ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ওঁরা তিনজন

পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলায় এমন কিছু মানুষ জন্মেছিলেন যারা জীবনের ব্যাক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে কোনদিন মাথা ঘামাননি। স্বাধিনতার জন্য সমস্ত রকম সুখ সুবিধা আনন্দ এমনকি নিজের জীবনটাও বিসর্জন দিয়েছিলেন। আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী শুনলে। তাঁরা খুব ভালভাবেই জানতেন যে ব্রিটিশ সরকার কোনদিনই শান্তিপূর্ণ ভাবে আমাদের স্বাধীনতা দেবে না। গান্ধিজির অহিংস নীতিতে আর আস্থা ছিল না তাঁদের। বিদেশী সরকারের অত্যাচারের প্রতিবাদে তাঁরা হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র । রক্তের বদলে রক্ত এই ছিল তাঁদের মূলমন্ত্র । সঙ্গে থাকত ভগবদ গীতা । তোমরা তো প্রত্যেকেই ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকি , মাস্টারদা সূর্য সেন, কানাইলাল দত্ত, ভগত সিং, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বাঘা যতীন এর নাম শুনেছ। সেই সময়ে অনেক মেয়েরাও বিপ্লবী দলে নাম লিখিয়েছিলেন।

আজ তোমাদের বলব তিন জনের কথা যারা রাইটার্স এ অর্থাৎ মহাকরণে অভিযান চালিয়ে সরকারকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁরা জানতেন যে এই অভিযানই তাদের শেষ অভিযান । কিন্ত তাতে কি যায় আসে ? তাঁরা তো বাঁচতে আসেনি এসেছিল মরতে। হ্যাঁ তোমরা ঠিক ধরেছ আমি বিনয় বাদল দীনেশ এর কথাই বলছি। নামেও কত মিল দেখেছ ? খুব অল্প কয়েকজন শহীদ দের নাম আমরা মনে রেখেছি। তাদের মধ্যে বিনয় বাদল দীনেশের নাম আমরা এখনও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। এদের আদর্শ , বীরত্ব , আত্মত্যাগ, সাহসিকতার কাহিনী আজ ও আমাদের উদ্দীপ্ত করে।

বিনয় বাদল দীনেশ এঁদের তিনজনেরই জন্মস্থান ঢাকা । বিনয়কৃষ্ণ বসু বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। বাবা রেবতী বসু ছিলেন আইনজীবী । সুতরাং বিনয় যে বেশ ধনী পরিবারের সন্তান সে কথা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলেন, খুব ভাল টেনিস খেলতেন। নিয়মিত শরীর চর্চা করতেন। স্বাস্থ্য বেশ ভাল ছিল। বাড়িতেই বন্দুক চালানো শিখেছিলেন। তাঁর নিশানা কখনও ব্যর্থ হয়নি।

ওঁরা তিনজন
শহীদ বিনয় বসু

বিনয় বাদল দীনেশ ছিলেন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ারস দলের সদস্য। বিভি দল নামেই তা পরিচিত ছিল। তোমরা যারা ইতিহাস পড়ছ তারা নিশ্চয়ই জান যে সেই সময় বাংলায় বেশ অনেক গুলো গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল । অনুশিলন সমিতি, যুগান্তর , আত্মোন্নতি সমিতি, মুক্তি সঙ্ঘ, বন্দেমাতরম সমিতি, সাধনা সমিতি, ব্রতি সমিতি, স্বদেশ বান্ধব সমিতি, ইত্যাদি। এই মুক্তি সঙ্ঘের নামই পরে বিভি দল হয়।

বিভি দল পরিকল্পনা করল অত্যাচারি পুলিশ অফিসার লোম্যান কে হত্যা করার। এই দায়িত্ব পড়ল বিনয়ের ওপর । একদিন সুযোগ ও পেয়ে গেলেন বিনয়। লোম্যন এবং হাডসন সাহেব ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন মিস্টার বার্ড কে দেখতে এলেন। বিনয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলেন তাই আশে পাশে তাঁকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে কারোর কোন রকম সন্দেহ হয়নি। লোম্যান এবং হাডসন যখন মিস্টার বার্ড এর সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসছেন তখনই ঘটলো ঘটনা । সুযোগ বুঝে বিনয় গুলি চালালেন তাদের ওপর । গুলির শব্দে সবাই ছুটে আসে কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা ঘটে গেছে । লোম্যান এবং হাডসন সাহেব মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন । বিনয় মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেলেন। তবে মেডিক্যাল কলেজের এক কর্মী বিনয়কে চিনতে পারে এবং পুলিশের কাছে তার নাম ফাঁস করে দেয়। এদিকে ঢাকা এবং আশপাশের অঞ্চল গুলোতে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়ে যায় । পুলিশ বিনয়কে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। পূর্ববঙ্গে থাকা তাঁর পক্ষে আর নিরাপদ ছিল না। তাই তিনি চাষির ছদ্মবেশে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। অনেক চেষ্টা করেও পুলিশ বিনয়ের নাগাল পায়নি।

ওঁরা তিনজন
শহীদ দীনেশ গুপ্ত

পরের ঘটনা কলকাতায় মহাকরণ অভিযান । সঙ্গে ছিলেন দুই বন্ধু বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত। দীনেশ সাহিত্য ও দর্শন পড়তে ভালবাসতেন। একবার অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন একজন সত্যাগ্রহীর ওপর পুলিশের লাঠি চালনার তীব্র প্রতিবাদ করে তিনি সরকারের বিরাগভাজন হন । বিভি দলকে একবার বলেছিলেন, হয় কাজের মত কাজ থাকলে দিন নয়তো বাড়ি চলে যাই ।নিজের ফাঁসির আদেশ শুনে বলেছিলেন ইশ্বর মঙ্গলময় । অমঙ্গলের মধ্যেও কোনও না কোন মঙ্গল লুকিয়ে আছে। কতোটা মনের জোর থাকলে মানুষ এই কথা বলতে পারে অনুমান করতে কষ্ট হয় না।

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা