ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
বাঁচার উড়ান

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পুবের আকাশে তখন লালাভ রং-এর ছটা ছড়িয়ে পড়ছে।। চারদিকে বিশ্বচরাচর জেগে উঠছে ধীর লয়ে। আবছা আন্ধকার থেকে গাছ গাছালি ক্রমশ দেখা দিচ্ছে। হাল্কা উত্তুরের হাওয়ায় তখন শীতের আমেজ। এদিকে চার দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ ও জলাজমির মধ্যে জেগে থাকা তেঁতুল ও বাবলা গাছে তখন সবার ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে। সবাই যে যার মতো 'ক্যাচর - ম্যাচর' করে দিনের কাজ শুরু করেছে। একে একে সবাই উড়ে যাচ্ছে গাছের ডাল থেকে।

আমাদের বাসায় আমার মায়ের কোল একদম ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। আমি তখন গুটিসুটি মেরে মায়ের কোলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। দেখি ভাই কখন মায়ের কোলের মধ্যে আরো সিঁধিয়ে বসে রয়েছে। চোখ বন্ধ করে ঝিমুচ্ছে। ভোরের শীতঘুম!

রাতচরা ধুসর রং-এর বক পাখিটা তখন দক্ষিণের বিল থেকে এসে ক্লান্ত দেহে আমাদের বাসার পাশের ডালে বসল। তারপর আনমনে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে আমাদের দিকে চোখ যেতেই একটু অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে -"কি লো পানকৌড়ি বৌ সকাল হতে চলল! বের হবি না?" মা তখন আমতা আমতা করে উত্তর দেয় -"যাবো তো নিশ্চই কিন্তু এই দেখ না বাচ্চাগুলো ছাড়ছে না কিছুতেই।" বকটা তখন গা ঝাড়া দিয়ে রাতের ক্লান্তি দূর করে বলে - "তা বললে হয়, ওদের উড়তে শেখাচ্ছ? ওদের বড় হাতে দাও। আর সকাল সকাল না বের হলে পরে আর কোন খাবারের সন্ধান পাবেনা কিন্তু..."

মা অস্বস্তিতে ঘাড় নেড়ে উত্তর দেয় - "জানি তো কিন্তু কি যেকরি..." বলেই মা গা ঝাড়া দিয়ে বাসা থেকে উড়ে উপরের ডালে বসল। অমনি একরাশ শীত এসে আমাদের জবুথবু বানিয়ে ছাড়ল। আমারা দু'জন তখন শীতের ভয়ে মায়ের কোলের জন্য বায়না ধরে কাঁদতে শুরু করি। মা এবার শাসন করে আমাকে বলে-"বুড়ি, তুই দিন দিন বড় হচ্ছিস। এখন ভালো করে উড়তে শিখলি না। কি করে চুনো পুঁটি শিকার করে নিজের খাবার জোগাড় করতে হয়, তাই-ই শিখলি না। এখন তোর কাজ হল ভাইয়ের দিকে নজর রাখা আর ওড়া প্র্যাকটিস করা। যতক্ষণ না আমি ফিরে আসছি ভাইকে লক্ষ্য রাখবি।"

তরপর মা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল দক্ষিণের খালে। আমি কি করব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। দেখি ভাই আমার কোলের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। তারপর কাঁদো কাঁদো ভাবে বলে - "দিদি, আমার বড্ড শীত করছে।" আমার রাগ হয়। রেগে গিয়ে বলি -"ছটু, এখন আর ঘুমোনোর সময় নয়। চল্‌ এখন আমরা ওড়া প্রাক্টিস করি।" ভাই তখন বিরক্ত হয়ে বলে - "ধ্যাত, আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমোব।"

আমি ডানা ঝাপটে ওড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি কখন যেন গাছের ডালের অনকটা উপরে উড়ে বেড়াচ্ছি! আমার বেশ মজা লাগে। আমি ভাইকে ভেঙচি কেটে বলি - "হেই কুঁড়ে, ঘুম কাতুরে --- উ-উ-উ।" বলেই একটা চক্কর দিলাম গাছটার উপরে। এখান থেকে এখন নিচের পৃথিবীটা খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। চারদিকে সবুজে সবুজ, জলাজমি, গাছ গাছালি কেমন সাজানো গোছানো বাগানের মতো দেখাচ্ছে। উপরে নিচে ওঠা নামা করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে আবার আমাদের বাসার পাশের ডালে উড়ে এসে বসলাম। হাঁপাতে শুরু করেছি। বাসা থেকে ভাই তখন আব্দারের সুরে বলে - "দিদি ক্ষিদে পাচ্ছে তো!" আমি বিরক্ত হয়ে উত্তর দিই - "ক্ষিদে পেয়েছে তো আমি কি করব?" "মা ফিরে এলে খাবি!" ভাই কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে - "সেই কখন গেছে মা। এখনো তো ফিরল না। এদিকে আমার তো ভীষণ ক্ষিদে পাচ্ছে তো!"

সূর্য্য তখন মাথার উপর। ভাই ক্ষিদেয় ক্লান্ত হয়ে অসহায়ের মতো নিঃশব্দে আমার দিকে চেয়ে আচ্ছে। কথা বলার শক্তি পর্যন্ত নেই। আমারো ভীষন ভীষন ক্ষিদে পাচ্ছে। মা তো এখন ফিরল না। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। এদিকে ডালের বাসার অনান্য মায়েরা সবাই খাবার নিয়ে ফিরে এসেছে। ওরা সবাই ক্যাচর ম্যাচর করে খেয়ে সবাই এখন খেলায় মত্ত। আমি পাশের ডালে ওদের জিজ্ঞেস করি -"মা কোথায় গেছে জানো?" ওরা সবাই একই উত্তর দিয়েছে - "জানি না।"

আমার কান্না পাচ্ছে এখন। উড়ে গিয়ে যে দেখবো সেই ক্ষমতাও নেই। খুব জোরে কেঁদে উঠি - "মা..."। তক্ষুনি গাছের উপর সেই কালো দুষ্টু কাকটা উড়তে উড়তে বলছে - "আরে তোমরা শুনেছ! দক্ষিণের বিলে পানকৌড়ি বৌ গিয়েছিল মাছ ধরতে, আর ওকে চোরা শীকারীরা ধরে নিয়ে গেছে।" মাথাটা টলমল করে উঠল। কানফাটা আওয়াজ করে কাঁদতে থাকি -"মা..."। সমস্ত আকাশটা যেন মাথায় ভেঙ্গে পড়ল। ডুকরে কাঁদতে থাকি।

কাকটা তখন নিজে নিজে বলতে থাকে - "আরে পানকৌড়িটা যখন জলে ডুব দিতে যাচ্ছে তখনই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম পাড়ে গাছের আড়ালে দুটো লোক জাল হাতে দাঁড়িয়েছিল। ওত পেতে রয়েছে কখন পানকৌড়ি ডুব দেবে জলে আর তক্ষুনি জালটা ছুঁড়ে দেবে ওর উপরে। আমি চেঁচিয়ে বারন করলাম। কিন্তু পানকৌড়ি কোন কথা শুনলেই না। এখন দেখ কি অবস্থা। এই বাচ্ছা দুটোর এখন কি হবে?!" বলেই ও আড় চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়। আমি জানি ও খুব হিংসুটে। এক্ষুনি বাসায় এসে ভাইকে ঠোকরাবে। আমি কাঁদতে কাঁদতে বড় বড় চোখ করে রাগ দেখিয়ে কাকটার দিকে তাকিয়ে থাকি। উড়ে এসে বাসায় ভাইয়ের পাশে বসলাম। ভাইকে সান্ত্বনা দিতে থাকি। ভাই কোন কথা শুনছেই না। কেবল কাঁদেই চলেছে। আমিও ওর সঙ্গে সমানে কাঁদতে থাকি।

আমাদের অসহায় আবস্থা দেখে উপরের ডালের শালিখ পুকলিদিদি আমাদের ডালে এসে বসল। সেও যেন সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছে, শুধু বলল - "বুড়ি তুই মনকে শক্ত কর। তুই বড়, আরো শক্ত হতে হবে তোকে। তুই এক্ষুনি উড়ে গিয়ে কোথাও থেকে খাবার জোগাড় করে আন। আর আমাদের বাসায়তো কোন খাবার নেই যে তোদের দেব।"

ভাই ক্লান্ত হয়ে মুখ গুঁজে শুয়ে ধুঁকছে। আমি যে এখন কি করি! ভাই ক্ষিদেয় আরো বেশি করে ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়েছে। এর আগে তো কখনো খাবার জোগাড় করতে বের হইনি। এখন যে কি করি! কিন্তু আমাকে যে পারতেই হবে। ভাইকে সুস্থ করে তুলতে হবে। চোখের জল মুছে পুকলিদিদিকে ভাইয়ের পাহারায় রেখে ডানা ঝাপটাতে শুরু করি। উড়ে এগিয়ে চললাম ঢলে পড়া সূর্য্যকে লক্ষ্য করে, পশ্চিমের খালের দিকে। তারপর বিকেলের লালাভ জলে ঝাঁপ দিলাম।

অবশেষে প্রায় অন্ধকার সন্ধ্যেবেলা কয়েকটা পুঁটি মাছ ধরে বহু কষ্টে বাসায় ফিরলাম। দেখি শালিখদিদি তখনো সমানে ভাইকে পাহারা দিয়ে বসে রয়েছে। আমাকে দেখে স্বস্তি বোধ করে। তারপর নিজের বাসায় উড়ে যেতে যেতে বলে -"নে ভাইকে খাইয়ে নিজে খেয়ে শুয়ে পড়। কাঁদিস না। যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। তোকে সব সামলাতে হবে..." এদিকে দেখি ভাই ক্ষিদেয় আর মায়ের জন্য কেঁদে কেঁদে একেবারে মুষড়ে পড়ছে। আর সমানে কেঁদেই চলেছে। ওকে আবারো সান্ত্বনা দিয়ে বলি - "ভাই, কাঁদিস না। এইতো আমি এসে গেছি - ভয় কিসের।"

গভীর রাতের তারাগুলো একে একে মিট মিট করে আমাদের দিকে অসহায়ের মতো চেয়ে আছে। এখন আমি ও ভাই মায়ের কোলের মধ্যে আরামে ঘুমোতাম। এখন চোখের জল বাধা মানছে না। ভাই ও সমানে কেঁদে চলেছে। ওকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চুপ তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম - কখন ভোর হয়। বিরাট এই পৃথিবীতে এখন আমরা বড্ড অসহায়। আমাদের কেউ নেই। খুব খুব কান্না পাচ্ছে।

বাঁচার উড়ান

আকাশ পাতাল কত কি যে ভেবে চলেছি তার ঠিক ঠিকানা নেই। কি করবো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না কিন্তু আমাকে শক্ত হতেই হবে। ভাইকে বড় করে তুলতে হবে। এখন সব দায়িত্ব আমার। তাই মনে মনে ঠিক করলাম সকাল হলেই প্রথম কাজ হবে আমাদের খাবার খাবার সংগ্রহ করা আর ভাইকে উড়তে শেখানো। মায়ের জন্য কান্না পাচ্ছে খুব তবুও কান্না চেপে বসে রইলাম সকালের আপেক্ষায়।

এখন ভাই খেয়ে কিছুটা যেন সুস্থ বোধ বোধ করছে। কিন্তু কাঁদো কাঁদো মুখে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে অসহায়ের মতো। আমি নিজেকে শক্ত করে ওকে জোরের সঙ্গে বললাম - "ভাই, চল ওড়া প্র্যাক্টিস করবি।" ভাই কাঁপা কাঁপা গলায় বলে - "আমি পারব না দিদি। আমার ভয় করে যে... " আমি আবারো জোরের সঙ্গে বলি - "তোকে পারতেই হবে। পারতেই হবে তোকে।" আমার জোরাজুরি দেখে ভাই বাসার খড়কুটো আঁকড়ে চেপে ধরে বসে থাকে। আমি জানি ভাই এভাবে ভয় পেয়ে বসে থাকলে ও উড়তে শিখবে না। ও বড় হতে পারবে না। চারদিকে শত্রুর থেকে বাঁচবে কিভাবে। তাই আমি ডানা ঝাপটে পা আঁচড়ে ওকে ঠেলে ফেলে দিলাম। ভাই তখন ডাল থেকে পড়ে যেতে যেতে ডানা ঝাপটাতে থাকে। তারপর বহু কষ্টে আঁচড়ে কামড়ে আবার বাসায় ফিরে এসে বসে। ও চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। আমি আবারো ওকে টেনে হিঁচড়ে ওকে বাসা থেকে নিচে ফেলে দিলাম। ও আবারও নিজেকে সামলাতে ডাল থেকে পড়ে যেতে যেতে ডানা ঝাপটাতে থাকে। আর কখন যেন ও উড়তে শুরু করে। তারপর উড়ে এসে পাশের ডালে বসে হাঁপাতে থাকে। আমি ওকে কোন সুযোগ না দিয়ে আবার ওর দিকে তেড়ে গেলাম। ও ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে পালাতে থাকল। আমি ওকে উৎসাহ দিতে থাকি। চিৎকার করে বলি - "সাব্বাস ভাই, সাব্বাস! এইতো পেরেছিস। তোকে পারতেই হবে। ওড় ভাই ওড়।" ও একা একা উড়তে ঊড়তে অবাক হয়ে আমার দিকে ফিরে তাকায়। আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করতে থাকি - "আমরা বাঁচব ভাই, আমরা বাঁচব।"


ছবিঃ ত্রিপর্ণা মাইতি

লেখক পরিচিতি

নিধু সর্দার

কাগজে-কলমে গ্রাফিক ডিজাইনার। কিন্তু সে কাজ ছাড়াও ইনি নানা কাজ করেন - মাঝেমধ্যে ইচ্ছামতীর জন্য ছবি আঁকেন, মাঝেমধ্যে ভাল ভাল গল্প লেখেন, আর প্রয়োজন হলেই চাঁদের বুড়িকে নানারকমের সাদাকালো-একঘেয়ে-বিরক্তিকর কাজকর্ম (যেগুলি একটা ব-অ-ড় ওয়েবসাইট চালাতে গেলে করতেই হয়)-সেইসব করতে সাহায্য করেন।
নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা