ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ছেলেধরা-অঞ্জন নাথ

অন্তু, রন্তু ও সন্তু তিন প্রাণের বন্ধু – এখন ক্লাস সিক্সে পড়ছে – ছোট বেলা থেকেই তিনজন ভীষণ ডানপিটে - পাড়াতে ডাকাবুকো হিসাবে ওদের নাম কিংবা বদনাম তাই পাড়ার অন্যান্য ছেলেরা ওদের একটু সমঝেই চলে আর সন্তুরাও ওদের একেবারেই পাত্তা দেয় না – নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ওদের মধ্যে সন্তু সব থেকে লম্বা, রন্তু মাঝামাঝি আর অন্তু একটু বেঁটের দিকেই তবে খুব গাট্টা গোট্টা চেহারা আর গায়ে জোরও ভীষণ তাই অন্য বন্ধুরা ওকে বাটুল-দি-গ্রেট বলে। ছুটি ছাটার দুপুরে ওরা চুপচাপ বেরিয়ে পড়ে ওদের পাড়া ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরের মাঠে যেখানে তাল ও খেজুর গাছের ভিড় আর প্রতি বছর শীত কালে খেজুর গাছ চেঁছে রসের হাঁড়ি বসানোর জন্য গাছগুলো কেমন ত্রিভঙ্গ মুরারির মত হয়ে গিয়েছে। মাঠের শেষে একটা মস্ত বড় আর লম্বা বহু পুরাতন ঝিল আর ঝিলের বাঁ ধার দিয়ে একটা মাটির রাস্তা দূরে গ্রামের দিকে চলে গিয়েছে। ছুটির দিনের স্তব্ধ দুপুরে ঝিলের পাড়ে বসে ওরা দেখে মাছরাঙ্গা পাখির জলে ঝাঁপিয়ে মাছ ধরা, চিল গুলো কেমন অনেক উঁচু থেকে মাছ দেখতে পেলে তিরের মত নেমে এসে ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিয়ে তাল গাছের মাথায় বসে খায় তবে অন্য কোন চিল ওকে দেখতে পেলে রীতিমত উড়ন্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ঝিলের শান্ত জলে মাছ ঘাই মারলে জলের উপর গোল গোল ঢেউ গুলো অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে যায়। ঝিলের জলে ব্যাঙ বাজি খেলাটাও খুব মজার – একটা পাতলা পাথরকে নিচু হয়ে জলের উপর ছুঁড়ে দিলে সেটা জলের উপর লাফাতে লাফাতে অনেক দূর চলে যায় তাই ওদের মধ্যে মাঝে মাঝে এই ব্যাঙ বাজির প্রতিযোগিতাও হয় – কার ছোঁড়া পাথর সব থেকে বেশী দূর গিয়েছে। এত সব মজার কথা অবশ্য ওরা বাড়িতে বলতে পারে না কারণ পাড়ার বাইরে যাওয়া ওদের একেবারেই বারণ।

শীতকালের খুব ভোরে ওই দূরের গ্রামের কিছু লোক মাঠের খেজুর গাছের মাথা সুন্দর করে চেঁছে তার মাঝখানটা একটু নালার মত করে সেখানে একটা কাঠি গুঁজে দেয় যাতে গাছের রস ওই কাঠি বেয়ে গাছে বাঁধা হাঁড়িতে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয় আবার পরদিন ভোর বেলা পুরাতন হাঁড়িটা খুলে আর একটা নতুন হাঁড়ি বাঁধে আর এটা চলতে থাকে পুরো শীতকালটা। সন্তুরা অবশ্য হাঁড়ি বাঁধা বা খোলা দেখেনি তবে ওই লোকগুলো যখন দুপুরের দিকে এসে দেখে যায় গাছে বাঁধা হাঁড়িগুলো ঠিক আছে কিনা তখন ওদের কাছে শুনেছে আর ওদের সাথে সন্তু রন্তুদের খুব ভাবও হয়ে গিয়েছে। ওদের কাছেই শুনেছে এই রস ওরা প্রত্যেক দিন ভোরে বাড়ি নিয়ে গিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে পাটালি গুড় আর ঝোলা গুড় বানায় – বাড়ি থেকে পাটালি গুড় এনে ওরা সন্তুদের খাইয়েছে – এর স্বাদ বাজারের পাটালি থেকে অনেক ভালো। ওরাই ওদের পৈ পৈ করে বারণ করে দিয়েছে কখনও যেন ঝিলের জলে না নামে – বহু পুরাতন ঝিল এবং একেবারেই ব্যবহার হয় না বলে জলে ভীষণ শ্যাওলা আর আগাছা আর নামলেই পায়ে জড়িয়ে যাবে তারপর আর নিস্তার নেই – একেবারে তলিয়ে যেতে হবে – কেউ বাঁচাতে পারবে না। ঝিলের ডান দিকের কোনাতে একটা মস্ত বড়ো একতলা বাড়ি আছে তবে বহু বছর থেকে কেউ থাকে না বলে জঙ্গল ও আগাছাতে ভরে গিয়েছে – দেওয়ালের অনেক জায়গাতে পলেস্তারা খসে পড়ে ইট গুলো যেন দাঁত বের করে রয়েছে। যখন লোকজন থাকতো তখন বোধহয় বাড়ির সামনে সুন্দর ফুলের বাগান ছিলো আর পেছনে আম, জাম, কাঁঠালের বিরাট বাগান তাই এখনও নানা রকমের ফুল ফোটে আর আম, জাম আর কাঁঠালে গাছ ভরে যায় তবে সাপের ভয়ে কেউ ওই সব ফল পাড়তে যায় না – সব পেকে মাটিতে পড়ে পচেই নষ্ট হয়। বাড়ির পাঁচিলের অবস্থাও খুবই খারাপ – অনেক জায়গাতেই ধসে গিয়েছে। ওরা ওই পাঁচিলের ধার থেকে দেখেছে সামনের লোহার গেটটা ভেঙ্গে এক দিকে ঝুলে আছে, সামনের দরজাতে মস্ত বড়ো তালা কিন্তু সেটাতেও মরচে পড়ে এমন অবস্থা চাবি থাকলেও মনে হয় আর খোলা যাবে না। সমস্ত জানালা বন্ধ আর তাতে নোংরা শ্যাওলা জমে আছে আর বড় বড় মাকড়সা বিরাট সব জাল বানিয়ে রেখেছে। গেট থেকে বাড়ির গা ঘেঁসে একটা সুঁড়ি পথের মত বাড়ির পেছন দিকে গিয়েছে – আগে বোধহয় ইট দিয়ে বাঁধানো ছিলো এখন তার বিশেষ কিছুই নেই আর পুরোটা কাঁটা গাছ, আগাছা, লতানে গোলাপ আর মাকড়সার জালে ভরে গিয়েছে।

আজ সন্তুর জন্মদিন – রবিবার বলে সকাল থেকেই রন্তু ও অন্তুর মা বাবারাও এসে গিয়েছে ওদের সাহায্য করতে আর সেই সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে। সকাল এগারোটা নাগাদ সন্তু মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেরিয়েছে পাড়ার দোকান থেকে বন্ধুদের জন্য ক্যাডবেরি চকোলেট কিনতে। ঘন্টা খানেক পর সন্তুর মার খেয়াল হয়েছে সন্তুর তো এত সময় লাগার কথা নয় – সন্তুর বাবাকে ডেকে বললেন,
‘একবার দেখো না গো দোকানে গিয়ে সন্তুটা কোথায় গেলো – এখনো স্নান টান করে নি – হয়তো মাঠে তিনটেতে মিলে খেলতে শুরু করেছে - তিন জনের খেলার যা নেশা।’

তিন বাবাই বেরিয়ে পড়লেন সন্তুর খোঁজে – মাঠে কেউ নেই, রন্তুর বাড়ির রোয়াকে অন্তু ও রন্তু লুডো খেলছে – ওরাও জানে না সন্তুর খবর। সবাই মিলে দল বেঁধে দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে মালিক বাসুদা বললো,
‘সন্তু তো প্রায় ঘন্টা খানেক আগে এসেছিলো – তিনটে ক্যাডবেরি চকোলেট কিনে বাড়ির দিকে দৌড়ালো।’

সন্তু এখনও বাড়ি ফেরেনি শুনে দোকানের কর্মচারি গবা বললো,
‘আমি তখন বাইরে ঝাঁট দিচ্ছিলাম – দেখি একটু দূরে ওই মোড়টায় রোগা মতো চোখে সান গ্লাস পড়া দাড়িওয়ালা একটা লোক সন্তুর সাথে কথা বলছে। সামনের রাস্তাটা ওখানে ঘুরে গিয়েছে বলে তারপর ওরা কোন দিকে গেলো দেখতে পাই নি।’

বাসুদা একটু ভেবে বললো,
‘ওই রকমই একটা লোককে দিন দুয়েক হলো এদিকে ঘুরতে দেখেছিলাম আর হ্যাঁ, লোকটার ডান গালে একটা বাজে ধরনের কাটা দাগ যেটা দাড়ি দিয়েও ঢাকতে পারে নি।’

বলতে না বলতে সন্তুর বাবার মোবাইল বেজে উঠলো – সন্তুর মার ফোন – কাঁদতে কাঁদতে কোন রকমে বললেন,
‘এক্ষুনি বাড়ি এসো – ভীষণ বিপদ।’

ওরা দৌড়ে বাড়ি এসে দেখে তিন মা-ই কাঁদছে – সন্তুর মা কোন রকমে জানালেন,
‘একটু আগে একটা ফোন এসেছিলো – একটা লোক ফ্যাস ফ্যাসে গলায় বলেছে ও সন্তুকে চুরি করেছে – এক লাখ টাকা পেলে তবেই ছাড়বে নয়তো - -’
বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন – একটু সামলে নিয়ে বললেন,
‘তারপর লোকটা সন্তুকে ফোন দিয়েছিলো – সন্তু বলছিলো, মা আমাকে চেয়ারে বেঁধে রেখেছে পবাতে - -’
‘ওর কথা শেষ হবার আগেই লোকটা ফোন কেড়ে নিয়ে বলেছে, পুলিস ফুলিস করলে খুব খারাপ হয়ে যাবে – কালকে সকালের মধ্যেই টাকা চাই – কোথায় দিতে হবে সেটা কালকে সকালে জানাবে বলেই লাইন কেটে দিলো।’

রন্তুর বাবা একটু ভেবে আস্তে করে বললো,
‘এখানকার থানার ইন-চার্য নিবারণ দত্তর সাথে আমার পরিচয় আছে – আমি ওর সাথে কথা বলে দেখছি চুপচাপ কিছু করা যায় কি না। আজ তো রবিবার - ব্যাঙ্ক বন্ধ – টাকার ব্যবস্থা কী করা যায় সেটাও দেখতে হবে।’

ওর ফোন পেয়ে নিবারণ দত্ত মিনিট পনেরোর মধ্যে এসে হাজির হলেন – ওকে দেখে রন্তু ও অন্তু বাইরে বেরিয়ে সিঁড়িতেই বসে পড়লো। দুজনেই গালে হাত দিয়ে ভাবছে সন্তুকে কোথায় নিয়ে লুকিয়ে রাখতে পারে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে ফোন করেছে তার মানে খুব একটা দূরে নিয়ে যায় নি – তাহলে? অন্তু বললো,
‘এ পাড়ার সব বাড়ি তো আমরা চিনি – এখানে রাখবে না – তাহলে কোথায়?’
রন্তু একটু ভেবে বললো,
‘আচ্ছা, মাসির সাথে তো লোকটা টাকার কথাই বলেছিলো তবে সন্তু বলেছিলো, মা আমাকে চেয়ারে বেঁধে রেখেছে পবাতে – তাই না?’
‘সন্তুকে চেয়ারে বেঁধে রেখেছে - - মানে কোন বাড়িতেই হবে কিন্তু ‘পবা’টা কী রে? কোন হেঁয়ালি নয়তো রন্তু?’
হঠাৎ রন্তু উঠে দৌড়ালো বাড়ির দিকে – অন্তু দৌড়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,
‘হঠাৎ বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করলি?’
‘আমি বুঝে গেছি – আর সময় নেই – সন্ধ্যের আগেই সন্তুকে ছাড়াতে হবে আর তার জন্য কিছু জিনিষের দরকার তাই বাড়ি যাচ্ছি – তুইও আয়।’
‘কিন্তু কোথায় রেখেছে সন্তুকে?’

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা