ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
জগতের বাহার

বাবুন জানালা দিয়ে আকাশ দেখছিল । আজ তার ভারী মনখারাপ । দুদিন আগে তার দাদুভাইয়ের শ্রাদ্ধের কাজ সারা হয়ে গেল।বাড়িভর্তি লোকজন ছিল।আজ বাড়ি ফাঁকা। এখন বাড়িতে তারা তিনজন। বাবা, মা ও সে। দাদুভাই তার খুব ভাল বন্ধু ছিল। তাকে যে কতরকমের গল্প শোনাত। আজ তাকে গল্প শোনানোর জন্য কেউ নেই। মা সারাদিন বাড়ির কাজে ব্যস্ত আর বাবা অফিসের কাজে। অফিস থেকে ফিরে এসেও তার কাজ। ল্যাপটপ নিয়ে বসে যাবে।

দাদুভাই-ই তো তাকে আকাশ চিনিয়েছে। বলেছে, বাবুন, ইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ফাঁক পেলেইএই পৃ্থিবীকে দেখো। খুব আনন্দ পাবে। বাবুন অবাক হয়ে বলেছিল, পৃথিবীকে কি করে দেখব দাদুভাই? পৃ্থিবীকে কি দেখা যায়? দাদুভাই সঙ্গে সঙ্গে তার ভুল শুধরে নিয়ে বলেছিল, আমি বলতে চাইছি চোখ মেলে এই জগতের বাহার দেখো। 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' সিনেমাতে গুপী যে গানটা গেয়েছে, মনে নেই তোমার? 'দেখ রে নয়ন মেলে জগতের বাহার...'। আমি সেই বাহারের কথা বলছি। এই বাহার মানে আকাশ, বাতাস, সূর্য, চাঁদ, গ্রহ, নক্ষত্র, অণু, পরমাণু ... এই দেখ, তুমি কি আর এতসব বুঝবে? তুমি আকাশ দেখো, পাখি দেখো, গাছপালা দেখো। আর যখন বড় হবে তখন এই জগতের বাহার দেখার জন্য ঘুরতে বেড়িয়ে যেও।

বাবুন কিন্তু আজ আকাশ দেখছে অন্য কারণে। মা বলেছে, দাদুভাই নাকি একটা তারা হয়ে আকাশের অন্য তারার সঙ্গে মিশে গেছে। দাদুভাই তাকে বলেছিল যে কোনো পরিষ্কার দিনে আকাশে নাকি পাঁচ হাজারের মত তারা দেখা যায়। এখন এত তারার মধ্যে সে দাদুভাইকে কী করে চিনে নেবে? ওই তো কালপুরুষ।

দাদুভাই-ই তো তাকে কালপুরুষ চিনিয়েছে। কালপুরুষ নাকি আকাশের যোদ্ধা। বড় বড় তার চোখ। আকাশের ডানদিকটা দেখিয়ে দাদুভাই বাবুনকে বলেছিল, দেখছ বাবুন, এটা কিন্তু পুবদিক। ওই দেখ, পরপর তিনটে তারা। কেমন বেঁকে আছে দেখেছ? ওটা কালপুরুষের কোমর। একটু ওপরে দুটো তারা কেমন উল্টোদিকে বেঁকে আছে, ওটা কালপুরুষের কাঁধ। একটা কাঁধ একটু বেশি ঝলমল করছে। আর ওই দুটো তারার মাঝামাঝি একটু ওপরে ছোট ছোট তিনটে তারা, ওটা কালপুরুষের মাথা। কোমরের নিচে পরপর যে ছোট তিনটে তারা নেমে গেছে সেটা ওর তলোয়ার। ডান কাঁধের ওপর একটা হাত আর বাঁ হাতের তারাটা ওর ঢাল। ডানপায়ের নিচে চোখের মত জ্বলছে একটা তারা। ওটা কালপুরুষের কুকুর। ওর নাম লুব্ধক।

বাবুন তার দাদুভাইকে থামিয়ে বলেছিল, কালপুরুষ আকাশে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে দাদুভাই? অন্য তারাদের সঙ্গে?
- কালপুরুষ আকাশে দুষ্টু তারাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাবুন। কোমর থেকে তলোয়ারটা বের করে দুষ্টু তারাদের ঘ্যাচাং করে কেটে দেয়। মাঝে মাঝে যে তারাগুলো খসে পড়ে, ওরাই ওই দুষ্টু তারা।

দাদুভাই বলেছিল, কালপুরুষের বাঁদিকে দেখ, সাতটা ছোট ছোট তারা। ওরা সাত ভাই। কালপুরুষ আর সাত ভাইয়ের ঠিক মাঝখানে যে লাল তারাটা সে ওই সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন। তার নাম রোহিনী।

এভাবেই বাবুনকে দাদুভাই আকাশের অনেক তারা চিনিয়েছে। কিন্তু এত তারার মধ্যে আজ দাদুভাই কোন তারা হয়ে লুকিয়ে আছে, সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। বাবুন দেখল, আজ আকাশের চাঁদটাও বেশি ঝকঝক করছে। সে নিশ্চয়ই আকাশের সব তারাদের চেনে। বাবুনের মনে হল, সে যদি ওই চাঁদের কাছে জানতে চায়, কোন তারাটা তার দাদুভাই, তাহলে নিশ্চয়ই চাঁদ দাদুভাইকে চিনিয়ে দেবে। বাবুন আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে আকুল হয়ে বলল, ও চাঁদ তুমি কি আমাকে চিনিয়ে দেবে, আমার দাদুভাই আকাশের কোন তারা হয়ে লুকিয়ে আছে? আমি যে এত তারার মধ্যে তাকে মোটেও চিনতে পারছি না।

বাবুনকে অবাক করে দিয়ে আকাশ থেকে সত্যি সত্যিই চাঁদ নেমে এল বাবুনের ঘরে। বাবুনের মনে হল তারাভরা আকাশে যেন নূপুর বেজে উঠল। একটা শান্ত বাতাস বয়ে গেল। বাবুনের সারাঘর চাঁদের নরম আলোয় ভরে গেল। চাঁদ নেমে এসেছে বলে আকাশের আলো নিভে গেল যেন। বাবুন অবাক হয়ে দেখল চাঁদের চোখে দু-ফোঁটা জল। তবে কি চাঁদেরও কষ্ট হয়েছে বাবুনের জন্য? চাঁদ বাবুনের ঘরে ঢুকেই বলল, বাবুন, মনখারাপ করে আছ কেন? দাদুভাইকে বুঝি খুঁজে পাচ্ছো না?

জগতের বাহার

বাবুন বলল, আকাশভরা এত তারার মধ্যে দাদুভাইকে কেমন করে খুঁজে পাবো বল? ও চাঁদ, তুমি চিনিয়ে দাও না আমার দাদুভাইকে।

বাবুনের গাল টিপে আদর করল চাঁদ। চাঁদের এই আদর করার ধরন একেবারে তার দাদুর মতো। বাবুনের একবার মনে হল, তবে কি দাদুভাই-ই চাঁদ হয়ে নেমে এসেছে তার ঘরে! কিন্তু তার সন্দেহকে দূর করে দিয়ে চাঁদ বলে উঠল, বাবুন, তুমি ঠিকই বলেছ, তোমার দাদুভাই তারা হয়ে আমাদের জগতে চলে এসেছে। তোমার ওই আকুল ডাকে আমি আর আকাশে থাকতে পারলাম না। সত্যি সত্যিই চলে এলাম তোমার ঘরে। আমি তোমার দাদুভাইকে ঠিক চিনিয়ে দেব। চাঁদের কথা শুনে বাবুন তখন আনন্দে আত্মহারা। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল আকাশ এখন অন্ধকার। ঠিক যেন কালো একটা চাদর। সেই চাদরের ওপর তারারা মিটমিট করে জ্বলছে। দূরে একটা প্যাঁচা কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল। বাবুন বুঝতে পারল রাত এখন অনেক হয়েছে।

চাঁদ বাবুনের হাত ধরে বলল, তুমি কালপুরুষকে চেনো বাবুন? ওই দেখ পুব আকাশে যে তারাগুলো দল বেঁধে রয়েছে, সে আসলে একা একজন। আমাদের আকাশ পাহারা দেয়। চাঁদের কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বাবুন বলে উঠল, কালপুরুষকে চিনি বৈকি! দাদুভাই-ই তো তাকে চিনিয়ে দিয়েছে। সে নাকি আকাশের যোদ্ধা। তার কোমরে যে তলোয়ার ঝুলছে, সেই তলোয়ার দিয়ে সে দুষ্টু তারাদের ঘ্যাচাং করে কেটে ফেলে।

বাবুনের কথা শুনে চাঁদ হেসে উঠল জোরে। চাঁদের হাসিতে বাবুনের ঘর আরও বেশি ঝলমল করে উঠল। চাঁদ বলল, তাহলে তো ভাবনাই নেই। তুমি তো কালপুরুষকে চেনোই। কালপুরুষের ঠিক ডানদিকে দেখ, একটা ছোট্ট তারা ঝলমল করছে। সে-ই তোমার দাদুভাই।
বাবুন ভয় পেয়ে বলে উঠল, না-না, দাদুভাই বলেছে কালপুরুষ খুব দুষ্টু। দাদুভাই তবে ঠিক তার পাশে জায়গা করে নিল কেন?
চাঁদ হেসে বলল, তোমার দাদুভাই যে জানে বাবুন, তুমি কালপুরুষকে খুব ভালভাবে চেনো। আকাশ দেখলেই তুমি কালপুরুষকে দেখবে, আর তাকে দেখতে পেলেই, ঠিক তার পাশে তোমার দাদুভাইকেও দেখতে পাবে।

বাবুন আনন্দে চাঁদকে জড়িয়ে ধরল। বলল, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ চাঁদ। এখন আমি রোজ আমার দাদুভাইকে দেখতে পাব।

চাঁদ বাবুনের মাথায় হাত রেখে বলল, তবে আমি এবার যাই, বাবুন? দেখছ না আকাশ কেমন অন্ধকারে ভরে গেছে। তারা-রা আমাকে খুঁজছে। তাদের আলো না দেখালে কালপুরুষ যে সব ভাল তারাদেরও কেটে ফেলবে।
বাবুন ভয় পেয়ে বলল, যাও চাঁদ, ওদের আলো দেখাও। দাদুভাই যে কালপুরুষের বড্ড কাছে রয়েছে, সে যদি এই অন্ধকারে আমার দাদুভাইকে দুষ্টু তারা ভেবে কেটে ফেলে? যাও, তুমি।

চাঁদ বাবুনকে বিদায় জানিয়ে আবার আকাশে ভেসে গেল। চাঁদ আকাশে ভেসে উঠতেই অন্ধকার আকাশ আলোয় আলোয় ভরে গেল। বাবুনের ঘরে নেমে এল অন্ধকার। সে কিন্তু নিশ্চিন্তে পাশবালিশটাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

খুব ভোরে মা-র ডাকে বাবুনের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে সে দেখল ভোর হয়ে গেছে। সূর্যের নরম আলো জানালা দিয়ে বাবুনের ঘরে এসে পড়েছে। তবে কাল রাতে চাঁদ যখন আকাশ থেকে তার ঘরে নেমে এসেছিল, সেই আলো এর থেকে ঢের বেশি নরম ছিল। দাদুভাইয়ের আদরের মত। দাদুভাইয়ের জন্য আবার তার মন খারাপ হয়ে গেল। ঠিক সেইসময় বাবুনদের বাগানের গাছপালারা দুলে উঠল হাওয়ায়। পাখিদের ওড়াউড়ি আর কিচিরমিচিরে ভরে উঠল আকাশ বাতাস। বাবুনের দু-চোখের পাতায় তখনও ঘুমের ভার। সে এক লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো। বাইরের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল পৃথিবী তার সব ধন সম্পদ যেন তাকে দিয়ে দিতে চাইছে। সে আনন্দে গান গেয়ে উঠল... "দেখ রে, নয়ন মেলে জগতের বাহার..."।


ছবিঃ অঙ্কিতা নস্কর

লেখক পরিচিতি

রুচিস্মিতা​ ঘোষ

রুচিস্মিতা ঘোষ। রসায়নশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বহুদিন ধরেই ছোটদের এবং বড়দের জন্য লেখালিখি করছেন। প্রকাশিত হয়েছে অনেকগুলি বই। এই মুহুর্তে একটি লিট্‌ল্‌ ম্যাগাজিন সম্পাদনার সাথে যুক্ত আছেন।

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা