ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

প্রকৃতি, এবং প্রাণীকুল বাদ দিয়েও একটা দেশের সম্পর্কে জানতে পরিচিত হতেই হয় সেই দেশের মানুষদের এবং তাঁদের কর্মকান্ডের সঙ্গে। এসো জেনে নিই আর্জেন্টিনার কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে, যাঁদের কাজ আজকের আর্জেন্টিনাকে তার নিজস্ব পরিচিতি দিয়েছে।

আর্জেন্টিনা
ওপরে, বাঁদিক থেকে ডান দিকঃ ফ্রান্সিস্কো মোরেনো, সিসিলিয়া গ্রিয়ারসন, ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো
মাঝে, বাঁদিক থেকে ডান দিকঃ লুই ফেদেরিকো লেলোয়া, খুলিও কোর্তাসার, এভা পেরোন
নিচে, বাঁদিক থেকে ডান দিকঃ খোর্খে লুইস বোর্খেস, চে গেভারা, পোপ ফ্রান্সিস

ফ্রান্সিসকো মোরেনো (Francisco Moreno)(১৮৫২-১৯১৯) উনবিংশ শতাব্দীর এক বিখ্যাত প্রকৃতিবিদ ও অভিযাত্রী। দেশের প্রথমদিকের এক নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে তিনি আর্জেন্টিনা ও চিলির সীমানা সংক্রান্ত বিতর্কের নিষ্পত্তির দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রথমদিকের একটি অভিযান ছিল রিও নিগ্রো (Río Negro Territory) অভিযান। এরপর বহু বছর ধরে নানা দুঃসাহসিক অভিযানে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। শেষজীবনে তিনি রাজনীতি ও জনশিক্ষার প্রসারে নিজেকে যুক্ত করেন। লা প্লাতা মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি (La Plata Museum of Natural History)-এর প্রতিষ্ঠাতা এই মানুষটি।

সিসিলিয়া গ্রিয়ারসন (Cecilia Grierson)(১৮৫৯-১৯৩৪) আর্জেন্টিনার প্রথম মহিলা যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। মেডিকাল স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়ে তাঁকে লিখে জানাতে হয় কেন তিনি চিকিৎসক হতে চান। পড়াশোনা চলাকালীন তিনি স্বেচ্ছাসেবী নার্স হিসাবে কাজ করতেন। সেই সময়েই প্রথম ঘন্টা লাগানো অ্যাম্বুল্যান্সের কথা তাঁর মাথায় আসে। তার আগে অবধি শুধুমাত্র দমকলে ঘন্টা বাজানো হত। সিসিলিয়া আর্জেন্টিনার প্রথম নার্সিং স্কুল এবং প্রথম ফার্স্ট এইড সোসাইটি স্থাপন করেন; চিকিৎসাবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বই লেখেন, এবং কিনেসিওলজি (kinesiology -the science of human movement) চর্চার পথিকৃৎ ছিলেন। মজার ব্যাপার হল, সেই সময়ের আইন অনুসারে, সিসিলিয়ার পেশাদার চিকিৎসক হিসাবে কাজ করা অপরাধ বলে গন্য ছিল। কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নি। মেয়েদের সার্বিক উন্নত জীবনযাত্রার জন্য আরোও নানা কাজকর্মে জড়িয়ে ছিলেন।

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (Victoria Ocampo)(1890-1979)ছিলেন একজন সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। ' বিশুদ্ধ আর্জেন্টিনীয় নারী'- এই শিরোপা তঁকে দিয়েছিলেন বোর্খেস। নিজের সমসাময়িকদের মধ্যে সবথেকে সুপরিচিত দক্ষিণ আমেরিকান নারী ছিলেন ওকাম্পো। তিনি শুধু নিজেই লিখতে না, তিনি অন্যান্য লেখকদের উৎসাহ দিতেন এবং কড়া সমালোচক ছিলেন। তিনি 'সুর' নামক বিখ্যার সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশ করতেন। দেশবিদেশের সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। দক্ষিণ আমেরিকা সফরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছুদিন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অতিথি হয়ে ছিলেন।

লুই ফেদেরিকো লেলোয়া (Luis Federico Leloir)(১৯০৬-১৯৮৭) আর্জেন্টিনার এক নোবেলজয়ী চিকিৎসক ও বায়োকেমিস্ট। সুগার নিউক্লিওটাইড, কার্বোহাইড্রেট মেটাবলিজম, রেনাল হাইপারটেনশন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে এবং গ্যালাক্টোসেমিয়া নামে একটি জন্মগত রোগের নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে আলোকপাতে সাহায্য করে। ১৯৭০ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ।

খুলিও কোর্তাসার*(Julio Cortazar)(1914-1984) ছিলেন এই দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যিক। ১৯৬০-৭০ এর দশকগুলিতে সারা দুনিয়ায় স্প্যানিশ সাহিত্য নিয়ে যে প্রবল উৎসাহ জাগে,সেই সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার স্প্যানিশভাষী মানুষদের মনে তিনি গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি ইউনেস্কোর অনুবাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।

এভা পেরোন (María Eva Duarte de Perón) (১৯১৯-১৯৫২) ছিলেন আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি খুয়ান পেরোনের স্ত্রী। অত্যন্ত গরিব পরিবারের মেয়ে এভা খুবই অল্প বয়সে গ্রাম থেকে বুয়েনস আইরেসে চলে আসেন অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ঘটনাক্রমে কয়েক বছর পরে খুয়ান পেরোনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এভা পেরোন শ্রমিকদের অধিকার এবং মহিলাদের ভোটাধিকার নিয়ে সরব হন, এবং আর্জেন্টিনার মহিলারা ১৯৪৭ সালে প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। আর্জেন্টিনার খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে এভা ছিলেন 'স্পিরিচুয়াল লিডার অফ দ্য নেশন' । এই উপাধি আর্জেন্টিনা আজ অবধি একমাত্র এভাকেই দিয়েছে। তাঁর জীবন কাহিনি নিয়ে তৈরি হয়েছে মিউজিক্যাল ছায়াছবি 'এভিটা' ।

আর্জেন্টিনার সাহিত্যজগতের এবং স্প্যানিশ ভাষায় সাহিত্যের এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব হলেন খোর্খে লুইস বোর্খেস* (Jorge Luis Borges)(১৮৯৯ -১৯৮৬)। প্রখর কল্পনাশক্তি ও প্রতিভার অধিকারী এই সাহিত্যিক একাধারে ছিলেন কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। বোর্হেস এর হাত ধরে স্প্যানিশ এবং লাতিন আমেরিকার সাহিত্যচর্চা আলাদা মত্রা পায়।

চে গেভারা(Che Guevara)(১৯২৮-১৯৬৭), কিংবদন্তী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস ও সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠার ব্রতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি আর্জেন্টিনারই মানুষ। ডাক্তারির ছাত্র হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজের সূত্রে দেখা দারিদ্র্যের চেহারা তাঁর চেতনায় বৈপ্লবিক চিন্তাধারার জন্ম দেয়। কিউবার বিপ্লবের সময়ে এবং তার পরে সেখানকার অর্থনীতি ও দেশের সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনেকখানি। তাঁর কৃতিত্ব এতটাই, যে, টাইম ম্যাগাজিনের 'বিংশ শতাব্দীর ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব'দের তালিকায় তাঁর নাম রাখা হয়।

পোপ ফ্রান্সিস (১৯৩৬-), প্রথম ইউরোপের বাইরের মানুষ হিসেবে ২৬৬ তম পোপ নির্বাচিত হন ২০১৩ সালে, তিনিও আর্জেন্টিনার মানুষ। মানবিকতার জন্য সারা বিশ্ব তাঁকে শ্রদ্ধা করে। দরিদ্র মানুষের সেবায় ও বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষজনের মধ্যে শান্তির বাণী প্রচারের দ্বারা মেলবন্ধন ঘটাতে তিনি অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন।

আর্জেন্টিনা সম্পর্কে আপাতত এটুকুই। আরোও অনেকের সম্পর্কে , অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা- তাও বাকি রয়ে গেল। কেমন লাগল আর্জেন্টিনা সম্পর্কে আমাদের এই নিবন্ধটি? জানিও আমাদের।


(* বিভিন্ন নামের বানানগুলি রয়্যাল অ্যাকাডেমী স্পেন প্রণীত, ২১টি দেশে মান্য ব্যকরণ ও উচ্চারণবিধি অনুযায়ী লিখিত;
তথ্য সৌজন্যঃ জয়া চৌধুরী, স্প্যানিশ শিক্ষক এবং অনুবাদক)

গ্রাফিক্স ও অতিরিক্ত তথ্য সংযোজনঃ মহাশ্বেতা রায়

নিচে রইল ইচ্ছামতীতে এর আগে প্রকাশিত আর্জেন্টিনার একটি গল্পের লিঙ্কঃ

উলের গল্প

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা