ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

নানারকমের কথা তো এতদিন হল। এবার ? আচ্ছা, চুম্বকের কথা একটু বললে কেমন হয় ।

সেটাই বলি না হয়। চুম্বক দেখেছ ত ? আলাদা করে চুম্বক না দেখে থাকলেও, ফ্রিজের গায়ে লাগানোর জন্য তৈরি 'ফ্রিজ ম্যাগ্‌নেট' এর কথা প্রায় সবাই জানে, তাই না?

অশ্বক্ষুরাকৃতি চুম্বক
অশ্বক্ষুরাকৃতি চুম্বক

আমাদের ছোটবেলায় দেখতাম, মুদিখানার দোকানদার খুচরো পয়সা রাখার পাত্রে একটা ছোট অশ্বক্ষুরাকৃতি চুম্বক রেখে দিত। সিকি বা আধুলি কেউ দিলেই চুম্বক বের করে দেখে নিত, চুম্বক পয়সাটিকে টানছে কিনা। চুম্বক পয়সাকে টানবে কেন, সেটা জানতে চাইছ ত ? কারনটা হল সিকি বা আধুলিতে এমন ধাতু থাকত সে সময়, যাকে চুম্বক আকর্ষন করে। আকর্ষন করলে মুদ্রাটি সঠিক, না হলে নকল! অনেকে সীসার তৈরি জাল(নকল আর অচলও) মুদ্রা ব্যবহার করে দোকানদারকে ঠকাতো, যা খালি চোখে প্রায়ই ধরা যেত না! তাই আসল না নকল এটা ধরার জন্যই চুম্বক ব্যবহার করা হত। এখন অবশ্য পরিক্ষা করে দেখা হয় না, কারন এখনকার মুদ্রায় সেই ধাতুগুলো রাখা হয় না যা চুম্বক দিয়ে চেনা যাবে!

একটা চুম্বকের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত একটা সেফটিপিন চুম্বকের গা বরাবর টেনে নিয়ে যাও, প্রথমে দেখবে চুম্বক সেফটিপিনকে আকর্ষন করছে। তবে সর্বত্র সমানভাবে নয়, দু'প্রান্তে বেশী মাঝে কম। প্রান্তদুটোকে বলে চুম্বকের মেরু।

আচ্ছা, "অশ্বক্ষুরাকৃতি" কথাটা কি নতুন শুনলে ? আসলে, এই চুম্বকটা দেখতে অনেকটা অশ্বক্ষুরে পরানো নালের আকারের অর্থাৎ U-আকৃতির, তাই নাম Horse-shoe magnet বা অশ্বক্ষুরাকৃতি চুম্বক বা U-চুম্বক। এছাড়াও আছে আরও নানা ধরনের চুম্বক, যেমন বার(দন্ড)চুম্বক,চুম্বক শলাকা, রিং বা গোলাকার ইত্যাদি। প্রয়োজন মাফিক বানিয়েও নেওয়া হয়ে থাকে। এমন বানিয়ে নেওয়া তড়িৎচুম্বকও আছে।

একটা চুম্বকের দুটি মেরু থাকে। দন্ড চুম্বক নিয়ে বললে বুঝতে সুবিধা হবে বলে সেটা নিয়েই বলি। তোমাদের বিজ্ঞানের বইতে চুম্বকের কথা পড়েছ আর এর ছবি দেখেছো নিশ্চয়ই। চুম্বকের দন্ডটির ঠিক মাঝখানে এক খন্ড সুতো বেঁধে ঝুলিয়ে দিলে দেখা যাবে কিছুক্ষন এদিক ওদিক দুলে উত্তর-দক্ষিন দিকে মুখ করে স্থির হয়ে দাঁড়াবে। এখন আর একটা চুম্বক ঐ ঝুলন্ত চুম্বকের কাছে নিয়ে এলে সেটা আর স্থির থাকবে না, যেটা নিয়ে আসা হল তার অবস্থানের সাথে ঝুলন্তটাও নড়া-চড়া করবে। কি নিয়মে ?

চুম্বকের কথা
চুম্বকের দুই মেরু

এই সব চুম্বকের দুপ্রান্তে ইংরাজিতে N আর S লেখা আছে, N মানে উত্তর মেরু আর S মানে দক্ষিন মেরু। হাতের চুম্বকের N মেরু ঝুলন্ত চুম্বকের N মেরু কাছে আনলে ঝুলন্ত চুম্বকটি দুরে সরে যাবে, (বা ঐ চুম্বকের N-দিকটাই মাত্র সরে যাবে, পুরো চুম্বকটা নয় বা সুতোকে কেন্দ্র করে ঘুরে যাবে) অর্থাৎ বিকর্ষন (Repulsion)হবে, আবার S-এর কাছে S আনলেও একই ঘটনা ঘটবে বা বিকর্ষন হবে। কিন্তু N-এর কাছে S-মেরু আনলে আকর্ষন(Attraction) হবে, মানে কাছে সরে আসবে। তাহলে বলাই যায় সম মেরু(একই ধর্মের মেরু,দুটোই উত্তর বা দুটোই দক্ষিন মেরু) পরস্পরকে বিকর্ষন করে আর বিষম মেরু(বিপরীত ধর্মী মেরু) আকর্ষন করে!

N আর S নাম হল কি করে ? আসলে N মানে হল North seeking pole আর S মানে South seeking pole, বাংলায় বললে হবে উত্তর সন্ধানী মেরু আর দক্ষিন সন্ধানী মেরু। কিন্তু বার বার seekingবা সন্ধানী কথাটা বলা পছন্দসই নয় একদম (এতবড় কথা পছন্দ হয় তাড়াতাড়ির সময়?), তাই সেটা হয়ে গেল North-pole আর South-pole । এর পর আরও ব্যবহারে দাঁড়ালো N-pole আর S-pole বা শুধু N আর S ।

তাহলে একটা গোলমেলে কথা মনে আসে না ? সুতো দিয়ে চুম্বককে ঝোলালে সে উত্তর-দক্ষিন হয়ে দাঁড়াবে কেন, পুব-পশ্চিমই বা হবে না কেন ? তাহলে ত এটাই বলা যায় আকর্ষ-বিকর্ষন যা হওয়ার, সবই উত্তর-দক্ষিনের ব্যাপার, পুব-পশ্চিমের নয়।

পৃথিবীর উত্তর দিকে ত উত্তর মেরুই আছে বলে ধরা হচ্ছে, তাহলে ঝুলন্ত চুম্বকের যে মেরু উত্তর মেরু দেখাচ্ছে, সে আসলে দক্ষিন ধর্মী,কারন বিষম মেরু আকর্ষন করে,আকর্ষন করে বলেই না উত্তরমুখি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লিখছি N-মেরু, তাই উত্তর সন্ধানী মেরু। আর একই ভাবে ঝুলন্ত চুম্বকের S-মেরু হল উত্তরধর্মী, তাই সে আবার দক্ষিন সন্ধানী মেরু।

আবার এমনও তো বলা যায় যে উত্তর দিকে নিশ্চিতই দক্ষিন মেরুর ধর্ম রয়েছে বা উত্তর দিকটা আসলে দক্ষিন মেরু, দক্ষিন দিকটা হবে উত্তর মেরু ! আবার বলছি এটা খুবই গোলমেলে ব্যাপার।

জাহাজে একটা যন্ত্র থাকে যাকে বলে কম্পাস। এর কি কাজ জান ? দিগ্‌ভ্রান্ত নাবিকদের পথ দেখানো। সমুদ্রে গিয়ে ডাঙ্গা থেকে দুরে গেলে দিক ভুল করার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, কেননা চারি দিকে শুধু জল আর জল! কোনটা কি দিক সেটা ঠাহর করা খুব মুশকিল! সে সময়ে একটা কম্পাস থাকলে বুঝতে খুব সুবিধা। কম্পাসে একখানা চুম্বক থাকে যে সর্বদা উত্তর-দক্ষিন দিক নির্দেশ করে। দুটো দিক জানা হয়ে গেলে বাকিগুলো জানতে কোন অসুবিধা নেই। (স্কুলের বইতে কম্পাস সম্পর্কে পড়ে থাকবে, তাই আর সেটা নিয়ে কিছু লিখছি না)।

কম্পাস
কম্পাস

কিন্তু এতেও আবার একটা গোলমাল আছে। পৃথিবীর ভৌগলিক উত্তর দিক আর চৌম্বক উত্তর দিক বা ভৌগলিক দক্ষিন আর চৌম্বক দক্ষিন একই বিন্দু নয়। দিক নিয়ে মোটামুটি একটা আন্দাজ পেলেও সঠিকভাব মিলে যায় না। পৃথিবীর ভৌগলিক দক্ষিন মেরু আর ভৌগলিক উত্তর মেরু জুড়ে দিয়ে যদি একটা দন্ড কল্পনা করা যায়, সেই দন্ড পৃথিবীর উত্তর দিককে যেখানে ফুঁড়ে বেরোবে সেটাই সঠিক উত্তর মেরু। চুম্বকের উত্তর মেরু কিন্তু সেটা নয় মোটেই, একটু তফাতে থাকে! তাহলে আমরা কম্পাসের সাহায্যে যে দিক বার করলাম, সেটা কি সঠিক উত্তর বা দক্ষিন মেরু হল ? আসলে আমরা যেটা বার করলাম সেটা হল চৌম্বক মেরু, সঠিক উত্তর দিক নয়। তাহলেও আন্দাজ ত পাওয়া যায়। এটাই লাভ।

আর কল্পিত আগের সেই দন্ড যদি উত্তর মেরু ফুঁড়ে বাড়তেই থাকে তাহলে সে দন্ড এক সময় ধ্রুবতারাকে ভেদ করে যাবে। এই কাল্পনিক দন্ডকে ঘিরে পৃথিবী ঘুরতে থাকে। এই কাল্পনিক দন্ডটাই পৃথিবীর অক্ষ। (তেমনি চৌম্বক অক্ষের কথা ভাবলে সেটা কিন্তু ভৌগলিক অক্ষের সাথে মিলে যাবে না বা একই হবে না)। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের যে কোন জায়গা থেকে ধ্রুবতারাকে লক্ষ্য করলে নিশ্চিতভাবেই উত্তর দিক সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় কারন ধ্রুবতারা পৃথিবীর অক্ষের ওপর অবস্থিত হওয়ায় উত্তর গোলার্ধের সব জায়গা থেকে নিজের নিজের অবস্থান অনুসারে একই স্থানেই দেখা যাবে। ধ্রুবতারা কিন্তু দক্ষিন গোলার্ধ থেকে দেখা যায় না। (কেন, সে সম্পর্কে ভুগোল বইতে পড়বে)। তাছাড়া, রাতে তারা দেখা গেলেও দিনের বেলা কি হবে ? ধ্রুবতারা কোথায় পাওয়া যাবে ? এক্ষেত্রে কম্পাস ছাড়া কোন গতি নেই। কম্পাসে একটা বাটির মত পাত্রে অনুভুমিকভাবে একটা চুম্বক রাখা থাকে, যা সর্বদা উত্তর-দক্ষিনমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, জাহাজের যে কোন অবস্থাতেই সে সর্বদা উত্তর দিক নির্দেশ করে।

আর একটা ব্যাপার দেখা গেছে যে পৃথিবীর আওতায় দীর্ঘদিন নাড়া চাড়া না করে লোহার খন্ড রেখে দিলে সেটা চুম্বক হয়ে যায়। এটা তোমাদের বাড়িতেও চুম্বক থাকলে, দেখতে পাবে যে খুব শক্তিশালী চুম্বকের আওতায় পিন বা সেফটিপিন রাখলে সেগুলো চুম্বক হয়ে যায়। আর এই চুম্বকের মেরুর বিন্যাস কেমন হবে জান? কাছের মেরুটা হবে বিপরীতধর্মী আর দুরেরটা সমধর্মী। মানে কি হল ? সেফটিপিনের যে প্রান্ত চুম্বকের উত্তর মেরুর কাছে থাকবে সে দক্ষিন হয়ে যাবে আর দুরেরটা হবে উত্তর মেরু। এই ঘটনাকে বলে "চৌম্বক আবেশ"। পৃথিবীর ওপর রাখা কোন লোহা, চুম্বক হয়ে গেলে তার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার হবে. ।

গিম্বল ব্যবস্থা
গিম্বল ব্যবস্থা

কম্পাস নিয়ে আর একটু বলি। কম্পাসে একটা অসুবিধা হত আগে। কম্পাসকে (চুম্বক রাখা বাটিটাকে) জাহাজের গায়ে আটকে রাখলে, যখন ঝড় হয়, তখন তার জন্য বা অন্য কোন কারনে বড় বড় ঢেউ হয় তখন ত জাহাজ দোলে, ফলে কম্পাসে রাখা চুম্বকও ত দুলবে, তাই সর্বদা অনুভুমিক থাকবে না আর তাতে সঠিক দিকও নির্দেশ করতে পারবে না। তাই দুললেও যাতে এই অসুবিধা না হয় তার জন্য একটা ব্যবস্থা করা হয় যাকে বলা হয় "গিম্বল" ব্যবস্থা (Gimbal arrangement)। এটা সব জাহাজেই করা থাকে। এই ব্যবস্থা করলে জাহাজ যতই দুলুক কম্পাস যথারীতি অনুভুমিকই থাকবে। এই ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে হলে স্কুলের দাদা-দিদিদের কাছে জানতে পারবে বা দেখে নিতে পারবে। ওরা পরীক্ষাগারে(Laboratory) নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দেবে। স্যারদেরকেও বলা যায়।

চুম্বকের সাথে তড়িতের, যাকে বলে গলায় গলায় ভাব। যে জেনারেটার যন্ত্রে বিদ্যুৎপ্রবাহ উৎপন্ন হয় তাতে চুম্বক না থাকলে হতই না। এমন আরও অনেক কিছু, যেমন টিউব (ফ্লুওরেসেন্ট) লাইটের চোক, পাখার মোটর, অ্যাম্পলিফায়ারের বা রেডিওর স্পিকার ইত্যাদি সবেতেই চুম্বক অপরিহার্য। আরও অনেক অনেক কিছুতে আছে চুম্বক!

অনেক কিছু বলার আছে চুম্বকের বিষয়ে তবে সে সব এখন আর বলছি না। সেগুলি আরেকটু বড় হয়ে বুঝলে, বেশি ভাল করে বোঝা যাবে। আজ এই পর্যন্তই।


ছবিঃ উইকিপিডিয়া

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা