ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
আড়ি বারো, ভাব তেরো

স্কুলের গেট থেকে বেরিয়েই বাবাকে আড়ি করে দিল রিমঝিম। ওর পিঠে ঝোলানো স্কুল ব্যাগটা হাতে নিতে নিতে বাবা দেখলেন মেয়ের মুখটা একেবারে গম্ভীর। কোনও কথাই বলছে না মেয়ে।একটু পরেই ও হয়ত ভাব করবে। প্রায় সারাদিনই চলে এই ভাব আড়ির পর্ব।কিন্তু এখন কেন আড়ি, সে কথাই ভাবার চেষ্টা করলেন ওর বাবা।

প্রতিদিন বাবার সঙ্গে সাইকেল করে স্কুলে যায় রিমঝিম।ওদের বাড়িটা শ্রীরামপুরে,হুগলি নদীর ধারে।আর স্কুলটা ব্যারাকপুরে। দুই শহরের পাশ দিয়ে বেঁকে যাওয়া নদীটা পেরোতে হয় ভুটভুটি করে। নদী পেরিয়ে কিছুটা সাইকেলে করে গেলেই রিমঝিমদের স্কুল,নিবেদিতা বিদ্যাপীঠ। ব্যারাকপুরের যেখানে ওদের স্কুল সেটা একটা সেনাছাউনি এলাকা। জায়গাটা শান্ত সুন্দর আর খুব নিরিবিলি।গাছপালায় ভর্তি।পলাশ,শিমূল,নিম,বট,ছাতিম থেকে তাল , নারকেল, আম,জাম, কাঁঠাল- সবই হাজির রাস্তার আশপাশ আর বাগান জুড়ে।গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায় টিয়া, চন্দনা,শালিক,কাঠবেড়ালি,ঘুঘু,কোকিল,কাকেরা। মাঝে মধ্যে হাজির হয় হনুমানের দলও । গাছ-গাছালি ভরা স্কুলটা রিমঝিমের খুব পছন্দের।ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে বাবার সাইকেলের সামনের সিটে উঠে পরে রিমঝিম।তারপর গোলবাড়ির রাস্তার বাঁকটা ঘুরতেই সরাসরি চোখে এসে পড়ে সকালের মিষ্টি রোদ্দুর। দিনের প্রথম ভাবটা সূর্যের সঙ্গেই করে রিমঝিম।কিন্তু কোনও কোনও দিন সূর্যের সঙ্গে আড়িও হয়ে যায় ওর। যেমন আজ। দাঁত মেজে,মুখ ধুয়ে,চোখে জল দিয়েও ঘুমটা কিছুতেই ভাঙছিল না।বাবার সাইকেলে চড়েও কাটছিল না ঢুলুঢুলু ভাব। গোলবাড়ির রাস্তার বাঁকটা ঘুরতেই চোখে এসে লাগল সূর্যের আলো। ঝলমলে আলোয় চোখের আধবোজা ভাবটাও গেল কেটে । আর অমনি সূর্যের সঙ্গে কড়ে আঙ্গুল বাড়িয়ে আড়ি করে দিল রিমঝিম।

বাবা বললেন- "সে কী রে,সূর্যের সঙ্গে আড়ি কেন?"
"দেখছো না, সূর্যটা চোখে কেমন ঝিকিমিকি লাগিয়ে দিল।" – চোখ কচলাতে কচলাতে রিমঝিম বলল।এরপর রাস্তার ভেউভেউ,আর একটা গরুর সঙ্গেও আড়ি করে দিল ও। কারণ সাইকেলের বেল দেওয়া হলেও রাস্তা থেকে কেউই সরছিল না।

তবে তিনমাথার মোড়ে এসে ভাব হল চড়াইপাখি আর পায়রার সঙ্গে।ওরা একমনে রেশন দোকানের ঝাঁট দিয়ে ফেলে দেওয়া গম, চালের টুকরো, ডাল খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল।

প্রায় রোজই স্কুল যাওয়ার সময় কাক, পায়রা, চড়াই, শালিকের সঙ্গে দেখা হয় রিমঝিমের। সবার সঙ্গেই ভাব করে দেয় ও। যদিও এসবই একপাক্ষিক।রিমঝিম আড়ি করুক বা ভাব, তাতে কোনও হেলদোল থাকে না পায়রা বা গরুদের। অবশ্য সে সব নিয়ে কিছু ভাবেও না রিমঝিম। তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে স্কুল যাওয়ার পথে ওকে না নিয়ে আগের বোটটা ছেড়ে দিলে ভুটভুটিকেও আড়ি করে দেয় ও।

রিমঝিমের পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলে হাতে নিয়ে ওর বাবা জিজ্ঞাসা করলেন – "কি হল মামমাম, আজ আড়ি কেন ?"
ঠোঁট ফুলিয়ে রিমঝিম বলল, "তুমি কেন দেরি করলে ? তুমি না আসায় দিদিমণিরা আমায় আটকে রাখল। আমার কান্না পাচ্ছিল। যদি তুমি না আসতে ?"
"তাই কখনও হয় ? আসলে একটা কাজ সেরে আসতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।" ছোট্ট রিমঝিমের পিঠে হাত রেখে বললেন ওর বাবা। বললেন, "আর এরকমটা হবে না।"
"আর কোনও দিন দেরি করবে না তো ? চোখ গোল গোল করে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল রিমঝিম।"
"কোনওদিন নয়, প্রমিস" – ওর বাবা উত্তর দিলেন। এক আকাশ হাসি খেলে গেল রিমঝিমের মুখে। বাবার দিকে বুড়ো আঙুল তুলে বলে দিল, "তাহলে তোমার সঙ্গে ভাব।"

রিমঝিমের মুখ জুড়ে খুশির ঝিলিক। মেয়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতেই গোটা এলাকা জুড়ে একটা আনন্দের আবহ টের পেলেন ওর বাবা। ঝলমল করে উঠল চারপাশটা। এলাকার পাখিগুলো যেন হঠাৎই বেশি বেশি করে কিচিরমিচির করতে শুরু করল। রিমঝিমরা যখন স্কুল ক্যাম্পাসের পাশে কালো পিচঢালা রাস্তা দিয়ে হাঁটছে তখন দুটো চেনা কুকুর এসে কুঁইকুঁই আওয়াজ করে চলে গেল। রিমঝিম বুড়ো আঙুল তুলে ওদেরও ভাব জানিয়ে দিল।

বাড়ি ফেরার পথে স্কুলের কথা শেষ হতে চায় না রিমঝিমের। কোন দিদিমণি আজ কিছুটা রেগে গিয়েছিল, কোন দিদিমণি আজ 'ভেরি গুড' বলেছেন তা সাইকেলে ওঠার পরই বলতে শুরু করে দেয় ও।

আজ সাইকেল একটু গড়াতেই রিমঝিম বলে উঠলো – "জানো বাবা আজকে শিল্পাম্যাম একটা গল্প বলেছে। একটা বাঘ আর বেড়ালের গল্প। বাঘটা খুব দুষ্টু। খালি সবাইকে ভয় দেখায়। আচ্ছা বাবা, বেড়াল কী বাঘের মাসি ?"

কখনও কখনও মেয়ের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার মত জ্ঞানগম্যি ওর বাবার থাকে না। যেমন, বেড়াল সত্যি বাঘের মাসি কী না তা ওর বাবারও জানা নেই। ছোটবেলা থেকে একথা শুনতে শুনতে তিনিও বড় হয়েছেন। তবে এসব ভাবনার মধ্যেই মোক্ষম একটা প্রশ্ন করে বসল রিমঝিম। বলল, "আচ্ছা বাবা আমার মাসিতো স্কুলে চাকরি করে। বাঘের মাসি কোথায় চাকরি করে ?"

রিমঝিমের বাবা মেয়েকে কিছু একটা বোঝাতে যাবেন এমন সময়ই রিমঝিম "ঈশানী-ঈশানী" বলে ডেকে উঠল। ঈশানী ওর মায়ের হাত ধরে বাস ধরতে যাচ্ছিল। রিমঝিমের ডাক শুনে ও পিছনে ফিরে হাত নেড়ে দিল। রিমঝিম বলল, "কাল আড়ি থাকলেও ঈশানীর সঙ্গে আজ আমার ভাব হয়ে গেছে। ও আজ আমায় ওর কাঁচের ছোট্ট জলপরীটা দেখতে দিয়েছে। অদৃজা,জয়তী,তপস্মিতা, ইমন, আর্যদীপ, প্রত্যুষের সঙ্গে আজ ভাব। তবে দিগঝুম, প্রত্যাশা, সৌমিতা, লাবণ্য,দেবাংশী, রাইকিশোরী-র সঙ্গে আড়ি করে দিয়েছি।"

"কেন আড়ি কেন ?" ওর বাবা জিজ্ঞাসা করলেন।
"স্কুল শুরু হওয়ার আগে ওরা কুমীরডাঙা খেলছিল। আমাকে খেলতে নেয় নি, তাই আড়ি।" উত্তর দিল রিমঝিম।

সাইকেলে যেতে যেতেই অঙ্ক কষার ছলে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে বলে ভাব আর আড়ির হিসেব কষছিলেন রিমঝিমের বাবা। দেখা গেল সূর্য, ভেউ-ভেউ, গরু থেকে স্কুলের বন্ধু – সব মিলিয়ে সকাল থেকে বারোটা আড়ি করেছে রিমঝিম। তাহলে ভাবের সংখ্যা কত ? চড়াই পাখি, পায়রা, স্কুলের বন্ধুদের হিসেব কষে ভাবের সংখ্যাও বারো বলে জানিয়ে দিল রিমঝিম।

আড়ি বারো, ভাব তেরো

সাইকেলে চলতে চলতে এই কথাবার্তার মধ্যেই হঠাৎ করে বাবার বাইকে চড়ে হাজির হল শাহিন। আজ ছিল ওর জন্মদিন। কিন্তু স্কুলের বন্ধুদের সকলকে দিলেও আড়ি থাকায় ও বাড়ি থেকে আনা চকোলেট রিমঝিমকে দেয়নি। পরে খুব দুঃখ হওয়ায় বাবাকে বলে গাড়ি ঘুরিয়ে বন্ধুকে চকোলেট দিতে এসেছে সে।

শাহিনের হাত থেকে চকোলেট নিয়েই ওর সঙ্গে ভাব করে দিল রিমঝিম। ও টা টা করে চলে যেতেই রিমঝিম বলল, "বাবা, বাবা অঙ্কের হিসেবটা হল – আড়ি বারো, ভাব তেরো।"


ছবিঃ পারিজাত ভট্টাচার্য্য

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা