ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

সপ্তমীর সন্ধ্যে। প্রায় এক কিলোমিটার  দূরে কোনোক্রমে পার্কিং পাওয়া গেল।  নেমে একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম লাইনে। মণ্ডপের সামনে পৌঁছোতে লাগলো পাক্কা এক ঘন্টা। আর মণ্ডপের থিম পেরিয়ে মা দুর্গার মুখ দর্শন করতে লাগলো আরো পঁচিশ মিনিট। প্রচার মাধ্যমের বিচারে আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জার উৎকর্ষতা বিবেচনা করে চারটে পুজো প্যাণ্ডেল দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে  প্রবল উৎসাহে আনন্দিত মনে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু দুটো মণ্ডপ দেখার পর ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরলাম। সঙ্গে বিরক্তি । বাকি দিনগুলো বারান্দায় বসে চলমান সুসজ্জিত দর্শনার্থীদের দেখেই কাটালাম। ব্যাস, পুজো শেষ।  এই হলো আমার এখনকার পুজো। খবরের কাগজে টেলিভিশন চ্যানেলে চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখে প্রথম টের পাওয়া যায় পুজো আসছে।  আর পুজো আসছে মানে এটা শরৎকাল। নাহলে টের পাওয়া মুশকিল শরতের আগমন।
যাই হোক শেষ অব্দি অনুভব করলাম উদ্যোগ আর আনন্দের মধ্যে বিরোধ। তাহলে ? এই যে দেড়মাস আগে থেকে প্রবল উত্তেজনা নিয়ে দোকানে শপিং মলে ভিড় উপেক্ষা করে পুজোর জন্যে কেনাকাটা হলো তার ফলশ্রুতি এই ! এই আমার পুজোর আনন্দ !

হতাশ মনে আমার স্মৃতির পুরোনো পৃষ্ঠা ওলটাতে গিয়ে মনে হলো পুজোর প্রকৃত আনন্দ আসলে  জড়িয়ে থাকে, ছড়িয়ে থাকে শৈশব আর কৈশোর জুড়ে। ছিল। আমার সেই আনন্দ ফেলে এসেছি সীমান্তের ওপারে। চোখ বন্ধ করে ভাবতে গেলে এখনও আবেগাক্রান্ত করে সেই স্মৃতি।  সে পুজোর সঙ্গে কোনো ধর্মের বোধ নেই। শাস্ত্র-পুরাণের বাইরে পুরোটাই সর্বজনীন,সাধারণ মানুষের লৌকিক উৎসবের অনাবিল আনন্দ।  সে পুজো শিউলিফুলের গন্ধ জড়ানো, নীল আকাশের শামিয়ানার নীচে কাশফুলের শুভ্র উপস্থিতি। সেই পুজোর কথাই বলি, তাদের জন্যে, যারা এখনো দাঁড়িয়ে আছে বাল্য আর কৈশোরের মাঝে। যারা এখনও সেই আনন্দময় শারদীয় পুজোর প্রত্যাশায় অপেক্ষা করে থাকে।
তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর মধ্যে মাত্র তিনজনকেই  আমার আপন মনে হতো। তাঁরা তিনজনই দেবী। তিন মা-মেয়ে। একজন হলেন হিমালয় দুহিতা উমা। দুর্গারূপে আমাদের কাছে আসেন।  আর দু'জন লক্ষ্মী-স্বরস্বতী। তাঁরা একবার আসেন মায়ের সঙ্গে, আর একবার একা। লক্ষ্মী একা যখন আসতেন আমাদের ঘরে, মনে হতো মা-কাকিমার মতো স্নেহময়ী।  আমাদের জীবনে,সোনার কলসি ভরে  শ্রী আর স্বাচ্ছন্দ নিয়ে এসেছেন। তাঁর আপ্যায়নের ভার ছিল মায়ের ওপর। আর সবচেয়ে নিজের মনে হতো স্বরস্বতীকে, ইনি পুরোপুরি আমাদের। আমাদের পড়ার টেবিল, হারমোনিয়াম-তানপুরা সবকিছুর ওপর তাঁরই দখল। তাঁর যত্ন আত্যি করার দায় দায়িত্বও ছিল আমাদের কাঁধে। মনে হতো ব্যক্তিগত উৎসব।

আর দুর্গা আসেন দিক দিগন্ত আন্দোলিত করে। আকাশ বাতাস প্রকৃতিতে সাড়া পড়ে যায়। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশে এতটাই স্বচ্ছতা ছিলো যে, ঋতুর হিসেব রাখতে হতো না মানুষকে। প্রকৃতিই দরজায় টোকা দিয়ে জানিয়ে যেতো বিভিন্ন ঋতুর খবর। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের এমনই আত্মীয়তা ছিল।
হঠাৎই একদিন ভোরবেলা শিউলির গন্ধ ভেসে এলো। আকাশের দিকে চোখ তুলে দেখি ছাই রঙের মেঘকে সরিয়ে দিয়ে  নীলরঙ আকাশের দখল নিয়েছে। ঝকঝক করছে আকাশ। তার মাঝে মাঝে মেঘের তুলো ধুনে দিয়েছে কোনো যাদু ধুনকার। স্কুলে যাওয়া আসার পথে  রাস্তার দু'পাশে যেখানে ছোট ছোট ঘাস জমি, খেলার মাঠ ছিল,দেখি সেখানেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কাশফুলের। এতদিন কোথায় ছিল ওরা কে জানে? কে ওদের জানিয়ে দিল এটা তোমাদের সময়। যেখানে যেমন খুশি ফুটে উঠতে পারো …।
শুরু হয়ে গেল শিউলি ফুল কুড়োনোর ধুম। সে ফুল পুজোর জন্যে যতটা না, তার চেয়ে বেশি যেন সাজি ভরে আনন্দ কুড়োনো। ভোরবেলায়, তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি,আমার প্রিয় বন্ধু রেহানা এসে ঘুম ভাঙাতো। ওদের ঘরে পুজো ছিল না, তবে একজন ঠাকুর ছিল। রবীন্দ্র্নাথ। মালা গেঁথে তাকেই পরাতো। শুধু শিউলি কুড়োনোর জন্যে একটা বাঁশের সাজি কিনেছিল কোন এক মেলা থেকে। শরৎকাল এলে শিউলিতলা ওকেও তো ডাকতো। রেহানাও জানতে চাইতো, হ্যাঁ রে পুজোর আর ক'দিন বাকি ? ওদের কাছেও দুর্গাপুজো মানেই শারদীয় উৎসব। বাঙালির উৎসব।

 আমরা সমবয়সী দু'তিনজন বন্ধু মিলে বেরিয়ে পড়তাম ফুল কুড়োতে। সবুজ ঘাসের ওপর ঝরে থাকা রাতের তারা যেন। বাড়ির কাছেই একটা পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল, যেটা একসময় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া কোন পরিবারের ছিল, পরে সরকারি কৃষিবিভাগের আঞ্চলিক অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে বিরাট একটা শিউলিফুলের গাছ ছিলো, যার মাথা একতলা ছাড়িয়ে প্রায় দোতলা্র ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। যার চিড় ধরা বাকলে বয়সের ছাপ। সেই চেরা বাকলের খাঁজে খাঁজে শুঁয়োপোকা থিক থিক করতো। চারদিক পাঁচিল ঘেরা বাড়িটার একটা অংশের ভাঙা পাঁচিলের ফোকল দিয়ে ঢুকতাম আমরা। ওই বয়সে  আমরাই যেন দিনের ঘুম ভাঙাতাম। নিয়ম করে ভোরবেলায় শিউলি কুড়োতে কুড়োতেই একদিন ভোরবেলায় “বাজলো তোমার আলোর বেনু”-র সুরে মহালয়ার সকাল দিয়েই একদিন পুজোর সূচনা হতো। মহালয়ার আগের দিন রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তাম,ভোরবেলায় উঠে 'মহিষাসুর মর্দ্দিনী' শুনবো বলে। একই অনুষ্ঠান, তবু যেন পুরোনো হতো না। প্রতি বছর নতুন রোমাঞ্চ নিয়ে শুনতাম।   
ফুল কুড়িয়ে এনে প্রয়োজন ছাড়াই মালা গাঁথতে বসতাম, লম্বা হলুদ বোটা কিছুটা নখ দিয়ে কেটে বাদ দিয়ে দিয়ে মালা গাঁথতাম, তাতে মালাটা দেখতে ভালো লাগতো,আর নখ হলুদ হয়ে যেতো, আর নাকের কাছে হাতটা নিলে খুব সুন্দর একটা গন্ধ পেতাম। ওই গন্ধটাই আমার কাছে পুজোর গন্ধ। আমার  শারদীয়া।

একজন লোক ছিল , আজ আর তার নামটা মনে নেই। তার কাজ ছিল বর্ষাকাল বাদে সারা বছর ভোরবেলায় রাস্তা দিয়ে 'রাই জাগো...' গাইতে গাইতে যেতো। রাই জাগুক না জাগুক আমাদের ঘুম ভাঙতো তার সুরে। মনে হতো প্রতিদিন জীবনটা নতুন শুরু হচ্ছে।তো শরৎকাল এলেই তার গান পালটে যেতো। এবার তার গলায় উঠতো আগমনী –'যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা আমার দুঃখে রয়েছে...' বুঝতে পারতাম পুজোর আর দেরি নেই। আমাদেরও মনের মধ্যে ছুটির বাঁশি বেজে উঠতো। বহুবার শোনা এই প্রচলিত গানটা  শুনে তখন মন কেমন করতো। মনে হতো আহা রে ঘরের মেয়ে পরের ঘরে বড় কষ্টে আছে। মা ঠাকুমারা দুর্গাকে নিজেদের ঘরের মেয়েই কল্পনা করতেন। বৎসরান্তে সে ঘরে ফিরছে। ঠাকুমা বলতেন, 'যুদ্ধ টুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে মায়ের বাড়ির আদর নিতে আসছে। অতগুলো দেবতা তাদের কারো ক্ষমতা হলো না অসুরকে জব্দ করে, সেই মেয়েটাকেই দায়িত্ব নিতে হলো'... শুনতে শুনতে খুব গর্ব হতো।

এই সময় টানা অনেকদিন ছুটি হতো স্কুলে। তবে দু'হাত যেমন উপচে উঠতো ছুটির আনন্দে, তেমনি মাথায় চেপে থাকতো স্কুলের 'ছুটির কাজ'এর বোঝা। বাধ্যতামূলক  সেই কাজগুলোর ফাঁক ফোকর ভরে থাকতো শিউলি ফুলের গন্ধে। পুজো পুজো আনন্দে।   

আমাদের ছোট মহকুমা শহরে হাতে গোনা গুটি কয় পুজো হতো। তার মধ্যে আমাদের পাড়ার পুজো তো সব অর্থেই সর্বজনীন।  অনাড়ম্বর কিন্তু আন্তরিক । পুজোর ক'দিন গোটা পাড়াটাকে মনে হতো একটা পরিবার।  
          
আমাদের বাড়ির ঠিক পাশে, চারু বাবুদের ফেলে যাওয়া বাড়ির সামনের ফাঁকা জমিতে পাড়ার একমাত্র বারোয়ারি পুজো হতো। নবীন পালের হাতে মা দুর্গার খড়ের শরীর তৈরি হতে না হতেই প্রতিদিন সকাল থেকে ক্লাসের বই খুলে নিয়ে জানালায়। বই থাকতো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, আমার চোখ থাকতো নবীনপালের দুটো হাতের শিল্পকর্মে। ওই খড়ের কাঠামোর মধ্যেই দিব্যি দেখতে পেতাম দশভূজাকে। যে কোনো গঠনশৈলী আজন্ম আমাকে চুম্বকের মতো টানে, সে কুমোরের চাক হোক, বা তাঁতির তাঁত, কিংবা শিল্পীর তুলি। চোখের পলক ফেলতাম না। আমিই যেন চোখে চোখে একটু একটু করে পূর্ণমূর্তিতে রূপ দিতাম দেবীকে।

এখানেই অন্য দুই দেবীর সঙ্গে আমার দুর্গার পার্থক্য। লক্ষ্মী স্বরস্বতী দুজনেই নিজেদের প্রসাধন সেরে নিয়ে তবেই আমাদের ঘরে আসতেন। আর মা দুর্গা  মণ্ডপেই একটু একটু করে পূর্ণরূপে প্রাকশিত হতেন। মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল, কবে খড়ের ওপর মাটির প্রথম প্রলেপ পড়লো,কবে দোমাটি হলো, কখনই বা খড়িমাটি লাগলো। কবেই বা মাটির বাটিতে বাটিতে রঙ তৈরি করে রাখা হলো, কখনই বা চোখ আঁকা হলো,আর অমনি চোখ মেলে তাকালেন মা দুর্গা্। অঙ্কখাতার বাইরে এসব হিসেবও রাখতাম।

পঞ্চমীর দিন, দু'তিনজন সহকারীকে নিয়ে ঢাকি হাজির। ছোট খাটো  বয়স্ক মানুষটা বিশাল এক ঢাকের ভারে সামনে ঝুঁকে থাকতো। ভাবতাম ওর কষ্ট হচ্ছে, অথচ সারাক্ষণ হাসি লেগে থাকতো তার মুখে। ঢাকের গায়ে বাঁধা থাকতো একগুচ্ছ কাশফুল। যেখানে চোখ রাখি সেখানেই শরৎকাল।  

এরই মাঝে একদিন চেনা দরজিকাকু বাড়িতে এসে জামার মাপ নিয়ে যেতো।কিংবা আমরাই তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে কাপড় পছন্দ করে আসতাম। বাবার সঙ্গে গিয়ে বাটার দোকান থেকেই জুতোটা কিনতে হতো। আমাদের দু'বোনের আর এক প্রস্থ ফ্রক মা নিজে তৈরি করে দিতেন। তখন রেডিমেড পোশাক খুব একটা পাওয়া যেতো না।  মায়ের হাতের পোশাক সবসময় সবার থেকে আলাদা হতো বলে আমরা ওগুলোই বেশি পছন্দ করতাম। সপ্তমীর দিনটা মায়ের বানানো ফ্রক পরেই শুরু হতো মণ্ডপে যাওয়া। মনে আছে সকাল বেলায় স্নান-টান করে অপেক্ষা করছি, মা তখন অন্য কাজ ফেলে জামায় শেষ বোতামটা বসিয়ে দিচ্ছেন তড়িঘড়ি। আমার তর সইছে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মণ্ডপে পৌঁছোনো চাই। পুজোর প্রস্তুতির ছোট খাটো ফাই-ফরমাশ যদি আমার ওপর বর্তায়, সেটা একটা বিরাট সম্মান। সমবয়সীরাও সেই আশায় আগেই উপস্থিত। পাড়ার বাঁধা পুরোহিত সুধীর ভটচায্যি 'জননী বেলপাতা গুলোকে ত্রিপত্রী করো তো বসে বসে',( কর্মকর্তারা তো ডাল শুদ্ধু বেলপাতা এনে দিয়ে তাদের কর্তব্য সেরেছে) কিংবা 'ধুনুচিটা সাজাও তো মায়েরা'...সে যে কী আনন্দ ! বড় দিদিরা পদ্মকলি ফোটানোর দায়িত্ম পেতো। ভাবতাম কবে যে বড় হবো !

আমাদের পাড়ায় পঁচিশ তিরিশটি পরিবারের মধ্যে সাকুল্যে তখন আট ন'টি হিন্দু পরিবারের বাস। দেশভাগের পর বাড়ি বিক্রি করে, বা ফেলে রেখেই অনেকেই চলে গেছে ভারতে। কিন্তু তাতে নিজেদের কখনো সংখ্যালঘু মনে হয়নি। পুজোর সময়ও না। কারন অ-হিন্দু মানুষরাও তাদের সাধ্যমতো সাহায্য করতো। এই প্রসঙ্গে একটা ছোট ঘটনার কথা বলতেই হবে। ঘটনাটা তখন ছোট ও তুচ্ছ থাকলেও এখন ভাবনাতে বেশ বড় ছায়া ফেলে। কোনো বিভেদের অনুভূতি ছিল না। মনে আছে সেবার আমাদের পাড়ার পুজোর জন্যে সপ্তমীর দিন দেখা গেল,স্থলপদ্ম  খুব কম। রেহানাদের বাড়িতে একটা বড় স্থলপদ্মের গাছ ছিল। ও মণ্ডপে এসে ওটা শুনেই দৌড়ে বাড়ি চলে গেল। খানিক পরে প্রচুর ফুল সমেত একটা স্থলপদ্মের ডাল নিয়ে হাজির। নিজে ফুল স্পর্শ করবে না বলে এই ব্যবস্থা। মণ্ডপে উপস্থিত দু'তিনজন একটু মুখ চাওয়াচায়ি করছিল ফুলগুলো নেবে, কি নেবে না। ঠাকুর মশাই  একবার নিজের ফুলের ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে রেহানার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,'শিবের জীব'। তারপর ফুলগুলো নেওয়ার বিধান দিলেন। এই যে রেহানা জানে পুজোর ফুল ওকে ছুঁতে নেই,সেজন্যে ওর কিন্তু কোনো খেদ নেই। ও জানে ওটাই নিয়ম,ওটাই স্বাভাবিক। আমিও তাই জানতাম। তখন এতে দোষের কিছু দেখিনি। ভাবিওনি। শুধু কিছুদিন যাবৎ রেহানাকে 'শিবের জীব' বলে খেপাতাম। ও তাতে মজাই পেতো। এখন যখন ভাবি গ্লানি হয়।

মণ্ডপ তো ছিল সাদামাটা। কোনো থিমের বালাই ছিলো না।  বাঁশ দিয়ে ঘিরে কিছু রঙিন কাগজের ঝালর দিয়ে সাজানো।  প্রতিমাই প্রধান। সে মূর্তিও সেই আদি অকৃত্রিম তেজোদ্দীপ্ত অসুরদলনী দুর্গার।তিনি যতই ঘরের মেয়ে হোন, তাঁর শক্তির রূপ দেখে ভরসা পেতে চাওয়াই আসল কথা। অতগুলো দেবতা অসুরের হাত থেকে বাঁচার জন্যে যে মেয়ের উপর ভরসা করে আছে,সে তো সামান্যা নয়। এই রূপই তো পুজিতা হওয়ার যোগ্য।

শারদীয়ার সবটুকু আনন্দ যদিও পাড়ার মণ্ডপ থেকেই পেতাম, তবু তারই মধ্যে একদিন বাবা দুটো রিকশা ভাড়া করে দিতেন, সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে আশেপাশের সব ক'টা প্রতিমা দেখে  আনন্দের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরতাম। জানালা দিয়ে দেখতাম পাড়ার মন্ডপে তখনও হ্যাজাকের আলোয় কয়েক জন বসে গল্প করছে । পুরোহিতের সহকারী পরের দিনের পুজোর কিছু কাজ এগিয়ে রাখছে। মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম অতন্দ্র দশভূজার পায়ের কাছে ঝিমোচ্ছে পুরোহিত আর তার সহকারী।বন্ধুরা সবাই  ঝাঁক বেঁধে অষ্টমীর অঞ্জলি,  সবার উপর গলা তুলে মন্ত্রোচ্চারণ, যেন তবেই সেটা দেবীর কানে পৌঁছোবে। নবমীর বিষাদ, তারপর দশমীর বিসর্জনের বাজনা দিয়ে উৎসব হয়তো শেষ হতো । তার রেশ রয়ে যেতো আরো সাতদিন। বিজয়ার প্রণাম আর নাড়ু। প্রতিবেশি সব গুরুজনদের প্রনাম করতে যাওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। রেহানাও ওর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এসে আমার মা বাবা ঠাকুমাকে প্রণাম করে নাড়ু আর মিষ্টি গজা খেয়ে যেতো।

দশমীর দিন,বিসর্জনের আগে ঢাক কাঁসর আর সানাই মিলে একটা অদ্ভুত কান্না মেশানো সুর তুলতো। আমার সত্যি সত্যি কান্না পেতো। মায়েদের সিঁদুরে মিষ্টিতে শেষবার দেবীর বরণ... দেখতাম বরণ শেষে মা দুর্গার কানের কাছে মুখ নিয়ে মা কিছু  বলতেন , কী বলতেন ?  
 
'আসছে বছর   আবার এসো আনন্দময়ী...'

 

ছবিঃ মহাশ্বেতা রায়

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা