ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
পুনর্মিলন

"স্যার, চিনতে পারছেন?"
"না, ঠিক চিনতে পারলাম না, কে বলো তো?"
"আমি স্যার, অনির্বাণ, ২০০৩ মাধ্যমিক, ২০০৫ উচ্চমাধ্যমিক, টাউন স্কুল । "
"ও মনে পরেছে, খোসবাগানে বাড়ি না তোমাদের?"
"হ্যাঁঁ স্যার, এই অবস্থায় আর আপনাকে প্রণাম করতে পারছি না। "
"আরে না না, ঠিক আছে, তা পায়ের এই দশা কি করে?"
"বাইক অ্যাক্সিডেন্ট স্যার, পা টাও গেছে।"
"ওহ, কোথায় হয়েছিল?"
"ওই গোলাপবাগ মোড়ের কাছে, পিছন থেকে লরির ধাক্কা। "
"সাবধানে চালাবে তো? হেলমেট ছিল না?"
"ছিল স্যার, তবুও ..."
"হুম, কি দিনকাল পড়ল...তা তুমি চাকরি কি করতে? তোমার সঙ্গে তো মাধ্যমিকের পর আর দেখাই হয়নি বোধহয়। "
"দেখা হয়েছে স্যার, আমি তো স্কুলেই ছিলাম। তবে সায়েন্স নিইনি। তাই আপনার অঙ্কের ক্লাসে দেখেননি।"
"ওহ তাই হবে, ভুলে যাই। তুমি কি কমার্স ছিলে ?"
"না স্যার, আর্টস। "
"তারপর কি করলে?"
"রাজ কলেজ থেকে বি. এ. পাস করে বসেই ছিলাম স্যার। টিউশন করছিলাম, ব্যাঙ্ক, রেলের পরীক্ষা দিচ্ছিলাম, কিছুই পাচ্ছিলাম না। অবশেষে বছর তিনেক আগে এই পিত্জা হাউস-এ তে চাকরি পেলাম।"
"বর্ধমানে পিত্‌জা হাউস আছে নাকি?"
"অনেক দিন তো স্যার, তিন বছর হলো। আপনি খাননি?"
"নাহ, আমি সেই আমেরিকায় গিয়ে ছেলের কাছে থাকার সময় খেয়েছিলাম। কলকাতা তে আছে জানি, বর্ধমানে আছে জানতাম না। তো সেখানে কি করতে? "
"এই স্যার, আমি বাড়ি বাড়ি পিত্জা ডেলিভারি করতাম। বাইক চালাতে পারি, ইংরেজি, হিন্দি দুটোই বলতে পারি, চাকরি পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।"
"সেই করতে গিয়েই কি এই অ্যাক্সিডেন্ট?"
"হ্যাঁ স্যার।"
"তা তোমার ভাই বোন আছে?"
"ভাই আছে স্যার, অর্ণব। বম্বে তে চাকরি করে, ওই যে দেখুন এসেছে।"
"আচ্ছা, তোমার বাবা কি অবসর নিয়েছেন?"
"হ্যাঁ স্যার, হেড পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন।"
"তা তুমি সংসার করেছ?"
"না স্যার, এই চাকরি তে ..."
"হুম"
"আপনার কি হলো স্যার?"
"ক্যান্সার, যকৃতে।"
"এ বাবা, খুব কষ্ট শুনেছি ?"
"হ্যাঁ তা কষ্টটা ভয়ানক-ই বটে। "
"আপনার ছেলে, মানে অতীনদা তো আমেরিকায় থাকে, ওখানে শুনেছি খুব ভালো চিকিৎসা, দেখাননি?"
"আরে তিন মাস আগেই ধরা পড়ল, অতীন বলছিল আসবে আমাকে নিয়ে যেতে, ছুটিই পায়না বেচারা। এখন আবার কিসব গ্রিন কার্ড না কি করাচ্ছে, কে জানে কবে আসবে এদেশে।"
"ওহ, ওটা কে ওখানে দাঁড়িয়ে ? আমি তো ভাবলাম অতীনদা। "
"না না, ও আমার ভাগ্‌নে সুবিমল, পাশের বাড়িতে থাকে।"
"আচ্ছা আচ্ছা।"
"তোর কথা একেবারেই মনে পড়ছে না, তুই কি স্কুলে খুব দুষ্টু ছিলি ? তুই বলছি কেমন? "
"অবশ্যই তুই বলুন। হ্যাঁ স্যার, সেই একবার আপনার ক্লাস কামাই করে আমরা স্টারে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম, আপনি জানতে পেরে আমাদের বেত দিয়ে মারেন।"
"ওহ মনে পড়েছে, তুই সেই দলে ছিলি, তার মানে তুই বসন্তর বন্ধু?"
"ছিলাম স্যার, এখন বসন্ত এলাকার এম.এল.এ. আমাকে কি আর বন্ধু ভাবে?"
"জানি রে, গতবছর এসেছিল আমাকে বাড়ি ভোটের আগে। সঙ্গী সাথীদের সামনে আমাকে এমন ভাবে স্যার স্যার করতে লাগলো, যেন খুব শ্রদ্ধা করে। জীবনে তো ক্লাসে দেখলাম না। "
"জানেন স্যার, আপনার একটা ডাকনাম ছিল আমাদের মধ্যে?"
"শুনেছি মনে হয়, তবু বল। "
"তুফান মেল। আপনি খুব তাড়াতাড়ি অঙ্ক কষতেন , আমরা কিছুই বুঝতাম না। ফ্যাল ফ্যাল করে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাই এই নাম। কিছু মনে করলেন না তো স্যার?"
"আরে ধুর, এখন আর মনে করে কি হবে?তা তুই সায়েন্স পড়লি না কেন?"
"স্যার, আমি মাধ্যমিকে কোনরকমে অঙ্কে পঞ্চাশ পাই। ওই ত্রিকোনমিতি আমার মাথাতে কোনদিন ঢুকত না। "
"আরে বলবি তো, তোকে নাহয় আমি ক্লাসের পর আলাদা করে দেখিয়ে দিতাম। "
"হ্যাঁ স্যার, সেটা ভুল হয়েছে।"
"আসি রে, আমার ডাক পড়েছে, ওপারে গিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। "
"আপনার তাড়া থাকলে চলে যেতে পারেন।"
"আরে ধুর, কিসের তাড়া ? তুই আয়। দেখা হচ্ছে?"
"ঠিক আছে স্যার। "

পুরুতমশাই বললেন, "সুবিমল, মামাকে শেষ বারের মত প্রণাম করে নাও।"

পুনর্মিলন

ছবিঃ ত্রিপর্ণা মাইতি

লেখক পরিচিতি

কণাদ বসু

কণাদ বসুর শৈশব কেটেছে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে; অধুনা ব্যাঙ্গালোর নিবাসী। বাঙলা বই পড়তে, বাঙলা গান শুনতে আর বাঙলা সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসেন। অবসর সময়ে স্মৃতির মণিকোঠার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা