ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

(আগের পর্ব পড়তে চাইলে এই লিঙ্কে দেখঃঅভিযান- পর্ব ১)

 

ভিতরটা অপরিসর,আমাদের মাথা গুহার ছাদ ছুঁই ছুঁই, শক্ত কালো পাথরের দেয়াল, ভিতরটা খুব গরম। মিনিট দশেক হেটমুন্ড হয়ে হাঁটার পরে ছাদ একটু উঁচু হল আর চারপাশটা চওড়া হয়ে এল। এবার স্যাম টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জায়গাটা দেখছিল, একটা ২০ বাই ১০ এর ঘরের মতো, উল্টোদিকে মনে হল সুরঙ্গটা হঠাৎ নীচের দিকে নেমে গেছে। এবার টর্চের আলো মাটিতে ফেলে চমকে ঊঠলাম - তিনটে কঙ্কাল আমাদের বিপরীত দিকে হাত দশেক দূরে পড়ে আছে, তাদের ঠিক সামনে মাটিতে দু তিনটে গর্ত খোঁড়া আছে, সেখানে আরও কিছু আছে মনে হল। স্যাম আমার পিঠে হাত রাখল আমি চমকে উঠলাম, সে ইশারায় জানাল ভয় পেয়ো না, তার পিছু পিছু গর্তগুলোর কাছে গেলাম সেখানে যা দেখলাম তাতে হাত পা পেটে সেঁদিয়ে যাবার জোগার, ভাবলাম নির্ঘাত কোনো নরখাদকের গুহায় ঢুকে পরেছি, গর্তগুলোর চারপাশ কালো হয়ে পুড়ে গেছে, স্পষ্টতই আগুন জ্বালান হয়েছিল, তার ওপর একটা গর্তে একজন মানুষের কঙ্কাল বসে আছে যেন হাঁটু মুড়ে মাথা নীচু করে। স্যাম আমার অবস্থা আন্দাজ করে বলে উঠলো-
এটা একটা সমাধিক্ষেত্র, এখানে মৃতদেহ পোড়ানো হতো, হাড় ও করোটি পরিবারের লোকজনকে দেওয়ার জন্যে, সেগুলো তারা সংরক্ষণ করে রাখতো, এটা বেশিরভাগ পলিনেশিয়দের সৎকারের পদ্ধতি ছিল।
আমি বললাম- ছিল মানে? এখন হয় না?
সে বলল- হয় তবে কম, এখন বেশিরভাগ মানুষ খ্রীষ্টান, তুমি কি ভাবছ বুঝতে পারছি, এই মানুষগুলো খুব কাছাকাছি সময়ের নয়।
আমি বললাম- দশ বছর আগের?
স্যাম আমার মুখের দিকে তাকালো - ও গল্পটা কানে গিয়েছে তাহলে, নাঃ তার থেকে অনেক বেশী কয়েকশো হলে আশ্চর্য হব না। আর দশ বছর আগে যারা এসে আর ফেরেনি তাদের মৃতদেহর কথা শুনেছ নিশ্চই, সেগুলো ছিল গর্তের মতো জায়গায়, আর বলতে হবে?
বলে সে ভালোভাবে দেহগুলো পরীক্ষা করে দেখতে লাগল।
আমি লজ্জা পেলাম, কালই বোঝা উচিত ছিল।

মাটিতে পড়ে থাকা দেহগুলোর গায়ে অতিজীর্ণ কিছু কাপড়চোপড় ছিল যেগুলো কাপড় বলে চেনাই সম্ভব না, স্যাম কিছু কাপড় ও হাড়ের নমুনা নিল। বলল- মনে হচ্ছে অশুভ দ্বীপের রহস্যটা এর থেকেই উদ্ধার করা যাবে, এরা সমাধি দিতে এসে হঠাৎ কোন দুর্ঘটনায় পড়ে, সম্ভবত একই কারন।

এবার স্যাম দেহগুলো টপকে সুরঙ্গের নীচু আর সরু হয়ে যাওয়া দিকটায় গেল, পিছু পিছু সুবোধ বালকের মতো আমি। এখানে মাথা নিচু করে ঢুকতে হল, দু পা নামতেই বীশ্রি ঝাঁঝাঁলো গন্ধ নাকে এল, এটা চেনা গন্ধ, স্যাম বলল হাইড্রোজেন সালফাইড, একটু সাবধানে পা ফেল। কিন্তু সাবধান হওয়ার আগেই দুজনের পা হড়কালো, তালগোল পাকিয়ে নীচের দিকে পড়তে লাগলাম,আমার টর্চ ছিটকে পড়ল, স্যামেরটা গলায় ঝুলছিল ভাগ্যিস।অতি কষ্টে দুজন দুজনকে আঁকড়ে ও মাটি আঁচড়ে যেখানে থামলাম সেখান থেকে হাতখানেক দূরে গরম ফুটন্ত কাদাজলের কুন্ড। আমার দম বন্ধ হয়ে এল, বেজায় কাশি শুরু হল, চোখ ও গলা জ্বলতে লাগল। স্যাম বলল কথা বলার চেষ্টা কোরো না, আমি দেখছি কিভাবে ওপরে যাওয়া যায়। কিন্তু দেখা গেল স্যামের ব্যাকপ্যাকে যা আছে তার সাহায্যে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া অসম্ভব। বেশ কিছুক্ষন বৃথা চেষ্টা করে আমরা প্রায় দম বন্ধ হয়ে মরতে বসলাম।আমার মনে হচ্ছিল আগ্নেয়গিরির পেটের মধ্যেই ঢুকে পরেছি, আর নিস্তার নেই। যা হোক এই সময় স্যাম আমার টর্চটা খুঁজে পেল। দুটো টর্চ থাকায় একটু ভাল করে দেখলাম আশপাশটা, আমাদের পায়ের কাছে বিভীষিকার মত হট স্পট ফুটছে কিন্তু তার পাশ বরাবর সরু একটা শুকনো রাস্তা রয়েছে,তার অপরদিকে মনে হচ্ছে সুরঙ্গপথের একটা এক্সটেনশন দেখা যাচ্ছে। পা হড়কালে সেদ্ধ হয়ে যাব, নিঃশ্বাসও নেওয়া প্রায় বন্ধ, সরীসৃপের মত বুকে হেঁটে রুদ্ধশ্বাসে আমরা জায়গাটা পেরোলাম।

এবার আবার একটা সুরঙ্গপথে ঢুকে পড়লাম, স্যামের ধারণা এই পথে সমুদ্রের কাছে পৌঁছনো যাবে, এই সুরঙ্গপথের কিছুটা জিওলজি এইসময় স্যাম আমাকে বলে, সেটা তোদের বলে নেওয়া দরকার, আমরা যে সুরঙ্গপথে হাঁটছিলাম সেটা আসলে একটা লাভা টানেল,যখন গরম লাভা নীচু ঢালের দিকে গড়িয়ে যায় তখন অনেক সময় উপরের তরল লাভা বাতাসের স্পর্শে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়, কিন্তু মাঝখানের লাভা তরল থাকে,ফলে এইরকম টানেল সৃষ্টি হয়।সেই কারনেই এই পথে সমুদ্রে পৌঁছনোর সম্ভাবনা স্যাম দেখেছিল।সেই আশায় আমরা হাঁটছিলাম, কিন্তু পড়বার সময় আমার পায়ে চোট লাগে, স্যামও অক্ষত ছিল না, মনে করিস না হাঁটাটা খুব সহজ কাজ ছিল, আর পথ যে রাজপথ ছিল না সে তো বলা বাহুল্য। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে টর্চ জ্বেলে চলতে সময় লাগছিল, পায়ের গোড়ালি ফুলে গোল হয়ে গেছে, আর একটা সমস্যা সুরঙ্গপথের নানা ছোটখাটো শাখা আমাদের বিভ্রান্ত করছিল,মূল টানেল কোনটা অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে বের করতে হচ্ছিল, বার কয়েক কানা গলির মত সুরঙ্গপথে সময় নষ্টও হল,পরিশ্রমে ব্যাথায় এক পাও আর হাঁটা যায় না, আমরা খুব আশা করছিলাম একটা ক্ষীণ আলো আবার দেখা যাবে অনেকক্ষণ হাঁটছি, কিন্তু তা যখন হল না তখন স্যাম ঘড়ি দেখে বলল, রাত এখানে থাকতে হবে, কারন বাইরে অন্ধকার নেমে যাচ্ছে আলোর রেশ না,দেখতে পেলে সুরঙ্গে পথ হারিয়ে ফেলব। ফলে ব্যাকপ্যাক খুলে পাথরের খোঁচা টোচা কম এমন একটা জায়গা দেখে জিরোতে বসলাম। স্যামের কাছে একটা দারুন স্লিপিং ব্যাগ ছিল, গুটিয়ে মিনি বালিশ হয়ে যেতো, সেটা পেতে বসলাম দুজনে, শুকনো খাবার খেয়ে নিলাম কিছু, ঠান্ডা ব্ল্যাক কফি, সঙ্গে আগুন জ্বালানোর ব্যাবস্থা থাকলেও তা সম্ভব ছিল না, দাহ্য গ্যাস বদ্ধ সুরঙ্গে থাকা খুব স্বাভাবিক, আর কার্বন মনোক্সাইডের ব্যাপারটা তো সবার জানা। আমাদের টর্চের সুবিধাটুকু ছিল বল ভরসা, কারন যথেষ্ট ব্যাটারি নেওয়া ছিল ব্যাগে। স্যাম দেখি পাথরের দেয়ালে টর্চ ফেলে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখছে, কতোরকম পাগল হয় ভাবতে ভাবতে চোখ জড়িয়ে এল, হঠাৎ নাড়া খেয়ে দেখি একখন্ড পাথর হাতে স্যাম আমাকে ডাকছে, কালচে পাথরে খোঁচা খোঁচা ক্রিস্টালের মতো কি সব, স্যাম খুব উত্তেজিত বলল- “আমি এমনটাই আশা করছিলাম কাল থেকে, বিমল এখানে প্রচুর মিনারেল আর দামী পাথর পাওয়ার সম্ভাবনা ”। টর্চের আলো ফেলতে পাথরটা পার্পেল ও লালের মাঝামাঝি অদ্ভুত একরকম আলো ঠিকরে দিল। আমার মতো আনাড়িরও মনে হল এ সাধারন জিনিস নয়, বললাম “কি স্টোন মনে করছ?”

 অভিযান

সে বলল “এখনই বলা মুশকিল, হলুদ আলোয় যেমন দেখাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ডে লাইটে এর রং বদলে যাবে, আর যদি সেটা ব্লু গ্রীন হয় তবে এটা আলেকজান্দ্রাইট, যদিও তাতেও ১০০ভাগ সিওর হয়া যাবে না”
আমি উৎসাহের চোটে খাড়া হয়ে বসলাম- “খুব দামী মনে হচ্ছে?”
স্যাম হাসল “তোমার এ বিষয়ে ধারনা বেশ কম দেখছি, যদি আলেকজান্দ্রাইট হয় এবং ভালো মানের তবেই দামের প্রশ্ন, তবে হ্যাঁ আসল ভালো আলেকজান্দ্রাইট শুধু দামী নয় দুষ্প্রাপ্য, তার অদ্ভুত রং বদলের ক্ষমতা আছে”।
এবার আমি সোজাসুজি জানতে চাই-'তুমি প্রস্পেক্টর,তাই তো?'
সে হেসে বলল “লাইসেন্সধারি, আমি অনেক আগেই আশা করেছিলাম বুঝে যাবে, একটু রেস্ট নাও পরে আর একটু খুঁজে দেখব, ৪টে নাগাদ আবার হাঁটা শুরু করব।”

এখানে মিতুল প্রশ্ন না করে পারল না- “প্রস্পেক্টর কি?”
-এককথায় যারা মাইন খুঁজে বেড়ায়, ক্যালিফরনিয়া গোল্ড রাশের সময় এরকম লোক হাজারো পাওয়া যেত আমেরিকায়, পরে স্যামেদের মত লোকেরা পড়াশোনা করে সরকারি অনুমতি নিয়ে কাজ করত। তার সাথে ন্যাশান্যাল জিওগ্রাফিক এর যোগাযোগ ছিল, সে তাদের ফ্রীল্যান্সার হিসেবেও কাজ করত, সেটা পরে জানতে পারি।
তিতির ছটফট করে বলে উঠল- “এটা তোর জানা উচিত ছিল মিতুল, জেনারেল নলেজ, এমন জায়গায় বাধা দিলি”।

দাদু শুরু করলেন-

লেখক পরিচিতি

রুপসা মন্ডল দাশগুপ্ত

বহরমপুর মুরশিদাবাদে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, প্রথম দিকের পড়াশোনা বিঞ্জান নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে তুলনামূলক সাহিত্যে বিষয় বদল শুধু ভালবাসা থেকে। বর্তমানে আমেরিকার বস্টন শহরে বসবাস। কবিতা আবৃত্তি , লেখা আর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ানো শখ ।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা