খেলাঘরখেলাঘর

তারকাদের আবির্ভাব

বায়োস্কোপের বারোকথা

(আগের সংখ্যার পর)

স্বাধীনতার পরে পরে, আরো একটা মস্ত ঘটনা ঘটে বানিজ্যিক ছবির, মানে যে ছবি আমরা হই হই করে দেখতে যাই, সেই দুনিয়ায়। আর তা হল যাঁদের তারকা বা স্টার বলা হয় , এমন একজন বা দুজনের আবির্ভাব। এইখানে, আমাদের একটু ভাবতে হবে, উত্তমকুমার কি করে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, এবং জীবনের শেষদিকে প্রায় নিজেই টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ার জলছবি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া চৌধুরী, মাধবী মুখোপাধ্যায় ও আরো পরের নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর করা ছবি এখনও ঘরে ঘরে আলোচিত হয়। লোকের মুখে মুখে ফেরে এমন ছবির নাম হল 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', ' সাড়ে চুয়াত্তর', 'সাত পাকে বাঁধা'- এইসব।

উত্তমকুমার
উত্তমকুমার


উত্তমকুমার কেন এত বড় নক্ষত্র বা স্টার হয়ে উঠতে পারলেন? নিশ্চয়ই বড় অভিনেতা বলে, কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। ছবি বিশ্বাস বা তুলসী চক্রবর্তীও তো খুব বড় অভিনেতা, কিন্তু তাঁরা তো আর 'স্টার' নন। উত্তমকুমার খুব আটপৌরে বাঙালির মত দেখতে ছিলেন। নায়কেরা যেরকম অসাধারণ সুন্দর হয় সেরকম কিছু নয়। আর সেখানেই তাঁর জোর। তাঁকে দেখলেই আমাদের পাশের বাড়ির ছেলে, দাদা অথবা খুব মাইডিয়ার কাকু মনে হয়। মনে হয়, জীবনের যে কোন ঝড়জলেই তিনি হটাত করে এসে আমাদের সমস্যার একটা সমাধান করে দেবেন, সে আমি ছবির নায়িকাই হই, অথবা ছোট কোন চরিত্রই হই। স্বাধীনতার পরে যখন বাঙালি জীবনে নানারকম বিচিত্র ও জটিল সমস্যা দেখা দিল, তখন উত্তমকুমারকে আমাদের প্রয়োজন ছিল। কারণ, তাঁর মুখ দেখলে মধ্যবিত্ত সমাজের হাজার হাজার মানুষের মনে হত, রাস্তায় যতই রোদ্দুর থাক, শরীরে যতই ঘাম ঝরুক, শেষ পর্যন্ত মুখে অমলিন হাসি নিয়ে উত্তমকুমার তো আছেনই। তাঁর অভিনীত গল্পে এই নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল। পন্ডিতেরা একে ক্যারিশ্‌মা (charisma) বলেন। আসলে পঞ্চাশের দশকে দেশ দুই টুকরো হয়ে যাওয়ায়, গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, তখনকার যুবক যুবতীদের জন্য যে ধরনের রূপকথার প্রয়োজন ছিল, উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন, রাজপুত্তুর ও রাজকন্যা হয়ে সেই প্রয়োজনের উত্তর দিতে পারতেন। এই জন্যই 'শাপমোচন' ছবিতে যখন গ্রামের ছেলে উত্তমকুমার শহরে এসে হেমন্ত মুখার্জীর গলায় গান গেয়ে একেবারে মাত করে দিলেন, তাঁর সেই জয়টাকে সেযুগের বাঙালী ছেলেমেয়েরা নিজেদের জয় বলে ভাবতে পেরেছিল। সুচিত্রা সেন ও প্রথম উত্তমকুমারের সাথে মিলে এখনকার বন্ধুত্ব ও মধুর সম্পর্কের বিষয়ে একটা ধারণা আমাদের দিয়েছিলেন।

সুচিত্রা সেন
সুচিত্রা সেন


আর কি ছিল যেই সোনার যুগ! উত্তমকুমারের গলায় গান গাইতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র ও মান্না দে। মেয়েদের গলায় ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, পরের দিকে আরতি মুখোপাধ্যায়। হাসাতেন তুলসী চক্রবর্তী তো বটেই, আর ভানু আর জহর তো এখন কিংবদন্তী হয়ে গেছেন। আর ছোটখাট চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করতেন, তাঁরাও সত্যি বড় অভিনেতা। এমনকি নামজাদা নায়ক ছাড়াও একটা ছবি সফল হয়ে যেত, যেমন 'পলাতক' - অনুপকুমার যার নায়ক, অথবা 'গল্প হলেও সত্যি' - দেখতে বেশ খারাপ রবি ঘোষ যার প্রধান চরিত্র। শুধুমাত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অথবা মান্না দে'র গলার গুণে একেকটা ছবি সুপারহিট হয়ে গেছে, যেমন 'মনিহার', 'শেষ পর্যন্ত', 'অ্যাণ্টনি ফিরিঙ্গি' । সেই সময়ে টেলিভিশন ছিল না, পরিবারগুলিও এত ছোট ছোট ছিল না। সেইযুগে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল একটা মুক্তি- যেমন ধর পরীক্ষার পরে সিনেমা দেখতে যাওয়া হত। তখন সিনেমা দেখা ছিল একটা উতসব, যেমন বাড়িতে নতুন জামাই এলে । এই যে সবাই মিলে হলে যাওয়া, ছবির শেষে কড়াইশুঁটির কচুরি আর নলেনগুড়ের সন্দেশ খেয়ে বাড়ি ফেরা, সেজদা সেলুনে উত্তমকুমারের মত ইউ ছাঁট চুল ছেঁটে বাড়িতে ফিরে জ্যাঠামশাইয়ের কাছে কানমলা খাচ্ছে, অথবা ছোড়দি চুপিচুপি ছাদের কোণে প্র্যাকটিস করে নিচ্ছে -"মালতী মধুপে হল মিতালী..." সিনেমা ছিল এরকমই। মধ্যবিত্ত জীবনের জানালা দিয়ে দেখা এক টুকরো আকাশ...

হায়! সেই মায়াঝরা সন্ধ্যা!


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক
চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবিঃ উইকিপিডিয়া

তোমার বন্ধুদের জানাও

FacebookMySpaceTwitterDiggDeliciousStumbleuponGoogle BookmarksRedditNewsvineTechnoratiLinkedinMixxRSS Feed

তোমার মতামত

ইচ্ছামতী শীত সংখ্যা ২০১২ কেমন লাগছে জানাও ইচ্ছামতী ব্লগের এই পাতায়