ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ভাল্লুক নিয়ে

সকাল বেলা ফড়িংয়ের চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেলো। বিছানায় উঠে বসে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাতে চোখে পড়লো শ্লেট রঙা গোমড়া মুখো আকাশ। মেঘ নেমে এসেছে ফিনফিনে বৃষ্টির চাদর জড়িয়ে। ঝলমলে রোদ্দুরটা কোথায় যে চলে গেলো কে জানে। এখন আগস্ট-এর মাঝামাঝি তবু এই নিত্যদিনের বৃষ্টি ভালো লাগে?

ফড়িং স্কুলের ছোট ক্লাসের বাচ্চাদের আয়া যশোদার মেয়ে। সারাদিন তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে বেড়ায়, কিন্তু এমন চ্যাঁচায় না তো কখনো। বেশীর ভাগ সময় আমাদের বাড়িতেই থাকে সে, শুধু রাত্তিরে বাড়িতে যায় শুতে। মায়ের কোল না হলে তার নাকি ঘুম হয় না।

আর দেরি না করে, তাড়াতাড়ি নাকে চশমা লাগিয়ে, পায়ে চটি গলিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেই, ফড়িং দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে বলে উঠলো, "দাদী, বাগানে কী কাণ্ড হয়েছে দেখবে চল।" আমি আমার স্কুলের সর্বজনীন দাদী। বললাম, চল দেখে আসি। ততক্ষণে আমার দুই নাতি মেহেল আর শমীকও বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। সবাই মিলে কাদা ভেঙে বাগানে গিয়ে দেখি সত্যিই একটা কাণ্ড ঘটেছে বটে। কাঁঠাল গাছের একেবারে নিচের দিকে মাটির কাছাকাছি যে কাঁঠালটা পাকতে শুরু করেছিলো সেটার অর্ধেকটা পরিস্কার করে খাওয়া। তার কোয়া বিচি এমন কী খোসাটা পর্যন্ত চাঁছাছোলা করে খেয়েছে। বাকিটা গাছেই ঝুলছে। এটা যে ভাল্লুকের কীর্তি তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কারণ ভাল্লুকটা বসে বসে আরাম করে পাকা কাঁঠালটা দিয়ে ডিনার সেরেছে, তার বসার ছাপ ভিজে মাটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে কিছু নখের আঁচড়ও রয়েছে। ততক্ষণে বাড়ির আর সবাই এসে গেছে। আমরা বলাবলি করছিলাম, চারিদিকে এতো আলো সত্ত্বেও ভাল্লুকটা কখন এলো, চৌকিদারও দেখতে পায় নি, বাকি কাঁঠালটার কী করা যায় ইত্যাদি। এমন ঘটনা অবশ্য এর আগেও যে হয় নি তা না। শীত কালের পর থেকে আমাদের স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে ভাল্লুকের আনাগোনা প্রায়ই হয়। পিছন দিকে একটা পাহাড়ি নালা আছে, বর্ষা কালে সেটা ফুলে ফেঁপে ওঠে, অন্য সময় পায়ের পাতা ডোবা জল থাকে। তার ওপারে কয়েকটা ছোট ছোট পাহাড়ি গুহা, সেখানে আছে কিছু ভাল্লুকদের ডেরা। তারা স্কুলের মাঠে মহুয়ার সময় মহুয়া খেতে ঢোকে, মহুয়া শেষ হয়ে গেলে উইয়ের ঢিপি খুঁড়ে উই খায়। কিন্তু কাঁঠাল ভক্ষণ এই প্রথম। হঠাৎ আমাদের কথা শুনে ফড়িং ফিসফিস করে বলল, "এবার কী হবে দাদী? ভাল্লুকটা যে সব খেয়ে গেল!" শমীক হো হো করে হেসে উঠে বলল, "কী আর করবি বল, এবার আর তোর কাঁঠাল আর খাওয়া হল না রে।"

অবশেষে সবাই মিলে স্থির করা হল কাঁঠালটা গাছেই ঝুলুক, রাত্তিরে যদি ভাল্লুকটা আসে তখন না হয় ওর ছবি তোলার চেষ্টা করা যাবে। চৌকিদারকেও বলা হল হুঁশিয়ার থাকতে, ভাল্লুকটাকে দেখতে পেলেই মোবাইলে ফোন করে জানিয়ে দেবে আমাদের। কিন্তু সে রাত্রে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ায় ভাল্লুকটা আসে নি, বোধহয় বেচারার ঐ বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছিলো না। ছেলে মিতুন বলল, "তোমার পাকা কাঁঠাল খেয়ে নিশ্চয় ওটার পেট খারাপ হয়েছে, তাই আসে নি।" কাঁঠালটা গাছেই ঝুলতে থাকলো।

পরের রাতে চাপাচুপি দিয়ে ঘুমোচ্ছি, আগের রাতে ভালো ঘুম হয় নি। রাত প্রায় একটা নাগাদ ছোট ছেলে রিশলু এসে ঘুম ভাঙিয়ে বলল, "মা, ভাল্লুকটা এসেছে। চল।" রিশলুর পেছন পেছন ন' বছরের নাতি মেহেলও উঠে এসেছে। দেখলাম, বাড়ি শুদ্ধু সবাই উঠে পড়েছে। রিশলু, মেহেল আর আমি সন্তর্পণে সামনের দরজা খুলে খোলা বারান্দাটায় এসে দাঁড়ালাম, বাকিরা ছোট ছাতে। রিশলু নিঃশব্দে আঙুল তুলে স্কুল অফিসের সামনের সিলভার ওক গাছের নীচটা দেখাল। দেখলাম, আধো অন্ধকারে ভাল্লুকটা আকাশের দিকে চার পা তুলে ঠিক কুকুরের মতো করে ঘুমোচ্ছে। আমি ভাবছিলাম ভাল্লুকদের ঘ্রাণ শক্তি তো খুব তীব্র হয়, আমরা এত জন দাঁড়িয়ে আছি ও বুঝতে পারছে না? এর মধ্যেই ভাল্লুকটা আমাদের দিকে মুখ করে উঠে বসলো। বড়বড় কালো লোমে ভরা, অন্ধকারে ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, গলার সাদা ভি-টা স্পষ্ট। রিশলুর ক্যামেরার শাটারের আওয়াজে ভাল্লুকটা পেছন ফিরে ঝামুর ঝুমুর করে ছোট গেটের দিকে দৌড়তে আরম্ভ করল তারপর ধুপ করে একটা আওয়াজ হল ছোট গেট ডিঙিয়ে লাফাবার। আমার নাতিরা ছোট থেকে এসব দেখতে অভ্যস্ত বলে এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এইবার মেহেল বলল, "ঠাম্মা, আমি তো তোমার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাল্লুকটা আমাকে দেখেই ভয় পেয়ে পালিয়েছে।" আমি হেসে বললাম, "বীর পুরুষ!"

পরের দিন আমার নাতিরা স্কুলে বন্ধুদের কাছে কত বড় হিরো হয়ে উঠেছিল জানি না। এরপর ক'মাস কেটে গেছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি। শীত টোকা মারছে দুয়ারে, সকাল বিকেলে হাল্কা শাল সোয়েটার পরতে হচ্ছে... সকালের রোদটাও ভালোই লাগছে। মুম্বই থেকে আমার ছোট বোন আর কলকাতা থেকে আমার বোনপো দেবু ও তার ছেলে বাঘা এসে পড়েছে সপ্তাহ খানেকের জন্যে। বাড়িতে হৈ হৈ কাণ্ড চলছে, কবে কোথায় যাওয়া হবে, কোথায় পিকনিক করা হবে, এই সব প্ল্যান হচ্ছে। তিন নাতি মিলে বাড়ি মাথায় করছে। রবিবার ঠিক হল মহুয়া তলায় পিকনিক হবে, মেনু – ভাত, পাঁঠার মাংস, চাটনি আর মিষ্টি। সেদিন নাতিদের কী উৎসাহ, কাঠ আনা, কাঠ কাটা, হাতে হাতে কাজ করে দেওয়া, ওদেরই দিন। গাছের নিচে চাটাই বিছিয়ে খাওয়া শেষ হতে হতে বেলা তিনটে প্রায়। রাত নামতে লোহার গ্রিলে কাঠ কয়লার আগুন জ্বালিয়ে আমার বউমা বসে গেল মুরগির রোস্ট করতে খোলা বারান্দায়। বাইরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, গ্রিলের গনগনে আগুনের চারদিকে প্লেট হাতে নিয়ে গোল হয়ে সবাই বসে আছে। বউমা সবাইকার প্লেটে প্লেটে গরম গরম মুর্গি তুলে দিচ্ছে আর দেবু নানা রকমের গল্প বলে চলেছে। দেবু দারুণ গল্প বলতে পারে, সবাই তার গল্প শুনছে সঙ্গে খাওয়াও চলছে।

রাত বারোটা বাজে, আমরা শোবার বন্দোবস্ত করছি। বাইরে তখনও গল্প গাছা চলছে, টুকরো টাকরা কথা ভেসে আসছে, হঠাৎ সব চুপ। মেহেল দৌড়ে এসে বলল, "ঠাম্মা, দিলু চাচা বলছে বড় গেটের বাইরে নাকি একটা ভাল্লুক শুয়ে আছে। বাপি, কাকা জেঠু সবাই দেখতে গেছে। আমরা যাই?" মেহেলের পেছন পেছন বাঘা আর শমীকও দাঁড়িয়ে লাইন দিয়ে। দিলু আমাদের রাতের চৌকিদার, সেও দাঁড়িয়ে। বললাম, "যাও, কিন্তু ঠাণ্ডা লাগিও না।" কথা শেষ হবার আগেই দে দৌড়। আমরা দুই বোন আর বেরোলাম না। খানিক পরে মেহেল এসে বলল, "ঠাম্মা, ভাল্লুকটা এখনও শুয়ে আছে।" বোন বলল, "এখনও ঘুমোচ্ছে? তুই দেখলি?" ও বলল, "হ্যাঁ, সাদা রঙের নাকটাও দেখলাম।" ধন্ধে পড়লাম, কালো ভাল্লুকের সাদা নাক? একটু পরে আবার মেহেল বড় বড় চোখ করে জানালো, ছবি তুলে জুম করে কাকা দেখেছে ভাল্লুকটার দুটো শিঙ আর লম্বা একটা ল্যাজ দেখা যাচ্ছে। আমি হেসে ফেলে বললাম, "সে কী রে?" ততক্ষণে বাকিরা সবাই হাসতে হাসতে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বেরিয়ে গিয়ে দিলুকে বললাম "হ্যাঁরে, গুরু মশাইরা গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করে। তুই ভাল্লুকের মাথায় শিঙ আর পেছনে ল্যাজ জুড়ে গরু বানিয়ে দিলি?"

সবাই যখন শুতে গেলাম তখন রাত গড়িয়ে এসেছে।


ছবিঃ মঞ্জিমা মল্লিক

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা