ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

আজ একুশে আগষ্ট, বহু আকাঙ্খিত সেই দিন। খুব ভোরে গঙ্গা আমাদের ডেকে দিল। কথা ছিল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আমি, সিতাংশু, গঙ্গা ও কুমার বেরিয়ে পড়বো। হরিশ বগুয়াবাসায় থাকবে, এবং কফি ও খাবারের ব্যবস্থা করবে। পাঁচটা বেজে গেছে। ঘুম ভাঙ্গতে দেখি পায়ের কাছে ওদের গায়ের ওপর পা তুলে নিশ্চিন্তে শুয়েছিলাম। উঠে পড়ে তৈরী হয়ে নিলাম। বাইরে কেমন ঠান্ডা বুঝতে পারছি না। সমস্ত মালপত্র জড় করে রেখে, কাঁধের ব্যাগ নিয়ে গুহার বাইরে এলাম।

আজ আমরা সেই কুন্ডের দর্শন পাব, যার রূপের তুলনা নেই। যার রূপ দর্শণ করতে গিয়ে একদিন শ'য়ে শ'য়ে মানুষ একই জায়গায়, একসাথে প্রাণ দিয়েছিল। আজ আমাদের সেই রূপকুন্ড দেখার শুভদিন। গুহাটাকে ডানহাতে রেখে, সরু রাস্তা ধরে আমরা চারজন এগিয়ে গেলাম। গঙ্গা আগে আগে চলেছে। ওই একমাত্র পথ চেনে। রাস্তা খাড়া ওপরে উঠেছে। দূরে কোন একটা শৃঙ্গ, বরফের টুপি পরে ধ্যানে বসেছেন। পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে আমরা সেই দিকেই চললাম। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত পেটে পড়ে নি, ফলে মানসিক আনন্দ যতই থাকুক, শারীরিক কষ্ট যথেষ্টই অনুভব করছি। গঙ্গা একটা স্যান্ডাকের জুতো পরে এসেছিল। জুতোটা পায়ে ঠিক মাপের না হওয়ার জন্যই হোক, বা ঐ জুতো পরে এত বেশী হাঁটার জন্যই হোক, ওর পায়ে বিশাল এক ফোস্কা পড়েছিল। কাল সারা রাস্তা ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছে। কাল সন্ধ্যায় ওকে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ড-এড্ লাগাতে বললে, ও খুব বাহাদুরী দেখিয়ে বললো "বাবু, ওসব জিনিস আপনাদের মতো শহুরে সাহেবদের জন্য, আমাদের ওষুধ হচ্ছে এই"। কথাটা বলেই, স্যান্ডাকের জুতো সমেত পা দিয়ে ফোস্কাটা গেলে দিল। আজ আর পুরানো জুতো পরার অবস্থায় না থাকায়, শক্ত জুতো রেখে সিতাংশুর হাওয়াই চটি পরে রূপকুন্ডে চলেছে।

আর কিছুটা পথ হাঁটার পর এল প্রথম হিমবাহ বা গ্লেসিয়ারটা। ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স যাওয়ার সময়, এর থেকে অনেক চওড়া গ্লেসিয়ার পার হতে হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল প্রায় সমতল মাঠের মতো। তার ওপর দিয়ে হাঁটতে কোন অসুবিধা হয় নি। কিন্তু বসুধারাতে বরফ ভেঙ্গে খানিকটা ওপরে উঠে বুঝেছিলাম, বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, বিশেষ করে ওপরে ওঠা কী রকম শক্ত কাজ। আজকের এই গ্লেসিয়ারটা খুব কম চওড়া, হয়তো কুড়ি-পঁচিশ ফুট হবে। কিন্তু এই গ্লেসিয়ারটা পার হওয়ার মধ্যে বিপদের ঝুঁকি প্রচন্ড। ওপর থেকে সোজা রাস্তা ক্রস্ করে ওটা নীচের দিকে নেমে গেছে। একবারে শক্ত বরফকে আড়াআড়ি ভাবে পার হয়ে, আমাদের আবার রাস্তায় পড়তে হবে। গ্লেসিয়ারটা কিন্তু খুব ওপর থেকে আরম্ভ হয়নি। তবে একবারে সোজা কত নীচু পর্যন্ত নেমে গেছে, বলতে পারবো না। ওটা পার হওয়ার সময় যদি কোনভাবে পা পিছলে যায়, তাহলে ধরবার মতো একটা ঘাসও নেই। একবারে গড়িয়ে কত নীচে চলে যেতে হবে জানি না। সঙ্গে স্পাইক্ লাগানো লাঠিও নেই। হাতে অতি সাধারণ একটা বাঁশের লাঠি, তা দিয়ে হুঁকো খাওয়া যায় জানি, কিন্তু গ্লেসিয়ারে পিছলে পড়লে কোন কাজে আসবে না, এটা নিশ্চিত।গঙ্গা হাওয়াই চটি পরে আছে। তাই কুমার গ্লেসিয়ারটা পার হওয়ার দায়িত্বটা নিয়েছে। কুমার প্রথমে তার হান্টার শ্যু-এর পিছন দিয়ে, অর্থাৎ গোড়ালির কাছ দিয়ে লাথি মেরে ঠুকে ঠুকে, বরফের ওপর একটা ছোট গর্ত মতো তৈরী করছে। সেই গর্তে পা দিয়ে গঙ্গা, তার পিছনে আমি, আমার পিছনে সিতাংশু যাচ্ছে। কুমারের তৈরী গর্তে কুমার দাঁড়িয়ে, ওর সামনে আর একটা নতুন গর্ত তৈরী করে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন গঙ্গা প্রথম গর্তে পা রেখে দ্বিতীয় গর্তের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গা যখন সামনের গর্তে পা রেখে এগিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণে পিছনের গর্ত প্রায় ভরাট হয়ে, আগের চেহারায় রুপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমার পক্ষে পার হওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমার পরে সিতাংশুর জন্য আর অপেক্ষা না করে, পুরোপুরি আগের রূপ নিয়ে নিচ্ছে। ছোট গর্তে পায়ের গোড়ালি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, আগের গর্ত থেকে গঙ্গা পা ওঠালে, আমি সেই গর্তে পা দিয়ে এগিয়ে যাব। সিতাংশু আর এইভাবে ঝুঁকি নিয়ে না এগিয়ে, ফিরে গিয়ে পাথর বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে, বরফ যেখান থেকে আরম্ভ হয়েছে, তার ওপর দিয়ে পার হয়ে, আবার শক্ত পাথর ধরে ধরে, কোনমতে নীচে রাস্তায় নেমে এল। ওকে দেখে আমারও তাই ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু আমি গ্লেসিয়ারের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি। পিছনের সব গর্ত বুঁজে গেছে। আমি এক পায়ের গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি, তাই পিছন ফেরাই মুশকিল। তার ওপর বরফ ভেঙ্গে গর্ত করে পিছনে যাওয়ার থেকে, সামনে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। গঙ্গা আমার অবস্থা দেখে তার হাত ধরতে বললো। সে সামনের দিকে মুখ করে পিছন দিকে হাত বাড়ালো। ওর হাত ধরলাম। ও খুব শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরলো। কিন্তু ঐভাবে হাঁটতে আরও অসুবিধা বোধ করলাম। তাছাড়া ও যতই অভিজ্ঞ ও দক্ষ হোক, ও হাওয়াই চটি পরে আছে। ওর পা কোন ভাবে পিছলোলে, ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে নীচে চলে যাবে। তাই ওকে হাত ছেড়ে দিতে বলে, কোনক্রমে বরফ পার হয়ে, আবার রাস্তায় এসে হাঁফ ছাড়লাম। একটু এগিয়েই আবার ঐ একই রকমের গ্লেসিয়ার। পার্থক্য শুধু এবারেরটা কত উঁচু থেকে নেমে এসেছে বোঝা যাচ্ছে না। ফলে এবারে আর সিতাংশু আগের বুদ্ধিটা কাজে লাগাতে পারলো না। তবে এবার আমরা কিছুটা অভিজ্ঞ। আস্তে আস্তে গতবারের কায়দায় গ্লেসিয়ারটা পার হয়ে গেলাম। গঙ্গা হাওয়াই চটি পরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিব্বি পার হয়ে গেল।

এরপরেই শুরু হ'ল তীব্র চড়াই। আস্তে আস্তে পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে ওপরে উঠছি। আরও অনেকক্ষণ হাঁটলাম। এখন পর্যন্ত রাস্তাও কম হাঁটা হ'ল না। কিন্তু গঙ্গার হিসাব মতো সাত কিলোমিটার পথ এখনও শেষ করতে পারলাম না। হঠাৎ আমার কীরকম শ্বাস কষ্ট হতে শুরু করলো। হাঁটতে গেলে বুকের বাঁ দিকটায় একটা যন্ত্রণা অনুভব করছি। বুকের ভিতর হৃদ্‌পিন্ড যেন অসম্ভব দ্রুত গতিতে চলছে। মনে হচ্ছে বুকের ভিতর হৃদ্‌পিন্ড যেখানে থাকে, সেই জায়গাটায় যেন কী একটা লাফাচ্ছে। এসব রাস্তায় একটু বসে বা দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিলে, আবার আগের শক্তি ফিরে পাওয়া যায়, সুস্থ বোধ হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাও হচ্ছে না। অনেকক্ষণ বসে থেকে বিশ্রাম নিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে, আবার সেই কষ্টটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গঙ্গা আমাকে উৎসাহ দিতে জানালো, সামনের চূড়াটা পার হলেই রূপকুন্ডের দেখা মিলবে। অথচ আমি আর এগিয়ে যেতে পারছি না। হঠাৎ মনে হ'ল হার্টে কোন গোলমাল হয় নি তো? হার্ট অ্যাটাক হবে না তো? গঙ্গা বোধহয় আমার মনের কথা, আমার অসহায় অবস্থার কথা, আমার কষ্টটা বুঝতে পেরেছে। সে বললো বিশ্রাম নিয়ে খুব আস্তে আস্তে এগোতে। বিশ্রাম নিলাম, কিন্তু এগোবার ক্ষমতা ফিরে পেলাম না। প্রায় ষোল হাজার ফুট উচ্চতায় আমার এখন যদি কিছু হয়, এরা কী করবে? সিতাংশু দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাকে বললো একটু বসে নিতে। ওর কথাটা যেন কীরকম শোনালো। ওর কথায় ভয়, না বিরক্তি মেশানো, ঠিক বুঝলাম না। আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার আর রূপকুন্ড দেখা হ'ল না। ভাবলাম ওদের বলি, তোমরা চলে যাও, আমি এখানে বসে অপেক্ষা করছি। কিন্তু রূপকুন্ডের দোরগোড়ায় এসে, সে কথা মুখ ফুটে বলতে পারলাম না। গঙ্গা বললো, "হাতে অনেক সময় আছে, তাড়াতাড়ি করার প্রয়োজন নেই। প্রেমসে হাঁটো"। আর প্রেমসে হাঁটা ! আমি সিতাংশুকে বললাম, তোমরা এগিয়ে যাও। আমি একটু বিশ্রাম নিয়ে, আস্তে আস্তে যদি যেতে পারি তো যাব। তোমরা দেখে এস। ওরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সামনের পথ ধরলো। আমাকে কী কষ্টে যে হাঁটতে হচ্ছে, বোঝাতে পারবো না। কোনক্রমে লাঠিতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে, এক পা এক পা করে ওপরে উঠছি। ওরা তখন অনেকটা ওপরে উঠে গেছে। আমি আবার বসে পড়লাম। ওরা আর একটু পথ ওপরে উঠেই, দাঁড়িয়ে পড়লো। সিতাংশু চিৎকার করে জানালো, রূপকুন্ড দেখা যাচ্ছে। নতুন উদ্যমে আস্তে আস্তে, অনেকটা সময় নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। এখান থেকে ছোট্ট কুন্ডটা দেখা যাচ্ছে বটে, তবে তার সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যাচ্ছে না। আজ এত কষ্ট কেন ভোগ করলাম জানি না। অতীতে কখনও এই অবস্থায় পড়তে হয় নি। কিন্তু কষ্টের শেষ প্রান্তে এসেই যেন সমস্ত কষ্ট লাঘব হ'ল। তরতর করে অনেকটা নীচে নেমে এসে, কুন্ডের পারে দাঁড়ালাম। কুন্ডটাকে একটা গোলাকার নীল জলের ডোবা বললেই ঠিক ব্যাখ্যা করা হবে। ডানদিকটা সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা, অপর পারটা, অর্থাৎ আমাদের ঠিক সামনের দিকটা পূর্ব দিক। ওদিকের পাহাড়ের চুড়াটা অনেকটা উচু। ফলে হাল্কা রোদ উঠলেও, কুন্ডে তার ছিটেফোঁটাও পড়ছে না। এখন পৌনে আটটা বাজে। সিতাংশু এত কষ্টের পরে রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, একবারে ভেঙ্গে পড়েছে।


রূপকুন্ড

কুন্ডের পারে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিছু পাথর সাজিয়ে একটা বেদী মতো তৈরী করা, তার উপর অ্যালুমিনিয়ামের তৈরী একটা বড় প্লেট্, একটা লোহার শিকে বাঁধা অবস্থায় দাঁড় করানো আছে। আরও অনেক এই জাতীয় প্লেট, হেলান দিয়ে দাঁড় করানো ও ইতস্তত ছড়ানো পড়ে আছে। এগুলোতে আগে যারা এখানে এসেছে, তাদের নাম, ঠিকানা খোদাই করা। এখানে আসবার সময় তৈরী করে নিয়ে আসা হয়েছে। বেদীর ওপরে একটা পলিথিন পেপারে মোড়া একটা ছোট্ট ডায়েরী, তাতে কয়েকজন বাঙালীর নাম, ও তাদের গাইডের নাম লেখা আছে। এদের মধ্যেই একজন, লক্ষ্ণৌ আসার সময় ট্রেনে অনিতা নামে মেয়েটার মুখে শোনা তার পরিচিত ছেলেটা। নাথু সিং অসুস্থ হওয়ায়, অপর একজন গাইড এদের দলকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। সঙ্গে অপর একটা দলও এসেছে। আমরাও ঐ ডায়েরীতেই আমাদের নাম, ঠিকানা ও গাইড-কুলিদের নাম লিখে, আবার পলিথিন পেপারে মুড়ে, বেদীর ওপর চাপা দিয়ে রেখে দিলাম। অ্যালুমিনিয়ামের প্লেটগুলোয়, বেশীরভাগই পশ্চিমবঙ্গবাসীর নাম।

সিতাংশু জানালো, এত কষ্ট করে এতদূর এসে, রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, তার আর অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছা নেই। সে এখান থেকে সোজা বাড়ি ফিরে যাবে। অনেক আশা নিয়ে এসে রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, আমার মনও খুব খারাপ হয়ে গেছে। তবে আমি নিশ্চিত, এখান থেকে কথামতো তিন তাল দেখে আমরা পিন্ডারী গ্লেসিয়ার যাবই। সিতাংশুর এই বিমর্ষভাব ততক্ষণ আর থাকবে না। ছোট একটা ব্রান্ডির বোতলে, গঙ্গাকে কুন্ড থেকে জল ভরে আনতে বললাম। গঙ্গা কুন্ড থেকে জল ভরে এনে দিল। সিতাংশু গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলো, তার ভীষণ জল পিপাসা পেয়েছে, এই জল খাওয়া যাবে কিনা। গঙ্গা জানলো, এই জল খেলে নির্ঘাত অসুখ করবে। তাই জল খাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করে ও নীচে কুন্ডের কাছে, একবারে জলের কাছে নেমে গেল।

আমি ডানদিক দিয়ে কিছুটা নেমেই, একটা সাদা মতো কী যেন আবিষ্কার করলাম। তুলে দেখি, একটা নরকঙ্কালের মুন্ডু। সাদা ধবধবে, দাঁতগুলো পর্যন্ত অবিকৃত আছে। এতক্ষণ নানা সমস্যায় রূপকুন্ডের ধারে হাজার কঙ্কালের কথা ভুলেই গেছিলাম। *** রূপকুন্ডের বুকে শয়ে শয়ে কঙ্কাল, বা কঙ্কালের হাড়গোড় দেখতে পাওয়ার কারণ হিসাবে দু'রকম মত শোনা যায়। ১)প্রাকৃতিক ২) ধর্মীয়।

১) সম্ভবত বহু বছর আগে কোন ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতে যাওয়ার সময় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে শয়ে শয়ে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এর বহু বছর পরে, এক ইংরেজ সাহেব জায়গাটায় গিয়ে অনেক মৃতদেহ ও কঙ্কাল দেখতে পান। ঘটনার কারণ ও সময়কাল বিশ্লেষণের জন্য একটি মহিলার অবিকৃত মৃতদেহ তিনি সঙ্গের কুলিদের নিয়ে আসতে বলেন। কুলিরা রাজী না হয়ে ভয়ে পালিয়ে আসতে চাইলে, তিনি বন্দুক তুলে ভয় দেখিয়ে মৃতদেহটি নিয়ে আসেন। বলতে লজ্জা করছে, মৃত্যুর কারণ ও সময় আমার জানার সুযোগ হয় নি।

২) হিমালয়ের দেবী, নন্দাদেবী রুষ্ট হওয়ায়, ঐ অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষের একসাথে মৃত্যু হয়।


রূপকুন্ডের আশেপাশে রয়েছে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল

কারণ যাই হোক না কেন, বহু মানুষ রূপকুন্ডে একসাথে মারা গেছিলেন। জায়গাটা অসম্ভব ঠান্ডা হওয়ায়, এখনও মৃতদেহ দেখতে পাওয়া না গেলেও, মাংসযুক্ত হাড়গোড় দেখতে পাওয়া যায়। এবং মহিলাদের ওখানে যাওয়ায়, অলিখিত নিষেধ আছে বলে শোনা যায়। যাহোক্, ওটাকে নিয়ে গঙ্গা ও সিতাংশুর কাছে ফিরে এলাম। গঙ্গা জানালো, এত পরিস্কার কঙ্কাল, বা তার অংশ এখন আর বিশেষ দেখতে পাওয়া যায় না। কঙ্কালের মুন্ডুতো দেখাই যায় না। এখানে যারা আসে, স্মৃতি হিসাবে অনেকেই কিছু কিছু অংশ নিয়ে যায়। অবশ্য বরফ খুঁড়লে পূর্ণ কঙ্কাল এখনও অনেক পাওয়া যাবে। তবে বরফের ওপরে পূর্ণ কঙ্কাল আর একটাও পাওয়া যাবে না। গঙ্গা চারিদিকে ছড়ানো ছেটানো অনেক হাড়ের টুকরো দেখালো। কোনটা হাতের অংশ, কোনটা পায়ের অংশ। তবে নরমুন্ড আর একটাও দেখতে পেলাম না। কোন কোন হাড়ের ওপর কালো মতো জমা অংশ দেখিয়ে, গঙ্গা জানালো, এগুলো মাংস। ঠান্ডায় নষ্ট হয়নি। হয়তো তাই হবে, কিন্তু পরীক্ষা করার প্রবৃত্তি হ'ল না। গঙ্গা আমাকে নরমুন্ডুটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বললো। কিন্তু একমাত্র অবিকৃত নরমুন্ড সঙ্গে করে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করলো না। তাছাড়া এতটা রাস্তা হেলমেটের মতো নরমুন্ড হাতে করে নিয়ে গেলে, ফেরার পথে পুলিশের ঝামেলা, এবং সর্বোপরি এই বয়সে নরমুন্ড হাতে বাড়ি ফিরে বাড়ির লোকেদের, ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে নরমুন্ড হাতে হিমালয় থেকে ফিরেছে ভেবে কষ্ট পাবার হাত থেকে মুক্তি দিতে, নরমুন্ড আর নিয়ে আসা হ'ল না। তাই পরের যাত্রীদের সহজে দর্শণ লাভের জন্য, ওটাকে বেদীর ওপর রেখে এলাম। ডানদিকের বরফের ওপরেই বেশী কঙ্কালের হাড়গোড় পড়ে আছে। গঙ্গা জানালো, ঐ বরফের তলায় এখনও অবিকৃত গোটা মৃতদেহ আছে। দেহের মাংস পর্যন্ত নষ্ট হয় নি। কারণ, ঐ বরফ কখনও গলে না।

রূপকুন্ডের পারে পারে আমরা অনেকক্ষণ ঘুরলাম, জলে হাত দিলাম। গঙ্গা বললো ওপরে উঠে আসতে। এবার মেঘ করতে শুরু করবে। আর একটু পরেই ফিরতে হবে। আমরা ওপরে উঠে এসে বেদীর ধারে বসলাম। এ জায়গাটার ঊচ্চতা ১৬৪৭০ ফুট। গঙ্গা জানালো, সাড়ে ন'টা-দশটার মধ্যে, জায়গাটা সাদা মেঘে ঢেকে যাবে। সূর্য পূর্বদিকের চুড়ার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। সূর্য ঠিক মাথার ওপর না উঠলে, রূপকুন্ডের জলে রোদ পড়ার আশা কম। অর্থাৎ সাড়ে এগারটা-বারটার আগে কুন্ডের জলে সূর্যালোক পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অথচ ওর কথা মতো প্রতিদিনই তার অনেক আগেই জায়গাটা গভীর মেঘে ঢেকে যায়। বোঝাই যাচ্ছে রূপকুন্ডে প্রায় কোনদিনই সরাসরি সূর্যালোক পড়ে না। খুব ভাল আবহাওয়া থাকলে, ন'মাসে ছ'মাসে রূপকুন্ড রৌদ্রস্নান করার সুযোগ পায়। এখন ন'টা বাজে। গঙ্গা বললো এর আগে কলকাতার এক ভদ্রলোক রূপকুন্ডে পৌঁছেই, সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে কুন্ডের ধারে পূজোয় বসেন। কিন্তু তিনি আর তাঁর পূজো শেষ করার সুযোগ পাননি। তার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এবার আমাদের ফিরতে হবে। আমাদের ছবি তোলাও শেষ। নরমুন্ড নিয়ে সিতাংশু, গঙ্গা ও কুমারের ছবি তুলতেও ভুললাম না। সকাল থেকে একবারে খালি পেটে আছি। খানিক বাদাম চিবিয়ে প্রাতরাশ সারলাম। রূপকুন্ডের রূপ, মোহিত হয়ে বসে থাকার মতো নয়, তাই আমরা রূপকুন্ডকে শেষ বারের মতো দর্শন করে, বিদায় জানিয়ে সদলবলে বগুয়াবাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা