ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

আজ সকাল থেকেই দিন্ টা খারাপ কাটল। কার মুখ দেখে যে উঠেছিলো কে জানে? ঘুম থেকে উঠেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল রুমির। রবিবার অর ভালো লাগে না। ছুটির দিন ওর ভাল লাগে না একটুও। আগের দিন মোবাইলটা হাত থেকে পরে দুটুকরো হয়ে গেছিল; আজ ল্যাপটপ চালাতে গিয়ে দেখল গোলমাল করছে যন্ত্রটা। আজ আর চ্যাটে বসা যাবে না। কাল বাবা মা দুজনেই খুব বকেছেন রুমিকে মোবাইল এর জন্য। আজ ল্যাপটপ খারাপ হয়েছে শুনলে না মেরে বসেন। কিন্তু এভাবে তো থাকা যায় না। ফোনটা অনেক কসরত করে জুড়ল ও কিন্তু ল্যাপটপ এর জন্য কাউকে ডাকতেই হবে। একাজ ও একা পারবে না। বিকেলে 'গয়নার বাক্স' দেখার প্ল্যান করেছিল কিন্তু ক্যান্সেল করতে হল। ল্যাপটপ সারাবার জন্য নিজের গাঁটের আটশো টাকা বেরিয়ে গেল। যাক তবু পাড়াতেই সারভিস সেন্টার আছে । সার্ভিস যে করে, সেই দাদাটিও খুব ভাল তবে টাকাটা কম নিলে আরও ভালো হত।বাবা মুখের সামনে কাগজ ধরে সকালটা কাটিয়ে দিলেন। মা রান্না ঘরে গজগজ করতে লাগলেন। টাকার কথা তুলে আর অহেতুক বকুনি খাবার কি দরকার? সাতটা থেকে সনি টিভি তে 'জব তক হ্যায় জান' দেখা যাবে বরং।

কিন্তু সে গুড়েও বালি। ঠিক সাতটা বেজে দশ মিনিটেই এমন ঝড় উঠলো মনে হল পৃথিবীর 'র ই না জান চলে যায়। যথারীতি লোডশেডিং। সেই কারেন্ট এল রাত সাড়ে বারোটায়। ইনভারটার কখন বন্ধ হয়ে গেছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিল রুমি আজকের দিনটার কথা। কি বাজেই না কাটল সারাদিন। ঘুমও আসছে না। কিছুক্ষন মোবাইল এ গান শোনার চেষ্টা করল তার পর একটা গল্পের বই খুলে বসলো। অনেক দেরি করে ঘুম এল রুমির। হঠাৎ মনে হল ও আর বিছানায় নেই কোথায় যেন চলে এসেছে- চারদিকে সবুজ গাছ এর সমারোহ, দূরে নীল পাহাড়ের সারি। সামনেই একটা পান্না রঙের নদী বয়ে যাচ্ছে তির তির করে। সেখানে খেলা করছে কয়েকটা রাজ হাঁস। নাম-না-জানা হরেক রকম ফুল ফুটে আছে। দুটো ময়ূর পেখম মেলে নাচছে। অচেনা ফুলের সুবাসে মন কেমন করে উঠলো। রুমি হাত বাড়িয়ে একটা বেগুনি রঙের ফুল তুলতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সাদা দাড়িওলা লোক রুমির হাত চেপে ধরল।

কি করছ খুকি? এটা কি তোমার বাড়ির বাগান পেয়েছ?
রুমির ভারি রাগ হয়ে গেল বলল, একটা ফুল-ই তো তুলছিলাম দাদু।
প্রথমে মনে হবে একটা ফুল তুলি, তার পর মনে হবে আর একটা তুলি তারপর মনে হবে আর ও চারটে তুলি।এই করেই তো তোমাদের লোভ বাড়ে।
রুমি অবাক হয়ে দেখছিল লোকটাকে। কোন প্রতিবাদ করতে পারতে পারল না চট করে।
বুড়ো লোকটা আবার বলল, তুমি দেখছি খুব রেগে গেছ, চলো ওই নদীর ধারে বসা যাক। ইচ্ছা না থাকলেও রুমি গেল। এই লোকটা ছাড়া এখানে সব কিছুই ভাল। নদীর তিরে একটা বড় গাছের তলায় গিয়ে ওরা বসলো। ঠিক গোধূলি'র আলো এখন। আকাশে রামধনু দেখা উঠেছে। এতো সুন্দর পরিবেশ আগে কখনও দেখেনি ও। বুড়ো লোকটি বললেন, কি খুকি, কেমন লাগছে এখানে?
খুব সুন্দর দাদু । আগে কখনো এত ভাল লাগেনি। এটা কোন জায়গা?
একটু আগের রাগটাও ও ভুলে গেছে। সাদা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে লোকটা বলল, এটা স্বর্গ। এখানে প্রকৃতি আছে তাই তোমার এতো ভাল লাগছে।
রুমি হতভম্ব হয়ে বলল, আমি কি মারা গেছি? কই মনে পড়ছে না তো!
না না তুমি এখন তোমার বিছানায় ঘুমিয়ে আছ। তোমার আত্মা কে এনে হাজির করেছেন ভগবান। তিনি আসলে ছোটো ছেলে মেয়েদেরই বেশি পছন্দ করেন বড়োদের থেকে। রোজই চেষ্টা করেন কোনও না কোনও ছেলেপুলেকে কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে আসার। কতো গল্প করেন তাদের সাথে আবার সময় হলে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেন।
রুমির কাছে এতক্ষনে পরিষ্কার হয় ব্যাপারটা। না হলে তো প্রায় কান্নাই এসে যাচ্ছিল ওর ! বলল, এখানে এসে আর ফিরতে ইচ্ছা করছে না আমার। ফিরে গেলেই আবার কলেজ পড়াশোনা কোচিং বাবা মায়ের প্রত্যাশা উফ! আমি আর যাবো না দাদু। কি সুন্দর শান্তি এখানে।
সামনের ঝোপ থেকে এক দল হরিণ বেরিয়ে এল। রুমি আবার বলল, এখানে মানুষ নেই খালি গাছপালা আর প্রা্ণী দেখছি।
মানুষ আছে তবে অনেক কম। এখন স্বর্গে আসার মত মানুষ পৃথিবীতে বেশি নেই।
আচ্ছা দাদু তুমি কে?
আমি বাগান দেখা শোনা করি। মালি বলতে পারো। নাও আপেল খাও। -বলতেই একটা লাল টুকটুকে আপেল এসে গেল রুমির হাতে। একটু আগেও ওর হাত খালি ছিল। আশ্চর্য হল না রুমি। স্বর্গ বলে কথা এখানে অনেক কিছুই হতে পারে।
রুমি আপেলটা নিয়ে একটা কামড় বসাল। দারুন স্বাদ ।বলল, তুমি ভগবান কে দেখেছ? কেমন দেখতে তাকে? তিনি নারী না পুরুষ?

না খুকি আমি তাঁকে কক্ষনও দেখিনি। তবে এখন তুমিই আমার ভগবান। এই গাছপালা নদী পাহাড় আকাশ এই সব কিছুর মধ্যেই তিনি আছেন। যা কিছু ভাল তাই জানবে ভগবান। চল খুকি তোমাকে একটু ঘুরে দেখাই। এসো আমার সঙ্গে। মালি উঠে দাঁড়ালেন। রুমিও উঠে পড়লো। মালি দাদু হাঁটছেন পেছনে রুমি। মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে ও দু চারটে ফুল কুড়িয়ে নিচ্ছে। কখন ও দাঁড়িয়ে পড়ছে অবাক হয়ে। আকাশের রঙ কেমন হাল্কা বেগুনি। গাছের পাতাগুলো আশ্চর্য রকমের সবুজ। মাটির রঙ গোলাপির দিকে। একটা গাছের তলায় এক সিংহ পরিবার বসে আছে। বাচ্চা দুটো খেলা করছে। সিংহ আর তার গিন্নি চোখ পিটপিট করে দেখতে লাগলো রুমিকে।
ও খুকি তুমি যে খালি দাঁড়িয়ে পড়ছ। মালি দাদু বললেন।
কি করব দাদু, আর হয়ত এখানে আসতে পারব না। তাই দেখে নিচ্ছি দু চোখ ভরে।
তা ঠিক যখন তোমরা মানুষরা কোথাও বেড়াতে যাও বেশির ভাগ সময়ই তোমরা চোখ বুজে ঘুমাও আর নয়তো নিজেদের মধ্যে হইহই করো। তারপর মোবাইল নিয়ে ব্যাস্ত থাকো, চিপসের প্যাকেট ফেলে নোংরা করো।
রুমি বলল, তুমি ঠিকই বলেছ দাদু।
ওই নদীর ওপারে মানুষদের বসতি আছে। এখানে সব কিছুই নিয়মে চলে। মানুষ ও অনেক কম। তোমাদের মত প্রতিযোগিতা এখানে নেই। সবাই সকাল সন্ধ্যে উপাসনা করে।
এখানে স্কুল নেই? চাকরি নেই? চলে কি করে?
স্কুল আছে। তবে কড়াকড়ি নেই। সবাই এখানে নিয়ম মেনে চলে। পরীক্ষা নেই। স্কুলে আমরা মানুষ তৈরি করি। শিক্ষিত অমানুষ নয়। আর চাকরি ? এখানে যারা বাস করে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু কাজ করে। প্রত্যেকে নিজের জমিতে চাষ করে ফসল ফলায়। অনেকে হাতের কাজ করে। কেউ শিক্ষা দান করেন । আমাদের নিজেদের যতটা প্রয়োজন আমরা ততটাই উপার্জন করি। বেশি বা কম নয়।
তোমরা অবসর সময়ে কি কর? তোমাদের তো টিভি নেই?
আমরা বই পড়ি, ছবি আঁকি। গান গাই, নাচি সে ভারি মজা। প্রায়ই আমরা একজোট হয়ে এরকম আনন্দ করি। পশু পাখিরাও যোগ দেয় আমাদের অনুষ্ঠানে।
তোমরা সবাই কেমন আনন্দ কর। অথচ আমার জীবনে কোন মজা নেই কোন আনন্দ ও নেই। রুমির একটা নিঃশ্বাস পড়ল।
হুম! খুব সমস্যা তোমাদের মতো মানুষদের। মর্তে দুঃখ কষ্ট বেশি বলেই শুনেছি। সবাইকে তো বলতে পারছি না তাই তোমাকেই বলছি ভাল কাজ করো দেখবে তোমার মন ভাল থাকবে। মর্তে যখন জন্মেছ দুঃখ তো পেতেই হবে খুকি। কখনও প্রিয়জনেরা দুঃখ দেবে, কখনও বাইরের নানা ঝামেলা বিপত্তি থাকবে। তা নাহলে ওটা মর্ত কেন?
ভাল কাজ কি ভাবে শুরু করব? দান ধ্যান ?
মালি দাদু আবার একটু হাসলেন। বললেন, তোমার বাড়িতে বাগান করার জায়গা আছে? অথবা ছাদ?
হ্যাঁ আছে।
তুমি আগে সুন্দর করে একটা বাগান করো। ছাদেও কিছু গাছ লাগাও টবে । বাড়িতে সবাই কে বোঝাও গাছ লাগানোর উপকারিতা। দেখবে তোমার বাগান দেখে সবার ভাল লাগবে। তোমার নিজের ও কত তৃপ্তি হবে। যখন দেখবে তোমার নিজের হাতে লাগানো গাছে ফুল বা ফল ধরেছে।
তুমি দারুন বুদ্ধি দিয়েছ দাদু । আমি নিশ্চয়ই করব। টিভি ল্যাপটপ মোবাইল ভিডিও গেম এসব আস্তে আস্তে আমাদের কেমন নিস্তেজ করে দিচ্ছে। জীবন থেকে আনন্দ উৎসাহ সব হারিয়ে যেতে বসেছে।
আনন্দ পেতে চাইলে কিছু সৃষ্টি কর খুকি। নিজের সৃষ্টিকে দেখলে যে আনন্দ পাওয়া যায় তার সাথে কোন কিছুর তুলনা মেলে না। প্রকৃতিকে ভালবাসতে শেখ। সে সব সময়ই সুন্দর। তাকে ভালবাসলে সেও তার রূপের ডালি নিয়ে তোমার চোখে ধরা দেবে...।

স্বপ্নটা ভেঙ্গে যেতেই মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেল। সত্যিই তো বুড়ো দাদু ঠিক কথাই বলেছেন। সারাক্ষণ যন্ত্র নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমরা নিজেরাই কেমন যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি । বিকেলের দিকে একটু খোলা আকাশের নীচে বসলে মন ভাল থাকে। বাগান করার সাজেসানটাই বেস্ট। অন্তত ফেসবুকের থেকে ঢের ভাল। সকাল থেকেই নতুন উদ্যম নিয়ে কাজে লেগে পড়েছে রুমি। প্রথমে বাজার থেকে টব কিনে আনল দুটো। সেগুলো বারান্দার এক কোণে রাখল। তারপর সন্ধ্যামালতির বীজ যোগাড় করল । মা বললেন, আমার অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল বাগান করার। ছাদে অনেকটা জায়গা আছে করলে বেশ ভাল হয়। আমার আর পুজোর জন্য ফুল কিনতে হবে না।
বাবা এতক্ষণ কাগজ পড়ছিলেন এবার বললেন, না তা হয় না। রুমি কষ্ট করে ফুল ফোটাবে আর তুমি তুলবে তা হতে দেব না। যেমন বাজার থেকে ফুল কিনে আনি সেরকমই কিনে আনবো । কিছু অফিসটাইম , গাঁদা , দোপাটি, অপরাজিতার বীজ তোকে জোগাড় করে দেব। আর গোলাপ, ডালিয়ার চারা কিনে আনব ।
এখন তো ডালিয়ার সময় নয়, বরং বেল, জুঁই , গন্ধরাজ, কামিনী এগুলো এনো।
বাবা মায়ের এতো আগ্রহ দেখে খুব অবাক লাগে রুমির। বলল, আগে তো দুটো চারার যত্ন করতে শিখি তারপর আসতে আসতে বাড়ানো যাবে গাছের সংখ্যা । দেখি কেমন ফুল হয় হয় এই দুটো থেকে।
আমরা তোকে হেল্প করব। দিনরাত মোবাইল নিয়ে খুটখুট করার চেয়ে অনেক ভাল কাজ । সময় ও কাটবে আমাদের। মা বললেন।
বাবা বললেন, আমি ও দুটো টব আনব অফিস থেকে ফেরার সময়। একটায় আমি অফিসটাইম বসাব আর...
মা বাবার থেকে কথা কেড়ে বলে ওঠেন , আর একটায় আমি স্বর্ণলতা বসাব। পাশের বাড়ির দুষ্টু'র মায়ের থেকে বীজ চেয়ে আনব। দেখব কার গাছের ফুল সবচেয়ে ভাল হয় রুমির, আমার না রুমির বাবার! জঘন্য সিরিয়াল গুলো দেখার থেকে অনেক ভালো টাইমপাস হবে।
তাহলে আজ থেকেই কম্পিটিশান শুরু হয়ে যাক । রুমি ঘোষণা করে।
হ্যাঁ , তবে এই প্রতিযোগিতায় আমরা প্রত্যেকেই একে অপরকে সাহায্য করব! বাবা বললেন।
সবাই কে খুব খুশী দেখাচ্ছে আজ। আনন্দের সন্ধান পাওয়া গেছে দেখে রুমির মন ভাল হয়ে যায় । এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে ভোরের বেলার স্বপ্নের কারনে। ভোরের স্বপ্ন কে সত্যি করার জন্য মন প্রাণ দিয়ে খাটবে রুমি।


ছবিঃ পারিজাত ভট্টাচার্য্য

লেখক পরিচিতি

সহেলী চট্টোপাধ্যায়

হালিশহরের বাসিন্দা সহেলী চট্টোপাধ্যায় বিভিন্ন ছাপা এবং ওয়েব পত্রিকায় বড়দের ও ছোটদের জন্য নিয়মিত গল্প লেখেন।

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা