ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
আমার প্রিয় কুকুরছানাগুলি

আমার প্রিয় কুকুরছানা এলিজাবেথ। সে আমার বাবার কারখানার কাছে থাকে। তাকে আমি খুব ভালোবাসতাম, বাবাও ভালোবাসেন, কিন্তু আমার মতো নয়। আমি ছোটো থেকেই কুকুরকে খুব ভালোবাসি। আমার বাড়িতে তিনটে কুকুর আছে। তাদের আমি অনেক ট্রেনিং দিয়েছিলাম। আমার বাড়িতে বাঘা নামে একটা মেয়ে কুকুর আছে। সে আগের বছর পাঁচটা, তার আগের বছর ছয়টা বাচ্চা দিয়েছিল। এ বছরে বাঘা আবার ছয়টা বাচ্চা দিয়েছে।

যাক, অনেকক্ষণ বকে ফেললাম, যেখানে ছিলাম সেইখানেই ফিরে যাই। এলিজাবেথের তিনটে বাচ্চা হয়েছিল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, ওই ২০ বা ২১ তারিখে, ঠিক ৯ :৩০ মিনিটে।

বাচ্চা হওয়ার আগে আগে পর্যন্ত সে আমার সঙ্গে অনেক খেলেছিল। তিনটে বাচ্চাই খুব সুন্দর। বাচ্চা হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা বাচ্চা নর্দমায় পড়ে গেল। সেই সাদা-কালো বাচ্চাটা খুব কাঁদছিল। বাবা নর্দমা থেকে ওকে তুলল। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো গেল না। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং পরের দিন বেড়ালে কামড়ে দিয়েছিল। বাবা ওকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এল। একটা লাল রঙের বাচ্চা ছিল। তাকে আমার খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু ওই সাদা-কালোটাকেও ভালো লাগত। তাই খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পাড়ার সবার লোভ ওই কুকুরটার ওপরই।

আরও একটা সাদা-কালো বাচ্চা ছিল। ওটাও খুব ভালো। লালটা আর কালোটা একসঙ্গে বড়ো হতে আরম্ভ করল। লালটা অনেক দুধ খেত, তাই খুব মোটা। কালোটাও অনেকটাই মোটা, তবে লালটার মতো নয়। কিছুদিন পরে ওদের চোখ ফুটল। লালটা আগেই মারা যেত। সে চারচাকা গাড়ির তলায় ঢুকে গিয়েছিল। আমি দেখতে পেয়ে গাড়ি থামাতে বললাম। তারপর অনেক কষ্টে বাচ্চাটাকে বের করলাম।

মাঝে মাঝেই ও নব কাকার বাইকের চাকার তলায় ঢুকে পড়ে। একবার তো সে কী কাণ্ড! নব কাকা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে, খেয়াল করেনি। আমি দেখলাম বলে, না হলে ও সেদিন মরেই যেত। একদিন লরির নীচে, একদিন টোটোর নীচে গিয়ে বসে ছিল। এইসব থেকে আমিই ওকে বাঁচিয়েছিলাম।

কালো বাচ্চাটা আমাকে দেখতে পেলেই আমার পায়ের ওপর এসে গড়াগড়ি দিত। আমি ওকে আদর করতাম। লালটাকে নিয়ে খুবই খেলতাম। আমি একটা কাঠের টুকরো নিয়ে ছুড়ে দিতাম। ওরা সেটার পেছন পেছন ছুটত।

এভাবে এক মাস কেটে গেল। এমন ঘটনা ঘটবে আমি নিজেও জানতাম না।

আমার প্রিয় কুকুরছানাগুলি

সেই দিনটা ছিল রবিবার। বিকেলের দিকে লাল বাচ্চাটাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তার পর এক সময় আচমকা ওর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি ছুটে গলির মুখে গিয়ে দেখলাম, দুটো বড়ো কুকুর বাচ্চাটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আর এলিজাবেথ ছুটে গিয়ে ছাড়ালাম। পিছন পিছন কালো বাচ্চাটাও এসেছিল। আমি ভেবেছিলাম কিছুই হয়নি বাচ্চাটার। বাচ্চাটাকে উলটে দেখলাম পেটের কাছটা দাঁত বসিয়ে ফুটো করে দিয়েছে। বাচ্চাটা খক খক আওয়াজ করছিল আর সেই ক্ষতস্থান থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছিল। আমি ওকে তুলে বাবার কারখানার কাছে আনলাম। বাবা, আমি, নব কাকা, অলোক কাকা আর বোনের মা প্রত্যেকেই অনেক টাকা খরচ করল। কিন্তু যে জায়গাটায় কামড়েছিল সেইখানটায় বেশ বড়ো ঘা হয়ে গিয়েছিল। সেদিন ডাক্তার ডাকা হল। চিকিৎসা করা হল। কিন্তু বাচ্চাটা বাঁচল না। রাত আটটার সময় মারা গেল। আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। আমি বাচ্চাটার মুখ চোখে জল দিলাম, কিন্তু উঠল না। আমাদেরই দোষ, আগে ডাক্তার দেখালে নিশ্চয় বেঁচে যেত।

কালো কুকুরটা একা হয়ে গেল। কিছুদিন পরে সে আবার খেলতে লাগল। কালো কুকুরটা বেশ ছটফটে। অমি কাগজের বল নিয়ে খেলত। সেও তার পেছনে ছুটত। কালো কুকুরটাকে আমার খুব ভালো লেগে গিয়েছিল।কালো কুকুর ছানাটা তখন সুস্থই ছিল।

আমি শুনেছিলাম বড়ো কুকুর দুটোর সঙ্গে আরও কয়েকটা কুকুর রাত্তিরবেলায় বেরোয়। সেই কুকুরগুলো কদমতলার নবরূপম সিনেমা হলের কাছে আসে। এই কুকুর দুটোর আগে আরও একটা হিংস্র কুকুর ছিল। সে গোটা বৃন্দাবন মল্লিক লেন ঘুরত এবং কোনো কুকুর বাচ্চা দেখলে কামড়ে দিত। কোনো কারণে এই দুটো কুকুরের বাচ্চাগুলো মারা গেছিল। সেই থেকে ওরা কোনো বাচ্চাকে সহ্য করতে পারত না। নব কাকা বলল যে, ‘সেই কুকুরগুলোকে সকাল বেলায় একজন লোক পাঁচশো গ্রাম বিস্কুট, দশটা রুটি, মাংসের ছাঁট, তরকারি—এত কিছু খাওয়াত। রাত্তিরেও তারা মাংসের ছাঁট খেয়ে বেরিয়ে পড়ত। সারা সকাল ঘুমিয়ে থাকত। কুকুরগুলোকে দেখলেই ভয় লাগত।’

আমার প্রিয় কুকুরছানাগুলি

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কালো কুকুরটার যেন কিছু না হয়। ১২ তারিখে রাত্তিরে ওকেও কামড়ে দিয়েছিল। সকালে দেখি, সে আমাকে দেখেও চুপচাপ শুয়ে আছে। আমি পায়ের লোম সরিয়ে দেখি দুটো দাঁতের দাগ। এবারে প্রথম থেকে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল বলে ও বেঁচে গেল। না হলে ও-ও মারা যেত। কিন্তু ওর পায়ের কাছটা ঘা হয়ে গিয়েছিল। এখন তা মিলিয়ে গেছে। যখন জগন্নাথ কাকার চার চাকার নীচে পা ঢুকে পা-টা ভেঙে গেছিল তখন জগন্নাথ কাকাকে টাকা দিতে হয়েছিল ওর চিকিৎসার জন্য।

এখন ওকে দেখলে খুব কষ্ট হয়। ওর ভাঙা পায়ে আর আগের মতো জোর নেই, খুঁড়িয়ে খঁউড়িয়ে হাঁটে। আমি ওর নাম দিয়েছি ব্ল্যাকি। ও এখন আমাকে দেখলে জিভ দিয়ে পা চাটে। তা দেখে আমার খুব মায়া হয়। মনে হয় ও বেঁচে যাবে।

লেখাঃ
সুতীর্থ খাঁড়া
হাওড়া বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশন
পঞ্চম শ্রেণি

ছবিঃ ফ্রি ইমেজ ওয়েবসাইট

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা