ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
সাফাই অভিযান

জিন্টির হাতের লেখা খুব ভালো। সে একটা সাদা কাগজে সুন্দর করে লিখেছে পাড়া পরিষ্কার রাখতে কি কি করণীয়। তার অনেকগুলো ফটোকপি করান হয়েছে। বিকেলবেলা বাড়ি বাড়ি সেগুলো বিলি করতে বেরোল ইয়ং স্কোয়াড। যে বাড়িটা থেকে শুরু করল সেটা অবিনাশ দত্তর, পাড়ায় যিনি বদমেজাজি দত্ত বলে পরিচিত। ছোটোরা পারতপক্ষে ওনার ধারে কাছে ঘেঁষতে চায় না। ওনার বাড়ির দোতলা থেকে রোজ সকালে জঞ্জাল বোজাই একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটের পুঁটলি পাশের এক চিলতে ফাঁকা জমিতে ছুঁড়ে ফেলা হয়। হাজার বারণ সত্ত্বেও কোনো ফল হয় নি। চিরন্তনের সঙ্গে তো এই নিয়ে একদিন কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয়ে গেছে।

জিন্টি এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো। সাহস করে সেই আগে এগিয়ে গেল। সঙ্গে বৃষ্টি আর সায়ন, পাড়ায় যাদের ডাকাবুকো বলে বেশ নাম আছে। ডোরবেল বাজান হল, দরজা খুললেন আর কেউ নয়, স্বয়ং অবিনাশদাদু। পাড়ার এতগুলো কচিকাঁচাকে একসঙ্গে দেখে তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল।

জিন্টির বুক দুরদুর করছিল। কিন্তু সে মিষ্টি হেসে একটা কাগজ অবিনাশদাদুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “দাদু, আমরা ঠিক করেছি আমাদের পাড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখব, রাস্তাঘাটে নোংরা থাকবে না। এর জন্যে আপনাদের সবার হেল্প দরকার। এই কাগজটায় সব লেখা আছে, প্লীজ এগুলো ফলো করবেন।”

অবিনাশ কাগজটায় চোখ বুলিয়ে হেঁড়ে গলায় বললেন, “পড়াশোনা, খেলাধুলো সব ছেড়ে এসব করা হচ্ছে?”
“না না পড়াশোনা আমরা ঠিকই করছি। আর খেলব কোথায় বলুন? পার্কটা আর মাঠটা কী বিচ্ছিরি নোংরা হয়ে থাকে। সেজন্যেই তো আমরা এসব করছি,” বৃষ্টি বলে উঠল।
“এটা কিন্তু আপনাদের মানে সব বড়োদের পরীক্ষা ধরতে পারেন,” সায়নের সাহস বেড়ে গেছে, “আমরা নজর রাখব কে কতটা নিয়ম মানছে।”
সবাই একটা বোমা ফাটার আশঙ্কা করছিল কিন্তু তার আগেই রিম্পি রিকির হাত ছাড়িয়ে সায়ন আর বৃষ্টির মাঝখান দিয়ে ওর ছোট্ট মুখটা বাড়িয়ে হঠাৎ বলে উঠল, “স্টার না পেলে কিন্তু আমরা পানিশমেন্ট দেব। দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।”

স্কুলের আন্টিদের কাছ থেকে রিম্পির নবলব্ধ জ্ঞান এটা। ওর নার্সারি স্কুলে কোনো বিষয়ে ফুল মার্কস পাওয়াকে স্টার পাওয়া বলে।

রিম্পির এই কথার পর আর কেউ দাঁড়াল না সেখানে, হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল।

রিকি চিরন্তনকে বলল, “জেঠু, তুমি বোনকে বাদ দাও দল থেকে। এতক্ষণে বোধহয় অবিনাশদাদু বাড়িতে ফোনও করে দিয়েছে।”
“তুই ঘাবড়াচ্ছিস কেন? বলেছে তো রিম্পি, তুই তো আর না। রিম্পিকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই নেই।”

এর মধ্যে চিরন্তন নিয়মিত পুরসভায় যাতায়াত করে পার্ক, খেলার মাঠ, দু একটা ফাঁকা জমি যা পড়ে আছে সব পরিষ্কারের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। ততদিনে সবাই পাড়া পরিষ্কার রাখার নির্দেশাবলীও পেয়ে গেছে। দিন কয়েকের মধ্যেই ইয়ং স্কোয়াডের একটা মিছিল দেখতে পেল সবাই, হাতে প্ল্যাকার্ডে “নিজের শহর পরিষ্কার রাখুন,” “যেখানে সেখানে প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলবেন না,” “জঞ্জাল শুধুমাত্র জঞ্জাল ফেলার গাড়িতেই ফেলুন, আশপাশ আবর্জনামুক্ত রাখুন” ইত্যাদি লেখা।

শুধু মিছিল বা কাগজ বিলি নয়, ইয়ং স্কোয়াড কাজ করাতেও পিছিয়ে নেই। যাদের বাড়িতে বাগান আছে তারা বাগান পরিষ্কার করা, গাছে জল দেওয়া এসবও করছে। একদিন দেখা গেল খেলার মাঠে বড়োদের ফেলে যাওয়া প্যাকেট, কাগজ ছোটোরা নিজেরা ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করছে। বড়োরা সেদিন একটু হলেও লজ্জা পেল। পার্কে নতুন লাইট, গাছ লাগান হয়েছে, দোলনাগুলোতে নতুন রঙ হয়েছে। বাচ্চাদের উৎসাহ দেখে কে! কেউ একটা ফুল কি পাতাও ছেঁড়ে না, পারলে দোলনাগুলোও ঝাড়পোঁছ করে! হরেনের গরুদের ঢোকাও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই উন্নতি চোখে পড়ল। বাচ্ছাদের জোরাজুরিতে তাদের বাবা মারাও আস্তে আস্তে সব মানছিলেন। অবিনাশের যদিও এসব মানার কোনো ইচ্ছেই ছিল না কিন্তু তাঁর নাতি নাতনি ইয়ং স্কোয়াডের সদস্য হয়ে যাওয়ায় মানতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে রিম্পিদের পাড়ার খবর সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে দেখেও গেছে, প্রশংসাও করেছে। চিরন্তন পুরো কৃতিত্বই ইয়ং স্কোয়াডকে দেন, বলেন, “ওরাই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।”

এর মধ্যে একদিন সারা শহরে মাইক বাজিয়ে ঘোষণা করা হল যে শহরের সব ওয়ার্ডের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে। সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ডকে পুরস্কার দেওয়া হবে। সব ওয়ার্ডের মধ্যেই এবার সাজসাজ রব পড়ে গেল। রিম্পিদেরই একমাত্র অত চিন্তা নেই, ওদের পাড়া তো পরিষ্কারই, ওয়ার্ডের বাকি অংশটুকুও ঠিকঠাক করতে তেমন সমস্যা হল না।

হঠাৎ একদিন চিরন্তনের কাছে খবর এল যে পার্কে খুব গোলমাল হচ্ছে। তিনি তো শুনেই বেরিয়ে গেলেন। কী ব্যাপার, না পার্কে কে বা কারা একগাদা জঞ্জাল ফেলে গেছে। হরেন দেখেছে তাদের, অন্য পাড়ার কতগুলো ছেলে নাকি। ছোটোরা খেলতে এসে এসব দেখে খুব মনমরা, তাদের চেঁচামিচিতে অনেকে এসেও গেছে। সবাই খুব উত্তেজিত।

হরেন বলছে, “এইগুলা অহনই অগো পাড়ায় গিয়া ফালাইয়া আস। পোলাপানগুলার খেলার জাগায় ফালাইল। বান্দরের পাল!”
অবিনাশ হেঁড়ে গলায় চেঁচাচ্ছেন, “হরেন তুই ছেলেগুলোর নাম বল। তারপর আমি দেখছি।”
ইয়ং স্কোয়াডেরও তাই মত, এখনই ওদের পাড়ায় যাওয়া হোক।
চিরন্তন সবাইকে শান্ত করলেন, বললেন, “না আমরা এসব কিচ্ছু করব না। বড়ো জোর আমরা ওদের বলতে পারি যে এসব করা ঠিক নয়।”
উনিই সব পরিষ্কার করে আবার সব ঠিক করার ব্যবস্থা করলেন।
দেখতে দেখতে প্রতিযগিতার দিন এসে গেল। বিচারকের দল সব ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে দেখলেন। ফলাফলও ঘোষণা করা হল। ইয়ং স্কোয়াডের প্রত্যাশা মতো তাদের ওয়ার্ডই প্রথম পুরস্কার পেল।

চিরন্তন পার্কে একটা ছোটো অনুষ্ঠান করলেন ইয়ং স্কোয়াডকে পুরস্কৃত করার জন্যে। ইয়ং স্কোয়াডের সব সদস্য হইহই করতে করতে স্টেজে উঠল। তাদের আনন্দ দেখে কে! এই সঙ্গে স্কোয়াডের সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য রিম্পিকে একটি বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হল। সে নাকি একটি অসম্ভব কাজ করেছে যদিও সেটা সর্বসমক্ষে প্রকাশিতব্য নয়। কিন্তু যেটা সবার সামনে বলা যাবে না সেটার প্রতিই সবার কৌতূহল থাকে। তাই সংবাদ সংগ্রহে বিলম্ব হল না।

জানা গেল সাফাই অভিযানের সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না বা বলা ভালো বন্ধ করার কোনো চেষ্টাই করা যায় নি। পাড়ারই এক ভদ্রলোক যাতায়াতের পথে রোজই রিম্পিদের বাড়ির উলোদিকে ইয়ে করেন। এরকমই এক দিন রিম্পি খেলছিল চিরন্তনদের বাড়িতে। এই কাণ্ড দেখে সে চেঁচিয়ে বলল, “জেঠু তুমি কি গরু? তোমার বাড়িতে বাথরুম নেই, তাই তুমি রাস্তায়…….” ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভদ্রলোক মুখে তো কিছু বললেন না কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিলক্ষণ চটলেন। কিন্তু ওইখানে ওই কম্মোটি করাও বন্ধ করতে হল। চিরন্তনের মতে একেও যদি অসাধ্য সাধন না বলি, তাহলে আর কাকে বলব!

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা