ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ব্লুবেরীর মঙ্গলযাত্রা

আশ্বিন মাস পড়লেই মনটা কেমন পুজো-পুজো করে ওঠে। ক্ষেতেমাঠে শাদা কাশফুল ফোটে, আকাশে পেঁজা পেঁজা শাদা তুলোর মত মেঘ খেলে বেড়ায়, বৃষ্টিচাচা বাঁশিখোল ঝোলায় পুরে "আসছে বছর আবার আসব" বলে ফুউউউস করে জাদুকর বরফির মত উধাও হয়ে যান, বাতাসে একটা মিহি ঠান্ডার আমেজ আসে, মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়...

ধুউউউস। সেসব হলে তো! সব ওই ক্কিড়িম্বা গ্লোবাল ওয়ার্মিঙের দোষ। আচ্ছা ভাই, অক্টোমাস পড়ে গেল, এখনও বসে বসে হয় সেদ্ধ হচ্ছি, নয়তো ফ্রাই হচ্ছি, নয়তো বা স্রেফ রোস্ট হচ্ছি। দিনের বেলা সুয্যিমামা রেগেমেগে ফুলটাইম ড্যুটি দিচ্ছেন, আর রাতে বৃষ্টির মেঘ এসে অ্যায়সা অম্বরকম্বলের মত ঠেসে ধরছে যে কাসুন্দি দিয়ে ফিশফ্রাই সব অম্বল হয়ে যাচ্ছে। মনের দুঃখে যে একটু ঠান্ডা লেমোনেড খাব তারও উপায় নেই, ফ্রীজ বাবাজী বিদ্যুৎদেবীর অনুপস্থিতিতে ধর্মঘটে বসেছেন। কী জ্বালা!

এইসব ভাবছি আর ঘরে বসে বসে ঘামছি, এমন সময় মনে পড়ল, এই যাঃ, ছাতের গাছগুলোতে তো জল দেওয়া হল না। সারাদিন বেচারারা রোস্ট হয়েছে, পাতাফাতা হলদে হয়ে গিয়েছে। তড়িঘড়ি বালতিতে জল ভরে ছাতে গিয়ে গাছেদের তেষ্টা মিটিয়ে মনে হল, কই, এখানে তো এতটা কষ্ট হচ্ছে না। বরং বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে যে। আর আমায় পায় কে, টুপ করে বালতিটা রেখে এসে একটা বই নিয়ে বসে গেলুম। সঙ্গে টর্চ ছিল, সন্ধ্যে হয়ে যেতেও বইতেই ডুবে রইলাম।

আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ আলো এল, এসেই পুট করে ফের পালাল। টর্চের ব্যাটারিটাও শেষের দিকে, মনের দুঃখে তাই আকাশের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখলাম, একটা জ্বলজ্বলে আগুনলাল চোখ আমার দিকে প্রচন্ড রেগেমেগে চেয়ে আছে। অন্য সময় হলে ভয় পেয়ে তখনই ধড়মড় করে পালাতুম, কিন্তু বইটার গল্পটা তখনও মাথায় ঘুরছিল বলে ব্রেনটা ঠিকসময়ে ক্লিক করে গিয়ে বলল, ওরে বোকারাম, ওটা চোখ নয় রে, মঙ্গল।

মঙ্গলগ্রহ! তাই তো। দক্ষিণ আকাশের ঠিক মাঝখানে সাইক্লপ্সের* চোখের মত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সৌরমন্ডলের চতুর্থ গ্রহ, আয়তনে ছোটর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে, বুধগ্রহের ঠিক পরেই। ২০০৬ সালের আগে হলে অবিশ্যি ইনি তৃতীয় স্থানে থাকতেন, প্লুটো গ্রহদের ক্লাব থেকে ছিটকে গিয়ে বামনগ্রহদের (dwarf planet) সঙ্গে যোগ দেওয়ায় সৌরমন্ডলে এখন মাত্র আটটি গ্রহ। সঙ্গে প্রচুর বামনগ্রহ, গ্রহাণু, উপগ্রহ, উপগ্রহাণু, উপবামনগ্রহ হ্যানত্যান তো রয়েছেই।

কারেন্ট নেই, তাই কলকাতা শহরের আকাশেও ওই বাজে লালচে আভাটা নেই, মঙ্গলকে তাই আজ ভীষণ লাল দেখাচ্ছে। এই টকটকে লাল রঙ দেখে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা একে বিভিন্ন দেবদেবীর সঙ্গে তুলনা করেছে। গ্রীক সভ্যতায় এই গ্রহের নাম এরেস (Ares), রোমান সভ্যতায় মার্স (Mars)। এঁরা যুদ্ধের দেবতা। চীনদেশে মঙ্গলগ্রহ আগুনের প্রতীক, নাম 火星 (আগুন তারা)। সুমেরীয় সভ্যতায় এই গ্রহকে নেরগাল (Nergal) নামক দেবতার সঙ্গে তুলনা করে হয়েছে। নেরগাল যুদ্ধ ও মহামারীর দেবতা।

কিন্তু মঙ্গলের রঙ এত লাল কেন? কই, অন্য কোন গ্রহের তো তেমন আলাদা করে রঙ বোঝা যায় না। এর কারণ মঙ্গলের মাটিতে প্রচুর ফেরিক অক্সাইড মিশে আছে। নাম শুনে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, ফেরিক অক্সাইড হল লোহা আর অক্সিজেনের রাসায়নিক মিশেল, বাংলায় যাকে আমরা জঙ বা মরচে বলি। শিরীষ কাগজ এর পরম শত্রু।

এইসব আকাশপাতাল ভাবছি বসে বসে, এমন সময় যে বইটা পড়ছিলাম সেটার কথা মনে হল। বইটা নিশ্চই সবার পড়া, না পড়া থাকলে এক্ষুণি লাইব্রেরী থেকে নিয়ে পড়ে ফেলা উচিৎ। লেখক মাণিকজেঠু, বড়রা এঁকে গম্ভীরভাবে সত্যজিত রায় নামেও ডেকে থাকেন। বইটার নাম ব্যোমযাত্রীর ডায়েরী, বইটার হিরো বিধুশেখর নামে একটা লোহার রোবট। বিধুশেখর রকেটে চেপে মঙ্গলে যেতে চায়, কিন্তু রোবট তো, নিজস্ব বুদ্ধিসুদ্ধি অতটাও নেই, তাই সে তার বাবা তিলুবাবুর সাহায্য চায়। তিলুবাবু ভারী বুদ্ধিমান মানুষ, অনেকটা আইনস্টাইন বা হকিঙের মত, মাথা খাটিয়ে চুল পাকিয়ে মাথায় টাক ফেলে খেটেখুটে তিলুবাবু একটা রকেট বানিয়ে ফেলেন। তাতে তাঁর পোষা বেড়াল নিউটন, খাস খানসামা প্রহ্লাদ, এবং লৌহমানব বিধুশেখরকে পুরে কালিপুজোর দিন হাউয়ের মতন হুউউউশ করে পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলের দিকে পাড়ি দেন। পোষা কুকুর আইনস্টাইনকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রকেটের মধ্যে একটা কুট্টুস-কুট্টুস গন্ধ পেয়ে আইনস্টাইন ঘেউঘেউ করায় তিলুবাবু তাকে বন্ধু ডক ব্রাউনের* তত্ত্বাবধানে রেখে যান। শোনা যায় ডক ব্রাউন ও তাঁর শাকরেদ মার্টি ম্যাকমাছির সঙ্গে আইনস্টাইন (ডগ) নাকি প্রচুর অ্যাডভেঞ্চার করেছে।

বিধুশেখর এন্ড কোম্পানি শেষমেশ মঙ্গলে পৌঁছতে পেরেছিল কিনা সেটা নাহয় বইতেই রয়েছে। কিন্তু আমি ততক্ষণে অন্য কথা ভাবছি। একটা বিশেষ তারিখ তখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ২১শে জুলাই, ১৯৬৯ সাল। আমার বাবা তখন কাঠমান্ডুতে, পিটিআই বলে যে সংবাদসংস্থাটা আছে, বাবা তাদের রিপোর্টার। এই দিন রাত দুটো অবধি রেডিও চালিয়ে শেষমেশ সেই ঐতিহাসিক কথাটা শোনার পর বাবা উৎসাহের চোটে সোজা কাঠমান্ডুতে মার্কিন হাইকমিশনারের/দূত/অ্যাম্বাস্যাডরকে ফোন করে অভিনন্দন জানান।

One small step for man; One giant step for Mankind.

বক্তা নীল আর্মস্ট্রং। স্থান চন্দ্রভূমি। অ্যাপোলো ১১ মহাকাশযানে চেপে পৃথিবী টু চাঁদ যাত্রা করে প্রথম মানুষ হিসাবে চাঁদের বুকে পা রাখার বিরল নজির গড়ার পর রেডিও মারফত আর্মস্ট্রঙের এই ক'টি কথা সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। আর্মস্ট্রং বছর ছ'য়েক হল মারা গেছেন, কিন্তু ইতিহাস তাঁকে কখনও ভুলবে না।

চাঁদ তো হল, পরের স্টপ তো মঙ্গলগ্রহ। মানুষ কবে যাবে এই লালগ্রহে, কবে পা রাখবে ফেরিক অক্সাইড মেশা এই জঙরঙা মাটিতে? চাঁদের অ্যাপোলো ইলেভেন কবে হবে? কে পা রাখবে প্রথম যুদ্ধদেবের বুকে?

"ব্লুবেরী।"

কালিপুজোয় হাইউরকেটে আগুন ধরালে যেভাবে সরররর করে সলতেটা জ্বলে তারপর বপ-ফসস-হুপ-হুইইইইইইইশ শব্দ করে বাজিটা আকাশের দিকে ধেয়ে যায়, সেই আওয়াজটাকে রেকর্ড করে উল্টোদিকে চালালে যা পাওয়া যায়, সেইরকম একটা শব্দ করে ছাতে উদয় হল টাইম-অ্যান্ড-স্পেস ট্র্যাভেলার গেছোদিদি দ্য ফার্স্ট অ্যান্ড ওনলি। দেখলাম হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ ফুটন্ত চা বা কফি, চুলে বরফের কুচি লেগে রয়েছে, কলকাতার গরমে এসে সেগুলো মনের দুঃখে গলে যাচ্ছে। সরে গিয়ে শতরঞ্চিতে বসার জায়গা করে দিলুম, গেছোদিদি গায়ের বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে পাশে এসে বসে বলল, "মঙ্গলগ্রহের উত্তরমেরুতে ছিলুম, বুঝলি। গেছোভাই নিয়ে গিছল। ওখানকার মাধ্যাকর্ষণ তো পৃথিবীর চেয়ে অনেক কম, তাই বেশি ঝড়ঝাপটার ব্যাপার নেই। বরফ আছে যদিও। তফাতটা মাপতে অ্যান্টার্কটিকায় গিয়ে সোজা বরফের ঝড়ের মধ্যে পড়ে গেলুম। গেছোভাই তাই মাপটাপ চেয়ে ব্রেজিল থেকে উপাদেয় কফি বানিয়ে দিল, আমিও তোর প্রশ্ন শুনে পুট করে চলে এলুম।"

গেছোদিদি রাণাঘাট-ডায়মন্ডহারবার-তিব্বত যতটা না করেন, রোমানসাম্রাজ্য-ডাইনোসুরযুগ-আলতামিরা বেশি করেন। ডাইনোসুর কথাটা গেছোদিদির বানানোই, বলে ওই শব্দটার মধ্যে একটা অসুর অসুর ব্যাপার না থাকলে তেমন জমে না।

জিজ্ঞেস করলুম, "ব্লুবেরী কী?"

গেছোদিদি কফি কাপে আরামের একটা চুমুক দিয়ে বলল, "কী নয়, কে। ব্লুবেরী চীজকেক অতি উপাদেয় খাদ্য বটে, কিন্তু এখন তোর ডায়েট চলছে, তোর বৌ বলে দিয়েছে আমায়, চাইলেও পাবি না, জিভ দিয়ে জল পড়লেও নয়। মানুষ ব্লুবেরী হল পৃথিবীর সম্ভাব্য মঙ্গল পায়োনীয়ার। নাসা ২০৩৩ সালে মঙ্গলে মিশন পাঠাবার প্ল্যান করছে জানিস তো?"

না তো, এ খবর তো শুনিনি। গেছোদিদি বলে চলল, "দেখ, মঙ্গলে মানুষ এখনও অবধি পৌঁছয় নি বটে, কিন্তু মানুষের তৈরী রোবট পৌঁছেছে। পাথফাইন্ডার, স্পিরিট, অপরচুনিটি, ক্যুরিওসিটি। এদের মধ্যে অপরচুনিটি ও ক্যুরিওসিটি তো এখনও চালু আছে। প্রচুর পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে, পরিকল্পনাও কিলোকিলো হয়েছে, দেখেশুনে মনে হচ্ছে ২০৩৩ সালে ব্লুবেরী মঙ্গলে পা রাখলেও রাখতে পারে।"

আরে বাবা ব্লুবেরীটা কে? আর সময় তো তোমার হাতের তালুর মধ্যে, সফল হবে কিনা সেটা তুমি জানো না?

গেছোদিদি কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল, "ভবিষ্যত নিয়ে কোনও কথা নয়, স্পয়লার-ফয়লার হয়ে যায়। আর ব্লুবেরী হল অ্যালিসা কার্সন (Alyssa Carson), ১৭ বছর বয়সী মার্কিন মেয়ে, মঙ্গলগ্রহে পাড়ি দেবার জন্য আদর্শ প্রার্থী, আর মঙ্গলপ্রজন্ম বা মার্স জেনারেশনের (Mars Generation) প্রতিভূ।" কফিতে চুমুক দিতে দিতে গেছোদিদি এই ব্লুবেরীর গল্প করতে লাগল, আমিও তন্ময় হয়ে শুনে গেলুম। শুধু একবার মনে হল, কফিটা একবারও অফার করল না।

"এই গরমে কফি খাবি?" দেখি গেছোদিদি আমার দিকে ভুরু তুলে তাকিয়ে আছে। ভেবেচিন্তে দেখলাম, না, তার চেয়ে বরং লেমোনেড গোছের কিছু হলে ভাল হত। যাই হোক, ব্লুবেরীর গল্পে আসি।

অ্যালিসা কার্সন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা প্রদেশের মেয়ে। জন্ম ২০০১ সালে। তিন বছর বয়সে নিকেলোডিয়ন চ্যানেলে দ্য ব্যাকিয়ার্ডিগান্স (The Backyardigans) নামে কার্টুন প্রোগ্রামে পাঁচ বন্ধুর স্বপ্নে মঙ্গলযাত্রা দেখে অ্যালিসা মু্গ্ধ হয়। বাবাকে জিজ্ঞেস করে মঙ্গলে সত্যি সত্যি মানুষ যেতে পেরেছে কিনা। বাবা বার্ট কার্সন বলেন যে না, চাঁদে মানুষ গেলেও মঙ্গলে যায়নি। তখন অ্যালিসা বাবাকে বলে যে সে মহাকাশযাত্রী হতে চায়। শুধু তাই নয়, মঙ্গলে প্রথম মানুষ হিসাবে পা রাখাও তার ইচ্ছে।

বার্ট কার্সন মেয়ের কথা শুনে ভেবেছিলেন, ছেলেমানুষ, আজ নভশ্চর হতে চায় তো কাল ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার-সুপারহিরো হতে চাইবে। কিন্তু বাবাকে অবাক করে ছোট্ট অ্যালিসা কিন্তু তার স্বপ্নে অটল থেকেছে। সেই তিন বছরে করা প্রতিজ্ঞা এখন সতেরো বছর বয়সী অ্যালিসা "ব্লুবেরী" কার্সনের কাছে একমাত্র মন্ত্র। যে করেই হোক, অ্যাস্ট্রোনট হতে হবে, মঙ্গলে যাওয়ার জন্য যা যা যোগ্যতা প্রয়োজন আয়ত্ত করতে হবে, ২০৩৩ সালে মঙ্গলমিশনের অনেক আগে থেকেই এমন এক রেজ্যুমে তৈরী করতে হবে যাতে তাকে ছাড়া নাসা মঙ্গলযাত্রার কথা ভাবতেই না পারে।

কিন্তু বাড়িতে বসে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু স্বপ্ন দেখলেই তো হগওয়ার্টসের মত নাসার চিঠি বাড়ি চলে আসবে না। তার জন্য প্রচুর শ্রম লাগবে, অধ্যবসায় লাগবে, প্রচুর পড়াশুনো লাগবে। কিন্তু তা বলে অ্যালিসা পিছিয়ে আসার পাত্রীই নয়। ছোটবেলা থেকেই পাথফাইন্ডার স্পিরিট অপরচুনিটি ক্যুরিওসিটি সম্পর্কে যত ভিডিও আছে সব দেখে ফেলেছিল ছোট্ট অ্যালিসা। বাবা ঘরের দেওয়ালে মঙ্গলগ্রহের এক বিশাল বড় ম্যাপ সেঁটে দিয়েছিলেন, ঘরে থাকলেই অ্যালিসার চোখ সেদিকে চলে যায়। হাতের কাছে গ্লোব বা অ্যাটলাস দেখলেই যেমন ইচ্ছা করে ঝাঁপিয়ে পড়ে পৃথিবীর অদ্ভুত বাহারী ভূগোল দেখে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে, অ্যালিসা তেমনই মঙ্গলের ভূগোলের সঙ্গে সুপরিচিত। বাবা বিভিন্ন ধরনের টেলিস্কোপ কিনে দিয়েছেন, অ্যালিসা তাই দিয়ে রাতের পর রাত (রাত না জেগে, অবশ্যই, শরীর খারাপ করবে) মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, কল্পনায় হয়তো উড়ে গিয়েছে তার বিভিন্ন প্রান্তে প্রান্তে। যদিও শেষমেশ তার পাখির চোখ একটাই --- মঙ্গল।

অ্যালিসার এর মধ্যে নাসার স্পেস ক্যাম্পে যাওয়া হয়ে গেছে। বিশ্বের তিন দেশে --- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যানাডা, ও তুরষ্ক --- এই স্পেস ক্যাম্পে খুদেদের মহাকাশযাত্রার কিছু প্রারম্ভিক তালিম দেওয়া হয়। তিন দেশের তিনটে স্পেসক্যাম্পে অংশগ্রহণ করা ও সার্টিফিকেট পাওয়ার নজির একমাত্র অ্যালিসারই আছে। এ ছাড়াও বছর দু'য়েক আগে নাসার পসাম (POSSUM) নামক প্রোগ্রামে কনিষ্ঠতম প্রার্থী হিসাবে অ্যালিসাকে বাছাই করা হয়েছিল। দশ, পনের, এমনকি কুড়ি বছরের বেশি বয়সীদের সঙ্গে এক সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছিল অ্যালিসা।

চাকরি পেতে রেজ্যুমে (resume) জমা দিতে হয়। কোন ইস্কুল-কলেজে পড়াশুনো করেছ, কত কত নম্বর পেয়েছ, কোন কোন ডিগ্রী আছে তোমার, আগে কী কী চাকরি করেছ ইত্যাদি সব লেখা থাকে তাতে। এই দলিলের উদ্দেশ্য একটাই, যিনি চাকরি দেবেন তিনি যাতে তোমার কী কী গুণ আছে, তোমার যোগ্যতা কী, এসব বুঝে নিতে পারেন। মঙ্গলযাত্রাটাকে যদি একধরনের একটা চাকরি বলে ধরা যায়, তাহলে অ্যালিসার রেজ্যুমে এত কম বয়সেই কিন্তু বেশ উজ্জ্বল।

কিন্তু মঙ্গলে যাওয়াটা কি এতই সহজ? নাসা মঙ্গলে যাওয়ার কথা ভাবছে বটে, পরিকল্পনা-প্রস্তুতি ইত্যাদিও দ্রুতগতিতেই চলছে। নাসা ছাড়াও কিছু বেসরকারী সংস্থাও মঙ্গলে যাওয়ার প্ল্যান করছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল ইলন মাস্কের স্পেসএক্স (SpaceX)। নাসা'র সদস্য না হতে পারলেও বেসরকারীভাবে অ্যালিসা অন্তত যে মহাকাশ অবধি পৌঁছে যাবে, সে নিয়ে বাবা বার্ট কার্সনের কোন সন্দেহ নেই। আর দু'বছরের মধ্যেই অ্যালিসা হয়ত স্পেসএক্সের রকেটে চেপে মহাকাশে পৌঁছে যাবে। আজকাল মহাকাশে মানুষ আকছার যাচ্ছে। পৃথিবীর চারদিকে কৃত্রিম উপগ্রহ রূপে ঘুরে চলেছে আন্তর্জাতিক মহাকাশস্টেশন বা ইন্টারন্যাশনাল স্পেসস্টেশন (International Space Station, ISS)। তাতে সর্বক্ষণ অন্তত তিনজন মানুষ থাকেন, মাসছয়েক থেকে ফের পৃথিবী ফিরে আসেন। জল খাবারদাবার অক্সিজেন ইত্যাদি বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন রকেটে করে পৃথিবীর মাটি থেকেই আসে। কোনও জরুরি অবস্থা হলে পৃথিবী থেকে সাহায্য আসতে খুব বেশি সময় যে লাগবে তা নয়।

কিন্তু মঙ্গলযাত্রা? যেতে ছ'মাস, ফিরতে ন'মাস, কেননা তদ্দিনে মঙ্গল আর পৃথিবী একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়েছে। কোনও গোলমাল হলে সাহায্য আসতে আসতে বছর ঘুরে যাবে। চাঁদে যেতে সময় লাগে দিন দুয়েক, মঙ্গল অনেক অনেক বেশি দূরে। পৃথিবীর আবহমন্ডল ছেড়ে মহাকাশে যাওয়া মানেই মহাজাগতিক রশ্মি বা কসমিক রে বিকিরণের ঝুঁকি থেকেই যায়।

বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ভীষ্মের মত অ্যালিসা তার প্রতিজ্ঞায় অটল। মঙ্গলে যেতেই হবে, সে যে মার্স জেনারেশন। ২০৩৩ সালে বয়স হবে ৩২, মহাকাশে যাওয়ার পক্ষে একদম আদর্শ বয়স। মঙ্গল থেকে না ফেরা অবধি বিয়েটিয়ে করার পক্ষে নয় ব্লুবেরী। বাবাকে ছেড়ে তিন বছর থাকতে হবে, এতে অ্যালিসার যতটা না কষ্ট, বাবা বার্টের দুঃখ কম কিছু নয়। কিন্তু দুজনেই জানেন, পাখির চোখ একটাই --- মঙ্গলযাত্রা। অ্যালিসার এই স্বপ্ন যে তার একার নয়, সেটাও সে বিলক্ষণ জানে। সে জানে, দুনিয়ার অর্ধেক মানুষের সম্ভাব্য প্রতিভূ সে।

চাঁদের মাটিতে বারোজন মানুষ হেঁটেছেন। ১৯৬৯ সালে প্রথম পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং, শেষ হাঁটা ১৯৭২ সালে জীন স্যর্ন্যনের। সবাই মার্কিন, এবং, উল্লেখযোগ্যভাবে, সবাই পুরুষ। আর্মস্ট্রঙের সেই বার্তাটা আরেকবার পড়লে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে যায়, প্রথম ছোট্ট পদক্ষেপটা ম্যান (Man) অর্থাৎ মানুষ/পুরুষের, বিশাল পদক্ষেপটাও পুরুষসভ্যতার/মানবসভ্যতার।

One small step for man; One giant step for Mankind.

তা বলে কি আর্মস্ট্রং মহিলাদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি? একদমই নয়। নাসার অ্যাপোলো মিশনের কম্প্যুটার সফ্টওয়্যার দলের প্রধান ছিলেন মার্গারেট হ্যামিলটন। মহিলা। হ্যামিলটনের আগের যুগে যন্ত্রগণক কম্প্যুটারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিল মগজাস্ত্রধারী মানবগণক। এঁদেরকে তখনকার দিনে কম্প্যুটার বলা হত, কাগজপেন্সিল বাগিয়ে এঁরা ঝড়ের মত যোগবিয়োগগুণভাগক্যালকুলাস সমস্ত করে দিতেন। এঁদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন ক্যাথরীন জনসন। ১৯৮৩ সালে স্যালি রাইড প্রথম মহিলা মহাকাশচারী হন। রাইডের পথ অনুসরণ করে কল্পনা চাওলা ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে দু'বার মহাকাশ পাড়ি দেন। দুঃখের বিষয়, ২০০৩ সালে কলম্বিয়া স্পেসশাটলের দুর্ঘটনায় চাওয়া প্রাণ হারান।

ব্লুবেরীর কি মৃত্যুভয় নেই? আছে, মঙ্গলযাত্রা যে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, এ কথা অ্যালিসা ভালভাবেই জানে। কিন্তু তা বলে সে পিছিয়ে আসার পাত্রী নয়। মার্স পাইওনীয়ার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যা যা ঝুঁকি আছে সেসবের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অ্যালিসা যথেষ্ট তৈরী। কল্পবিজ্ঞান টেলিভিশন প্রোগ্রাম "স্টার ট্রেক"-এ মহাকাশযাত্রী ক্যাপ্টেন কার্ক বলেছিলেন, "রিস্ক ইজ আওয়ার বিজনেস।" ঝুঁকি নেওয়াটাই তো আমাদের কাজ। ঝুঁকি আছে, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, ও প্রচুর প্রচুর ট্রেনিং করলে ঝুঁকিগুলোর মুখোমুখি হওয়াটা অসম্ভব কিছু না, সেটা অ্যালিসা বিলক্ষণ বোঝে।

তা বলে ভবিষ্যত মঙ্গলযাত্রী কি শুধুই মহাকাশ ও রেড প্ল্যানেট নিয়েই পড়ে থাকে সারাক্ষণ? আলবাত না। অ্যালিসা ইস্কুলে নিয়মিত ক্লাস করে, বিজ্ঞান নিয়ে, বিশেষত অ্যাস্ট্রোবায়োলজি নিয়ে পিএইচডি করার ইচ্ছা তার আছে। ভাল ফুটবল খেলে অ্যালিসা, ভাল সাঁতার কাটতে পারে, আর ইংরিজি, স্পেনীয়, ফরাসী, ও চৈনিক ভাষায় বাকপটু হওয়া ছাড়াও অল্পস্বল্প তুর্কী ভাষাও বলতে পারে। এ ছাড়াও অবসর সময়ে বিভিন্ন ইস্কুলে গিয়ে মহাকাশ, মঙ্গলযাত্রা, ও নিজের জীবন নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়। রেজ্যুমেটা এর মধ্যে বেশ মোটা হয়েছে অ্যালিসা "ব্লুবেরী" কার্সনের।

কিন্তু ব্লুবেরী কেন?

গেছোদিদি কফিতে শেষ একটা চুমুক দিয়ে বলল, "ওটা ওর কল সাইন। নাসায় যখন রেডিওর মাধ্যমে কথাবার্তা হয়, তখন তো আর সবসময় নাম ধরে ডাকা যায় না, ব্যাপারটা বিরক্তিকর। তাই সবাইকে একটা করে ডাকনাম দেওয়া হয়। নাসার ভাষায় একে কল সাইন (call sign) বলে। অ্যালিসার কল সাইন হল ব্লুবেরী। বুঝলি?"

"তাহলে," আমি বললাম, "অ্যালিসার স্বপ্ন যদি সত্যিই ফলে যায়, মঙ্গলের লালমাটিতে যদি লুইজিয়ানার মেয়েটিই প্রথম পা ফেলে, তাহলে কী বলবে বলে মনে হয় তোমার?"

"কী বলবে?" উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল গেছোদিদি, "কী বলবে সেটা ওর সিদ্ধান্ত। তবে কী, এইটের মত কিছু বললে বেশ হয়---"

One small step for a human; One giant step for Humankind.

পাদটীকা
সাইক্লপ্স (Cyclops) : গ্রীক পুরাণের একচোখা দৈত্য। হোমারের অডিসি (Odyssey) নামক মহাকাব্যে এর দেখা পাওয়া যায়। গ্রীক বীর ইথাকারাজ ওডিসিয়ুস (Odysseus), যাকে রোমান সাহিত্যে ইউলিসিস (Ulysses) নামে ডাকা হয়, ট্রয়ের যুদ্ধ শেষ করে সমুদ্রপথে দেশে ফিরছিলেন। মাঝে একটা দ্বীপে সাইক্লপ্স পলিফীমাসের (Polyphemus) খপ্পরে পড়ে ওডিসিয়ুসের দলবল। বেশ কয়েকজন পলিফীমাসের পেটে যাওয়ার পর ওডিসিয়ুস তাকে এক পিপে সুরা দিয়ে বশ করার চেষ্টা করেন। সুরাপানে মাতাল দৈত্য ওডিসিয়ুসের নাম জিজ্ঞেস করলে ইথাকারাজ বলেন তাঁর নাম ওউটিস, রোমান ভাষায় নিমো, অর্থাৎ "কেউ না"। শেষে বুদ্ধি করে পলিফীমাসকে অন্ধ করে ওডিসিয়ুস সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে পালাবার চেষ্টা করেন। পলিফীমাস তার সঙ্গী সাইক্লপ্সদের কাছে সাহায্য চেয়েও পায় না। কীকরে পাবে? পলিফীমাসকে কে অন্ধ করেছে এর উত্তর তো "কেউ না"।

ডক ব্রাউন (Doc Brown) : ব্যাক টু দ্য ফ্যুচার (Back to the Future) সিনেমার প্রধান চরিত্র। বৈজ্ঞানিক ও ইনভেন্টার, অনেকটা প্রফেসর শঙ্কুর মত। দেখতে অনেকটা গোঁফ ছাড়া আইনস্টাইনের মত। শাগরেদ মার্টি ম্যাকফ্লাই ও কুকুর আইনস্টাইনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর নিজের তৈরী টাইমমেশিন বা সময়যানে করে বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার করেছেন। লক্ষণীয় ব্যাপার, তাঁর সময়যানটি একটি গাড়ি।

ছবিঃ

অ্যালিসা 'ব্লুবেরী' কার্সন। ট্রেনিঙে থাকা অ্যাস্ট্রনটদের নীলরঙা জাম্পসুট পরে মঙ্গলগ্রহের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মার্স জেনারেশনের সম্ভাব্য প্রতিভূ। (ছবির উৎস) 

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা