ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

সেদিন সকালটা বেশ খারাপই ছিল। ফেসবুকে হঠাৎ এক বন্ধুর পোস্ট --রবিন উইলিয়ামস চলে গেলেন। হঠাৎ-ই।তুমি অবশ্য তাঁকে কত টা চেন জানি না, তবে আমার বড় হয়ে উঠতে উঠতে সিনেমা দেখার সঙ্গে তাঁর এক বিশেষ যোগ ছিল।চার্লি চ্যাপলিনের স্ল্যাপস্টিক কমেডি তো অনেক বড় হয়ে বুঝেছিলাম,তার আগে চ্যাপলিন কে দেখে শুধু হাসতাম তাঁর অংগভঙ্গীর জন্য।কিন্তু রবিন উইলিয়ামস বড্ড সমসাময়িক, বড্ড মনকে সটান ছুঁয়ে যাওয়া একটা নাম যা শুধু ওফুরন্ত হাসির হুল্লোড়ে মাতিয়ে রেখেছিল আমার বড় হওয়া-কে। Mrs. Doubtfire, Dead Poets’ Society, Captain Hook, Jumanji, Good Will Hunting – কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি।বিশ্বজোড়া হাসির তুবড়ির সেই মানুষটা আজ নিঃশব্দে অন্ধকারে।

বিফল মনোরথে আবার বিফলতার-ই গল্প…ফিরে আসি সিপাহী বিদ্রোহে। অত কিছু করেও কিছু হল না জান!বিদ্রোহীদের বীরত্ব বা শত্রুর মোকাবিলা করার সাহসের কোনো অভাব ছিল না।কিন্তু অতবড় গণভ্যুত্থান, আর তাতে আবার শত্রুর অনুপ্রবেশকে আটকানো – এই দু-টোতেই পরিচালনা ও পরিকল্পনার বেশ অভাব ছিল।


বিদ্রোহীদের কামান দেগে হত্যা করা হয়

কার্ল মার্ক্সের চোখে এটাই ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। খুবই বিশৃঙ্খল, ছিলনা কোনো উপযুক্ত সেনাপতি অব্দি। উল্টোদিকে আবার বৃটিশদের মধ্যে শৃঙ্খলাপরায়ণ সেনা আর অভিজ্ঞ সেনাপতি, কোনোটারই অভাব ছিল না।তাদের যুদ্ধের কৌশলও ছিল উন্নততর।তাই যা হবার তা হল। বিদ্রোহ দমন করে যেখানেই ইংরেজরা ঢুকেছে, সেখানেই চালিয়েছে সন্ত্রাস।সে সন্ত্রাসের কাছে নাদির শাহের সন্ত্রাস-ও ছোট লাগে।প্রতিশোধের মুখে তারা কোনো বাছ-বিচার রাখে নি।শিশু, নারী, বৃদ্ধ – কাউকে তারা রেয়াত করে নি।বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পন করার পরেও তাদের কামানের মুখে বেঁধে, তোপ দেগে উড়িয়ে দিয়েছে নৃশংস ইংরেজরা।কেন্দ্রীয় কোনো নেতৃত্ব না থাকলে, বিশৃঙ্খলতা তো আসবেই। বৃটিশদের বিদ্রোহী-রা কোনঠাসা করে দিয়েছিল বটে একদম শুরুতে, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তারা বাইরে থেকে সৈন্য নিয়ে এসে নিজেদের ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিয়েছিল।

প্রেসিডেন্সিতে এমন কোনো একটি জেলাও ছিল না, যে বিদ্রোহের আতঙ্ক সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনুভূত হয় নি।তার ওপর আবার সর্ষের মধ্যেই ভূত – ভারতের সামন্ত নৃপতি। এঁদের সাহায্য ছাড়া এই অভ্যুত্থান দমন করার ক্ষমতা ছিল না ইংরেজ সরকারের। বর্ধমানের মহারাজা ছিলেন অন্যতম খলনায়ক। বলতে খারাপ লাগে জান, এমন এক মহাগণঅভ্যুত্থানেও সামন্ত নৃপতিদের ভূমিকা ছিল বৃটিশদের স্বার্থ-রক্ষা; দেশীয় নৃপতিরাই ছিল ভারতে বৃটিশ শাসনব্যবস্থার শক্ত খুঁটি।ভারতের অগ্রগতির প্রধাণ প্রতিবন্ধক তারাই।

বিদ্রোহের কিন্তু ইস্তেহার ছিল। সেখানে খুব পরিষ্কার করে বলা ছিল যে সংগ্রাম হবে হিন্দু আর মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায়। দেশের গরীব মানুষদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে আর তাদের মর্যাদা আর সম্মান দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।ভাবতে অবাক লাগে, জান, যে মাত্র দু বছরের গণ অভ্যুত্থানে দেশের দশ-হাজার বর্গমাইল এলাকা বৃটিশ-শাসনমুক্ত হয়েছিল আর সারা পৃথিবীতে শক্তিশালী ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার বিরূদ্ধে১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ছিল সবচেয়ে তীব্র ও ব্যাপক বৈপ্লবিক আঘাত।


মহারানী ভিক্টোরিয়া

‘The Patriot’ নামে এক দৈনিক ছিল সে সময়ে। সম্পাদক, শ্রী হরিশচন্দ্র মুখার্জী। তিনি তাঁর লেখা সম্পাদকীয় তে এই বিদ্রোহ-কে জাতীয় স্তরের বলে আখ্যা দেন আর বৃটিশদের বর্বর প্রতিশোধের নীতিকে তুলোধনা করেন, তাঁর কলমের আঘাতে। সে লেকার জোর এমনি ছিল যে বৃটিশ গভর্ণর জেনারেল লর্ড ক্যানিং-ও নড়ে বসেন। কিছুদিনের মধ্যেই বৃটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার-র পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের প্রতি নমনীয় নীতি নেওয়ার ঘোষণা করা হয়। কোম্পানীর হাত থেকে বৃটিশ রানী ভারত শাসনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেন।

ভারতের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ সিপাহী বিদ্রোহ তো এই সব কা্রণে সফল তো হল না। কিন্তু তা বৃটিশ শাসকদের এক দারুণ শিক্ষা দিয়ে গেল। তারা প্রথম প্রমাদ গুণল – এই দেশে আর বেশি দিন শাসন কায়েম রাখা যাবে না। ভারতের স্বাধীনতার জন্য শেষ সশস্ত্র বিদ্রোহ ছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান (১৯৪৩-৪৫)। আর আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে, প্রথম আর শেষ , দু’টি যুদ্ধের শ্লোগান ছিল একইঃ “দিল্লী চলো”।

তবে কলমের জোর বড় জোর, জান! তার খানিকটা আঁচ তো তুমি পেলেই ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এর প্রভাব থেকে – তা কি প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করেছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের, এমনকি স্বয়ং ইংল্যান্ডের রানীকেও। তাই তো বলি, লিখতে শেখ, বই এর লেখা নয়। নিজের লেখা, নিজের মনের লেখা, নিজের ভাললাগা, খারাপলাগা, প্রতিবাদ – সব প্রকাশ কর তোমার ঐ ছোট্ট কলমের মাধ্যমে। একমাত্র সে-ই তোমার সারাজীবনের সাথী।


ছবিঃউইকিপিডিয়া

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা