ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

আজ আগষ্ট মাসের পনের তারিখ। ট্রেনে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে শুরু করলো। আসবার আগে কাগজে পড়েছি বিহার ও উত্তর প্র্রদেশে প্রচন্ড বন্যার কথা। ট্রেনে বসে কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। দুপুর নাগাদ আমরা লক্ষ্ণৌ এসে পৌঁছলাম। ট্রেনে খুব ভিড়। আমরা ধরাধরি করে মালপত্র্র স্টেশনে নামালাম। একটা বড় ব্যাগ অনিতা নামের মেয়েটিকে লক্ষ্য রাখতে বলে গেছিলাম। আমরা মাল নিয়ে নামার সাথে সাথে দেখি মেয়েটি ঐ ভারী ব্যাগটা প্ল্যাটফর্মে নিজেই নামিয়ে এনেছে। ওর পক্ষেই বোধহয় এটা সম্ভব। গতকাল থেকে ট্রেনে লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন স্টেশনে ও নিজের এবং অন্যান্য অনেক বয়স্ক যাত্রীর খাবার জল, প্ল্যাটফর্মে নেমে ভরে আনছে। সে আমাদের যাত্রার শুভ কামনা জানালো। আমাদের মুখ চেনা, অল্প পরিচিত, সেই হেড অফিস বা অন্যান্য শাখার সহকর্মীরা কিন্তু কোন সাহায্যের হাত বাড়ায় নি।

আমরা মালপত্র নিয়ে কাঠগুদামের গাড়ির উদ্দেশ্যে নির্দ্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রওনা দিলাম। গাড়ি রাত ন’টায়। কাঠগুদাম যাবার রিজার্ভেশনও পাওয়া গেল। আমরা মালপত্র নিয়ে দোতলায় ওয়েটিং রুমে গেলাম। ভালভাবে স্নান সেরে, সিতাংশু একটা রিক্সা নিয়ে ওর সেই দাদার বাড়ি গেল। আমার কিন্তু মোটেই ইচ্ছা ছিল না যে, ও এখন কোথাও যায়। কোন রকম বিপদ ঘটলে যাবার বারোটা বেজে যাবে। কিন্তু ঐ এক হাঁড়ির জন্য আমাকে মুখ বুজে ওর যাওয়াকে মেনে নিতে হ’ল। আমি মালপত্র আগলে বসে থাকলাম। ওয়েটিং রুমের বারান্দা থেকে লক্ষ্ণৌ স্টেশনের গম্বুজের ওপর চাঁদ ওঠার সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। প্রায় পৌনে আটটা বাজলো, শ্রীমান সিতাংশুর পাত্তা নেই। এত খারাপ লাগছে, ভিতরে ভিতরে কিরকম একটা টেনশন হচ্ছে বোঝাতে পারবো না। এখানকার রিক্সাগুলো এত বাজে, এত বেপরোয়া ভাবে রাস্তায় চলে যে, যেকোন মুহুর্তে একটা কিছু ঘটে যেতে পারে। একটা করে রিক্সা স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, আমি খুব আগ্রহ ভরে লক্ষ্য করছি সঙ্গী ফিরে এল কী না, আর প্রতিবারই আমাকে আরও চিন্তায় ফেলে, রিক্সা থেকে অপরিচিত লোক নামছে। এবার রীতিমতো বিরক্ত লাগছে। প্রথম থেকে আমি হাঁড়ি বা ডেকচি, বাড়ি থেকেই নিয়ে আসার কথা বলে আসছি। এমন সময় একটা সাইকেলে একটা হাঁড়ি হাতে বাবু তার দাদার সাথে স্টেশনে এলেন। সেই মুহুর্তে যে কী আনন্দ ও শান্তি হ’ল বলতে পারবো না। ট্রেনের বগি ও বার্থ নাম্বার দেখে, সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে, আমরা ট্রেনে চাপলাম। সিতাংশু জানালো ওর বৌদি বলেছে, হাঁড়িটা যেন বেশী মাজা না হয়, তাহলে ফুটো হয়ে যেতে পারে।

রাত ন'টার একটু পরে ট্রেন ছেড়ে দিল। লোয়ার বার্থে আমি, আর আপার বার্থে সিতাংশুর শোবার ব্যবস্থা হ'ল। ট্রেনটা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেডিস কুপ থেকে একটা আর্তনাদ ভেসে এল। গিয়ে দেখি জানালার ধারে বসা এক ভদ্রমহিলার কানের রিং কেউ টেনে নিয়ে গেছে। তার কান থেকে রক্ত ঝরছে। নিজের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, এক যুবক বার্থ রিজার্ভেশনের আশায় রেলওয়ে কর্মচারীর সাথে কথাবার্তা বলছে। যুবকটি জানালো, সে পুলিশে কাজ করে। আমার প্যান্টের বাঁ পকেটে এক টাকার একটা প্যাকেট, অর্থাৎ এক’শ টাকা। ডান পকেটে বেশ কিছু টাকার ট্রাভেলার্স চেক্। একটু তন্দ্রা মতো এসেছে, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। দেখি সেই যুবক আমার বার্থে আমার পায়ের দিকে ম্যানেজ করে আধ শোয়া হয়ে রয়েছে। আর তার একটা হাত ঠিক আমার বাঁ পকেটের ওপর। আমার মনে হ’ল ওর কোন বদ মতলব আছে। হয়তো বা পকেটমার। চুপ করে ঘুমের ভান করে শুয়ে শুয়েই ওর ওপর নজর রাখলাম। যুবকটিও এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন ও ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ আমি নিশ্চিত, ও জেগে আছে। ওর ওপর সন্দেহটা আরও বেড়ে গেল। হঠাৎ মনে হ’ল এভাবে তো চলতে পারে না। রাত জেগে ওকে আমি পাহারা দেব নাকি? কখন আমি ঘুমিয়ে পড়বো, আর সেই সুযোগে ও আমার পকেটের সমস্ত টাকা নিয়ে কেটে পড়বে। আমি উপুড় হয়ে শুলাম। একটু পরে লোকটা উঠে গেল। আমি এবার এমন ভাবে শুলাম, যাতে আর কেউ না আমার পাশে বসবার বা শোবার সুযোগ পায়। ঘুম এসে গেছিল। হঠাৎ একটা ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি সেই যুবকটি আবার আমার পাশে, পায়ের কাছে বসেছে। একটু পরেই ও আমাকে একটু ঠেলে আমার পাশে শোবার চেষ্টা করলো। এবার আমি আপত্তি জানালাম। ও বেশ কড়া সুরে আমায় সরে শুতে বললো। আমার এত রাগ হ’ল যে সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে ওর টিকিট দেখতে চাইলাম। চিৎকার করে ওকে তখনই আমার সিট থেকে উঠে যেতে বললাম। চিৎকার করার উদ্দেশ্য, সিতাংশুর ঘুম ভাঙ্গানো। সিতাংশুর ঘুম কিন্তু ভাঙ্গলো না। লোকটা একটু ঘাবড়ে গিয়ে আমার সিট ছেড়ে উল্টো দিকের সিটটায় বসলো। আমার চিৎকার শুনে কন্ডাক্টার গার্ড এসে ওর টিকিট দেখতে চাইলো এবং ওকে নেমে যেতে বললো। ও অভিযোগ করলো যে, আমি ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করে, সিট থেকে সরিয়ে দিয়েছি। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত ও আমাদের রিজার্ভড্ কামরা ছেড়ে নেমে গেল। আমিও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করলাম।

ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। জানালা দিয়ে খুব সুন্দর সূর্যের আলো এসে পড়েছে। একটু পরে "লালকুয়া" নামে একটা স্টেশনে গাড়ি এসে থামলো। আগেরবার যখন নৈনিতাল, আলমোড়া ইত্যাদি গেছিলাম, তখন দেখেছিলাম এই লালকুয়া স্টেশনে অতি উপাদেয় জিলিপি পাওয়া যায়। তাই তাড়াতড়ি প্ল্যাটফর্মে নেমে টাটকা জিলিপি ও সিঙ্গাড়া কিনে আনলাম। সিতাংশু তার ভাগের সিঙ্গাড়া, জিলিপি নিয়ে নিজের সিটে চলে গেল। আমি দরজার সামনে পাদানিতে পা রেখে মেঝেতে বসে, বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে, সিঙ্গাড়া জিলিপি ও চা দিয়ে উপবাস ভঙ্গে মন দিলাম। খুব আস্তে গাড়ি ছুটছে। লাইনের ধারে ধারে বোর্ডে ঘন্টায় চার কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলার নির্দেশ দেখলাম। এত আস্তে গাড়ি চলার কারণ কী বুঝলাম না। সোয়া আটটা নাগাদ ট্রেন হলদুয়ানি স্টেশনে এসে পৌঁছালো। এখানেই আমরা নেমে যাব। এখান থেকেই গোয়ালামের বাস ধরার সুবিধা। একটা রিক্সা নিয়ে সামনেই বাসস্ট্যান্ডে এলাম। ন'টার সময় বাস ছাড়বে। সিতাংশু টিকিট কাউন্টারে টিকিট কাটতে গেল। আমি মাল পাহারা দিচ্ছি। তিনটে বাঙালী ছেলেও দেখলাম এই বাসে যাচ্ছে। সিতাংশু ফিরে আসলে, মালপত্র বাসের ছাদে তুললাম। কিট্ ব্যাগটা আর কেরোসিন তেলের টিনটা, বাসের ভিতরেই রাখা হ'ল। আগেই আমি দুটো সিট্ দখল করে রেখেছি। হাওড়া থেকে কাঠগুদামের দুরত্ব ১৫৩১ কিলোমিটার। রিজার্ভেশন চার্জ নিয়ে এক একজনের ভাড়া লেগেছে সাতাত্তর টাকা নব্বই পয়সা। হলদুয়ানি থেকে গোয়ালদাম প্রায় এক'শ আশি কিলোমিটার পথ। দু’জনের বাস ভাড়া লাগলো সাতচল্লিশ টাকা দশ পয়সা। বাসে বসে ঐ তিনজন ছেলের সাথে আলাপ হ'ল। ওরা কলকাতায় থাকে, যাবে গোয়ালদাম। ওখান থেকে পরের দিন যোশীমঠ হয়ে কেদারনাথ, বদ্রীনারায়ণ, ভ্যালী অফ্ ফ্লাওয়ার্স, হেমকুন্ড যাবে। একেবারেই অনভিজ্ঞ, এই প্রথম এই জাতীয় রাস্তায় আসছে। ওদের মধ্যে একজনকে দেখলাম এর মধ্যেই ভয়ে অস্থির। ওরা গোয়ালদাম দেখতে চায়। তাই এত ঘুরে, পরের জায়গাগুলো যাবে। ঐ সব জায়গা আমার দেখা, কোথায় কোথায় থাকার জায়গা ভাল পাওয়া যাবে, কোথায় কী অসুবিধা, সব কিছু ডিটেলস্-এ ওদের জানালাম।


নন্দাদেবী

বাস আলমোড়া হয়ে বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ গোয়ালদাম এসে পৌঁছালো। গোয়ালদাম আমি আগেও এসেছি। পথের সৌন্দর্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তবে এখান থেকে নন্দাদেবী, নন্দাঘন্টি, ত্রিশুল, ইত্যাদি শৃঙ্গ খুব পরিস্কার দেখা যায়। এবার আমরা ওদের আরও কাছে যাব। মালপত্র নামিয়ে, আমি গেলাম টুরিষ্ট বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করতে। একটা ঘরে পাঁচটা বেড, এক একটা বেডের ভাড়া আট টাকা। একটা ডবলবেড রুম আছে, ভাড়া পঁচিশ টাকা। কোনটাই আমার পছন্দ হ'ল না। আমি চাইছি সস্তায় একটা আলাদা ঘর। কারণ রাতে মালপত্র ঠিক করে গোছাতে হবে। তৃতীয় কোন লোক আমাদের ঘরে থাকে, এটা আমার পছন্দ নয়। টুরিষ্ট বাংলোর উল্টোদিকে, রাস্তার ধারেই "মানস সরোবর" হোটেল। মালিক, দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলার হাসানাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ অঞ্চলে ছিলেন। ভদ্রলোক মিলিটারিতে কাজ করতেন। বেশ ভাল বাংলা বলেন। তার সাথে ঘর দেখতে গেলাম। এক একটা ঘরে চারটে করে বিছানা। প্রতি বেডের ভাড়া চার টাকা। আমরা ষোল টাকা ভাড়া দিয়ে একটা ঘর নিলাম। মালপত্র ঘরে রেখে, তালা দিয়ে রাস্তায় এলাম। বাস থেকে নামার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, একজন নেপালীদের মতো দেখতে স্থানীয় লোক, আমাদের দু'জনকে লক্ষ্য করছেন। এখনও দেখছি তিনি রাস্তায় পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন। এখনও তিনি আমাদের লক্ষ্য করে যাচ্ছেন। আমার বধ্যমূল ধারণা হ'ল, ইনি অবশ্যই বীর সিং। কিন্তু কী করে বোঝা যায়? সিতাংশুকে বললাম আমরা ওঁর পাশ দিয়ে যাবার সময় বীর সিং সম্বন্ধে আলোচনা করতে করতে যাব। তাহলে উনি বীর সিং হলে, নিজেই আমাদের সাথে কথা বলবেন। বীর সিং সমস্যা মিটলো ভেবে করলামও তাই। অথচ তাঁর দিক থেকে কোন সাড়া মিললো না। বুঝে গেলাম, ইনি আর যে সিংই হোন, বীর সিং নন। চা জলখাবার খেয়ে, যে পথটা দেবল হয়ে রূপকুন্ড যাবার জন্য বড় রাস্তা থেকে নেমে গেছে, সেই পথে একটু নীচে একটা দোকানে গেলাম। বয়স্ক দোকানদারকে আমাদের অসুবিধার কথা জানালাম। সব কথা শুনে ভদ্রলোক জানালেন, বীর সিং নিশ্চই চিঠি পেয়েছেন। আর চিঠি পেলে যত রাতই হোক, তিনি গোয়ালদাম এসে আমাদের সাথে দেখা করবেনই। ভদ্রলোক বীর সিংকে ভাল ভাবে চেনেন। মনে একটু আশার সঞ্চার হ'ল। ভদ্রলোক বললেন বীর সিং এই পথেই আসবেন এবং তার সাথে দেখা করবেন। বীর সিং আসলে তিনি তাঁকে আমাদের কথা বলে আমাদের হোটেলে পাঠিয়ে দেবেন। আর বীর সিং যদি আজ না আসেন, তাহলে কাল সকালে দেবলে যে ডাক নিয়ে যায়, তার হাতে আমাদের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়ে দেবেন।



ছবিঃ ত্রিপর্ণা মাইতি
ফটোগ্রাফঃউইকিপিডিয়া

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা