ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
যদিও সন্ধ্যা

বাঙ্কারের ভেতর আলো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনা চারেক জওয়ানের সাথে আমি এই আউটপোষ্টটা পাহারা দিচ্ছি। কেউ কাউকে ভালো দেখতে পাচ্ছি না। বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তার মধ্যে ফায়ারিংএর শব্দ। উত্তপ্ত বুলেটগুলো দিশাহারা হয়ে যেদিকে পা্রে ছুটছে। আর তাদের শাসন করতেই যেন থেকে থেকে ভেসে আসছে মেশিনগানের উদ্ধত আওয়াজ, ট্যট—ট্যট—ট্যট—ট্যট—ট্যট—ট্যট—।

যখন গুলি-গোলা চলছে না, চারপাশের নীরেট নিস্তব্ধতা এসে গলা চেপে ধরছে। এইরকমই এক নৈঃশব্দের মাঝে দেখি সুবেদার রবিন মন্ডল এসে দাঁড়িয়েছে।

—মেজর, সামনের ট্রেঞ্চে কেউ ইঞ্জিওর্ড হয়েছে মনে হচ্ছে। রবিন বলল শুকনো গলায়, আমি গিয়ে নিয়ে আসি?
প্রথমটা ঠিক ঠাহর হল না কি বলতে চাইছে। রবিন জানালো বাইরে কেউ ইঞ্জিওর্ড হয়েছে। ও তাকে গিয়ে নিয়ে আসতে চায়।
—তুমি কি উন্মাদ? একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, বাইরে কে ইঞ্জিওর্ড হয়েছে, তুমি তা জানলে কি করে?
—সুনন্দ, মেজর। আমি ওর গলা শুনেছি। রবিন একটু ধরা গলায় বলল।

একটা ধমক দিতেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমিও শুনতে পেলাম একটা ক্ষীণ আর্তস্বর রবিন আমাকে একটু ধরবি?

সুনন্দর গলাই বটে! কিন্তু তাই কি? আওয়াজটা আসছে খানিকটা দূর থেকে, তাই ঠিক ঠাহর হচ্ছে না। হাতের রেডিয়াম ঘড়িটা দেখলাম, রাত বারোটা কুড়ি। তার মানে সুনন্দ বাঙ্কার থেকে গেছে প্রায় দু'ঘন্টার ওপর। এতক্ষণ পরে ও রবিনকে এভাবে ডাকছে কেন?

এই ব্যাটালিয়ানে আমি, রবিন আর সুনন্দ এই তিনজনই বাঙালী। তাই সিনিয়ার হলেও ওদের সাথে অনেক কথা হতো। রবিন আর সুনন্দ যেন এক জন্মজন্মান্তরের বন্ধনে বাঁধা পড়েছিল। ওদের জন্ম হয়েছিল দু'চার মাস এদিক ওদিক। কিন্তু তারপরের সম্পূর্ণ পথ ওরা একসাথে চলেছিল। এক পাড়ায় থেকেছে, এক স্কুলে গিয়েছে, একসঙ্গে পড়াশোনা ছেড়েছে, একসাথেই সেনাবাহিনীতে ঢুকেছে। তারপর আজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল। লোকে হরিহর আত্মার উদাহরণ দিতে ওদের দেখাত। ওরা মজা করে বলতো, মনে পড়ে না, কখনও আমরা একলা বিশেষ কিছু করেছি বলে। তা সে স্কুল পালানো হোক, কি গাছ থেকে আছাড় খাওয়া হোক, হেডস্যারের বাগানের ফুলচুরি হোক, টিকিট না কেটে ট্রেনে চড়াই হোক...।

আজ যখন অ্যাকশনের অর্ডার দিয়েছিলাম, ওরা চেয়েছিল একসাথে যেতে। কিন্তু রবিনকে যেতে দিই নি। বাঙ্কার খালি করে যাওয়া যাবে না। সুনন্দ বুড়ো আঙ্গুল তুলে 'থাম্বস আপ' দেখিয়ে চলে গেছিল।

—অ্যাই রবিন, আমি উঠে দাঁড়াতে পারছি না। একটু ধরবি?

আবার সেই স্বর! আর কোন সন্দেহ নেই, এ সুনন্দ! ওর নিশ্চই কোনও বিপদ হয়েছে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে বিপদের একটাই মানে হয়। এক মুহূর্তের জন্যে চোখের সামনে ওদের দুজনের হাসিমুখ ছবিটা ভেসে উঠলো।

রবিনকে অসহিষ্ণু লাগছিল। হাত তুলে ওকে থামিয়ে বললাম, বাইরে খুব কাছেই এক্সট্রীম ফায়ারিং হচ্ছে। এই অবস্থায় আমি তোমায় যেতে দিতে পারি না রবিন। আয়্যাম ওয়েটিং ফর রিইনফোর্সমেন্ট। তার আগে আমি চাই না আর একজন হ্যান্ড কমে যাক।

বাইরে সেই কাতরোক্তি আরও একবার শোনা গেল। আর একটু যেন ক্ষীণ। রবিন অনুনয় করে বলল, ও আমার বন্ধু, মেজর। আমরা ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি। প্লীজ আমাকে যেতে দিন।

এবারেও রবিনের পাগলামিতে অনুমতি দিলাম না। এই অন্ধকারে ফায়ারিংএর মধ্যে বাইরে যাওয়া পাগলামি ছাড়া আর কি? ওকে বুঝিয়ে বললাম, তুমি ভুল করছ, রবিন। ব্যাটলফীল্ড সেন্টিমেন্টাল হবার জায়গা নয়। মন শক্ত করো। আমি জানি সুনন্দ তোমার বন্ধু কিন্তু আওয়াজ শুনে বুঝতে পারছ না, হি'জ নট গোইং টু সারভাইভ?

হঠাৎ বুঝলাম না একথা বলে ঠিক করলাম কিনা। যুদ্ধক্ষেত্রে কম্যান্ডিং অফিসারের অবাধ্য হতে নেই, জওয়ানদের শেখান হয়। দেখি দু'হাত পিছনে করে শক্ত হয়ে রবিন আমার আদেশ পালন করতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাপরের মতো ওর বুকের ওঠানামা দেখে মনে হচ্ছিল ওর হৃৎপিণ্ডটা বোধহয় বুক ছিঁড়ে এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে।

আর একবার সেই ক্ষীণ স্বরটা ভেসে এলো- রবিন...? রবিন কাতরভাবে আবার বলল, এখনও ওকে হয়তো আমি বাঁচাতে পারি, মেজর। প্লীজ...।

আর পারলাম না। হতাশভাবে মাথা নেড়ে ওকে বললাম, ওকে, গো গেট হিম। বাট বি কেয়ারফুল। রবিন ধনুকের ছিলা ছাড়া তীরের মতো বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে গেল। যদিও জানতাম ও অযথা রিস্ক নিচ্ছে, কিন্তু ওকে আর রুখতে পারি নি।

অন্ধকারে রবিন কি করে সুনন্দকে খুঁজে পেল, কি করে তাকে টেনে হিঁচড়ে বাঙ্কারে নিয়ে এলো জানি না। কিন্তু দেখি খানিক পরেই জামা ধরে একজন সৈনিকের দেহটা টেনে এনে বাঙ্কারে ফেলল। রবিনের ডান হাতের জামায় রক্ত লেগে। বুঝলাম মৃত্যু খুব দূরে ছিল না। বন্ধুকে খুঁজে নিতে রবিন নিজের জীবনের পরোয়া করে নি!

সুনন্দর মুখের দিকে চাইতেই আমার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। নাড়ী পরীক্ষা করেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ও গড!

যুদ্ধে নিকট বন্ধুকে আমি এর আগেও হারিয়েছি। নিজেকে সামলে নিলাম। রবিন পাথর হয়ে গেছিল, মনে হল ওর সব অনুভূতি বোধহয় অসাড় হয়ে গেছে। আমি স্বান্তনার স্বরে বললাম, আই টোল্ড ইউ রবিন, হি ইজ নো মোর।

রবিন তখনও এক দৃষ্টিতে সুনন্দর দিকে চেয়ে ছিল। ওকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবার একটু ধমকের সুরেই বলতে হল, আমি তোমাকে বলেছিলাম কিনা, ও বাঁচবে না? নাউ ইউ সী, হি ইজ ডেড। তুমিও মারা যেতে পারতে, অ্যান্ড আই উড হ্যাভ লেফট উইথ অ্যানাদার হ্যান্ড লেস...? অল বিকজ অফ ইয়োর সিলি সেন্টিমেন্ট। এখন বুঝতে পারছ, কতোবড় ভুল তুমি করেছিলে?

—আমার ভুল হয় নি মেজর। রবিন যন্ত্রের মতো কথা বলল এবার। গলার স্বর তার বরফের মতো ঠাণ্ডা, আমি কোন ভুল করি নি। আমি যখন ওর কাছে পৌঁছই তখনও ও বেঁচে ছিল। —হাউ ডিড ইউ সে দ্যাট?

যদিও সন্ধ্যা
—ও কথা বলেছিল, মেজর। আমি যখন ওর হাত ধরেছিলাম, ও কথা বলেছিল,...ওর শেষ কথা...। কি বলেছিল জানেন?
—কি?
—ও বলেছিল, আমি জানতাম, তুই আসবি!

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা