অবশ্য এছাড়া আরো রং আছে, যেমন পিঙ্ক গ্রানাইট। উপগ্রহ চিত্রে এই পাহাড়টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিলো গ্রানাইট পাথরের এই পাহাড়টি তে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে ধূসর কোয়ার্টজ পাথরের অনেক গুলি পাতলা শিরা হয়তো আছে। সোনা অনুসন্ধানে এটা আমাদের কাছে খুবই পছন্দের জায়গা তার উপরে, জীবনের খবর, যে এই পাহাড়ে এর আগে কেউ কোনো খোঁজ চালায় নি।

আমাদের যাবার রাস্তায় মাঝে পড়বে কদোমা টাউন। কদোমা থেকে একজন স্থানীয় লোককে আমরা তুলে নেবো, এই অভিযানে ওকে হেড মিস্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করা হলেও, ও আসলে হবে আমাদের গাইড।

জীবনের কথা মতো আমরা এই অভিযানের উদ্দেশ্য যতটা সম্ভব গোপন রাখা যায় তা রাখছি। সাধারণতঃ এ ধরনের অভিযানে যন্ত্রপাতি যায় ছোট ট্রাকে আর্ আমরা যাই বোলেরো মতো জীপে। কিন্তু জীবন বললো একসাথে দু দুটো গ|ড়ি, এটা কিন্তু অনর্থক দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, রাবল্‌ নিয়ে যাচ্ছি ভেবে বিপদ হতে পারে।

এখানের ভাষায়, রাবল্‌ মানে , সোনা আছে, এরকম বড় বড় পাথরের টুকরো। এরকম পাথর, নদী আর যে পাহাড়ে সোনা আছে তার তলায় দেখা যায়। সবাই দেখতে পায় না কিন্তু কেউ পেলে তখন সবাই তার ওপর আর জায়গাটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছোটো ট্রাকে গেলে লোকে আমাদের হিচ-হাইকার বলে মনে করবে, তাহলে আর কোনও ঝামেলা হবে না।

ছোটো ট্রাক মানে বোলেরো, কাম্পেরা গাড়ীর চাইতে সামান্য বড়ো । এ ধরনের গাড়ীতে একটা ছোটো টাব থাকে পেছনে। এই টাবে আছে সপ্তাহ খানেকের রেশন, শুকনো খাবার, ছোটো জেনেরেটার, সার্ভের যন্ত্রপাতি, আর আমাদের কয়েকটা সুটকেস। সব মিলে ওজন কম নয়, এই মাল ভরতি টাবের জন্যে পরে মুশকিল কম হলো না।

কডোমা তে সেই লোকটি যাকে আমরা আসলে লোকাল গাইড হিসেবে নিয়ে যাবার কথা, হঠাৎ বৃষ্টির জন্য বোধ করি এল না । ও না থাকলেও আমাদের কাছে জি পি এস, কম্পাস আর টোপোগ্রাফিক ম্যাপ আছে, তবে একটু অসুবিধে হবে । কডোমা থেকে গ্রানাইট হিল্ একুশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, পাঁচ কিলোমিটার পরে কাঁচা রাস্তা শুরু হবে, সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ঘুরতে হবে।আমাদের টোপোগ্রাফিক ম্যাপ তাই বলে, জি পি এস একটু বেশি বলছে, কারো খেয়াল নেই যে মেঘলা আকাশে জি পি এস একটু খেয়াল খুশি করে। খানিক ক্ষণ পরে সেই নিয়ে আরো বেশী হয়রানি হল, সে কথায় পরে আসছি।

শুরু হোল গ্রানাইট পাহাড় যাবার, চুলের কাঁটার মত, পাহাড়ের চার পাশে প্যাঁচ দেওয়া কাঁচা রাস্তা। ষোল কিলো মিটার এই রাস্তাটাতে চড়াই উতরাই করে, একটা পাহাড় টপকে, তবে গ্রানাইট হিলে যাবার রাস্তা আসবে।

জাপানি ট্রাক গজরাতে গজরাতে প্রথম পাহাড়চূড়োতে উঠে এলিয়ে পড়ল। একে বৃষ্টিতে ভেজা কাদা রাস্তা তার ওপর মাল পত্রে ভরতি টাব, একটু বিশ্রাম পেলে ঠিক হয়ে যাবে, আমাদের ড্রাইভার বন্ধু রবার্ট এই বলে আমাদের আশ্বস্ত করলেও পরে আবার উতরাই পথে জাপানি বাবা কয়েক বার কাশতে কাশতে আবার বিগড়ালেন। সদা হাস্যময় রবার্ট এবার গম্ভীর মুখে ইঞ্জিনের বনেট খুলে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মন দিলে।

কিছুক্ষণ পরে বড় ডাক্তারদের মতো বললে "এক-আধ ঘণ্টা লাগবে কিন্তু যদি তাতে না হয় তবে কি হবে আমি জানি না। তোমরা এত ভারি জিনিষ ভরেছ আমি আগে জানলে অন্য ব্যবস্থা করতাম।"

আমরা ঠিক করলাম এক ঘণ্টায় আমরা যতটা পারি হেঁটে এগিয়ে যাই, কিছু না হোক গ্রানাইট পাহাড়ের তলায় পৌছাতে পারব। মুস্কিল হল আমাদের সব মেসিন পত্র রইল ট্রাকে পড়ে, এসব ছাড়াই যতটা সম্ভব সেটুকু কাজ এগিয়ে থাক। পাহাড়ি উতরাই রাস্তায় আমরা নামছি তো নামছিই, প্রায় এক ঘণ্টা চলেছি, কিন্তু চোখ রয়েছে পড়ে থাকা টুকরো কোয়ার্টজ পাথর গুলোর দিকে। এগুলো সব এসেছে পাশের গ্রানাইট পাহাড় থেকে, কিন্তু সবাই এসেছে, কিছু গ্রানাইট পাথরের টুকরো ও এসেছে, কিন্তু আসে নি সে, ধূসর-ধোঁয়াটে রঙের কোয়ার্টজ পাথর, যাতে কোথাও-কোথাও আছে সেই বহুমূল্যবান হলুদ ধাতু- সোনা ।

চড়া রোদ নিয়ে মাথার ওপরে সূর্য, প্রায় পাহাড়তলীর কাছাকাছি এসে গেছি আমরা, একটা বড় ছায়া দেখে আর লোভ সামলানো গেল না। একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক আর ম্যাপটা আর এক বার দেখে নি সকলে বসে। ছটফটে জীবন সবের আগে বেশ অনেকটা দূরে ওকে হাঁক দিয়ে ডাকলাম সবাই।

জীবন আমাদের ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকালো আর বেচারি তাতে অন্যমনস্ক হয়ে হোঁচট খেল জোরে আর গড়িয়ে মাটিতে পড়লো । সেই দেখে আমরা সবাই দৌড়ে গেলাম। ওকে ধরে উঠতে সাহায্য করলাম।

সবাই মিলে গাছের ছায়াতে বসে কফি আর স্যান্ডুইচ খাচ্ছি, আর জীবন এর সাথে মজা করছি, ওর মত শক্ত জোয়ান, কিসে এমন হোঁচট খেল, যাতে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে হল?

ও নাকি খুব শক্ত কিছুতে আঘাত করেছে, কিন্তু সেই জায়গা তে এত লতা পাতার জঙ্গল যে ও দেখতে পায় নি। সবাই তখনো বসে, আমার হঠাৎ কি মনে হল,জীবন যেখানে পড়ে গেছিল, সে জায়গার আগাছা সাফ করা শুরু করতেই বেরিয়ে পড়ল নুন- মরিচ রঙের গ্রানাইট, গড়িয়ে পড়া নয়, মাটি ফুঁড়ে এসেছে।

সবাই মিলে এই জায়গাটার আশে পাশে লতা জঙ্গল সরাতেই অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটি ফুঁড়ে আসা গ্রানাইট পাথর বেরিয়ে পড়ল এবং এই পাথর কে ছোটো ছোটো কোয়ারটজ পাথরের স্তর চিরে গেছে । এটা যে পাশের গ্রানাইট পাহাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে তাতে আর কোনো সন্দেহ রইল না

অবশেষে একটু নীচের দিকে যেতেই পাওয়া গেল ধোঁয়াটে সাদা রঙের সেই কোয়ার্টজ পাথর এবং তার সাথে পাতলা চুলের মত উজ্জল হলুদ সোনা, এবং ছোটো দানা দানা সোনার নাগেট । যদি আরও নীচে গিয়েও বেশ কয়েক জায়গাতে এইরকম পাথর আমরা পাই তাহলে একদম নিশ্চিত হওয়া যাবে যে এই পাথর গ্রানাইট পাহাড় থেকে নেমে এসেছে - তাহলে তো আমরা এক বিশাল কিছু ভাণ্ডারের সামনে। দারুন উত্তেজিত হয়ে আমরা নিচে নামতে শুরু করলাম। পাহাড়ের নীচটায় গভীর জঙ্গল। সেইখানে একটা ব্যাপার ঘটলো।

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা