ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ছায়াসবুজ

আইসক্রিম ভূতটা আছেই। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফ্লাইওভার থেকে নেমে গাড়িটা যেখানে বড় রাস্তায় বাঁক নেয়, ঠিক সেখানে।
- আজকেও ছিল মা।
- ছিল তো। সঙ্গে ম্যাগিভূতও ছিল। আর চিপস পেত্নি।
এই জন্যই মা বাবাদের নতুন কিছু বলার কোনও মানে হয় না। রাতুল, বিন্নিকে বললে প্রুফ দেখতে চাইবে। পিকস্। অথবা ভিডিও।
কিন্তু ছবি তুললে কিছুই আসছে না।
- ঠাম্মা হেল্প। তোমার ফোনটা কাল দিও।
- ভূত, জিন এদের ছবি ওঠে না বাবা।
- ওঠে। ইউটিউবে হাজার হাজার ভিডিও আছে। তবে ওদের ক্যামেরা গুলো বোধহয় অন্য ভাবে বানানো।
চার মাস হল রিজুরা এই টাউনশিপে এসেছে। স্কুল যাওয়ার নতুন রুটে একটা ফ্লাইওভার ঢুকে গেছে। রণিদা একদিন ঐ বড় রাস্তাটায় পড়ার মুখে গাড়িটা দাঁড় করিয়েছিল। রেডিয়েটারে জল ঢালতে। সেদিন প্রথম ভূতটাকে দেখা। ফিকে সবুজ। কিন্তু জমাট সবুজ। মেগাপিক্সেল ক্যামেরার ফোকাসের মত চোখে ধরতে পারছিল না শুরুতে। ফুটে উঠেছে। একটু একটু করে। স্লোওলি। একটা বড় কিছু। থ্রি ডি। নড়ছে। মানে দুলছে। রণিদা বলল কিছু নেই। উলটে রিজুর চশমাটা ধুয়ে দিল। তার মানে এলিয়েন নয়। এলিয়েন বেছে বেছে দেখা দেয় না। ভূত দেয়। রিজুর ঘাড়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেছিল। বুকের ভেতর ধুন্ধুমার। ভূতটা ওখানে কি করছে?
গাড়িতে উঠে রিজু আর একটা কথা বুঝেছিল। ভূতটা বেশ ঠান্ডা। এতক্ষণ ওর ঠান্ডা লাগছিল।

ইন্টারনেটে কোথাও এমন ভূতের কথা নেই। সবুজ রঙের ডেমন হয়। পোল্টারজিস্ট ও দেখা গেছে। কিন্তু সেগুলো আলাদা। একেবারেই এর মতন নয়।
এর মধ্যে আরও দুদিন ও ভূতটাকে দেখেছে। গাড়ি থেকে নামা হয়নি। মা না বলে রাখলে রণিদা রাস্তায় কোথাও গাড়ি থামাবে না।
ফের একদিন সুযোগ। রণিদাকে কী একটা কাজে ওখানেই থামতে হল। দুপুর দুটো। ডাবল লেন রাস্তার দুই ধারে চওড়া ফুটপাথ। এখানে কেউ হাঁটাহাঁটি করে না। হুস হুস করে গাড়ি চলে যায় শুধু।
ভূতটাকে একটু কাছ থেকে দেখাটা দরকার। এটা একটা অ্যাডভেঞ্চার। মাথা ঝাঁকিয়ে সাহসটাকে এক জায়গায় জড়ো করতে যতক্ষণ। তাছাড়া বড়মা একটা মন্ত্র শিখিয়েছিল। - ভূত আমার পুত, পেত্নি আমার ঝি, হিংটিংছট থাকলে বুকে ভয়টা আমার কী!
একটু প্রিমিটিভ শুনতে। কারণ এসব সেই ঠাকুরমার ঝুলির সময় লেখা তো, তাই। তবে বিড়বিড় করলে ভয়টা কমছে। সত্যিই।

কিন্তু এত কাছ থেকেও হাত দিয়ে ধরা যাচ্ছে না তো! ভূতের কি সত্যিই ম্যাটার থাকে না? কেমন যেন আছে কিন্তু নেই? শুধু ঠান্ডা। শিরশিরে ঠান্ডা। আর সবজে আলো। চারদিকে। আর কিসের যেন শব্দ। অনেক শব্দ। মিউজিকাল। কোরাস। চোখটা ঘুমে টানছে রিজুর।
হাত পা এলিয়ে শুয়ে পড়লে বেশ হয়।

হঠাৎ সবকিছু ভ্যানিশ। ঘুমটাও।
রণিদা। ছোঁ মেরে তুলে কোথায় একটা বসিয়ে দিয়েছে।
- তুমি ঐ মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে কী করছিলে রিজু! ওটা একটা ম্যানহোল! আর অত গাড়ি যাচ্ছে! অতবার বললাম গাড়ির থেকে নেম না....
রণিদা বকছে। খুব রেগে গেছে।
আচ্ছা, একজন রোগামত বুড়ো মানুষ এদিকে তাকিয়ে আছে কেন? ও-ও কি ভূত?
রণিদা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বলল, আমার বাবা। উনিই দেখালেন তুমি মাঝরাস্তায় হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছো। বাবার ব্যাঙ্কের কাগজ দিতেই তো গাড়ি দাঁড় করালাম। শিক্ষা হল বটে।
রিজুর কানে সব ঢুকছে না। ডেঙ্গুর সময়ে এমনটা হত। সব আবছা।

ছায়াসবুজ

যে বেঞ্চে রিজু বসে আছে তারপাশে একটা রিকশা দাঁড় করানো।
- ওটা আমি চালাই দিদি। ঐ দেখ ওদিকে আমাদের স্ট্যান্ড। বুড়ো মানুষটা হেসে বলল।
রিকশা চড়তে রিজু ভীষণ ভালোবাসে। খুব কম চড়তে পায়।
- তুমি চাপবে দিদি? এখান থেকে আমার সঙ্গে রিকশা চেপে বাড়ি যাবে?
মনের কথা যে এমনভাবে বুঝে যায়, সে কি ভূতটাকে দেখতে পাবে?
কিন্তু কিছু বলার আগেই রণিদা ওর বাবাকেও ধমকে দিল। রিজুর এখন জেদ করতে ইচ্ছে করছে না। নইলে রিকশা চেপেই বাড়ি ফিরত। আর দাদুটার মুখটাও কেমন মাথায় হ্যালোওয়ালা হাসিহাসি ইমোটিকনের মত।
- ও দাদু। একটা কথা।
গাড়ির জানালা দিয়ে মুন্ডু বের করে রিজু ডাকল।
রণিদা ড্যাশবোর্ডে কী সব গোছাচ্ছে।
- তুমি ঐখানে কখনও সবুজ রঙের আইসক্রিম ভূতটাকে দেখেছো?
হাসিমুখটা কেমন যেন অন্যকিছু হয়ে গেল। একবার রণিদার দিকে তাকিয়ে আলতো গলায় বলল - উনি ভূত নন গো দিদি। উনি ছায়া। তুমি ওখানে আর যেও না। উনি ভালো করতে গিয়ে শেষে বিপদ ডেকে আনবেন।
- মানে?
মানেটা শোনার জন্য জেদটা করতেই হল রিজুর। বড়দের সহজে বোঝানো যায় না কিনা।

ক্রেয়নের সবুজটা খুব হালকা করে বুলোলেও ঐ ফিকে সবুজটা হবে না। হাজারঝুরি বটগাছটা কেটে ফেলার সময়ে নাকি অসময়ে বৃষ্টি হয়েছিল। সাতদিন ধরে। বন্ধ ছিল ব্রীজ তৈরির কাজ। গুঁড়িটা উপড়ে যে মস্ত গর্তটা হয়েছিল সেটা দিয়েই নেমেছিল জল। তারপর থেকে ঐটুকু সবুজ নাকি হাওয়ায় থেকে গেছে। কেউ কেউ দেখতে পায়। তবে ফিকে হয়ে আসছে দিনদিন। দাদু বলল তার ছায়ায় রোগ সারত, তার হাওয়ায় আয়ু বাড়ত, তার বয়স ছিল আকাশের দেবতাদের সমান। আয়ু মানে লাইফলাইন।

মাকে, বাবাকে, রাতুলের মা, বিন্নির বাবা আর সবাইকে জানাতে হবে, ওরা না জেনে চলে এসেছে থাকতে এমন এক জায়গায় যার লাইফলাইন কমে গেছে। যাচ্ছে। ওরা কেউ জানে না অন্যের জিনিস জোর করে নিয়ে তৈরি করা এই বাড়িঘর, পার্ক, সুইমিংপুল। এটা সুপারভিলেনদের কাজ। একদিন রিজুদেরও সব কিছু কেড়ে নিতে পারে ওরা। হাজারঝুরি গ্রামের লোকগুলোর মতই হারিয়ে যেতে পারে রিজুরাও। সে সব হওয়ার আগেই চলে যেতে হবে। হাজারঝুরির ছায়া পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই। খুব শিগগির।


আর একটু কথা –

শহর কিন্তু জন্ম থেকেই শহর থাকে না। একটু একটু করে গড়ে ওঠে। বেড়ে ওঠে। নানা কারণে বাড়ে। তবে মূল কারণ ব্যবসা বাণিজ্য। কোনও একটা ব্যবসা থেকে শুরু হয় অন্য ব্যবসা। যেমন ধর, আজকে কেউ কাপড়ের কারখানা খুললে পাশে জামাপ্যান্টের দোকান সার দিয়ে বসে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। ব্যবসা বাড়লে মানুষও বাড়ে। কেনাকাটার জন্য নয়। কাজ পাওয়ার জন্য। যাদের কাছে টাকার যোগান থাকে তাঁরা ব্যবসাটা চালু করে ফেলেন। ধর কেউ জামাপ্যান্টের দোকান বসালেন, সেলাই মেশিন টেশিন কিনে ফেললেন। এবার জামাগুলো বানাবে কে? আসলকাজটা তো কাউকে করতে হবে! সেই সব কাজ করানোর জন্য আসে পাশের গ্রাম গঞ্জ থেকে মানুষকে নিয়ে আসা হয়, কখনও বা তাঁরা নিজেরাই আসেন।কিছু রোজগার হবে বলে। ব্যবসায় যদি ভালো লাভ হতে থাকে তাহলে আরও নতুন ব্যবসাদার আসেন। দোকান বাজার কল কারখানা বাড়ে, কাজের খোঁজে নতুন মানুষও আসতে থাকেন। অন্য অন্য শহর থেকেও মানুষ আসতে থাকেন। মানুষবাড়তে বাড়তে থাকার জায়গা কম পড়ে। তখন শহর বাড়তে থাকে। তোমরা তো সংখ্যা ভালোবাসো। একটা হিসেব দিই। ১৯৯০ সালে কলকাতা ছিল ৩,১১৩ বর্গ কিমি। ২০০৩ সালে বেড়ে হল ৫,৯৬০বর্গ কিমি। ২০১৪ সালে হলে ৯,৬৮৭বর্গ কিমি!কেমন? হোল তো আক্কেল গুড়ুম? মানে ১৪ বছরে তিন গুণ!

এখন শহর তো গাছ নয় যে নিছক জলে হাওয়ায় বেড়ে উঠবে! শহর বাড়ে আশেপাশের গ্রাম, মাঠ ঘাট, ক্ষেত খামার, বন জঙ্গল এই সব নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে নিতে। তাতেক্ষেত খামার মাঠঘাট মুছে গিয়ে মস্ত মস্ত বাড়ি হয়, কল কারখানা তৈরি হয়। গাছপালা বন জঙ্গল কেটে রাস্তা হয়, ব্রীজ হয়, আরও বাড়ি হয়। বেড়ে ওঠার সে এক দুর্দান্ত গতি। সে গতি কারুর পরোয়া করে না। বুলডোজার দেখেছ? টিভিতে?বইয়ের পাতায়? অনেকটা সেই রকম। নিজের ইচ্ছেয় বুলডোজারের সামনে থেকে সরে না গেলে বা সুপারম্যানের মত শক্তি না হলে তার চাকার নিচে পিষে যেতে হয়। কেউ কেউ নিজের ইচ্ছেয় সরে যান। কিন্তু অনেকেই আছেন যাঁদের ইচ্ছে নেই কিন্তু শক্তিও নেই, তাঁদেরও সরে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। তাঁরা যে কোথায় যান, পাঁচ-সাত পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে, তার খবর আর রাখা হয় না। ঐ গাছ পালা, ফুল পাখি, ক্ষেত মাঠ সব কিছু ঘষেমুছে যায় ম্যাপ থেকে। যেন কখনও ছিলোই না। সবুজ রং টা তাই ফিকে হয়ে আসে, হাওয়ায় শ্বাস নেবার মত প্রাণবায়ু, মানে অক্সিজেনও কমতে থাকে। ধোঁয়া বাড়ে, সালফার, কার্বণ-ডাই-অক্সাইডের মত বিশ্রী গ্যাস বাড়তে থাকে। রোগ বাড়ে, সুস্থতা কমে।

তবে জানো, আমার বিশ্বাস তোমরা বড় হলে এর একটা উপায় ঠিক করতে পারবে। উপায় বলব, না হেস্তনেস্ত, আজ দাঁড়িয়ে বলতে পারছি না। কারণ বুলডোজার রোখার শক্তি নাকি একটা অন্য রকম পৃথিবী গড়ে তোলা, কোনটা তোমরা চাইবে এতো তোমাদের ওপরেই।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা