ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
বিষাক্ত গ্যাস রহস্য

(১) ধর, ধর, চোর

মাঝে মাঝে নিজে ড্রাইভ করে বেরিয়ে পড়া তাঁর বহুদিনের স্বভাব। সেদিনও তেমন এক সফরের মধ্যে তিনি বাংলার এক ছোট্ট শহরের বাস স্টেশনে একটু থেমেছিলেন। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে। দূরপাল্লার বাসগুমটিতে তখন অজস্র যাত্রী লটবহর নিয়ে বাসের অপেক্ষায়। কেউ বসে আছে, কেউ আবার অস্থির পায়চারি করছে। তার মধ্যে দুটি কিশোর একটা কুকুর নিয়ে খেলা দেখাচ্ছে আর গান শোনাচ্ছে। যাত্রীরা খুশি হয়ে মাঝেমধ্যে কিছু পয়সা তাদের বাড়ানো থালায় ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছেলে দুটির একজন আবার বাঁশি বাজাচ্ছে, যদিও প্রায়ই তার থেকে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছে না। বোধহয় তার হাত-পা নাড়ার সঙ্কেতেই কুকুরটা লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে নানা খেলা দেখাচ্ছে।

খেলার শেষে ছেলে দুটি বসার জায়গা না পেয়ে একটা বেঞ্চের পাশে এসে দাঁড়াল। কে জানে ওরা আশেপাশে থাকে, না বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। কুকুরটা যেন মালিকের ইশারায় গুমটির অন্যদিকে এক যাত্রীর পায়ের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মোটাসোটা যাত্রীটি তার সঙ্গের একটা টিনের বাক্স শেকল দিয়ে বেঞ্চের সঙ্গে বেঁধে নিশ্চিন্তে ঘুম দিয়েছে। এরা অভিজ্ঞ যাত্রী, বাসের শব্দে ঠিক ঘুম ভেঙে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে আমাদের মোটরযাত্রী একটু অবাক হয়ে দেখলেন, কুকুরটা মন দিয়ে বাক্সের শেকলটা চাটছে।

হঠাৎ আলো নিভে গেল। গুমটিতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। লোড শেডিং? কই, একটু দূরে দোকানপাটে তো আলো জ্বলছে! চিন্তিত যাত্রীরা যে যার মাল সামলাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি ছায়া তিরবেগে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। বাসগুমটি ছাড়িয়ে রাস্তার আলোয় পড়তেই দেখা গেল, এরা সেই দুই কিশোর। তাদের হাতে একটা বাক্স আর পোষা কুকুরটা বশংবদের মতো তাদের পেছনে চলেছে।

মূল রাস্তা ছেড়ে এক নির্জন গলিতে গিয়ে তারা থামল। আশেপাশে কেউ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে তিন মানুষ-জন্তু মিলে বাক্সটা ঘিরে কী যেন করতে লাগল। একটু পর বাক্সটা খুট করে খুলে গেল। সাথে সাথে দুজনের মুখ খুশিতে উদ্ভাসিত! বাক্স হাতড়ে কীসব তাদের কাঁধের ঝোলায় ভরে উঠতে যাবে, হঠাৎ পেছন থেকে শুনতে পেল, "দাঁড়াও!"

চট করে ঘুরে দেখে, এক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মাঝবয়েসী মানুষ। ধাক্কা মেরে পালানো যায় কিনা ভাবছিল, তখন শুনল, "উঁহু, পালাবার চেষ্টা কোরো না, গুলি করে দেব। আর তোমাদের কুকুরটাকেও বলো যেন চুপচাপ থাকে। আমি প্রাণীহত্যাও চাই না।"
ফ্যাকাশে মুখে একটি ছেলে বলল, "আপনি কি পুলিশ?"
"পুলিশের বাবা। নাও, আমার সঙ্গে চলো। যা বলছি করলে আমার দয়া হলেও হতে পারে। নইলে –"

ভদ্রলোকের পেছন পেছন তারা আবার মূল রাস্তার দিকে ফিরে চলল। সেখানে একটা জম্পেশ গাড়ি দাঁড়িয়ে। দরজা খুলে তিনি ওদের ভেতরে বসার জন্য ইঙ্গিত করলেন। একজন আড়চোখে কুকুরটার দিকে চাইছে দেখে তিনি বললেন, "ওকেও তুলে নাও।"

ওরা উঠে বসলে পর ভদ্রলোক বললেন, "চালাকি করার চেষ্টা কোরো না। একটু বেচাল দেখলেই –"
"গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেবেন, আপনার পেছনেও দুটো চোখ।" একটি ছেলে বলল।
"বুদ্ধিমান ছেলে!" ভদ্রলোক হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, "চলো, আগে একটা জরুরী কাজ সেরে ফেলা যাক। তারপর তোমাদের সঙ্গে আলাপ করা যাবে।"
আড়ষ্ট ছেলেদুটি দেখল, উনি আবার বাস স্টেশনের দিকেই চলেছেন। একজন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "স্যার, ওদিকে নেবেন না। পাবলিক কেলিয়ে কীচক বধ করবে।"
"না না, পাবলিক নয়, আমরা পুলিশের কাছে যাচ্ছি।"
"স্যা-র!" ওরা প্রায় কেঁদে ফেলল, "গরিব মানুষ, নিতান্ত বাধ্য হয়ে করে ফেলেছি। আমাদের পুলিশে দেবেন না। তাহলে আমাদের মা-বোন না খেয়ে মারা যাবে।"
"পুলিশের কাছে যাচ্ছি, তোমাদের ধরিয়ে দেব তো বলিনি। সে ব্যাপারটা তোমাদের গপ্পো শুনে তারপর ঠিক করা যাবে।" বলতে বলতে ভদ্রলোক বাস গুমটির পুলিশ চৌকিতে এসে গেছেন।

"ইনস্পেক্টর, এই ছেলে দুটো এই বাক্সটা কুড়িয়ে পেয়েছে। বোধহয় কোনও প্যাসেঞ্জারের মাল কেউ চুরি করে পালাচ্ছিল, এরা গিয়ে পড়ায় ফেলে পালিয়েছে। সব শুনে আমি এদের এখানে নিয়ে এলাম।"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ – একজন প্যাসেঞ্জার তো এক্ষুণি রিপোর্ট করে গেল।" বলতে না বলতেই সেই মোটা লোকটি এসে হাউমাউ করে উঠল, "আরে, এটাই তো আমার বাক্স! কিন্তু কী সর্বনাশ, এ যে ভাঙা!"
ভদ্রলোক বললেন, "চিন্তা করবেন না, আপনার দামি জিনিসগুলো চোর নিয়ে যেতে পারেনি। এরা কুড়িয়ে ব্যাগে ভরে নিয়ে এসেছে।" তাঁর ইশারায় ছেলেদুটি এবার কিছু ধাতব জিনিস তাদের ঝোলা থেকে বের করে কাঁচুমাচু ভঙ্গীতে লোকটার হাতে তুলে দিল।
"এই তো আমার বৌয়ের গয়নাগুলি!" লোকটার মুখে এতক্ষণে হাসি, "বাঃ, সবই ঠিকঠাক আছে। তা বাবারা, বিরাট উপকার করলে! কিছু কিনে খেও", বলে সে একটা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে ধরল।
"না না, তার দরকার হবে না।" ভদ্রলোক বললেন, "আমি ওদের একটু এগিয়ে দিচ্ছি। পথে মিষ্টি-ফিষ্টি আমিই খাইয়ে দেব।"

(২) খুনি গ্যাসের তাজ্জব প্রতিক্রিয়া

একটা চলনসই হোটেল। এখানেই ভদ্রলোক ছেলে দুটিকে নিয়ে রাতের আস্তানা গেড়েছেন। ম্যানেজার কুকুরটা নিয়ে আপত্তি করছিল। কিন্তু ভদ্রলোক কানে কানে কী একটা বলায় সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলল, "না না স্যার, আপনি যান। তবে দেখবেন – মানে, বোর্ডাররা যেন কোনও কমপ্লেইন না করে।"
"কথা দিচ্ছি করবে না, এ ট্রেইনড কুকুর।"

ঘরে গুছিয়ে বসে ভদ্রলোক শুরু করলেন, "আগে পরিচয়টা সেরে ফেলা যাক। আমি ডঃ গৌরব চন্দ্র, ডাক্তার-গবেষক ও একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তা। তোমরা হয়তো আমার নাম শোনোনি। কিন্তু আমাদের লাইনের লোক ছাড়াও অনেক বিখ্যাত মানুষ ও দেশনেতা একডাকে আমায় চেনেন। এবার তোমাদের নাম বলো।"

"আমি বলাই, ও সুবল। আর এ আমাদের কুত্তা ভেলী। আপনি আমাদের দয়া করে পুলিশে দিলেন না দেখে আমরা কৃতজ্ঞ। তবে স্যার, আপনি একজন গণ্যমান্য লোক। দুটো পাতি চোরকে দু'ঘা দিয়ে ছেড়ে না দিয়ে তাদের পেছনে কেন সময় আর টাকা নষ্ট করছেন?"

"করছি এইজন্য যে কতগুলো কারণে তোমাদের সম্বন্ধে আমার মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। আর একজন গবেষকের তো জানো – প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া অবধি শান্তি হয় না।"

বলাই আর সুবল পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাউয়ি করল। ডঃ চন্দ্র বলতে লাগলেন –
"মাঝে মাঝে এমন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া আমার নেশা। শেষ অবধি শিলিগুড়ি যাব একটা কাজেই। কিন্তু ট্রেনে বা প্লেনে না গিয়ে এভাবে ধীরেসুস্থে দেখতে দেখতে গেলে মনটা ফ্রেশ হয়ে যায়। পথে এই বাস স্টেশনে একটু থেমেছিলাম। তখনই তোমরা আমার চোখে পড়ো। প্রথমে আমি কিছু সন্দেহ করিনি। কিন্তু আলো নিভে যাবার পর যা যা ঘটেছে তা আর কেউ না দেখলেও আমার চোখ এড়ায়নি। আমার কাছে তোমাদের খেলাটা স্পষ্ট হয়ে যাবার পর আমি গাড়ি নিয়ে তোমাদের ফলো করি। তারপরেরটা তো জানো।
এবার আমার প্রশ্নগুলি বলি। এক, তোমরা ঘুরে ঘুরে সবার বাক্স নজর করছিলে। কিন্তু কোনটার মধ্যে সোনা আছে কী করে বুঝলে? দুই, তোমরা বাক্সটার চেন কীভাবে কাটলে? আমি দেখেছি তোমরা নয়, শুধু ভেলী ওটার কাছে ছিল। আর তিন, আমি জানি গুমটির মেইন তোমরাই অফ করেছিলে। কিন্তু ঐ ঘুটঘুটে অন্ধকারে এত লোক ডিঙিয়ে তোমরা ঠিক ঐ লোকটার বাক্সটাই কী করে নির্ভুলভাবে তুলে নিয়ে এলে?"

সুবল ও বলাই এ-ওর মুখে চাইছে। শেষে বলাই বলল, "আসলে স্যার, আমাদের কিছু আশ্চর্য ক্ষমতা আছে – আমার, সুবলের আর ভেলীর। এই ক্ষমতাগুলি আমরা পেয়েছি এক দুর্ঘটনার পর – যে দুর্ঘটনায় আমাদের জীবন তছনছ হয়ে গেছে।"
"খুলে বলো, কিছু লুকিও না।" ডঃ চন্দ্র নড়েচড়ে বসলেন। বলাই আবার শুরু করল –

"আমাদের বাড়ি এই জেলারই কুঠিগঞ্জে। আমাদের বাবা ছিলেন কারখানার মজুর। কারখানার পাশের শ্রমিক ব্যারাকে ছিল আমাদের আস্তানা। মজুরের ছেলে হলেও আমরা দুজন লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম, ফার্স্ট-সেকেন্ড হতাম। জীবনে দাঁড়িয়ে সংসারের অভাব ঘোচাব, এই ছিল আমাদের বাবা-মা'র স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল। একদিন গভীর রাতে কারখানার গ্যাস ট্যাঙ্ক থেকে কীসব বিষাক্ত গ্যাস লিক করল। অনেকে মারা গেল, অনেকে জীবনের মতো গেল পঙ্গু হয়ে। সরকার দশজন বললেও আসলে অন্ততঃ পঞ্চাশজন মারা গিয়েছিল। আরও কয়েকশোজন হয়ে গিয়েছিল পঙ্গু বা চিররুগ্ন। শ্রমিক ব্যারাক কারখানার কাছে ছিল দেখে সেখানেই ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। আমরা দুজনই বাবাকে হারিয়েছি, মা'রাও আর কাজ করার মতো সুস্থ হয়নি।"

"তোমাদের কিছু হয়নি?"
"আমরা ছোটোরা খাওয়ার পর বরাবরের মতো সেই রাতেও পাশের পাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে গিয়েছিলাম। তাই একটু অসুস্থ হয়ে পড়লেও আমরা ভাইবোনেরা শেষ অবধি সামলে নিই। কিন্তু তারপর থেকে আমাদের দু'জনের কিছু অদ্ভুত ব্যারাম দেখা দেয়।"
"ব্যারাম?" ডঃ চন্দ্র নড়েচড়ে বসলেন।
"আমি কানে নানা বিদঘুটে শব্দ শুনতে পেতে লাগলাম – কোনও হারমোনিয়াম খুব চড়া স্কেলে বাজলে অথবা খুব নিচু দিয়ে প্লেন কাছে এগিয়ে এলে যেমন হয় তেমন বিকট শব্দ।"
ডঃ চন্দ্র এবার হাত বাড়িয়ে বললেন, "তোমার বাঁশিটা দাও।"
"আপনি জানেন!" একটু অবাক হয়ে বলাই বাঁশিটা পকেট থেকে বের করে দিল। ডঃ চন্দ্র জোরে ফুঁ দিলেন। সুবলের কোনও হেলদোল হল না, কিন্তু বলাই চমকে কানে হাত দিল। আর ভেলী অনিশ্চিতভাবে একবার বলাইয়ের, আর একবার ডঃ চন্দ্রের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
"আর তুমি?" সুবলের মুখের দিকে তাকিয়ে ডঃ চন্দ্র বললেন।
"আমি চোখের সামনে নানা অদ্ভুত, ভুতুড়ে দৃশ্য দেখতে শুরু করলাম। চোখ বন্ধ করলেও সেগুলো চট করে যায় না।"
ডঃ চন্দ্র ব্যাগ হাতড়াতে লাগলেন। তারপর "এতেই হবে" বলে একটা কালো রুমাল বের করলেন। সেটা সুবলের চোখে বেঁধে দিয়ে তিনি ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন। সবশেষে বলাইকে ইশারায় ঘরের এক কোণে দাঁড়াতে বলে সুবলকে জিগ্যেস করলেন, "বলাইকে দেখতে পাচ্ছ?"
"হ্যাঁ স্যার, ঘরের কোণে ঐ আলমারিটার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে।"
ডঃ চন্দ্র কী ভাবলেন, তারপর সুবলকে জানালার পাশে এনে বললেন, "বাইরে কিছু দেখতে পাচ্ছ?"
"আবছা আবছা। সামনে অন্ধকার, শুধু দূরে নদীর মতো একটা কী যেন। আর কিছু বুঝতে পারছি না।"
ডঃ চন্দ্র সুবলের চোখ থেকে রুমালটা খুলে নিয়ে বললেন, "এবার?"
"এবার স্যার দেখতে পাচ্ছি – নদীতে একটা নৌকো, তাতে মাঝি আর দুজন পুরুষ যাত্রী।"
ডঃ চন্দ্র তাঁর ট্র্যাভেল ব্যাগ খুলে সেখান থেকে একটা বাইনোকুলার গোছের যন্ত্র বের করে চোখে লাগিয়ে বাইরে অন্ধকারের মধ্যে ফোকাস করলেন। তারপর তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠল অবাক বিস্ময়। কিন্তু কিছু না বলে তিনি ভেলীর দিকে ফিরে বললেন, "আর ও?"

"ও তখনও হয়নি। ওর মা কালী ছিল আমাদের পোষা। কালী গ্যাস খেয়ে লুটিয়ে পড়লেও বেঁচে যায়। কিছুদিন পর ওর বাচ্চা হয়। সেগুলো খুব কমজোরি ছিল। শুধু এই ভেলী কীভাবে যেন বেঁচে গিয়েছিল। কিছুদিন পর আমরা দেখলাম ভেলীর লালায় খুব তেজ। পা চাটলে পায়ের চামড়া উঠে যাচ্ছে। বকেঝকে ওকে শেখানো হল মানুষের গা না চাটতে। পরে দেখলাম ও লোহা বা টিন চাটলে সেগুলোও ক্ষয়ে যাচ্ছে। ক্রমে বুঝলাম সব সময় নয়, মাঝে মাঝে ওর মুখ থেকে অমন তেজি লালা বেরোয়। অনেক চেষ্টায় সেটাকে আমরা কন্ট্রোল করতে শেখালাম। এখন শুধু আমি ইশারা করলে ওর জিভ থেকে ঐ তেজি লালা বেরোয়।"

"এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিস্কার হল।" ডঃ চন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "যখন দেখলে তোমাদের দুজনের আর কুকুরের এই অসুস্থতাগুলি এক বিশেষ ক্ষমতাও বটে, যা কাজে লাগিয়ে চুরি-চামারি করা যায় –"
"বিশ্বাস করুন স্যার, প্রথমে আমরা এই ক্ষমতাকে শুধু খেলা দেখাবার কাজে ব্যবহার করতাম। 'ম্যাজিক' ভেবে লোকে পয়সাও দিত। কিন্তু এভাবে আর ক'টাকা হয়? বাবারা নেই, মা'রা অসুস্থ, বাড়িতে রোজগেরে কেউ নেই। পড়াশোনা তো হলই না। নিতান্ত সংসার টানার দায়ে শেষ অবধি এই পথ ধরলাম।"
"তোমরা ক্ষতিপূরণ পাওনি?"
"সে না পাওয়ারই মতো। সরকার সামান্য কিছু টাকা দিয়েছিল, তাতে চিকিৎসার খরচই ওঠেনি।"
"আর মালিক?"
"মালিকের খুব নাম, অনেক খুঁটির জোর। সে গায়ের জোরে প্রমাণ করে দিল ইউনিয়নের কয়েকজন মজুর মালিকের ওপর আক্রোশে গ্যাস ট্যাঙ্কের ভালভ খুলে দিয়েছিল। আর শ্রমিক ব্যারাকটা নাকি বেআইনি কলোনি, নিরাপত্তার কথা ভেবে মালিক অনেকবার বললেও শ্রমিকরা ওঠেনি।"
"কথাগুলি সত্যি?"
"না, স্যার! মালিক নিরাপত্তার কথা না ভেবে বেপরোয়াভাবে কাজ করাতো দেখেই এই দুর্ঘটনা। আর শ্রমিক ব্যারাকে তো মালিক নিজে আমাদের বসিয়েছিল, ওর লোক মাস পয়লায় এসে ভাড়া নিয়ে যেত।"
ডঃ চন্দ্র গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, "কদ্দিন আগে দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল?"
"বছর পাঁচেক আগে, স্যার।"
"ওঃ, তখন আমি বিদেশে ছিলাম। তাই হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে। তা, কী গ্যাস লিক করেছিল?"
"ঠিক তো জানি না। শুনেছি ক্লোরিন আর নাইট্রিক কী যেন।"
"উঁহু, মনে হয় আরও ভয়ঙ্কর কিছু। আচ্ছা, ফ্যাক্টরির নাম কী? তার মালিকই বা কে?"
"ফ্যাক্টরিটা ফ্যান্সি কসমেটিকস, রকমারি পারফিউম তৈরির কারখানা। আর মালিক দেবকুমার সিনহা।"
"কী বললে?" ডঃ চন্দ্র চমকে উঠলেন। তারপর বললেন, "সে ফ্যাক্টরি এখনও চলছে?"
"হ্যাঁ, মাস ছয়েক বন্ধ থাকার পরই আবার চালু হয়েছে। শোনা যায়, লোকটা ইনসিওরেন্স কোম্পানির থেকে মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে।"
ডঃ চন্দ্র ঘরে অস্থির পায়চারি করতে লাগলেন। শেষে বললেন, "অর্থাৎ তোমাদের সর্বনাশ করে সে বহাল তবিয়তে আছে। তোমরা বদলা নিতে চাও না?"
সুবল ভয়ে ভয়ে বলল, "চাই তো, ভেবেওছি। কিন্তু লোকটার অনেক টাকা, লোক আর ওপর মহলে চেনাজানা। আমরা চেষ্টা করেও ওর একশো হাতের মধ্যে পৌঁছোতে পারিনি।"
"তোমরা নিজেরা পারবে না, আমার মদত নিতে হবে।"
"কিন্তু স্যার, আপনি কেন আমাদের মদত দেবেন?"
ডঃ চন্দ্রের মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। বললেন, "দেব – তার প্রথম কারণ আমি অন্যায় সহ্য করতে পারি না। আর দ্বিতীয় কারণ, ঐ দেবকুমার লোকটার সাথে আমার অনেক দিনের পুরনো একটা ফয়সালা বাকি রয়ে গেছে। তোমরা আমার সঙ্গে হাত মেলাবে?"
দুজনের হাত সাথে সাথে এগিয়ে এসে ডঃ চন্দ্রর প্রসারিত হাতে মিশে গেল। তারপর বলাই জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু স্যার, আপনার প্ল্যানটা কী?"
"সব বলব, শুধু আমাকে একটা রাত গুছিয়ে ভাবতে দাও। এখন চলো, ডিনার সেরে ফেলা যাক।"

(৩) ম্যাজিক, না বিজ্ঞান?

পরদিন ব্রেকফাস্টের পর ওদের তিনজনের, অথবা বলা ভালো চারজনের মিটিং বসেছে। সুবল শুরু করল, "আচ্ছা স্যার, আমাদের এই বিশেষ ক্ষমতাটা কি কোনও অসুখ – না ম্যাজিক বা ভর?"

ডঃ চন্দ্র মৃদু হেসে বললেন, "ভর বা ম্যাজিক নয়, বিজ্ঞান দিয়েই এর ব্যাখ্যা করা যায়। নিশ্চিত হতে গেলে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তবে আপাতত আমার অনুমানটা বলছি। সেদিন বিষাক্ত গ্যাসে অনেকে মারা গেছে বা গুরুতর অসুস্থ হয়েছে। কিন্তু ঐ গ্যাসেরই একটু কম ডোজের ধাক্কা তোমাদের শরীর সামলে নিলেও নার্ভ পুরোপুরি সামলাতে পারেনি।

বলাই যে 'ভূতুড়ে' শব্দ শুনছে, সেটা অতি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ 'আলট্রাসোনিক'। এই শব্দ সাধারণ মানুষ শুনতে পায় না, কিন্তু কুকুর প্রভৃতি কিছু জীবজন্তু পায়। মানুষের ভেতর-কানের নার্ভ উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে সাহায্য করে। বলাইয়ের ঐ নার্ভগুলি হয়তো গ্যাসের প্রভাবে অতি-সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাই সে 'আলট্রাসোনিক'ও শুনতে পাচ্ছে। ডগ হুইসলে ঐ শব্দ দিয়ে কুকুরকে ডাকা হয়। বলাই সে শব্দ শুধু শুনতে পাচ্ছে তা নয়, কোনও বস্তুতে তার প্রতিফলন শুনে বস্তুটার সম্বন্ধেও ধারণা করতে পারছে। যেমন সেটা হালকা, না ভারি ধাতু। কঠিন, না তরল। ডাক্তারিতেও আলট্রাসোনিক শব্দের প্রতিফলনের সাহায্যে এভাবে রোগীর শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের 'ছবি' তোলা হয়। বলাই তার অভিজ্ঞতার সাহায্যে মনে মনেই আলট্রাসোনিক ছবি তৈরি করে ধরে ফেলছে সামনের জিনিসটার ভেতরে সোনাদানা আছে কিনা। তাই না?"

বলাই লজ্জিতভাবে মাথা নাড়লে ডঃ চন্দ্র আবার বলতে লাগলেন, "আর সুবল অন্ধকারে বা খুব কম আলোয় নিশাচর প্রাণীর মতোই দেখতে পাচ্ছে। 'রড' বলে এক ধরণের চোখের সেল প্রাণীকে অল্প আলোয় দেখতে সাহায্য করে। মানুষের চেয়ে নিশাচর প্রাণীদের অনেক বেশি 'রড' থাকে, তাই তারা রাতে দেখতে পায়। সুবলের এই সেলগুলির নার্ভ হয়তো অতি-সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাই সে অল্প আলোতেও দেখতে পাচ্ছে। চোখের পাতার সামনে কিছু অর্ধস্বচ্ছ আবরণ থাকলেও সে এমন দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে যা আমাদের খোলা চোখে ধরা পড়ে না। তাই অন্ধকার গুমটিতে গিয়ে বাক্স হাতানো তার কাছে জলভাত।"

লজ্জায় লাল হয়ে সুবল বলল, "কিন্তু তাহলে আপনি সেদিন অন্ধকারে আমাদের কীভাবে দেখলেন?"

"আমার ইনফ্রা-রেড রাতচশমার সাহায্যে। কাল রাতে সেটাই আবার বাইনোকুলারে লাগিয়ে যাচাই করে নিলাম যে তুমি ঘুটঘুটে অন্ধকারেও তিন মাইল দূরের নদীর দৃশ্য ঠিকই দেখেছ।
সবশেষে ভেলীর কথায় আসি। ওর ব্যাপারটাই আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে। কুকুর বা মানুষের পেটে অ্যাসিড থাকে। কিন্তু ওর মা'র গ্যাস লাগার ফলে অধিকাংশ বাচ্চা জন্মাল দুর্বল হয়ে আর একটার লালা থেকে অত্যধিক অ্যাসিড বেরোতে লাগল। এগুলো খুব খারাপ 'জেনেটিক' পরিবর্তন। ভাগ্যিস ভেলী এই অ্যাসিড ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নইলে চারপাশের সবকিছু অনিচ্ছাসত্ত্বেও নষ্ট করে ফেলত! তা, তোমরা ওকে কাজে লাগালে চেটে চেটে তালা, শেকল এসব ধাতুর জিনিস চট করে ভেঙে ফেলতে। তাই না?"

বলাই লজ্জায় মুখ নামাল। তারপর বলল, "কিন্তু এসব অদ্ভুত প্রভাব কোন গ্যাস থেকে হতে পারে?"
চিন্তিত মুখে ডঃ চন্দ্র বললেন, "সম্ভবতঃ খুব খারাপ কোনও মানুষ মারা গ্যাস থেকে। আর দেবকুমারকে যতটা চিনি, কসমেটিকস ফ্যাক্টরির আড়ালে অমন গ্যাস তৈরির চেষ্টা করা তার পক্ষে অসম্ভব নয়।"
"তাহলে তো সে চেষ্টা ও এখনও করে যাচ্ছে। তবে তো পুলিশে খবর দেওয়া দরকার।" বলাই বলল।
ডঃ চন্দ্র মৃদু হেসে বললেন, "কাজ হবে কি? তোমরাই তো বলছিলে লোকটার অনেক টাকা, অনেক কানেকশন? সত্যিই পুলিশ-নেতাদের মধ্যে ওর অনেক মুরুব্বি আছে। তাই শুধু বললে হবে না, প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। আর সেই কাজেই আমি তোমাদের লাগাব।"
"অর্থাৎ স্পাইয়ের কাজে?" সুবল বলল, "কিন্তু আমাদের ওরা ভেতরে ঢুকতে দেবে কেন?"
"দেবে, কারণ আমি কাল রাতেই খবর নিয়েছি ওরা নানা কাজে লোক নিচ্ছে আর তোমাদের রেকমেন্ডেশন আমি জোগাড় করে দেব। তারপর তোমাদের আশ্চর্য ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে –"
"আমরা দেবকুমারের হাঁড়ি হাটে ভেঙে দেব।"
"একজ্যাক্টলি! শুধু একটা কথা – তোমাদের কি আঠেরো বছর হয়েছে?"
"বোধহয় হয়েছে", সুবল-বলাই পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাউয়ি করল।
"ঠিক আছে, না হলেও ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"
ডঃ চন্দ্র এবার ভেলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "পরবর্তী সমস্যা, তোমাদের তৃতীয় জনকে অর্থাৎ একে কীভাবে ফ্যাক্টরিতে ঢোকানো যায়।"

লেখক পরিচিতি

অনিরুদ্ধ সেন

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনীয়ার ও মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী অনিরুদ্ধ সেন কলকাতা-মুম্বইয়ের বিভিন্ন সাময়িকপত্র ও ওয়েব ম্যাগাজিনের নিয়মিত লেখক। তাঁর লেখা ও অনুবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, এবং সংকলিত বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা