ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
টাঙ্গাওয়ালা

বেশ কয়েক বছর আগের কথা বলছি তখন আমরা উত্তর বঙ্গের একটা ছোট শহরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তাম। এখন শহরের বিস্তার এর সাথে সাথে কলেজের চারিদিকে বসতি হয়ে গেলেও সেই সময় আমাদের কলেজটা শহর থেকে একটু দূরেই ছিল। আমরা কলেজ এর কাছাকাছি একটা বাড়ীতে মেস করে থাকতাম, দোতলায় কাকু কাকিমা মানে বাড়িওয়ালা আর তাঁর স্ত্রী থাকতেন আর নিচের তলার দুটো ঘরে আমরা কলেজের চার বন্ধু থাকতাম। রাস্তার দু ধারে মাঝে মধ্যে দু একটা বাড়ি, বাকিটা ঝুপড়ি আর গাছপালা ঝোপঝাড়ে ভরা ছিল, শহরে যাবার জন্যে অল্প কয়েকটা বাস থাকলেও সাইকেল বা ঘোড়ায় টানা টাঙ্গাই আমাদের সহজ এবং সস্তা বাহন ছিল।

সেই দিনটা ছিল শনিবার। সন্ধ্যায় রথীন, মুকুল আর আমি আমাদের ঘরে বসে চা খেতে খেতে আড্ডা মারছিলাম বা একটু ভদ্র ভাবে বললে পরে বলা যেতে পারে গল্প করছিলাম। এমন সময় মনিরুল ঘরে ঢুকে বলল, "আজ শ্যামলীতে নাইট শো তে একটা অস্কার প্রাইজ পাওয়া ভাল ইংলিশ ফিল্ম আছে, যাবি? হলের একজনের সাথে আমার জানাশোনা আছে টিকিট পেতে অসুবিধা হবে না।"

মনিরুলের কাছ থেকে ফিল্মের কথা শুনে সবাই লাফিয়ে উঠলাম; মুকুল বলল, "কাল তো রবিবার, আজ সিনেমা দেখতে গেলে কোন অসুবিধা হবে না। মনি, তুই টিকিটের ব্যবস্থা কর আমরা রেডি হয়ে নিচ্ছি।"

মনি অর্থাৎ মনিরুলের বাড়ি বহরমপুরে আর মুকলেসুর রহমান মানে আমাদের মুকুলের বাড়ি বর্ধমানে, রথীন আর আমার দুজনকারই বাড়ি রামপুরহাটে। আমাদের চার জনের মধ্যে মুকুলের একটা লিডারশিপ ছিল, শুধু চার জনের মধ্যে কেন কলেজের ক্লাসেও দেখেছি সব কাজে আগে মুকুল। এটা বলা বাহুল্য যে আমাদের চার জনের মধ্যে দোস্তি খুব। এবার মনি আর মুকুল জামা বদলাতে ওদের ঘরে চলে গেল, আর আমরা দুজনেও তৈরি হয়ে নিলাম। ন'টা থেকে শো আরম্ভ, আমাদের বেরোতে বেরোতে সওয়া আটটা বেজে গেল। ফেরবার সময় অত রাতে যদি টাঙ্গা না পাই তাই আমরা দুটো সাইকেল নিয়ে ডবল বাইক-এ অর্থাৎ এক একটা সাইকেলে চালক এবং একজন করে আরোহী নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। ডবল বাইক ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না, কারণ আমার আর মনির দুটো সাইকেলেই হাওয়া নেই, কাছাকাছি সাইকেলের দোকানও নেই, হাওয়া ভরতে আমাদের আবার অনেকটা যেতে হত, তাই মুকুলের আর রথীনের সাইকেল দুটোই অবলম্বন। এর মধ্যে মনি ফোন করে সিনেমা হলের ওর পরিচিত লোককে বলে রেখেছে আমাদের জন্য চারটে টিকিট রেখে দিতে।

এতটা পথ ডবল বাইক করে সিনেমা হলে পৌঁছাতে পৌনে ন'টা বেজে গেল। তাড়াতাড়ি করে সাইকেল দুটো গ্যারাজে রেখে দিয়ে মনি হলের অফিসে ঢুকে গিয়ে টিকিট জোগাড় করে আনল। আমরা চারজন হলে ঢুকে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট সিটে বসলাম। ঠিক ন'টায় শো আরম্ভ হল, সিনেমা দেখছি, মাঝে মাঝে মারপিটের দৃশ্যে সিটি পড়ছে, যা তখনকার দিনে ওখানকার হলে খুবই স্বাভাবিক ছিল। শো শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেছে, হল থেকে বেরিয়ে গ্যারাজ থেকে সাইকেল বার করে চাপতে গিয়ে দেখি ও মা কি হবে, মুকুলের সাইকেলে একদম হাওয়া নেই। যাক, গ্যারাজ মালিকের কাছ থেকে পাম্পার নিয়ে হাওয়া ভরে আমরা যখন বের হলাম, তখন এগারটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। আমি আর রথীন আগে আগে যাচ্ছিলাম, আমাদের পিছনেই মনি আর মুকুল আসছিল। আমরা বড় জোর সাত আট মিনিট এসেছি এমন সময় মুকুল চেঁচিয়ে উঠল, - "যাঃ, আবার হাওয়া চলে গেছে, সাইকেল চালানো যাচ্ছে না।"

আমরা দেখলাম মুকুলের সাইকেলটার পিছনের চাকায় একদম হাওয়া নেই, চাকা বসে গেছে। রাত হয়ে গেছে, নির্জন অন্ধকার রাস্তা, আকাশে তারা রয়েছে কিন্তু চাঁদ দেখা যাচ্ছে না, তারার আলোয় তো আর রাস্তা আলোকিত হয় না। এই অন্ধকার রাতে এখন হাঁটা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। এখনও অনেকটা রাস্তা, যাই হোক যখন কোন উপায় নাই, তখন অন্ধকারের মধ্যেই চার জনে মিলে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে হাঁটতে শুরু করলাম। রাত প্রায় সাড়ে এগারটা হবে রাস্তার ধারে একটা ঝুপড়ির সামনে খালি গা লুঙ্গি পরা একটা মাঝ বয়সী লোক আমাদের দেখে বলল, "বাবুরা এত রাতে হেঁটে হেঁটে কোথায় যাচ্ছ?"

মুকুল বলল,"আর বলবেন না দাদা, সিনেমা গিয়েছিলাম, সাইকেল লিক হয়ে গেছে, টেকনিক্যাল কলেজে যাব, এতটা রাস্তা কখন পৌঁছাব জানি না।"
"সামনের মোড়টা পেরলেই একটা টাঙ্গা পেয়ে যাবেন, আমি এখনই ওদিক থেকে এলাম। টাঙ্গাওয়ালাকে বলবেন ও নিশ্চয়ই ওর টাঙ্গা করে আপনাদের পৌঁছে দেবে।"
"তা হলে তো ভালই হয়। ধন্যবাদ দাদা, এখন দেখি আমাদের কপালে কি আছে।"

আমরা চারজন গল্প করতে করতে এগোচ্ছি, একটু যাওয়ার পরই একটা মোড় এল, মোড়টা পেরিয়ে দেখি সত্যি জঙ্গলের ধারে একটা টাঙ্গা দাঁড়িয়ে আছে। সেই অন্ধকার রাতে আকাশে চাঁদ না পেলেও টাঙ্গাটা দেখে আমরা যেন হাতে চাঁদ পেলাম। টাঙ্গাওয়ালাকে অনুরোধ করে বললাম," ভাই, আমরা বড় মুশকিলে পরে গেছি, আমাদের একটা সাইকেল লিক হয়ে গেছে, আপনি টেকনিক্যাল কলেজে আমাদের একটু পৌঁছে দেবেন?"

" জি, আপনাদের জন্যেই তো আমি দাঁড়িয়ে আছি। আপনারা টাঙ্গায় উঠুন।"

টাঙ্গাওয়ালা

মুকুলের খারাপ হয়ে যাওয়া সাইকেলটা নিয়ে আমি আর মুকুল টাঙ্গায় উঠলাম, রথীন আর মনি রথীনের সাইকেলে করে আমাদের টাঙ্গার পিছনে পিছনে আসতে লাগল। টাঙ্গাওয়ালাটা লুঙ্গি আর ফুলাহাতা পাঞ্জাবি পরে আছে, অন্ধকারে মুখটা দেখা যায় নি, তাছাড়া মাথাসহ তার মুখের বেশির ভাগ অংশই গামছা দিয়ে জড়ানো। অন্ধকার রাতে শুধু ঘোড়ার পায়ের টগবগ টগবগ ছন্দের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হয়ত ঝিঁঝিঁর ডাক বা জোনাকির আলো ঝোপঝাড়ে আছে, কিন্তু সে দিকে মন দেওয়ার মতন অবস্থা তখন আমাদের ছিল না। মুকুল আর আমি নিজেদের মধ্যে দু একটা কথা বললেও টাঙ্গাওয়ালা চুপচাপ ছিল কোন কথা বলছিল না। শুধু একবার মুকুল মুখে সিগারেট নিয়ে আগুন জ্বালতেই টাঙ্গাওয়ালা বলে উঠেছিল, " আগুন জ্বালাবেন না, আমার ঘোড়া আগুনকে ভয় পায়।"

টাঙ্গাওয়ালার ওই কথা শুনে মুকুল তার মুখ থেকে সিগারেটটা বার করে আবার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রেখে আমার মুখের দিকে তাকাল। অন্ধকারে নির্জন রাস্তার মধ্যে দিয়ে আমাদের টাঙ্গা ছুটে চলেছে, মনিদের সাইকেল আমাদের থেকে একটু পিছিয়ে পরেছে। মাঝে একবার কুকুরের কান্নার ডাক আর শিয়ালের ডাক শুনতে পেলাম। এদিকে ঝোপঝাড় আছে জানি কিন্তু শিয়াল আছে বলে এর আগে শুনিনি। কুকুরের কান্না আর শিয়াল ডাকের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে একবার বিদ্যুৎ চমকে উঠল, বিদ্যুৎ ঝলকের আলোয় ঘড়িতে দেখলাম ঠিক রাত বারোটা বাজে। মুকুল আমাকে ওর কনুই দিয়ে খুঁচিয়ে টাঙ্গাওয়ালার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে আমাকে ঈশারা করে কিছু বলতে চাইল কিন্তু আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, তবে এইটুকু বুঝলাম মুকুল হয়ত একটু ভয় পেয়েছে, কারণ তারপর থেকে ও আমার গা ঘেঁসে বসল আর ওর একটা হাত দিয়ে আমার একটা হাত চেপে ধরে রাখল।

রাত সওয়া বারোটার সময় আমাদের মেসবাড়ির সামনে এসে টাঙ্গাটা ঘুরিয়ে নিয়ে থামল, মুকুল আর আমি টাঙ্গা থেকে সাইকেলটা ধরাধরি করে নামালাম। সাইকেলটা আমি ধরে আছি, মুকুল তার পকেট থেকে কুড়ি টাকা বার করে টাঙ্গাওয়ালাকে দিতে গেলে টাঙ্গাওয়ালা হাত বাড়াতেই মুকুল কাঁপতে কাঁপতে বসে পরে রাস্তার উপর লুটিয়ে পড়ল। আমি সাইকেলটা একধারে রেখে মুকুলকে তুলতে গিয়ে দেখি সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। এর মধ্যে টাঙ্গাটা কখন চলে গেছে খেয়াল করিনি। আমি মুকুলকে সামলাচ্ছি, এর দু এক মিনিটের মধ্যেই মনি আর রথীন এসে পৌঁছাল। সাইকেলটা পাশে রেখে ওরা ছুটে এলে আমি ওদের বললাম, "আমরা টাঙ্গা থেকে নামার পর মুকুল টাঙ্গাওয়ালাকে টাকা দিতে গিয়ে কি হল হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।"

আমরা তিন জনে মিলে মুকুলকে কোলে করে তুলে আমাদের ঘরে নিয়ে গিয়ে চৌকিতে শুইয়ে দিলাম। সিলিং ফ্যানটা জোড়ে চালিয়ে ওর মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলাম। রথীন একবার বেরিয়ে সাইকেল দুটো ঘরে ঢুকিয়ে রাখল। দু তিন মিনিটের মধ্যেই মুকুল একবার চোখ মেলে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "কি হয়েছে, তোরা আমার মুখে জল ছেটাচ্ছিস কেন? "

আমি বললাম, "ও কিছু না এখন তুই এখন একটু ঘুমো।"

মুকুল ঘুমিয়ে পরলে, টাঙ্গাতে কি কি হয়েছিল, টাঙ্গাওয়ালার সিগারেটের আগুন জ্বালাতে বারণ করার কথা, রাত বারোটার সময় কুকুরের কান্না, শিয়ালের ডাক, পরিষ্কার আকাশে হঠাত মেঘ আর বিদ্যুৎ চমক, বিদ্যুৎ চমকের পর মুকুলের ভয় পেয়ে আমার হাতটা চেপে ধরার কথা, তারপর আমরা বাড়ির সামনে এসে গেছি না বলাতেও টাঙ্গাওয়ালার নিজে থেকে আমাদের বাড়ির গেটের সামনে তার টাঙ্গা দাঁড় করানো, সবই মনি আর রথীনকে বললাম। মনি বলল, ওরা তো আমাদের পিছনেই ছিল, কিন্তু টাঙ্গাটাকে ফিরে যেতে ওরা দেখে নি। টাঙ্গা আর টাঙ্গাওয়ালা সম্বন্ধে একটা রহস্য আমাদের মনে দানা বেঁধে উঠল। যাই হোক, মুকুলের গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম ওর গা খুব গরম, জ্বর এসেছে। বাকি রাতটা জেগে আমরা ওর কপালে জলপটি আর হাওয়া দিয়ে কাটালাম। সকালে ওর জ্বরটা ছেড়েছে মনে হল। ব্রাশ করে চার জন মিলে চা খাচ্ছি এমন সময় বাড়িওয়ালাকাকু এসে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালেন। ওনাকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে বললাম। উনি বললেন,"কাল রাতে তোমাদের কি হয়েছিল, অত রাতে টাঙ্গার আওয়াজ পেয়ে জানালা দিয়ে দেখলাম তোমরা মুকুলকে ধরাধরি করে কোলে তুলে ঘরে ঢোকালে।"

কাল রাতে কি কি ঘটেছিল, টাঙ্গাতে যা যা লক্ষ্য করেছি ওনাকে সবই বললাম। মুকুল এখনও একটু ঝিমিয়ে থাকলেও সে বলল, " রাত বারোটার সময় আকাশে বিদ্যুৎ চমকের আলোতে টাঙ্গাওালাটার হাতটা দেখে মনে হল হাতটা ঠিক ঘোড়ার খুরের মতন দেখতে। তখন একটু ভয় পেলেও ভেবেছিলাম আমি হয়ত ভুল দেখেছি। আবার টাঙ্গা থেকে নেমে যখন ওকে ভাড়ার টাকা দিতে যাচ্ছিলাম আমি স্পষ্ট দেখলাম টাঙ্গাওালার দুটো হাতই ঘোড়ার খুর, তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।"

আমাদের কথা শুনে কাকু বললেন,"এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটা গোরস্থান আছে, বছর তিনেক আগে এক অমাবস্যার রাতে একটা টাঙ্গাওয়ালা তার ভাইকে সাথে নিয়ে টাঙ্গা করে এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় ঠিক রাত বারোটায় আচমকা এক বাজ পড়ে ঘোড়া সমেত টাঙ্গাওয়ালা আর তার ভাই মারা যায়। সেই দিনটা ছিল শনিবার। শুনেছি তারপর থেকে প্রত্যেক অমাবস্যার রাতে বিশেষ করে ওই দিন শনিবার হলে ওই টাঙ্গাওয়ালা গোরস্থানের কাছে রাস্তার ধারে টাঙ্গা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তার ভাই কিছুটা দূরে একটা ঝুপড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ওদের সওয়ারের জন্যে। কালও অমাবস্যা আর শনিবার দুইই ছিল।"


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা