ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
roopkunder-

haatchhani

আজ ঊনিশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। কথা মতো আজ আমাদের বৈদিনী বুগিয়াল যাবার কথা। গঙ্গা অবশ্য আলি বুগিয়াল দিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। আসবার আগে অনেকেই বলেছিল, আমরা যেন একদিন অন্তত বৈদিনীতে থাকি। ওটাই নাকি এ পথের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। গঙ্গা কফি তৈরী করে নিয়ে আসলো। কফি খেয়ে মালপত্র তুলে নেওয়া হ'ল। কেয়ারটেকারকে দশ টাকা দিতে হ'ল। আমরা আস্তে আস্তে পথ চলতে শুরু করলাম। উতরাই এর পথে চলেছি। গতকালের সেই জল নেবার জায়গাটা ফেলে, আমরা নীচে নেমে চললাম। এখানেই ভোরবেলার প্রয়োজনে দু'জনে একবার এসেছিলাম। আর এখানে এসে আমি এই যাত্রার সব থেকে বিপজ্জনক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম।

জলের জায়গাটার পবিত্রতা রক্ষা করতে, জামা প্যান্ট খুলে, একটু দুরে পাথরের আড়ালে, অনন্ত আকাশের নীচে গালে হাত দিয়ে, উদাস মনে বসেছিলাম। সিতাংশু অন্য দিকে তার পছন্দ মতো জায়গা বেছে নিয়েছে। অত সকালে কোন লোকজন না থাকায়, জামা, প্যান্ট, জুতো, জলের জায়গার কাছাকাছি একটা পাথরের ওপর রেখে এসেছিলাম। কাজ সেরে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখি, এক পাল বাচ্চা ছেলে, বোধহয় কোন মর্নিং স্কুলের ছাত্র, জলের জায়গায় এসে হৈচৈ করে জল খাচ্ছে, জল ছিটিয়ে খেলা করছে। আমি অশুচি অবস্থায় একটা পাথরের আড়ালে বার্থ ড্রেসে দাঁড়িয়ে আছি। অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, তাদের বাড়ি বা স্কুলে যাবার কোন লক্ষণ নেই। নির্জন জায়গায় জামা, প্যান্ট, জুতো দেখে তারা অবাক। আমার হাতে তখন দুটো অপশন। হয় নাঙ্গা সন্ন্যাসী হয়ে, লজ্জার মাথা খেয়ে, তাদের কাছে গিয়ে, তাদের আরও অবাক করা। নয়তো আজকের যাত্রা বাতিল করে, ওদের বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত চোরের মতো লুকিয়ে অপেক্ষা করা। শেষে কী ভেবে ওরা চলে যেতে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পেরেছিলাম, এবং স্বপোষাকেই ফিরেছিলাম।

roopkunder-haatchhani

যাহোক্, এবার শুরু হ'ল চড়াই, উতরাইয়ের পথ। এখন পর্যন্ত কিন্তু খুব কষ্টকর কোন চড়াই পাই নি। অন্তত লোহাজঙ্গের সেই প্রাণান্তকর চড়াই পার হওয়ার পর, এ পথকে কোন কষ্টকর বলে মনেই হচ্ছে না। আমরা দু'জনে অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কুলি ও গাইডের দেখা নেই। কুলিরা তবু না হয় মাল বইছে, গঙ্গা থেকে থেকে কোথায় হাওয়া হয়ে যাচ্ছে কে জানে। আরও অনেকটা পথ পার হয়ে একটা জায়গায় আমরা বসলাম। আসার পথে একটা জায়গা দেখলাম, যেখানে তাঁবু থাকলে রাত কাটানোর পক্ষে আদর্শ জায়গা হিসাবে মনে হ'ল। আমরা নিয়ম মাফিক পাথরের ওপর বসে বাদাম ও মুড়কির ঠোঙা বার করলাম। মাটি এখনও শিশিরে ভিজে আছে। সকালের সূর্যালোক খুব আরামদায়ক। এতক্ষণে গঙ্গা ও হরিশের আগমন হ'ল। ওদের বাদাম ও মুড়কি খেতে দিলাম। গঙ্গার সাথে মুড়কি নামক বস্তুটির আগে পরিচয় হয় নি। সে অনেকক্ষণ দেখে জিজ্ঞাসা করলো "এটা কী খাবার"? নাও ঠ্যালা, মুড়কির হিন্দী কী? বললাম এটা এক প্রকার মিঠাই, এর নাম মুড়কি। সে খানিকটা মুখে পুরে জানালো, খাদ্যটা তার খুব পছন্দ হয়েছে। আগে কখনও কোন যাত্রীকে সে এই খাবার আনতে দেখেনি। এতক্ষণে কুমার এসে হাজির হ'ল। ওকেও খাবার দিলাম। আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম। এখন পর্যন্ত যতটা পথ এলাম, তার বেশীর ভাগটাই উতরাই। গঙ্গা দুরে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললো, বাঁদিকটা ওয়ান গ্রাম। সেই লাল রঙের জায়গাটা এখন বেশ পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। ও জানালো আরও কিছুটা পথ পার হয়ে, আমরা ডানহাতি রাস্তা ধরবো। বহুদুরে আলি বুগিয়াল যাবার রাস্তাটা ও আঙ্গুল দিয়ে দেখালো বটে, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, রাস্তাটা ঠিক কোন জায়গা দিয়ে গেছে। সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা আলি বুগিয়ালের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। এখন পর্যন্ত বিশেষভাবে আকর্ষণ করার মতো কোন দৃ্শ্য চোখে পড়েনি। সেই পাহাড়, সেই খাদ, দুরে জঙ্গলে ঢাকা উচু চুড়া, সেই একই দৃ্শ্য। গঙ্গা জানালো এবার চড়াই এর পথ শুরু হবে। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, এবং নিজেকে সামনের চড়াই এর উদ্দেশ্যে তৈরী করে নিলাম।

বাঁহাতে ওয়ান যাবার রাস্তা ছেড়ে, আমরা ডানদিকে বেঁকলাম। আস্তে আস্তে রাস্তা ওপরে উঠছে, তবে ভয় পাওয়ার মতো খাড়াই নয়। দু'পাশে হাল্কা জঙ্গলের মাঝ দিয়ে রাস্তা। একঘেয়ে হাঁটা, মাঝে মাঝে ছবি তোলা, রাস্তার পাশে বসে বা শুয়ে বাদাম অথবা লজেন্স চেবানো, আবার নতুন করে পথ হাঁটা। এইভাবে কতক্ষণ হেঁটেছি জানিনা, বেলা এখন বেশ বেড়েছে। গঙ্গা বললো সামনের গ্রামে সঙ্গে নিয়ে আসা রুটি ও আলুসিদ্ধ খাওয়া হবে। ডান পাশে ছোট ছোট ছাউনির কুড়ে ঘর ইতস্তত ভাবে তৈরী করা হয়েছে। একটা ঘরের সামনে, একবারে ছোট তিনটে বাচ্চা খেলা করছে। আর একটা বাচ্চা বোধহয় কেবল দাঁড়াতে শিখেছে। আমি রাস্তার ওপর থেকে একটা লজেন্স দেখাতেই, একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে লজেন্সটা নিয়ে আসবার জন্য ইশারা করতে লাগলো। কিন্তু কেউ সাহস করে এগিয়ে আসলো না। আমরা লজেন্সটা নিয়ে এগিয়ে যাবার ভান করতেই, ওরা বুঝলো আর লজ্জা করাটা ঠিক হবে না। একটা বাচ্চা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। তার নাম জিজ্ঞাসা করাতে, সে কী একটা নাম বললো বুঝতে পারলাম না। তার হাতে একটা লজেন্স দিলাম। এই লোভনীয় দৃশ্য দেখার পর, বাকী দুটো বাচ্চাও এগিয়ে এসে তাদের নাম বলে লজেন্স নিল। আমরা এগতে যাব, এমন সময় ওদের মধ্যে একজন, সেই ছোট্ট, কেবল হাঁটতে শেখা বাচ্চাটার নাম বললো। অর্থাৎ ওর ভাগেরটা দাও। আর একটা লজেন্স ওর হাতে দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম। সামান্য একটা লজেন্স পেয়ে, ওরা যে কী খুশী হয় ভাবা যায় না। আর একটু পথ ওপরে এসে, রাস্তার বাঁপাশে একটা ছোট ঘর। সামনে পাথর পেতে খানিকটা জায়গা বারান্দার মতো করা। সেখানে খুঁটির ওপর কাঠের তক্তা পেতে কয়েকটা বেঞ্চের মতো তৈরী করা হয়েছে। বারান্দা বা উঠোনের মতো জায়গাটায়, অনেক কাঁচা পাতা ছোট ছোট করে ছিঁড়ে, শুকতে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা বারান্দায় উঠে এল। দু'জন বৃদ্ধ বসেছিলেন, তাঁরা আমাদের বেঞ্চে বসতে বললেন। এটা কোন দোকান, না এই দুই বৃদ্ধের বাসস্থান বুঝলাম না। গঙ্গা রুটি ও আলুসিদ্ধ বার করলো। এখানেও দেখলাম গঙ্গাকে এরা চেনে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম শুকতে দেওয়া এগুলো কী পাতা? একজন বৃদ্ধ জানালেন এগুলো তামাক পাতা। হাতে নিয়ে দেখলাম, কোন গন্ধ নেই। বাঁপাশে ছোট্ট একটা জায়গায় বাগান মতো করা। ওখানে কয়েকটা গাছকে বৃদ্ধ ভদ্রলোক আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ঐগুলো তামাক গাছ, বিড়ি তৈরী হয়। যদিও খুব উন্নত মানের নয়, তবু ওঁদের কাজ মিটে যায়।

এখান থেকে ওয়ানের দিকে বহুদুরে একটা ঢেউ খেলানো মাঠের মতো জায়গা দেখা যাচ্ছে। খুব সুন্দর সেই দৃশ্য। একজন লোক, সম্ভবত মিলিটারিতে চাকুরী করে, ওপর থেকে এসে, আমাদের পাশে বসলো। আমরা রুটি, আলুসিদ্ধ ও কফি খেলাম। আর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, চললাম বুগিয়াল। বেশ কিছুটা সময় ঝোপঝাড় জঙ্গলের পথ ধরে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। এটা আসলে বাইপাশ, হরিশ ও কুমার অন্য দিক দিয়ে মালপত্র নিয়ে আসছে। গতকাল লোহাজঙ্গ আসার পথে হরিশ তার পিঠের ব্যাগের সঙ্গে কেরসিন তেলের টিনটাও বেঁধে নিয়েছিল। ঐ ব্যাগে চাল, ডাল, আটা ও অন্যান্য সমস্ত খাদ্যদ্রব্য ছিল। রাস্তায় হঠাৎ আমাদের চোখে পড়েছিল যে ব্যাগটা টিনের তেলে অনেকটা জায়গা ভিজে গেছে। খুব ভয় পেয়েছিলাম। একে তো সমস্ত রাস্তাটা এই এক খিচুড়ি, আর রুটি আলুসিদ্ধ ছাড়া কিছুই জুটবে না, তার ওপর কেরোসিনের সুগন্ধ হ'লে, ভয়াবহ ব্যাপার হবে। পরে অবশ্য সেই আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। পলিথিন শিটে সমস্ত কিছু মোড়া থাকায়, সম্ভবত কেরোসিনের গন্ধ তাদের আক্রমন করতে পারে নি। আজ তাই গঙ্গা নিজে কেরোসিনের টিন হাতে করে নিয়ে পথ চলছে। তার পিঠে তার নিজের একটা ব্যাগ আর আমাদের কিট্ ব্যাগটা রয়েছে। হরিশ রোগা হলেও কিন্তু কুমারের থেকে অনেক বেশী ও ভারী মাল বইছে। এখন আমরা যে জায়গাটা দিয়ে যাচ্ছি, সেটা একটা ঘন জঙ্গল। চারপাশে বিরাট বিরাট গাছ, জায়গাটাকে আলো ছায়ায় সাজিয়ে রেখেছে। এখানে কোন রাস্তা নেই, তাই অগত্যা গঙ্গার সাথে গতি মিলিয়ে আস্তে আস্তে ওপরে উঠছি। নিজেদের এ পথ চিনে যাবার ক্ষমতা নেই। গঙ্গা কিছুটা করে পথ যায়, আর যেখানে সেখানে বসে পড়ে, আমার কাছে বিড়ি চায়। আমার এই ঘন ঘন বসে অনবরত বিশ্রাম নেওয়াটা পছন্দ না হলেও, চুপ করে আছি। সিতাংশুকে দেখছি গোমড়া মুখে বসে থাকতে। ওর বিরক্তির কারণ বুঝছি, কিন্তু এপথে কুলি গাইডকে মেনে না নিয়েই বা উপায় কী? এবার গঙ্গা এক জায়গায় বসে আমাদের বললো কুলিরা অনেক পিছিয়ে পরেছে। ও মাঝে মাঝে সুর করে "আ-----উ-----" করে একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ করে, যেটা অনেক দুর থেকেও শোনা যায়। এখন আবার সেরকম অদ্ভুত রকমের তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলো। ওদিক থেকে কোন সাড়া এল না। তার মানে কুলিরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। আমরা চুপচাপ বসে আছি। সামনে বিরাট খাদ। বহুদুরে উচু পাহাড়ের শ্রেণী। তারই একটার মাথায় লোহাজঙ্গের সেই সাদা মন্দিরটা চোখে পড়লো। গঙ্গাই অবশ্য সেটা আমাদের দেখালো। খাদের বাঁদিকে পাহাড়ের শ্রেণী অবশ্য খুব কাছে। অর্থাৎ আমরা এখন যেখানে রয়েছি, তার সাথে যোগ রয়েছে। গঙ্গা হাত দিয়ে দেখিয়ে বললো ওটার ওপর উঠতে হবে। এবার হরিশ এসে উপস্থিত হ'ল। কিন্তু কুমার না আসায় চিন্তা শুরু হ'ল, কারণ ও, এপথে এই প্রথমবার আসছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গঙ্গা উঠে পড়লো। বোধহয় কুমারের-ই খোঁজে। একটু এদিক ওদিক দেখে, আবার সেই তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলো। এবার কিন্তু ওদিক থেকে কুমারেরও সাড়া মিললো। যাক্ বাঁচা গেল। কুমার এসে বসলো। একে একে ওরা এসে উপস্থিত হচ্ছে বলে, প্রত্যেককে বিশ্রামের জন্য সময় দিতে হচ্ছে। ফলে আমরা বসে বসে হাঁপিয়ে যাচ্ছি। ওরা তিনজনে একবারে খাদের ধারে এগিয়ে গিয়ে বসলো। এবার দেখি ওরা আঙ্গুল দিয়ে খাদের দিকে কী দেখাচ্ছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ওরা হরিণ দেখতে পাওয়া যায় কিনা খুঁজছে। সিতাংশু যেখানে বসেছিল, সেখানেই বসে রইলো। ওর অবস্থা দেখে হাসিও পাচ্ছে, করুণাও হচ্ছে। আমারও যে খুব ভাল লাগছে তা নয়, তবু ভাল লাগাবার চেষ্টা করছি। অনেকটা "পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে" গোছের ব্যাপার। গঙ্গা জানালো সন্ধ্যাবেলা এখানে এলে অনেক হরিণ দেখতে পাওয়া যায়। আমি বললাম জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর। গঙ্গা বললো "বাবুজী, এখানে থেকে যাও। তোমায় একটা কোঠি বানিয়ে দেব। এখানকার একটা ভাল লেড়কিকে সাদি করে, এখানকার বাসিন্দা হয়ে যাও"। আমি বললাম তুমিই তাই করো না কেন? সে উত্তরে বললো যে সে বিয়ে করতে চায় না।

লেখক পরিচিতি

সুবীর কুমার রায়

ছোটবেলা থেকে মাঠে, ঘাটে, জলাজঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ফড়িং, প্রজাপতি, মাছ, পশুপাখি, গাছের সাথে সখ্যতা। একটু বড় হয়ে স্কুল, এবং তারপরে কলেজ পালানোর নেশায় এর ব্যাপ্তি আরও বৃদ্ধি পাওয়ায়, অনেক নতুন ও অদ্ভুত সব মানুষের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ ঘটে। পরবর্তীকালে ছত্রিশ বছরের কর্মজীবনে ও ভ্রমণের নেশায় আরও বিচিত্র চরিত্রের মানুষ, বিচিত্র সংস্কার, বিচিত্র জায়গা দেখার ও বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ ঘটে। সুবীর কুমার রায় কর্ম সুত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক অফিসার ছিলেন। নেশা ভ্রমণ ও লেখা।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা