ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
আমাদের নতুন নায়িকারা

বয়স বছর কুড়ির আশেপাশে, মাথার চুল ছোটছোট করে কাটা, গায়ের রংটা চাপা। প্রথমে দেখলে মনে হবে বাচ্চা মেয়েটা বোধহয় স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে। কিন্তু খোঁজ নিলে জানা যাবে মেয়েটি ভারতীয় মেয়েদের মধ্যে একদিনের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলে ফেলেছে এই বছরের মে মাসে, করেছে ১৮৮ রান! সেই সঙ্গে খেলে ফেলেছে ৩২০ রানের পার্টনারশিপ পুনম রাউতের সঙ্গে, এত রানের পার্টনারশিপ মেয়েদের ক্রিকেটে তো হয়ইনি আগে, এমনকি ছেলেদের খেলাতেও ওপেনারদের সবচেয়ে বড় পার্টনারশিপের রেকর্ড ছিল ২৮৬ রানের, সেটাও ভেঙে ফেলেছে তারা!

আবার এই মেয়েটাই ২০১৬ সালে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে ৬ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে অল্পবয়স্ক ভারতীয় হিসেবে পাঁচ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড করেছিল! হ্যাঁ ছেলে-মেয়ে দুজনের মধ্যেই!

ওর নাম দীপ্তি শর্মা। সুরেশ রায়নার ভক্ত! ক্রিকেটটা মন দিয়ে খেলার জন্য যে কোন সোশ্যাল মিডিয়াতেই উপস্থিত নেই। এই তো কদিন আগে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলে এল। সেখানেও বিশ্বকাপের ফাইনালের মত ম্যাচে বিপক্ষের পঞ্চাশতম ওভারে বল করার দায়িত্ব এই কুড়ি বছরের মেয়েটার হাতেই তুলে দিয়েছিল অধিনায়ক মিতালি।

*****
আমাদের নতুন নায়িকারা

আবার আর একজনের কথা বলি। পাঞ্জাবি মেয়ে, ছোটখাটো, রোগাই বলা যায়। বাবা খেলাধুলো করতেন। খুব ছোটবেলা থেকেই সে ক্রিকেট শিখতে যেত বাড়ী থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে মোগাতে। খেলতে হত ছেলেদের সঙ্গে। কী করবে? আর খুব বেশী মেয়ে ক্রিকেট খেলত না যে! পরে অবশ্য ও বলেছে, তাতে ওর সুবিধাই হয়েছে! ছয় মারতে শিখেছে ভালো করে।

তাই তো বিশ্বকাপের আগের কোয়ালিফাইং টুর্নামেন্টের ফাইনালের শেষ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দলের এগারো নম্বর খেলোয়াড়কে সঙ্গে নিয়ে ছয় মেরে আর শেষ বলে দু রান নিয়ে দলকে জিতিয়েছিল সে।

শুধু তাই নয়, প্রথম ভারতীয় হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মহিলাদের বিগ ব্যাশ লিগে ডাক পেয়েছিল সে। প্রথম ম্যাচেই নিজের দল সিডনি ঠান্ডারকে উপহার দিয়েছিল এক চোখ ধাঁধানো ইনিংস। সেই খেলায় কভারের ওপর দিয়ে মারা তার ছয় চমকে দিয়েছিল সবাইকে। এমনকি বোলার জেমা ট্রিস্কারি অবধি হেসে ফেলেছিলেন সেই অপ্রত্যাশিত ছয় দেখে। কমেন্ট্রি করতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মহিলাদের ক্রিকেটের অদম্য শক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে করা তার ১৭১ রানের ইনিংসকে তুলনা করা হচ্ছে সেই ১৯৮৩ সালের কপিল দেবের ১৭৫ এর সঙ্গে। ভারতীয় পুরুষদের ক্রিকেটকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে কপিলের সেই অসামান্য ইনিংস। দেখা যাক হরমনের ইনিংস মেয়েদের জন্য সেটাই করে কিনা।

হ্যাঁ, আমি হরমনপ্রীত কউরের কথাই বলছি। যার অসাধারণ ছয় মারার ক্ষমতা দেখে অনেকেই নাম দিয়েছেন 'Harmonster'।

*****
আমাদের নতুন নায়িকারা

এবার আসি আর একজনের কথায়। দলের সিনিয়ার সদস্যা, গত পনেরো বছর ধরে ভারতীয় দলে খেলছে। এই সময়ে মিতালি রাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়। ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টাউন্টন টেস্টে নিয়েছিল ১০ উইকেট, জিতেছিল ভারত। সেই জয়ের ভিত্তিতেই ভারত জেতে সেই সিরিজ। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম সিরিজ জয়। ২০০৭ সালের আইসিসির মহিলাদের মধ্যে বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয় সে।

এইভাবে একের পর এক পারফরমেন্স দিয়ে গেছে। করেছে ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব। এই সেদিনও নিজের শেষ বিশ্বকাপের ফাইনালে তিন উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের মিডল অর্ডারকে জোর ধাক্কা দিয়েছিল সে। মিতালি যেরকম মহিলাদের একদিনের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশী রানের মালিক তার ঝুলিতে তেমনই আছে সবচেয়ে বেশী উইকেটের রেকর্ড!
সে আমাদের ঘরের মেয়ে। চাকদার ঝুলন গোস্বামী। স্মৃতি, দীপ্তির আদরের 'ঝুলুদি'! গত কুড়ি বছরের বাংলার ক্রিকেট নিয়ে বললে সৌরভ, মনোজ, ঋদ্ধিমানদের সঙ্গে ওর নামটাও বাদ দেওয়া যাবে না!

*****
আমাদের নতুন নায়িকারা

এইভাবে পরপর একতা বিস্ত, স্মৃতি মান্ধানা, রাজেশ্বরী গায়েকোয়াডদের কথা বলা যায়। সকলের জীবনটাই গত তিনমাসে একটু হলেও যেন বদলে গেছে। তারা ক্রিকেট খেলেছে তাদের সারা জীবন কিন্তু বিশ্বকাপের চোখ-ধাঁধানো ফলাফলের পরে এখন সামান্য হলেও যেন সাধারণ ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমিকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে তারা।

ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল কিন্তু টেস্ট ম্যাচ খেলছে সেই ১৯৭৬ সাল থেকে। বিশ্বকাপে প্রথম খেলেছে ১৯৭৭ সালে। শান্তা রঙ্গস্বামী, সন্ধ্যা আগারওয়াল, ডায়না এডুলজিদের পারফরমেন্স কিন্তু মোটেই খারাপ ছিল না। কিন্তু কোনভাবেই সাধারণ জনতার নজর কাড়তে পারেননি তাঁরা। আর পাঁচটা জিনিসের মতই 'মেয়েদের আবার ক্রিকেট' বলে অবজ্ঞায় ঠোঁট উলটেছেন অধিকাংশ ক্রিকেটপ্রেমী।

এবং এই জিনিস চলেছে তিরিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে। খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেলগুলোর কথাও না বললেই নয়। পুরুষ দলের যেকোন জয়, যেকোন রেকর্ড যখন যায়গা করে নিয়েছে প্রথম পাতায় বা টিভির খবরের হেডলাইনে সেখানে মেয়েদের জয়ের খবর ছাপা হয়েছে শেষ পাতায়, খবর শেষ হওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয়তো তা উল্লেখ করেছেন সংবাদ পাঠক/পাঠিকা। মেয়েরা কিন্তু দমে না গিয়ে খেলে গেছে। লড়ে গেছে, নিজেদের উন্নত করেছে। বর্তমান ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিটনেস বাড়িয়েছে, ফিল্ডিংকে নিয়ে গেছে বিশ্বমানের কাছাকাছি। রেজাল্ট আরো উন্নত হয়েছে আস্তে আস্তে। এসেছে দীপ্তি, স্মৃতিদের মত নতুন তারকারা। এই বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগেই শেষ সতেরোটার মধ্যে ষোলটা ম্যাচ জিতেছিল তারা। প্রধান মিডিয়াতে তাও বিশেষ জায়গা পায়নি তারা। আর এখানেই এগিয়ে এসেছিল স্যোসাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটারের বিভিন্ন গ্রুপে, বিভিন্ন পেজে আলোচনা শুরু হয়েছিল আস্তে আস্তে। প্রচার করেছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ফেসবুক পেজ। টুইটারে ক্রিকেটাররা নিজেই নিজেদের আপডেট দিচ্ছিলেন।

আমাদের নতুন নায়িকারা

এরপর ঘটল বিশ্বকাপ। ফাইনালের হৃদয়বিদারক হার বাদ দিলে গোটা টুর্নামেন্টেই মন ভরিয়ে দেওয়ার মত পারফর্ম করেছে মিতালি, একতারা। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়, গ্রুপের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া আর টানটান সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো। ফ্যানদের জন্য এগুলোই এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে মন কেড়ে নেওয়া স্মৃতি।

এবার পরের চ্যালেঞ্জ। সাধারণ ভারতীয় ফ্যানেরা এখন লাফালাফি করছেন বটে কিন্তু ভুলে যেতেও বেশী সময় নেবেননা তারা। সঙ্গে অবশ্যই যোগ হবে প্রত্যাশার চাপ। বিশ্বকাপের ফাইনালের শেষ আধ ঘন্টার ওই জঘন্য ব্যাটিং বিপর্যয়ের পরেও অনেকে বলেছেন, "আহারে, মেয়েরা... ওরা ফাইনালে গেছে এই অনেক!" তাঁরা যেটা বুঝছেন না, তাতে এই মেয়েগুলোকে অপমানই করছেন তাঁরা। যেন বলছেন, মেয়েদের দ্বারা এর চেয়ে বেশী কিছু হওয়ার নেই। তার চেয়ে বরং বলুন, ওরা খারাপ খেলেছে। ফাইনালে রান তাড়া করার চাপ নিতে পারেনি। আমরা ওদের কাছে শুধু ফাইনালে পৌঁছনো নয়, বিশ্বকাপ আশা করি! তবেই আমাদের মহিলা ক্রিকেটাররা নিজেদের প্রাপ্য মর্যাদা পাবে। রসদ পাবে নতুন লড়াই করার। কে জানে ২০২১ সালে নিউজিল্যান্ড থেকে শুধু এই পরিচিতিটাই নয় সঙ্গে বিশ্বকাপটা নিয়েও ফিরবে তারা!

ভারতীয় ক্রিকেটের তারকা বলতে লোকে এখনো সেই সি কে নাইডু, মুস্তাক আলি থেকে শুরু করে গাভাসকার, বিশ্বনাথ, কপিল, শচীন, সৌরভ, রাহুল, সেহওয়াগ হয়ে হালফিলের ধোনি, কোহলি, আশ্বিনদেরই নাম করে। তবে শান্তা রঙ্গস্বামী, ঝুলন, মিতালিদের নামগুলো যোগ করার সময় বোধহয় এসে গেছে।

 

ছবিঃ বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা