ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
গুবলুর গোয়েন্দাগিরি

ঘুমটা ভাঙতেই তড়াক করে উঠলে বসলো গুবলু। দেরি হয়ে গেলো নাকি? ঘড়িটা আবার গেলো কোথায়? হাতড়ে হাতড়ে অ্যালার্ম ক্লকটা পেলো পায়ের পাশে। ঘুমের ঘোরে হাত ছোঁড়ার চোটে মনে হয় ছিটকে গেছে। ঘড়িটা দেখে একটু নিশ্চিন্ত হল ও।  যাক মাত্র সাড়ে তিনটে বাজে। বেশি আগে উঠে পড়েছে ও টেনশনের চোটে। ওই লোকটা রোজ ঠিক ভোর সাড়ে চারটেয় বেরোয়। তা তাহলে এতক্ষন করে কী ও? এই শেষরাত্তিরে উঠে একটু যেন খিদে খিদেও পাচ্ছে।  অগত্যা বাধ্য হয়েই রান্নাঘরে গিয়ে হাতড়ে হাতড়ে চানাচুরের কৌটোটা বের করলো গুবলু। আলো জ্বালাবার উপায় নেই। মা জানতে পারলে পিঠে বেশ কয়েক ঘা পড়ার প্রবল আশংকা আছে। কৌটোতে বেশ অনেকটা চানাচুর আছে। এটা আর কালকে বিকেলে কেনা কুলের আচারটা শেষ করতে করতেই লোকটা এসে যাবে মনে হয়।

তা গুবলু যতক্ষণ চানাচুর আর কুলের আচারে ব্যস্ত ততক্ষন ওর সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দি না হয়। গুবলুর ভালো নাম অনন্য, অনন্য সেনগুপ্ত। কিন্তু ঘরে,বাইরে, স্কুলে সব জায়গায় ও গুবলু বলেই পরিচিত। ঘরে তাও ওর অতটা গায়ে লাগে না। কিন্তু স্কুলে যখন স্যার বা অন্য ক্লাসের ছেলেগুলোও এসে ওকে গুবলু ডাকে তখন প্রেস্টিজ পুরো গ্যামাক্সিন। আজকাল তো টুইশনির মেয়েগুলোও ওকে গুবলু বলে গাল টিপে দিয়ে যায়। গুবলুর এই সাড়ে সর্বনাশের জন্য একমাত্র দায়ী হলো বড় জেঠু। গুবলুকে নিয়ে ওর মা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ঢুকতেই জেঠু বলেছিলো "এ তো দেখি পুরো গুবলু।" সেই থেকেই গুবলু নামটা শনির মতন ওর গায়ে সেঁটে আছে। ওর পাড়ার দুচারটে বন্ধু ওর ক্লাসেই পড়ে। কাজেই নামটা সেখানে ছড়াতেও দেরি হয়নি। গুবলু সবাইকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছে, একজন নামকরা গোয়েন্দার ডাকনাম কখনোই গুবলু হতে পারেনা। কিন্তু কেউ পাত্তা দিলে তো। ওর গোয়েন্দা হবার ইচ্ছেটার মতোই নাম পরিবর্তনের ইচ্ছেটাও এক ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
 গোয়েন্দা হবার কথাটা বলিনি বুঝি? গুবলু ক্লাস সিক্সে পড়লে কি হবে? ও একেবারে গোয়েন্দা গল্পের পোকা। ফেলুদা, কিরীটি ব্যোমকেশ তো বটেই, শার্লক হোমস, এরকিউল পোয়ারো, মিস মারপল, ফাদার ব্রাউন কারোকেই পড়তে বাকি রাখেনি সে। ওর খুব ইচ্ছে ও বড় হয়ে গোয়েন্দা হবে। কিন্তু সে কথা তুললেই বাড়ির লোকে হাঁ হাঁ করে তেড়ে আসে। এটার মূলেও সেই বড়জেঠু। সেভাবে দেখতে গেলে গুবলুর জীবনের সব কটা বড় বড়  সমস্যার মূলেই বড়জেঠু মিলিটারি গোঁফ আর রাশভারী নজর নিয়ে বসে আছেন।

ব্যাপারটা বরং তাহলে একটু খুলেই বলা যাক। গুবলুর কালান্তক নামটা বড়জেঠুর অবদান তো বটেই। তারপরে ধরো গুবলু একটু খেতে ভালবাসে সে সাধেও বড়জেঠু বাদ সেধে রেখেছে। গুবলুর চেহারাটা সত্যিই একটু নাদুসনুদুস টাইপের। একটু নেয়াপাতি ভুঁড়িও আছে। বড় জেঠুর ফেভারিট পাসটাইম হলো, গুবলুকে দেখলেই ওর পেটে একটা আঙুলের খোঁচা মেরে বলা "ওহে গুবলেকুমার, পেটের পাঁচ নম্বরটা এবার মাঠে নামালে হয় না? এভাবে চললে তো এবার নিজেই ফুটবল হয়ে যাবি। লোকে তখন ফুটবলের বদলে তোকে নিয়েই মাঠে খেলতে নামবে" সাথে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাড়জ্বালানি হাসি।

শুধু তাই নয়, বড়জেঠুর পাল্লায় পড়ে গুবলুকে আজকাল রোজ সকাল ৫:৩০ টায় উঠে ঢকঢক করে এক গ্লাস পঞ্চতিক্তের রস খেয়ে মাঠে ছপাক দৌড়াতে হয়। ফাঁকি মারার বিলকুল উপায় নেই, কারণ বড়জেঠুও ওই একই সময়ে পঞ্চতিক্তের রস খেয়ে ওর সাথেই দৌড়াতে  যায়। কাজেই বেচারি গুবলু যে রসটা ফেলে দেবে সে উপায়ও নেই। ফিরে এসেও কি রক্ষা আছে? বড়জেঠুর কড়া তত্ত্বাবধানে আখের গুড় আর ছোলা খেয়ে পড়তে বসা, তারপরে চান করে, ভাত খেয়ে  স্কুল। সেখান থেকে ফিরেও শান্তি নেই, এক গ্লাস দুধ খেয়ে মাঠে দৌড়াতে যেতে হয়, তারপর রাতের পড়াশুনো। রাতের খাওয়ার পর  আধ ঘন্টার ছুটি পায় গুবলু গল্পের বই পড়ার  জন্য। কিন্তু তিরিশ মিনিট শেষ হলেই বড়জেঠু এসে আলো বন্ধ করে দেয়।
 
গুবলুর আগে এতো সমস্যা ছিলনা। বড়জেঠু মিলিটারিতে চাকরি করত, ছুটিছাটায় বাড়ি এসে গুবলুকে ধরত বটে কিন্তু ঠাকুর, ঠাকুর করে দিন পনেরো কাটিয়ে দিতে পারলেই গুবলু আবার বছরখানেকের জন্য নিশ্চিন্ত। মুশকিলটা হয়েছে বড়জেঠু মাসছয়েক হলো রিটায়ার করে বাড়ি এসে বসায়। সেই থেকে গুবলুর এই সর্বনেশে রুটিন। সাথে আচার, ভালো মন্দ খাওয়া সব বন্ধ। মা, জেঠিমারা ওর হয়ে দু তিনবার মিনমিন করে দরবার করেছিল বটে  কিন্তু বড়জেঠু কারোকেই পাত্তা দেয় নি। জেঠুর সেই এক কথা "কর্নেল সেনগুপ্তের ভাইপো এরকম গোবরগণেশ হয়ে বড় হবে নাকি? আর ওসব তেতো খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।  আমিও তো রোজ সকালে ওর সাথেই তেতোগুলো খাই।  আত্মসংযম  শিখতে হয়। এই যে  আমি এত মিষ্টি ভালোবাসি, যবে থেকে আমার সুগার  ধরা পড়েছে একটাও মিষ্টি  খেতে দেখেছো?" বড়জেঠি খ্যারখ্যার করে বলে ওঠে "কিন্তু, তাতেও তো সুগার কমার কোনো নাম নেই। এবার থেকে ভাতের পাতে রোজ দুবেলা করলা সেদ্ধ দেব। কিন্তু ওই বাচ্চা ছেলেটার তো সুগারও হয়নি। এই বয়েসে যদি একটু আশ মিটিয়ে না খায় তো কবে  খাবে?"  কিন্তু মিলিটারি জেঠুর মতামত নাড়ায় সে সাধ্যি কার আছে? বেচারি গুবলুর ওই ভয়ংকর রুটিনই বহাল থাকে।
 
তা বড়জেঠুর যতই আত্মসংযম থাক, গুবলুর তাতে কি? গুবলুর খুব ইচ্ছে করে বড়জেঠুকে জিগেস করবে "তুমি কি ছোটবেলাতেও আত্মসংযম করতে?" কিন্তু সেসব জিগেস  করলে পাছে  বড়জেঠু ওকেও করলাসেদ্ধ খাইয়ে দেয় সেই ভয়েই নেহাত জিগেস করে উঠতে পারছে না গুবলু। সব মিলিয়ে গুবলুর এখন ঘোর দূর্দিন। গুবলু প্রায় ভাবব ভাবব করছে যে ও গোয়েন্দা ছেড়ে সন্ন্যাসী হবার প্ল্যান করবে কিনা।  ক্লাসে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড জীয়নকেও বলে ফেলেছে সেই সব প্ল্যান। গুবলুর প্ল্যানে এখন শুধু একটাই  বাধা। জীয়ন বলেছে সন্ন্যাসী হতে গেলে সোয়েটার পরা চলবে না. হিমালয়ের বরফের মধ্যেও নাকি গুবলুকে খালি গায়ে বসে তপস্যা করতে হবে। এদিকে গুবলুর আবার ভীষণ ঠান্ডা লাগে। শীতকালে ঠান্ডা জলে চান করার নাম শুনলেও কান্না পায়। একটা কেন, দুটো সোয়েটার পরলেও মনে হয় শীত করছে। ও খুব মিন মিন করে জীয়নকে জিগেস করেছিল, "সোয়েটার পরে তপস্যা করলে হবেনা?" জীয়ন তাতে খুব গম্ভীর হয়ে বলেছে  "সোয়েটার পরলে কেন, শুধু সোয়েটার পরার কথা ভাবলেই নাকি সন্ন্যাসী হবার পরীক্ষায় ফেইল করিয়ে দেয়." তা সেসব জীয়ন জানবে, ওর দাদুর বেস্ট ফ্রেন্ড সন্ন্যাসী হয়ে  গেছিল। তাই দাদুর থেকে শুনে শুনে সন্ন্যাসী হবার সব নিয়মকানুন ও জানে। এই সোয়েটার সংক্রান্ত সমস্যাটা সল্ভ হলেই গুবলু সন্ন্যাসী হয়ে যাবে ঠিক করেছে। এই মিলিটারি জীবন আর সহ্য হচ্ছে না।  

তা এই রকম যখন গুবলুর মনের অবস্থা, সেই সময়েই লোকটাকে ওর চোখে  পড়েছিল।  বড়জেঠুর পাল্লায় পরে রাত্তিরে তো ভালো খাওয়া শিকেয় উঠেছে ওর।  রোজ রাতে গুনে গুনে দুটো রুটি, সব্জিসেদ্ধ আর হালকা চিকেনের ঝোল জোটে ওর। বাড়িসুদ্ধু সকলেরই একই দোষ ওদের। কষা মাংস বা লুচি এধরনের ভালো খাবার গত মাস ছয়েকের মধ্যে চোখে দেখেনি ও।  একদিকে এই ট্যালটেলে খাবার খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পরার দশা, তার ওপরে আবার সেদিন দৌড়াদৌড়ির চোটে ক্লান্ত হয়ে ও খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। শেষ রাত্তিরে খিদের চোটে ঘুম ভেঙে বিস্কুটের খোঁজে বেরিয়েছিল গুবলু। তখনই হঠাৎ দোতলার বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে লোকটাকে দেখতে পায় ও।  একটা নস্যি রঙের চাদর আগাগোড়া মুড়ি দিয়ে লোকটা চুপি চুপি ওদের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে। তারপরে হঠাৎ যেন নিশ্চিন্ত হয়ে লোকটা হনহন করে কোথায় চলে গেলো। গুবলুর তো তখন কৌতূহল তুঙ্গে উঠেছে। খিদে ভুলে ও বারান্দার ফাঁকে উঁকি  ঝুঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করছিল লোকটাকে যদি দেখা যায়।  মিনিট পনেরো বাদেই লোকটা আবার এসেছিল। তারপর আবার ঘাড় উঁচু করে এদিক ওদিক দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে সুট করে ওদের গেট টা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল লোকটা। কিন্তু গুবলু সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই যে লোকটা কোথায় চলে গেলো ও আর টের পেলোনা।

গুবলুদের বাড়িটা বেশ অনেকটা জায়গার ওপরে আর পাঁচিলটাও জায়গায় জায়গায় ভাঙা। তাই অনেকেই ওদের বাগানের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট করে।  কিন্তু এই লোকটার আচার আচরণ বেশ সন্দেহজনক। একে তো তখন বাজে ভোর সাড়ে চারটে তার ওপরে লোকটা আগাগোড়া চাদর মুড়ি দিয়ে ছিল।  সময়টা শীতকাল হলেও ব্যাপারটা একটু সন্দেহজনক আর সব থেকে বড় কথা, লোকটা দুবার করে ওদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে কি দেখছিল? সেদিনই স্কুলে গিয়ে জীয়নকে পুরো গল্পটা খুলে বলেছিল গুবলু। জীয়ন সব শুনে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল "হাইলি সাসপিশাস। তুই লোকটা কোথায় গেলো দেখতে পেয়েছিলি?" "নারে, বারান্দা থেকে নিচে নামতে নামতেই লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেলো।" জীয়ন একটু ভেবে বলল "তোর কি মনে হয়? লোকটা কে আর তোর বাড়ির দিকে দেখছিলোই বা কেন?" "আমার মনে হয়, লোকটা বড়জেঠুর কোন পুরোনো শত্রু হতে পারে, জানিস? কারণ বড়জেঠু তো মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে ছিল, অনেকেই বড়জেঠুর ওপর রেগে আছে।  না হলে এরকম শেষ রাত্তিরে এসে আমাদের বাড়িটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে কেন? লোকটা জানিস বেশ ঘুরে ঘুরে আমাদের বাড়িটা দেখছিল। হয়তো কোন ফাঁকফোকর খুঁজছিল, যেখান দিয়ে ও বাড়িতে ঢুকবে। তবে বড়জেঠুকে তো আর চেনে না, বাড়িতে পঞ্চাশটা তালা লাগিয়ে ঘুমোতে যায়।" "তুই তাহলে এক কাজ কর। কদিন একটু লক্ষ্য করে দেখ, লোকটাকে আর দেখতে পাস কিনা। যদি লোকটা রোজ আসে তখন না হয় আমরা একটা প্ল্যান করব।  আমি কিন্তু এতে তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হব."

নতুন রহস্যের আমদানিতে গুবলুর এখন উদার মন।  তার ওপরে সত্যি যদি বড়জেঠুকে এই লোকটার হাত থেকে ও বাঁচাতে পারে তাহলেও কি বড়জেঠু আর ওর ওপর এতো অত্যাচার করবে? একটু কি কৃতজ্ঞতাও থাকবে না? তাই ও জীয়নকে বলেই ফেললো "দাঁড়া কদিন দেখি, যদি লোকটা রোজ আসে তাহলে লোকটাকে এরপর ফলো করব।  আমাদের বাড়িটা দুবার দেখার মাঝে লোকটা কোথায় যায় জানতে হবে। ওটুকু জানলেই দুজনে একসাথে প্ল্যান করবো লোকটাকে কি ভাবে ধরা যায়।" যে কথা সেই কাজ। গুবলু পর পর কদিন রোজ অ্যালার্ম দিয়ে সোয়া চারটেয় উঠে লক্ষ্য করেছে যে লোকটা রোজ ঠিক সাড়ে চারটে নাগাদ ওদের বাড়ির সামনে আসে।  খুব মন দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাড়িটা আগাগোড়া লক্ষ্য করে হনহন করে চলে যায়, তারপর আবার মিনিট পনেরো পর ফেরত আসে, বাড়িটা আবার ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে সুট করে মিলিয়ে যায়। ফেরার সময় একদিন গুবলু লক্ষ্য করেছিল লোকটার হাতে চাদরের তলায় কিছু একটা ধরা আছে।" সেটা যে কি সে ব্যাপারে গুবলু আর জীয়ন এখনো এক মত  হতে পারেনি। গুবলু এক্কেবারে সিওর যে লোকটা রোজ ওদের বাড়ির তলায় এসে ডিনামাইটের স্টিক পুঁতছে পুরো বাড়িটাকে একেবারে উড়িয়ে দেবে বলে আর জীয়নের মতে লোকটা স্পাই, জেঠুর কাগজপত্র চুরির মতলবে ঘুরছে, কারণ স্পাই না হলে রোজ একই সময়ে আসবে কেন? তবে লোকটা যে খারাপ আর বড়জেঠুর পেছনেই পড়েছে সে ব্যাপারে ওরা দুজনেই মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ গুবলুর বাবা বা মেজজেঠু দুজনেই এমনি ব্যাংকে আর আইটিতে চাকরি করে তাই তাদের পেছনে দুষ্টু লোক ঘোরার চান্স কম।  

এক সপ্তাহ কেটে গেলো এরকমভাবে। গুবলু লোকটাকে রোজই দেখেছে। এদিকে বাড়ির মিলিটারি রুটিন তো চলছেই। গুবলু তাই ঠিক করেছে এবার একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।  এবার একদিন গিয়ে দেখতে হবে লোকটা ওই ১৫ মিনিটে কোথায় যায়।  সেটুকু জানা গেলে নয় পুলিশ বা বড়জেঠুকে বলা যাবে। কিন্তু একটা লোক রোজ সকালে আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে একথা বললে যে বড়জেঠু পাত্তাও দেবেনা সেটা গুবলু ভালোই জানে। উল্টে বড়জেঠুর ওকে ক্ষেপানোর তালিকায় আরেকটা নতুন আইটেম যোগ হবে। নাহ, এব্যাপারটা আরেকটু জেনেশুনেই জেঠুকে বলা ভালো, কে জানে সত্যি যদি লোকটাকে ধরিয়ে দিতে পারে গুবলু তবে হয়তো ওর গোয়েন্দা হবার প্ল্যানটাও সবাই সিরিয়াসলি নিয়ে নেবে।

পরের দিনই টিফিনে খেতে খেতে জীয়নকে ওর প্ল্যানটার কথা বলে ফেললো গুবলু। জীয়নও খুব উত্তেজিত। তবে কিনা ভোর সাড়ে চারটেয় বেচারির বাড়ি থেকে বেরোবার উপায় নেই। উপায় যে গুবলুরও খুব আছে তা নয়, বাড়ি তো আগাগোড়া তালা বন্ধ আর চাবি জেঠুর কাছে। তবে কি, বাড়ির পেছনের আমগাছটার একটা
ডাল একেবারে ছাদে নেমে এসেছে, সেটা বেয়ে গাছে উঠতে পারলেই নেমে আসা একেবারে জলভাত। আর বড়জেঠুর পাল্লায় পরে গুবলুর আজকাল শারীরিক উন্নতি হয়েছে অনেক। এখন সে অনায়াসেই একটুও না হাঁপিয়ে মাঠে ছপাক দৌড়াতে পারে আর গাছের ডাল বেয়ে ওঠা নামাটাও জেঠু শিখিয়েছে মিলিটারি ট্রেনিঙের পার্ট হিসেবে। কাজেই সেদিকে চিন্তা নেই। চিন্তা শুধু লোকটার নজরে না পড়ে কী করে লোকটাকে ফলো করা যায় সেই নিয়ে। জীয়ন হঠাৎ বললো "আইডিয়া! গুবলু তুইও একটা চাদর মুড়ি দিয়ে লোকটার পেছন পেছন যা, তাহলে লোকটা তোকে চিনতে পারবে না।" "তোর কি মাথা খারাপ নাকি? চাদর মুড়ি দিয়ে আমি গাছ বেয়ে নামবো?" "আহা তা কেন? একটা ব্যাগে চাদরটা ঢুকিয়ে নে, তারপর গাছ থেকে নেমে চাদর গায়ে লোকটাকে ফলো করবি।" এই প্ল্যানটা মন্দ নয়, আরো দুতিনবার খতিয়ে দেখলো ওরা। গাছ থেকে নেমে গুবলু চুপিচুপি লোকটার পেছনে গিয়ে দেখবে লোকটা কার সাথে দেখা করে, তারপর মোটামুটি ব্যাপারটা বুঝতে পারলে, বড়জেঠুকে ডেকে এনে লোকটাকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেবে।

যে কথা সেই কাজ। গুবলু আগের দিন রাতেই ব্যাগ ট্যাগ  সব গুছিয়ে রেখেছে, চাদর, টর্চ, একটা দড়ি, হুইসিল সব রেখেছে ব্যাগের মধ্যে। পরদিন সকালেই একটা এস্পার ওস্পার হবে। আজকেই সেই দিন। আর সেজন্যই গুবলু রাত সাড়ে তিনটে থেকে বসে আছে উত্তেজনার চোটে আর আচার খাচ্ছে। আচারটা খেতে খেতেই হঠাৎ সোজা হয়ে বসলো গুবলু, লোকটাকে কি ভাবে ফলো করবে সেটা ভাবতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই ভুলে গেছিল ও। হঠাৎ নজর পড়তেই দেখলো চারটে পঁয়ত্রিশ। এক ছুটে বারান্দায় গিয়ে দেখলো, লোকটা এসে গিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাড়ির চারপাশটা লক্ষ্য করছে। তার মানে গুবলুর হাতে মিনিট পাঁচেক আছে গাছ বেয়ে নিচে নামার জন্য। এক ছুট্টে  ঘরে গিয়ে ব্যাগটা নিয়েই গুবলু তরতর করে তিনতলার ছাদে উঠে গেলো, এরপর গাছের ডাল ধরে নিচে নামা আর মিনিট পাঁচেকের ওয়াস্তা। আমগাছের আড়াল থেকেই গুবলু লক্ষ্য করলো লোকটা চাদরটা ভালো করে মুড়ি দিয়ে এবার হাঁটা শুরু করেছে। গুবলুও একটু দূরত্ব রেখে লোকটার পিছু নিলো।

 গুবলুর গোয়েন্দাগিরি

ওর পায়ে কেডস, তাই শব্দ হবার আশংকা নেই। কিন্তু ওর বুকটা এত জোরে জোরে ঢিবঢিব করছে যে গুবলুর ভয় করছে লোকটা ওটা শুনেই ওকে ধরে ফেলবে। গুবলু প্রানপনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো। "আমি অনন্য সেনগুপ্ত, বিখ্যাত গোয়েন্দা। এরকম একটা বাজে লোকের সাধ্য কি আমাকে ধরে?" এসব বলতে বলতে নিজেকেই নিজে সাহস দিতে দিতে হাঁটতে লাগলো গুবলু। বাপস কি জোরে হাঁটে রে লোকটা, ওর সাথে পাল্লা দিতে গুবলুকে হাফ দৌড়াতে হচ্ছে প্রায়। এই প্রথম বড়জেঠুর ট্রেনিংকে মনে মনে থ্যাঙ্কস দিলো গুবলু। আগে হলে এতক্ষনে বেদম হয়েই হাল ছেড়ে দিতো ও। আরো একটু হেঁটে গলির মোড়ে পৌঁছে গেলো লোকটা। আরেকটা লোক ওখানে আগের থেকেই দাঁড়িয়ে আছে একটা সাইকেল নিয়ে। সাইকেলে অনেকগুলো কিসব বস্তা ঝোলানো। গুবলুর বুকটা ঢিবঢিব করতে লাগলো আরো জোরে। ওই সাইকেলে করেই ডিনামাইটের সাপ্লাই দেয় লোকটা নির্ঘাত। কৌতূহলে, উত্তেজনায় নিজের অজান্তেই কখন এগিয়ে গিয়েছিল গুবলু। লোকদুটো তখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
সাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো লোকটা তখন চাদর মুড়ি দেওয়া লোকটাকে বলছে, "সব প্যাক করা আছে. তাড়াতাড়ি ঢুকিয়ে  ফেলুন অন্য কেউ দেখে ফেললে কিন্তু মুশকিলে  পড়বেন।" "হ্যাঁ বাবা, তাড়াতাড়ি দে, এটা ঝট করে নিয়েই বাড়ি ঢুকে যাবো। ভাগ্যিস এত সকালে আর কেউ ওঠে না।" চেনা গলাটা কানে আসতেই সব কিছু ভুলে গুবলু চেঁচিয়ে উঠলো "বড়জেঠু!!! তুমি এখানে  কী করছো? এই লোকটা কে?" গুবলুর গলাটা কানে যেতেই চাদর মুড়ি দেওয়া বড়জেঠুর হাত থেকে প্যাকেটটা ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। "একি গুবলু!! তুই এখানে কী করছিস?" "বারে, আমি তো তোমাকে ফলো করেই এখানে এলাম, তোমাকে রোজ সকালে চাদরমুড়ি দিয়ে বেরোতে দেখে সন্দেহজনক লেগেছিল তাই। তা এই লোকটা কে? তুমি রোজ এর সাথে দেখা করো কেন?" দ্বিতীয় লোকটা এতক্ষনে একগাল হেসে বলল "আমাকে চিনতে পারলেনা গুবলুবাবু? আমি রসিক শিউলি গো. আমার থেকে মাঝে মাঝে খেজুরের রস খাও না?" রসিক শিউলি, বড়জেঠুর সন্দেহজনক আচরণ আর একটাও মিষ্টি না খাওয়া, গুবলুর তখন সব অঙ্ক মিলে গেছে। ও একেবারে ইউরেকার ভঙ্গিতে বলে উঠলো "বড়জেঠু, তুমি রোজ সকালে লুকিয়ে লুকিয়ে খেজুরের রস খাও আর গুড় নিয়ে বাড়ি ফের। আর সেই জন্যই তুমি সারাদিনে একটাও মিষ্টি খাও না। কি ঠিক বললাম তো? আর আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে এরকম বলতে থাকো" বড়জেঠুকে তখন চেনা যায়না, লজ্জায় অধোবদন চেহারা। কোনোমতে মাথা নেড়ে সায় দিলেন প্রতিটি কথা সত্যি। "কী করব বল? তোর জেঠির পাল্লায় পরে সারাক্ষণই তো খালি করলা খেয়ে যাচ্ছি। একটু যদি মিষ্টি না খাই তাহলে তো  উঠব নারে। তবে গুবলু দেখ, যেটুকু করেছি তোর ভালোর জন্যই করেছি। আজকে ওই সব ডায়েট ফলো করে আর দৌড়াদৌড়ি করে তোর চেহারাটা আগের থেকে কত ভালো  হয়েছে।" "সেটা ঠিক, আজকে ফিট না থাকলে হয়তো তোমাকে ধরতেই  পারতাম না। তবে জেঠু আমি যে গোয়েন্দা হিসেবে আমার প্রথম কেসটা ঠিকঠাক সল্ভ করেছি সেটা কিন্তু সেটা কিন্তু তোমাকে স্বীকার করতেই হবে।" "সেটা অবিশ্যি ঠিক। তুই খুব ভালো গোয়েন্দাগিরি করেছিস। তবে গুবলু, তুই কি এই খেজুরের রস আর গুড়ের কথাটা বাড়িতে বলে দিবি? তোর জেঠি তো তাহলে আর আমাকে আস্ত রাখবে না রে।" "আচ্ছা, বলবো না, কিন্তু তিনটে শর্ত আছে, প্রথমত তুমি মিষ্টি খাওয়াটা একটু কমাবে, দ্বিতীয়ত আমার একটু আধটু মিষ্টি ভাজাভুজি খাওয়া অ্যালাও করবে আর তৃতীয়ত আমার গোয়েন্দাগিরিতে সাপোর্ট দেবে। তবে জীয়নকে কিন্তু বলতেই হবে। ও আমার গোয়েন্দাগিরির অ্যাসিস্ট্যান্ট তো।" জেঠু এতক্ষনে একগাল হেসে বললেন "ঠিক আছে, তোর প্রথম সাকসেসফুল কেসের অনারে আজকেই বিরিয়ানি হয়ে যাক। আমিই খাওয়াবো বাড়িসুদ্ধু সবাইকে। জীয়নকেও ডেকে নিস। তবে দৌড় আর পঞ্চতিক্ত কিন্তু চালু থাকবে।"

সেদিন সকালে দৌড় থেকে বাড়ি ফিরেই গুবলু বলল "মা, আজ বিকেলে রান্না করোনা। বড়জেঠু আজ রাত্রে আমাদের সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াতে নিয়ে যাবে বলেছে।" তিনটে গলা তিনদিক থেকে একসাথে শোনা গেলো "তোর বড়জেঠু?" "বিরিয়ানি?" " খাওয়াবে?" গুবলু মিচকি হেসে হ্যাঁ বলেই জামাকাপড় ছাড়তে ঘরের দিকে দৌড়ালো। বাড়ির লোককে এবার জেঠু সামলাক, ওর এখন তাড়াতাড়ি জীয়নকে ফোন করে পুরো গল্পটা বলা দরকার।

 

ছবিঃ নভনীল দে

লেখক পরিচিতি

রোশনি ঘোষ

শিক্ষা ও চাকুরীসূত্রে গত দশ বছর ধরে নিউ ইয়র্কবাসী। আপাতত একটি বায়োটেক কোম্পানিতে পেটেণ্ট এজেন্ট আর রাত্রিবেলায় পার্ট টাইম ল স্টুডেন্ট। এর ফাঁকে সময় পেলে গল্পের বই পড়তে, ছবি তুলতে আর জমিয়ে রাঁধতে ভালোবাসেন। চাকরি আর স্কুলের কড়াকড়ি থেকে ছাড়া পেলে বেড়াতে যাওয়াটাও আরেক শখ।

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা