ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ভজু

ভজু , ভালো নাম ভজহরি, বোকাসোকা, রোগারোগা চেহারা। বাঁশি বাজায়, পাখির ডাক নকল করে , ভালো ঢাকও বাজায়।আবৃত্তিও করে খুব সুন্দর। অঙ্কটা ঠিক পারেনা এই যা। ভজুদের টিনের চালার ছোট্ট বাড়ি।খুব অভাবের সংসার। আগে এমনটা ছিল না। কিন্তু ভজুর বাবার মৃত্যুর পর দুরাবস্থা চরমে উঠেছে ভজুদের বাড়ি থেকে দক্ষিণে কিছুটা পথ গেলেই কলকলি নদী। নদীর ধারে যে বুড়ো বটতলা আছে তার পাশ দিয়ে একটু হেঁটে গেলে বাজারটা. সেখানে সারি সারি চপ এর দোকান।মোচারচপ , সয়াবিনের চপ , মাংসেরচপ , ইয়া বড় বড় সাইজ বেগুনি, ডালপুরি , কত না সুখাদ্যের গন্ধ ভেসে আসে।কালুরাম কাকার দোকানে খাসা চিংড়ির চপ ভাজে। ভজুর খুব ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে চপ খেতে , জিলিপি খেতে , মায়ের জন্যে নিয়ে যেতে। সেই অনেকদিন আগে রথের মেলার কথা মনে পড়ে ভজুর। বাবার কাঁধে চেপে জিলিপি খাচ্ছিল ভজু। বাবা একটা দারুণ সুন্দর বাঁশিও কিনে দিয়েছিল।কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পর মা আর কোথাও বেরোতেই চায় না। খুব কষ্ট করে এখন সংসার চালায় মা। ভজুর টিউশন খরচ নিজে না খেয়েই জমায়। তাই ফালতু খরচে ভজুর মন সায় দেয় না। ভজুর সঙ্গে যে কজন বন্ধু টিউশন পড়ে তারা সব বেশ বড় বাড়ির ছেলে। তারা ভজুর মতো ছেলের সঙ্গে এক সঙ্গে বসতেই লজ্জা পায়। কিন্তু ভজুর দরকার পড়ে অন্য কাজের সময়। যেমন কোনোদিন টিউশন এর শেষে ভজুকে দিয়ে চপ আনানো , মিষ্টি আনানো। আর সেটা না করলেই ওরা স্যারের কাছে ভজুর নামে মিথ্যে নালিশ করে ওকে হেনস্থা করার চেষ্টা করে।

সেরকমই একদিন ভজুকে ছেলেরা পাঠালো চপ আনতে। ভজু আমতা আমতা করে বলল , "রোজ রোজ ওই বটতলা দিয়ে যেতে আমার কিন্তু ভারী ভয় লাগে , রোজই মনে হয় কারা জানি পিছু নিচ্ছে। ঘাড়ের ওপর ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাস ফেলছে।

সিধু মুখ বেঁকিয়ে বলল "ঢপ এর চপ নিঃশ্বাস ফেলছে। ওসব ঢপ অন্য কোথাও দিও। কাজ এড়ানোর ধান্দা!"

কাজেই ভজু বেরিয়ে পড়ল বরাবরের মতো। শীতের রাত। লোকজন যে যার ঘরে লেপমুড়ি দিয়ে বসে তেলেভাজা মুড়ি খাবে , আর সিরিয়াল দেখবে এসময়। পাড়াগ্রামে জনমানুষ তো দূরের কথা একটা লোম ওঠা নেড়ীও দেখা যাবে না।

ভজু পায়ে পায়ে বটতলা দিয়ে এগোতে থাকে। ওর গায়ে একটা ছেঁড়া সোয়েটার । রোগা চেহারাতে শীত যেন আরও কামড়ে ধরেছে। গ্রামের বাড়িঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা গেলেই বটতলা।

একদম শুনশান,জনমানবহীন। ভজু খুব দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটতে থাকে। ঠিক বটতলার কাছাকাছি এসে শুনতে পায় পেছন পেছন কে জানি হেঁটে আসছে।ভজু একটু থমকে দাঁড়ায়, চারদিক দেখে, আবার চলতে শুরু করে।

আবার সেই শব্দ; একটু থেমে থেমে। এবারে ভজু প্রায় দৌড়তে যাবে, অমনি পেছন থেকে কে ডাক দেয়-" ভজু, ও ভজু,আমি তোর ন'গাঁয়ের রাঙ্গাপিসি। আমাকে চিনলিনে ?"

ভজু এবার পেছনে তাকিয়ে দ্যাখে , একজন মহিলা সাদা নরম শাড়ি পরে ,গায়ে একটা কালো শাল জড়িয়েছে। ভজু ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মহিলা কাছে এগিয়ে আসে।

" কীরে? আমাকে চিনতে পারলিনে। তোর বাবা নাড়ু আমাকে কত খাতির করত। রাঙাপিসি তোমার জন্যে লালদই এনেছি ছাতিমতলা থেকে , রাঙাপিসি এই নাও আমাদের পুকুরের চিতলমাছ..."

ভজুর বাবার নাম ছিল নরহরি দাস অনেকেই নাড়ু বলে ডাকত। ভজুর তাই একটু প্রত্যয় জন্মালো।

সে সাহস করে বলল-" আচ্ছা রাঙাপিসি, এদিকে কী করছিলে?"
রাঙাপিসি বলল, "ন'গেরাম তো কবে ছেড়ে দিয়েছি,এখন এইদিকেই থাকি।ওই যে আমার ঘর"
ভজু দেখল দুরে একটা টিমটিম করে কুপির আলো দেখা যাচ্ছে।
"ন'গেরাম তো সেবার বন্যায় ভেসে গেল ঘরবাড়ি বিষয়সম্পত্তি , গরু ছাগল সব হারালো।মানুষের কী দুর্ভোগ! কীদুর্ভোগ! " রাঙা পিসি কপালে হাত দেয়। তা তোকে তো রোজই দেখি ইদিকপানে যেতে। কোথায় যাস বাবা ?"
"চপ আনতে গো পিসি , কালুরাম কাকুর দোকানে দারুণ চিংড়ির চপ ভাজে,"
"তাই এমন খাসা গন্ধ পাই। আহা কত দিন চিংড়িমাছ চোকেই দেকিনি, আমার জন্যেও দুটো আনবিতো ?"
ভজু থতমত খেয়ে বলল , "আমি পয়সা কোথায় পাব ? বাবা মারা যাওয়া পর আমাদের দোকানটাও বন্ধ হয়ে গেল। আমি আর মা , কোনোরকমে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে।মা বেতের ঝুড়ি বোনে আর সেলাই করে, উল বোনে।"

"আহারে নাড়ু ছেলেটা বড় ভালো ছিল , অনেক পুন্যি করেছিল।আমাদের মতো কি আর পাপী তাপী ..." বলে রাঙাপিসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো।

ভজু বলল, "আমি চপ আনতে যাচ্ছি আমার বন্ধুদের জন্যে , বঙ্কা স্যারের কাছে অঙ্ক করিতো সেইখানে..."
পিসি নাক সিঁটকে , চোখ মটকে বলল, "ছেলেগুলো পাজিতো। নিজেরা খাবে আর এই শীতের রাতে তোকে দিয়ে চপ আনাবে ...
চল ভজু তুই আমার সঙ্গে চল কালুরাম এর দোকান , তোকে আমি পেট ভরে চপ, ডালপুরি, মিষ্টি খাওয়াব।"

ভজু বড় বড় চোখ করে তাকালো।
খিদে তো তার পেয়েছিল খুব, বিকেলে দুটো মুড়ি আর আধখানা শসা খেয়েছে।
অনেকটা হেঁটে এই বট তলা আসতে হয়। শীতের রাত, খিদেটাও পেটের মধ্যে যেন ঢাকের বাদ্যি জুড়েছে।

তবুও সে লজ্জা লজ্জা করে বলল "কিন্তু পিসি ..."
"কিন্তু কীরে? আমি তোর্ ন' গাঁয়ের রাঙা পিসি না ?"
"আচ্ছা চল"
দুজনে মিলে চলল কালুর দোকানে ।
কালুরাম ভজুকে দেখলেই তিরিক্ষে মেজাজে কথা বলে , তার ওপরে তার বাজখাঁই গলা।মুষকো চেহারা , আর কালো কালো দাঁত।দেখলেই ভজুর কেমন ভয় করে। এবারেও সে হেঁড়ে গলায় বলে উঠলো," কী চাই রে ভজু ?"

তারপর হঠাত চোখ কপালে তুলে বলল "রাঙা দিদি তুমি ?
রাঙা পিসি একটু রহস্যময় হেসে বলল – "এই যে আমি, আর এ হলো আমার আদরের ভাইপো"
কালুরাম কপাল থেকে ঘাম মুছে বলল -" ও তুমি রাঙা দিদির ভাইপো? তা আগে বলবে তো।বোসো, বোসো, এই ভূতু ভূতনাথ , ওদেরকে সব গুলো আইটেম এনে দে।"

"স অ অ অ ব আইটেম ?"
"বাংলা বুঝিস না নাকী?"
ভূতু নামে ছেলেটি কাঁপা কাঁপা হাতে এক ঝুরি ভাজা ডালপুরি , এক থালা সন্দেশ , ঠোঙ্গায় করে জিলিপি আর থালা ভর্তি কতরকম যে চপ রেখে গেল তার ইয়ত্তা নেই ।
রাঙা পিসি ভজুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল "খা ভজু , ভালো করে খা।"
ভজু বলল "এত্ত আমি খাব কী করে রাঙা পিসি ?
মায়ের জন্যে নিয়ে যাব ? মা তো কতদিন এসব খায় নি। "
"নিশ্চয়, আগে তো তুই খা ..."
"না রাঙা পিসি তুমি বেঁধে দিতে বল আমি আর মা একসঙ্গে খাব। মা আমার জন্যে না খেয়ে বসে থাকে। "
তুমি চিংড়ির চপ খাবে না রাঙা পিসি ?"
"না রে , খেতে তো খুব ইচ্ছে হয়, কিন্তু আমি বেধবা মানুষ। ওই বামুন দাদা জানতে পারলে খুব রাগ করবে"
"বামুন দাদা কে গো?"
"ওই তো ব্ট তলাতেই থাকে। খড়ম পায়ে ঘোরে।ধম্মে কম্মে খুব মতি। পান থেকে চুন খসলেই এক্কেবারে দাঁত জিভ নেড়ে হাজির।"

সেদিন ভজু আর তার মা পেট ভরে ডালপুরি , চপ , জিলিপি , সন্দেশ খেল ।
মা জিজ্ঞেস করলো ," কে দিল রে এইসব? "
ভজু মিথ্যে করে বলল "কালুরাম কাকা দিয়েছে ।"
কারণ রাঙা পিসি বলে দিয়েছে "একেবারে আমার নাম নিবি না ভজু। আমি এসেছি আর তোদের সঙ্গে দেখা করতে যাইনি শুনলে তোর্ মা খুব রাগ করবে ।"
ভজুর মা একবার অস্ফুটে বলল , "কালুরাম এমন দেখতে হলে কী হবে ? ভেতরে মানুষটা ভালই.. না রে ভজু ?"
ভজু আর কথা বলতে পারছিল না তৃপ্তিতে চোখ জুড়িয়ে আসছিল।

পরের দিন টিউশনেএসে শোনা গেল ভজু আজ আসবেনা। সকালে স্কুল থেকে ফেরার সময় সিধু আর ন্যাপা তাকে খুব মেরেছে। সে প্রচুর ঢপ দিয়েছে, রাঙা পিসি , রাতের ভুরিভোজ ইত্যাদি ইত্যাদি ।
সিধু নাক সিঁটকে বলল ,"আমাদের সঙ্গে চালাকী! ও কাল সোজা বাড়ি চলে গেছিল আমাদের পয়সা গুলো আজই গুম করবার তালে ছিল। আমি আর ন্যাপা গিয়ে সোজা ধরেছি। বুড়ো বট তলায় নিয়ে গেছি। ওখানে কোনো ঘর নেই। পিসি তো দুরের কথা! "
"গালটা চেপে ধরে বললাম, 'কী রে তোর্ রাঙা পিসি কি গাছে থাকে ?' "
"এমন মার মেরেছি দুদিন বাবু বিছানায়।"

ভজু

পরের দিন সিধু আর ন্যাপা চপ আনতে গেল বট তলা দিয়ে ।
বট তলা টা সত্যি অন্ধকার আর গা ছমছমে ।
ন্যাপা কাঁপা গলায় বলল " সিধু শুনতে পাছিস ?
পায়ের শব্দ"
সিধু কান পেতে শুনলো কেমন একটা খ্যাট খ্যাট শব্দ ।
তারপর দুজনে পেছন ফিরে যা দেখল তাতে তাদের চক্ষু চড়ক গাছ !
তালগাছের মতো ঢ্যাঙ্গা একজন খড়ম পায়ে হেঁটে আসছে তাদের পেছনে গায়ের রং ফ্যাকাশে। চোখ দুটো রক্তবর্ণ যেন বেরিয়ে আসছে। গালের চামড়া ঝুলে গেছে। মাথার পেছনে একটা টিকি। গলায় পইতে আর পরনে ধুতি।
সে তার লম্বা লম্বা হাত দুটো বাড়িয়ে দুজনের জামার কলার ধরে বিড়ালের মতো ঝুলিয়ে হাঁটতে লাগলো ।
" এই যে দুটো উচ্চিংড়ে ধরেছি বোন। এখন কাঁচা খাবে না ভাজা সেটা ঠিক কর।"
ভজুর রাঙা পিসি বলল , " বামুন দাদা জানো তো আজ আমার উপোস। ওদের বরং ওই বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখো। কাল দেখব। "

পরের দিন সিধু আর ন্যাপা কে সব গ্রামের লোক অজ্ঞান অবস্থায় বট তলায় আবিষ্কার করলো ।

এর পরে ভজুর গায়ে কেউ কোনদিন হাত তোলেনি। এমনকী সবাই খুব সম্মান দিয়ে কথা বলত। সবাই জানে ভজুর এক রাঙা পিসি আছে। অঙ্ক নিয়েও ভজুর চিন্তা রইলো না । বামুন দাদা নামে তার এক গৃহ শিক্ষক জুটে গেছে. আর কালুরামের দোকানে বেশির ভাগ খদ্দের কারা তা এখন ভজু জানে। কালুও তাকে খুব খাতির করে। রাঙা পিসির তো সাত কূলে কেউ নেই তাই ভজুকেই ভালোবেসে চপ-কাটলেট-এর একটা দোকান খুলে দিয়েছে রাঙা পিসি । যেখানে তার মা বসে বেশিরভাগ সময়... আর খদ্দেরও প্রচুর। ..ন'গাঁয়ের বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষদের তো আর খিদে কম নয়।


ছবিঃ পিনাকী দত্ত

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা