ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

আকাশটা আজ সকাল থেকেই কুয়াশায় ঢাকা। ঠিক যেমনটি হয়ে আছে রাজনারায়ণের মন। মানুষ একবার কোন এক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে গেলে আর এই ভাবটা থাকে না, প্রতিকূলতার মোকাবিলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যতক্ষণ সেই দুর্যোগ না আসছে, ততক্ষণ এই ভাবটা যেন গলা চেপে থাকে। কোথা দিয়ে বিপদটা কোন রূপে দেখা দেবে, অবচেতনার অন্ধকারে সেটাই হাতড়ে বেড়ায়।

রাজনারায়ণ গ্রামের ছেলে, কিন্তু নিজের চেষ্টায় এখন শহরের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। তিনি বয়সে প্রবীণ, সাধারণত সহজে বিহ্বল হন না। কিন্তু নিরূপমার অসুখটা তো সাধারণ নয়। কাল যখন ডঃ তালুকদার সব মেডিক্যাল রিপোর্ট আর এক্স-রে পরীক্ষা করে বুঝিয়ে বলছিলেন নিরুপমার শারীরিক সমস্যাটা কতটা গুরুতর জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, রাজনারায়ণের পায়ের তলা থেকে একটু একটু করে মাটিটা সরে যাচ্ছিল। শেষে ডঃ তালুকদার বললেন, দেখুন, ব্যবস্থা যা নেবার, নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা করা, পেশেন্ট কতটা রেস্পন্ড করে তার জন্য। দেয়ার ইজ অলওয়েজ আ চান্স অফ সারভাইভাল, কিন্তু কিছু মনে করবেন না, আমি খুব একটা ভরসা দিতে পারছি না।
ডঃ তালুকদারের এই স্পস্ট কথা বলার অভ্যাসটা বরাবর পছন্দ করেছেন রাজনারায়ণ। তাতে বোঝা সহজ হত, ডাক্তারের মনের মধ্যে আসলে কি আছে। ডঃ তালুকদার বিচক্ষণ ডাক্তার, রোগ নিদানে তাঁর বড় একটা ভুল হয় না। মনে হয় অজানা এক ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন কাজ করে, অল্প কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষাতেই রোগের আসল জায়গাটিতে পৌঁছে যাবার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা এই চিকিৎসকের আছে। তার পরিচয় রাজনারায়ণ বেশ কয়েকবার পেয়েছেন। আজ তাই একান্তভাবে রাজনারায়ণ চাইছিলেন, ডঃ তালুকদার যেন আশাব্যঞ্জক কিছু বলেন।

কিন্তু তিনি তো তা বললেন না? আজ এই অভিজ্ঞ ডাক্তারের কথায় রাজনারায়ণের চিন্তাভাবনাগুলো কেমন ধূসর হয়ে গেল। তাহলে ডাক্তার তাঁর পেশেন্টের যে অবস্থা নিরূপণ করলেন, তাই কি নিরুপমার ভবিতব্য?

রাজনারায়ণের চল্লিশ বছরের পুরনো সঙ্গী নিরুপমা। স্বামী-স্ত্রী স্বভাবে ঠিক একে অপরের বিপরীত। নিরুপমা শান্ত, মৃদুভাষী, ঘরমুখী, মন্দির ও তীর্থের প্রতি তাঁর এক সহজাত আকর্ষণ। আর রাজনারায়ণ উচ্ছাসপ্রবণ, আড্ডাবাজ, প্রথাগত পূজো-পাঠের পরিপন্থী। কিন্তু এই বৈপরীত্বের জন্য কখনও কোনও বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। নিরুপমা হতে দেননি, নিজেকে তিনি একান্তভাবে রাজনারায়নের পরিপূরক করে গড়ে নিয়েছিলেন।

আজ বারবার করে সব পুরনো কথা মনে আসছে।

রাজনারায়ণের চেয়ে উচ্চতায় অনেকটা খাটো ছিল নিরুপমা। আদিত্যদা একবার সে কথা নিয়ে ঠাট্টা করায় রাজনারায়ণ মজা করে বলেছিলেন, সমস্যা তো যতো ছোট হয় ততই ভালো, তাই না আদিত্যদা?

কথাটা অবশ্য নিতান্তই মজা করে বলা, নিরুপমা কোনোকালেই রাজনারায়ণের সমস্যার কারণ হননি । ব্যবসাসূত্রে ব্যস্ত জীবনে নিরুপমাকে অল্পই সময় দিতে পেরেছেন রাজনারায়ণ। ছেলে চন্দনের জন্মও রাজনারায়ণের অনুপস্থিতিতে। তার জন্য কখনো কোন অভাব বা অভিযোগ জানাননি নিরুপমা।

একবারই শুধু এক বিবাহবার্ষিকীতে নিরুপমা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আজ দিনটার কথা কি তোমার মনে আছে? রাজনারায়ণের যথারীতি মনে ছিল না। নিরুপমা মনে করিয়ে দিতে রাজনারায়ণ ফস করে বলে ফেলেছিলেন, ওঃ, তা চল এক মিনিট নীরবতা পালন করা যাক।

রাজনারায়ণের স্বভাবই ওরকম, কোন কিছু না ভেবেই বলা কথা। নিরুপমা একটু অপ্রতিভ হাসি দিয়ে অবস্থা সামলে নিয়েছিলেন। কোন অভিযোগ জানাননি। বাড়ীতেই চিংড়ি মাছের মালাইকারী আর পুলি-পিঠে বানিয়ে সবাইকে খাইয়েছিলেন। রাজনারায়ণ পরে ভেবে দুঃখ পেয়েছিলেন, নিরুপমাকে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।

এইসব ছোট ছোট সব কথা আজ খালি মনে আসছে। রাত পোহালেই হয়ত এসব শেষ হয়ে যাবে। রাজনারায়ণের জীবনের কতখানি জুড়ে যে নিরুপমা ছিল, সে তো আর বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না। সারারাত ধরে ঈশ্বরের কাছে রাজনারায়ণ জানাচ্ছিলেন, আর একবার একটা সুযোগ দাও। আর নিরুপমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা নয়। এবার তাকে ঠিক বুঝিয়ে দেবেন, ছেলে-বৌ নাতি নিয়ে রাজনারায়ণের এই ভরা সংসারে তার স্ত্রীর জায়গাটা ঠিক কোথায়। বিনিদ্রায় কখন রাত শেষ হয়ে গেছে জানতেই পারেননি।
—দাদু, আজ তুমি বাসন্তী রঙের সিল্কের কাপড় নিয়ে আসবে কিন্তু।

সাত বছরের নাতি বাবলুর কথায় আবার বর্তমানে এসে পড়লেন রাজনারায়ণ। নিরুপমা ও রাজনারায়ণের চক্ষের মনি এই বাবলু। বাবলুরও ভীষণ প্রিয় তার দাদু আর ঠাকুমা। বাবা-মাকে ছেড়ে থাকতে পারে বাবলু, কিন্তু ঠাকুমাকে তার সর্বদা চাই। নিরুপমা খুব ভালো মাটির প্রতিমা গড়তে পারেন, নাতিকে নিয়ে মাটির পুতুল বানিয়ে জন্মাষ্টমী-রাস-দোল মানানো হয়। এবারে সামনের বসন্ত পঞ্চমীতে দুজনে ঠিক করেছিল ঠাকুর গড়ে ধুমধাম করে সরস্বতী পুজো করা হবে। বাবলু স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়েছে, ঝটপট দাদুর কাছে আবদার জানিয়ে গেল, আর বেশী সময় নেই। ঠাম্মা এসেই কাজ আরম্ভ করবে কিন্তু।

—তোমার ঠাম্মার যে শরীর খারাপ দাদু? রাজনারায়ণ না বলে পারলেন না, যদিও ভীষণভাবে চাইছিলেন বালকের উৎসাহের খানিকটা নিজের মধ্যে পেতে।
—তাতে কী হয়েছে? আমি কাল মা সরস্বতীকে বলে দিয়েছি, ঠাম্মাকে তাড়াতাড়ি সারিয়ে বাড়ী এনে দাও। না হলে তোমার পূজো কী করে হবে? বাবলু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল, ঠাম্মা খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে চলে আসবে। তুমি আজ নিয়ে আসবে কিন্তু।

বাবলুর গলায় কী অনাবিল আশ্বাস। শিশুরা কি এইরকমই হয়? রাজনারায়ণের সম্মুখে সময়ের ঘূর্ণি যেন হঠাৎ পিছনপানে ঘুরে চলল। তিনি পৌঁছে গেলেন অনেকগুলো বছর আগে...এক নিস্তরঙ্গ গ্রামের একটা ছোট্ট বাড়ীতে...

***

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পরদিন ঘুম থেকে উঠেই তাড়াতাড়ি বালিশ তুলে দেখত পল্টু। সিঁদুর-দূর্বো মাখা রূপোর টাকাটা ঠিক পাওয়া যেতো। মা লক্ষ্মী রেখে গেছে!
হবেই তো। কাল রাত বারোটা পর্যন্ত পল্টু জেগেছিল যে। ঠাম্মা বলেছে, যে সব ভালো ছেলে লক্ষ্মীপুজোর পরে রাত বারোটা পর্যন্ত জেগে থাকে তাদের কাছে মাঝ রাত্তিরে মা লক্ষ্মী এসে একটা টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করে যায়। তাই তো বলে কোজাগরী পূর্ণিমা। মা লক্ষ্মী ঠিক জানতে পারে, কোন ছেলেটা রাত বারোটা অবধি না ঘুমিয়ে জেগেছিল।
অনেক ছোটবেলায় এই গল্প শুনেছিল পল্টু। বোধহয় তিন বছর বয়সে। তখন থেকে প্রত্যেক কোজাগরী পূর্ণিমায় রাত জাগে সে। প্রতিবার মা লক্ষ্মী এসেছে, টাকা দিয়ে গেছে। এই টাকা পল্টু খর্চা করে না। মা'র কাছে জমিয়ে রাখে। এই করে মোট পাঁচটা টাকা জমা হয়েছে।

পল্টু কল্পনায় দেখে একটা সাদা প্যাঁচায় চেপে শেষ রাত্তিরে লক্ষ্মীঠাকুর উড়ে আসছে। পল্টুর কাছে এসেই দেখতে পায়, এই তো একটা লক্ষ্মী ছেলে রাত বারোটা পর্যন্ত জেগেছিল। তখন আস্তে করে মা লক্ষ্মী তার ঝাঁপি থেকে দূর্বো-সিঁদুর লাগা একটা টাকা বার করে পল্টুর বালিশের নীচে রেখে দিল।  

পাঁচ বছর ধরে পল্টু অনেক কষ্ট করে রাত বারোটা অবধি জেগে থেকেছে। তারপর বিছানায় শুয়ে আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকতে চেষ্টা করে। যদি ঘড়িতে কিছু ভুল থাকে। একটুর জন্যে যদি মা লক্ষ্মী এসে দেখে, এই ছেলেটা তো বারোটার আগেই ঘুমিয়েছে। তাহলে তো আর টাকা দেবে না মা লক্ষ্মী!

কয়েকবার পল্টু চেষ্টা করেছে, যতক্ষণ না লক্ষ্মীঠাকুর আসে, জেগে থাকতে। একেবারে হাতে-নাতে তাকে ধরে ফেলতে। কিন্তু ঠাম্মা বলেছে, মা লক্ষ্মী অত সহজে দেখা দেয় না। তাই আসবার আগে বাচ্ছা ছেলেদের ঠিক ঘুম পাড়িয়ে দেয়। তাই হয়েছে, অনেক চেষ্টা করেও পল্টু কখনও বেশী জেগে থাকতে পারেনি। তারপর কখন যেন মা লক্ষ্মী এসে বালিশের নীচে ঠিক টাকা দিয়ে গেছে। এই পাঁচ বছরে কখনও এর অন্যথা হয়নি।

সৌদামিনী দেবী কখনও তাঁর আট বছরের নাতির এই সরল বিশ্বাস ভেঙ্গে যেতে দেননি!

এবার লক্ষ্মী পুজোর দিন কিন্তু সন্ধ্যের পর থেকেই পল্টুর বেজায় ঘুম পাচ্ছে। আসলে বিকেলে খুব বেশী খেলাধূলো করে ফেলেছে। আটটা না বাজতেই তাই পল্টুর চোখ ঢুলে আসছে।

তবু অনেকক্ষণ বই খুলে পড়ল পল্টু। ঢুলে বইএর ওপরেই পড়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। তবু পড়তে চেষ্টা করছিল। সাড়ে আটটায় মা খেতে দিল। সজাগ হয়ে খাওয়া সেরে জানলার কাছে গিয়ে বসল সে। চোখ মেলে চাঁদের দিকে চেয়ে পল্টু জেগে থাকার চেষ্টা করতে লাগল। আর মাঝে মাঝে চোখ রগড়ে ঘড়ি দেখছে। ন'টা— সাড়ে ন'টা— দশটা—। আর পারছে না, তবু জেগে আছে পল্টু। এখনই ঘুমিয়ে পড়লে যে মা লক্ষ্মী আর আসবে না।

কখন যে একটু তন্দ্রা এসে গেছে বুঝতেই পারেনি পল্টু। ধড়মড় করে জেগে দেখে সাড়ে এগারোটা বেজেছে। ইস্‌স্‌— সে কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? না না, এই তো সে জেগে আছে। আর আধ ঘন্টা। সে ঠিক জেগে থাকবে। ভীষণ ঘুম আসছে তার, তবুও—

আর বসে রইল না পল্টু। ঠাম্মা জেগে ছিলেন, নাতি না ঘুমোলে তিনিও শুতে যান না। সোজা তাঁর কাছে গিয়ে পল্টু বলল, রাত বারোটা বাজতে আর কত বাকি ঠাম্মা?
—আর আধ ঘন্টা। তোমার খুব ঘুম পাচ্ছে, তাই না সোনা?
—হ্যাঁ। কিন্তু আমি জেগে থাকব। না হলে লক্ষ্মীঠাকুর যে আসবে না।
—তুমি ঘুমিয়ে পড়ো সোনা। তুমি ছোটো তো, তাই এতোক্ষণ জেগেছ তাতেই মা লক্ষ্মী আসবেন।
পল্টুর যেন বিশ্বাস হয় না।— এখন ঘুমিয়ে পড়লেও মা লক্ষ্মী আসবে? তুমি ঠিক বলছ?
—বলছি তো, আসবেন। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
পল্টুর মনে দোনামোনা। ঠাম্মা তাকে ভোলাচ্ছে নিশ্চই। রাত বারোটা অবধি না জাগলে লক্ষ্মীঠাকুর কখনও আসে? টাকা দেয়? তার ওপর সে আবার একটু আগে—
ভয়ে ভয়ে পল্টু ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করে, না না, রাত বারোটা পর্যন্ত আর ঘুমোব না। কিন্তু ঠাম্মা, আমি বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাহলে কি লক্ষ্মীঠাকুর আর আসবে না? কিন্তু দেখ— এখন তো জেগে গিয়েছি। তাই না? তাহলেও কি মা লক্ষ্মী রাগ করবে?

***

জানলার বাইরে বাসের শব্দে চমক ভাঙ্গল রাজনারায়ণের। বাবলুর স্কুলবাস এসে গেছে। তাইতে চড়ে বাবলু জানলা দিয়ে হাত নাড়ছে রাজনারায়ণের দিকে। দূরে কারখানায় সাইরেন বাজল। খবরের কাগজওয়ালা কাগজ ফেলে দিয়ে গেল। পাশের বাড়ীতে বাসন ধোয়ার আওয়াজ। লাঠিহাতে মাথায় মাফলার মুড়ে দীপ্তেনদা প্রাতর্ভ্রমণে বেরোলেন, বয়স তাঁর প্রায় আশি। তখন কুয়াশা খনিকটা কেটেছে, শীতের সকাল ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ঘুমভাঙ্গানি সূর্যের আলো যেন একটা হালকা সোনালী রঙের চাদর চারদিকে মেলে দিয়েছে।

স্কুলবাস ছেড়ে দিল, জানলা থেকে বাবলুর উজ্জ্বল সোনালী মুখটার দিকে চেয়ে সত্তর বছরের পল্টু অস্ফুটস্বরে বললেন, বাসন্তী রঙের সিল্কের কাপড় আমি আজ নিশ্চই নিয়ে আসবো, দাদু।

ছবিঃ শিল্পী ঘোষ

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা