ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
জান কবুল

পূর্ব-সিকিমের পাহাড়ে , ছবির মতো সুন্দর গ্রামটার নাম হোল পদমচেন। গ্রামটার উচ্চতা প্রায় নয় হাজার ফুট- সারাবছরই দিনের সর্বাধিক তাপমাত্রা কখনো ১০ ডিগ্রী ছাড়ায় না আর শীতের রাতে ওটা চলে যায় শূন্যের দু-তিন ডিগ্রী নিচে ( সেল্সিয়াস )। গ্রামের লোকে সামান্য 'ক্ষেতি' করে, হাঁস -মুরগী পালে আর শীতে কাঁপে।

গ্রামটার পুবদিকে আরিতার পাহাড় , যার ওপারে ভুটান। গ্রামের উত্তরে পাহাড় কেটে পাকা রাস্তা ঘুরতে ঘুরতে, প্রচুর বাঁক নিয়ে উপরে উঠে , জুলুক, লুংথুং ছাড়িয়ে,অনেক উঁচুতে সেই নাথুলা পাস অবধি চলে গ্যাছে। এখান থেকে ভালো করে নজর করা যায় না-ঘন কুয়াশা ওই জায়গা গুলোকে সব সময় ঘিরে আছে I আমাদের মিলিটারির লোক পাকা রাস্তা বানিয়েছে । আমাদের গাড়ি ওই বিপদ-সংকুল রাস্তা দিয়ে বারবার যাতায়াত করে । এই সময়টা ,যখন তুষার পড়ার মরশুম, তখন রাস্তাটা আরো বিপজ্জনক হয় । তবে, আমাদের গাড়িচালকদের যেমন ভালো চালানোর হাত, তেমনি ওরা সবাই দুর্জয় সাহসী লোক । আর, কেনই বা হবে না ? চীনাদের সাথে সমানে টক্কর দিতে হচ্ছে না !

গাঁয়ের মানুষজনদের মতে, আমরা লোকগুলো ভালো, গাঁয়ের লোকের অনেক উপকার করি। ওদের জন্য একটা বাস সকালে মিলিটারির রাস্তা দিয়েই নীচে কালিম্পং হয়ে শিলিগুড়ি যায় আর, একটা বাস শিলিগুড়ি থেকে উঠে আসে কাপুপ নামের গ্রাম অবধি যাবার জন্য। ওই বাসে খবরের কাগজ, ব্যবসার জিনিস আর লোকজন আসে । বর্ষায় ফি -বছর ওই রাস্তায় ধ্বস নামে, আমাদের লোকজনই চটপট রাস্তা খোলার ব্যবস্থা করে । এই গ্রামেই আমাদের একটা বড়ো মিলিটারী মেডিক্যাল ইউনিটও আছে, এখানে অসুখ-বিসুখে, গাঁয়ের লোক চিকিৎসা করাতে আসে । তাই তো ওরা মতদান করেছিলো, যার জন্য ১৯৭৫ সালে সিকিম পাকাপাকিভাবে ভারতের একটি রাজ্যে পরিণত হয় । সেই সঙ্গে এটা, চীনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারত এখন চীন -তিব্বত সীমান্তে নিজের সেনাবাহিনীকে খুব ভালো করে সাজিয়ে নিয়েছে , যাতে ১৯৬২ সালের মত আবার একটা অকারণ যুদ্ধ না শুরু হয়ে যায়। মাঝেমধ্যেই একেবারে জেনারেল পদের উচ্চপদস্থ অফিসারেরা এই সব সীমান্ত এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখেন ও উপযুক্ত পরামর্শ দেন ।

একদিন আমার মেডিক্যাল ইউনিটের অফিসে বসে আমার এম্বুল্যান্স ড্রাইভার করণ সিং-এর সাথে টুকটাক কথা বলছি, এমন সময় আমাদের সিগন্যাল্স কোরের ছেলেটা আমার জন্য পাঠানো একটা লগ- মেসেজ নিয়ে এলো । কালিম্পং থেকে জানিয়েছে যে, কাল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল কুলদীপ সিং কলকাতা থেকে ( ইস্টার্ন কমান্ডের হেড -কোয়ার্টার ) থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছে , ওখান থেকে একটা হেলিকপ্টারে চড়ে এসে নাথুলা পাসের আশেপাশে আমাদের অবজারভেশন পোস্ট আর সীমান্ত এলাকাগুলি ঘুরবেন । উনি সকালেই আসছেন,তাই , নজরদারি হয়ে গেলে ( আর্মি-র ভাষায়, 'রেকি' ) কাপুপ গ্রামে আমাদের হেলিপ্যাডে নেমে কিছুক্ষণ হয়তো বিশ্রাম নেবেন । আমি যেন তার আগেই মেডিক্যাল কিট ও অ্যাম্বুল্যান্স সহ ওখানে হাজির থাকি ।

পরদিন খুব সকালে ওঠা হল। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেন সিলিন্ডার চেক করলাম। তারপর,গাড়ির পিছনে এক জোড়া স্নো-চেন ভরে, পেট্রল-মোবিল চেক করে ,স্যালুট ঠুকে করণ সিং বোঝালো যে সে যাত্রার জন্য প্রস্তুত। আমরা বেড়িয়ে পড়লাম এবং গাড়ি সহ পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে উঠতে লাগলাম। বেশ কয়েকবার এই পথে যাতায়াত করেছি, কিন্তু প্রতিবারই রাস্তার অজস্র হেয়ার-পিন বেন্ড গুলো মনে ভয় জাগায়।

লুংথুং ছাড়িয়ে আরো উপরে উঠতে লাগলাম। কিন্তু, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট-এ না দাঁড়িয়ে চলে যাওয়া যায় নাকি! সামনে সম্পূর্ণ খোলা দিগন্তে, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর আশ-পাশের পাহাড়ে তখন সোনা রোদের ছোঁয়া লেগেছে। প্রাণ ভরে দেখছিলাম ,করণ ব্যাটা তাড়া লাগালো। কাপুপ এখনো এক ঘন্টার রাস্তা। আর, সব চেয়ে চিন্তার কারণ হল পশ্চিম আকাশের কালো মেঘটা।

মেঘটা আস্তে আস্তে আয়তনে বাড়ছে এবং আমরা কাপুপ পৌঁছানোর সময় সারা আকাশ ভরিয়ে দিনের আলো কমিয়ে দিল । কে বলবে যে আমি এক ঘন্টা আগে সূর্যোদয় দেখেছি। কিন্তু, এই সব জায়গায় তো এই রকমই ব্যাপার-স্যাপার দিনরাত চলে ।

কাপুপ হল ১৩,৫০০ ফিট উচ্চতায় একটা গ্রাম, এখানে আমাদের একটা এ্যাডভান্স ড্রেসিং স্টেশন (এ.ডি .এস) আছে, আর আছে তার লাগোয়া গল্‌ফ্‌ খেলার মাঠ - পৃথিবীর উচ্চতম গল্‌ফ্‌-কোর্স । টেলিফোনের ঝনঝনানি আমার চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে দিল । ব্রিগেড কমান্ডার ফোন করেছেন । তাঁকে জানালাম যে আমি পৌঁছে গেছি । কিন্তু উনি জানালেন, আমি যেন নেমে আসি। আচমকা ডাক পেয়ে, জেনারেল সাহেব সকালে শিলিগুড়ি থেকেই দিল্লী চলে গেছেন । উনি দুই সপ্তাহ পরে আবার একদিন এখানে আসবেন । একটু হতাশ হলাম। ভেবেছিলাম,নতুন জি.ও.সি -ইন -সি সাহেবের সঙ্গে আলাপ করব .....। ততক্ষণে এখানে ময়দার গুঁড়োর মতো তুষারপাত শুরু হয়েছে। মিনিট দশেকের মধ্যে রাস্তা ও চারিপাশ ভরে গেল বরফে আর রাস্তার উপরের বরফ জমে কঠিন হয়ে যেতে লাগলো। এই রাস্তায় সোজা-পথে চালাতেই গাড়ি হড়কে যাবে , তার উপরে হেয়ার -পিন বেন্ড সামলে নীচে নামা তো আরো কঠিন কাজ ।

করণ সিং গাড়ির সামনের চাকা দুটোতে স্নো -চেন পড়াতে লাগলো । এগুলোতে স্পাইক লাগানো থাকে , যারা ওই বরফের মধ্যে গেঁথে গিয়ে আবার খুলে যাবে ,পরের টার্নে বরফের মধ্যে গেঁথে যাবার জন্য। গাড়িটা লো –গীয়ারে ধীরে চললে পিছলানোর সম্ভাবনা কম । করণ বললো , "চলো সাব , যো হোগা দেখা যায়গা !"

করণের হাতে গাড়ি ও ভাগ্য দুই-ই সঁপে দিয়ে নামতে লাগলাম । ও বাঁক গুলো ভালই সামলাচ্ছে , উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি আসছে না বটে, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ আপদ তো আপেল ছেড়ে এখন আমাদের ধরেছে এবং টেনে নামাচ্ছে । সত্যি ,বেশ রিস্কি ব্যাপার । ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করে বেরোলেই হতো । কিন্তু, ড্রাইভারের সামনে ভীতু সাজতে চাই নি ।

অনেকটাই পথ পেরিয়ে এসেছি। আর আধা ঘন্টার মধ্যে জুলুক পৌঁছাবো। সামনে একটা টানা উতরাই আছে, তারপর কিছুটা সোজা রাস্তা। আবার আলো ফুটেছে। একপাশে পাহাড়, আরেক পাশে করণ সিং এর দিকটায় অতল খাদ, বহু নিচে ঝোপ-জঙ্গল।

জান কবুল

তখনই ঘটল ব্যাপারটা। করণ বলল, "সাব-জী , ঘাবড়াইয়ে মত , লেকিন বাত এয়সা হ্যায় কি, গাডডি কা ব্রেক নেহি লাগ রহা হ্যায়।" তারপর ও বলতে চাইল এখন ও চাইলেও এই ভারী গাড়ি দাঁড় করানো যাবে না । ওর কর্তব্য-জ্ঞান বলে ,আগে সিনিয়রের জান বাঁচাও, তারপর সরকারী সম্পত্তি ( গাড়ি ) বাঁচাও, নিজে বাঁচবে পরে , কিন্তু সব ছেড়ে পালিয়ে যেও না । আমি যেন দরজা খুলে নেমে পড়ি ,এই সময় স্পিড তো বেশী নেই। ও নিজের জান কবুল করে দেবে কিন্তু শেষ অবধি দেখে যাবে। আমি ওর মানসিক কাঠিন্য দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু, ওকে ছেড়ে যেতে মন চাইল না । আমি ওর পাশে বসে হ্যান্ড-ব্রেক টানলাম, কোন লাভ হল না । বললাম,ব্যাক-গীয়ার লাগাও । ও বলল, আপনি প্লীজ নেমে যান। আমার চোখে জল এলো -যা হয় হোক , জবরদস্তি ব্যাক গীয়ার দিতে গেলাম । ও এক ঝটকা দিয়ে আমার হাত সরিয়ে মাপ চাইলো । এতে ,গাড়িটা ওর কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেল, সামনেই রাস্তার বাঁক ,তারপরই অতল খাদ । আপকে লিয়ে জান কবুল হ্যায় , সাব"- বলে, ও উঠে আমার দরজার লক খুলে আমাকে এক ধাক্কা দিলো! আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায় ,আর বরফে খানিকটা পিছলে গেলাম। আমি সোজা হয়ে উঠতে উঠতে, টলমলে গাড়ী সামনের নিচু পাঁচিলে ধাক্কা খেয়ে করণ সহ উল্টে পড়লো নিচে অতল খাদে । আমি অবশেষে কিনারে পৌঁছিয়ে দেখলাম, বহু নিচে ঝোপের উপর শব্দ করে গাড়ীটা পড়লো ,তারপর আরো নিচে , ঝাপসা দৃষ্টির আড়ালে কোথাও নেমে গেল । ওই সময় আমার আর কিছুই করার রইল না ।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

লেখক পরিচিতি

প্রদোষ প্রদীপ ভট্টাচার্য্য

প্রদোষ প্রদীপ ভট্টাচার্য্য পেশায় চিকিৎসক । ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন; বর্তমানে স্থায়ীভাবে কলকাতায় কর্মরত। স্কুলজীবন থেকেই লেখার অভ্যাস, কলেজে দেয়াল-পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। ছোটদের জন্য লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা